সর্বশেষ কোন ম্যারাথনে অংশ নিলেন?
তপনতোষ চক্রবর্তী: এই মার্চেই টোকিও ম্যারাথন করেছি। এটি বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ সাতটি অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের (এডব্লিউএমএম) একটি। অন্য ছয়টি হলো বস্টন ম্যারাথন, লন্ডন ম্যারাথন, নিউইয়র্ক সিটি ম্যারাথন, বার্লিন ম্যারাথন, শিকাগো ম্যারাথন ও সিডনি ম্যারাথন। ২০১২ সালে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান অ্যাবট ল্যাবরেটরিজ এই সিরিজ চালু করে। ২০২৫ সালে আমি এই সাতটি এডব্লিউএমএম সম্পন্ন করি। টোকিও ম্যারাথনে পঞ্চম ‘সিক্স-স্টার মেডেল’ অর্জন করেছি। বিশ্বের মূল ছয়টি মেজর (সিডনি বাদে) শেষ করলে একটি সিক্স-স্টার মেডেল দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের নিউইয়র্ক সিটি ম্যারাথন শেষে অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরস কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চার বা তার বেশি সিক্স-স্টার মেডেল অর্জনকারী দৌড়বিদদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ।
ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজর কতবার শেষ করেছেন?
তপনতোষ চক্রবর্তী: টোকিও ম্যারাথন আমার ৩৫তম ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজর। সাত মহাদেশে এ পর্যন্ত মোট ৭০টি ম্যারাথন ও আলট্রাম্যারাথন সমাপ্ত করেছি। এর মধ্যে চারটি ছিল অ্যাডভেঞ্চার ম্যারাথন—এভারেস্ট ম্যারাথন, বিগ ফাইভ ম্যারাথন, কমরেডস ম্যারাথন ও অ্যান্টার্কটিকা ম্যারাথন। টানা তিন বছর বছরের সব কটি মেজর শেষ করার কৃতিত্ব অর্জন করেছি—২০২৩ ও ২০২৪ সালে ছয়টি করে এবং ২০২৫ সালে সাতটি। ৭৫ বছর বয়সে এটি অত্যন্ত দুঃসাধ্য ও বিরল অর্জন। বিশেষ করে, ২০২১ সালে হৃদ্রোগসহ (এইচএমটিজি) আরও তিনটি বয়সজনিত অসুখ ধরা পড়ার পরও।
আর এ বছর?
তপনতোষ চক্রবর্তী: ২০২৬ সালে সাতটি ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরেই নিবন্ধিত আছি। পাশাপাশি কেপটাউন ম্যারাথনেও অংশ নেব, যা অষ্টম মেজর হিসেবে মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে আমার লক্ষ্য ৯টি ম্যারাথন।
কীভাবে শুরু হয়েছিল আপনার দৌড়জীবন?
তপনতোষ চক্রবর্তী: ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ভীষণ টান ছিল। একবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে নিতে মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। হঠাৎ বই বন্ধ করে বেরিয়ে পড়লাম। যতক্ষণ পারলাম দৌড়ালাম, তারপর হাঁটতে হাঁটতে ফিরলাম। ফিরে এসে দেখি মাথা পরিষ্কার। আবার পড়ায় মন বসে গেল। এরপর মাঝেমধ্যে এমন করতাম। ফিট থাকতে ফুটবল ও ভলিবল খেলতাম।
পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বুয়েট) ভর্তির পরও নিয়মতি ভলিবল ও ফুটবল খেলেছি। এরপর কানাডায় চলে এলাম। ১৯৮৯ সালে এক্সনের (বর্তমানে এক্সনমবিল) অভ্যন্তরীণ নিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে যাই। সেখানে সহকর্মী ড. জন লঙ্গো ও রয় ব্রাউন দুপুরের প্রচণ্ড গরমেও দৌড়াতেন। দৌড়ের আগে ও পরে তাঁদের মুখের পরিবর্তন আমাকে ভাবাত। তখনো মনে করতাম, ম্যারাথন দৌড়বিদেরা একটু পাগল! কিন্তু তাঁদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে রাতে নিজের বাসার আশপাশে ২০–৩০ মিনিট দৌড়ানো শুরু করি।
বয়স ৫০ হওয়ার আগে আগে ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম—একটি ম্যারাথন দৌড়াব। প্রশ্ন করেছিলাম নিজেকে, ‘ওরা পারলে আমি কেন পারব না?’ স্থির করলাম—ভ্যাঙ্কুভার ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথনে অংশ নেব। ২০০০ সালের ৭ মে ম্যারাথনের দিন প্রথম ৩২ কিলোমিটার ভালোই গেল। তারপর রোদ চড়ল, শরীর কাঁপতে লাগল। তবু শেষ পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করি। প্রথম ম্যারাথনের জন্য এটি সম্মানজনক সময়। কিন্তু পরে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। বিমানবন্দরে অন্যদেরও আমার মতো কষ্টে হাঁটতে দেখে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—ম্যারাথন আর না।
কিন্তু পাঁচ দিন পর ব্যথা ভুলে গেলাম, মনে রইল শুধু অভিনন্দন। খুঁজতে লাগলাম পরের ম্যারাথন। ২০০১ সালের ক্যালগেরি ম্যারাথনে অংশ নিলাম। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্টফোর্ড ম্যারাথনে দৌড়ালাম। সময় হলো ৪ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ৩১ সেকেন্ড, প্রথম ম্যারাথনের চেয়ে ১২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড কম।
২০০৪ সালে অংশ নিলাম নিউইয়র্ক সিটি ম্যারাথনে। লাখো দর্শকের উল্লাসে অনুপ্রাণিত হয়ে ৪ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে শেষ করি। সেদিন গলায় ঝুলেছিল একটি পদক, ৪২.২ কিলোমিটার ম্যারাথনের পদক। যে ম্যারাথন পরে অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ২০১৯ সালে আমার প্রথম সিক্স-স্টার মেডেলের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে ওঠে।
এভারেস্ট বেজক্যাম্পেও তো দৌড়েছেন?
তপনতোষ চক্রবর্তী: হ্যাঁ, ২০১৩ সালের ২৯ মে। তখন আমার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সাতটি মহাদেশের প্রতিটিতে অন্তত একটি করে ম্যারাথন করা। এশিয়া মহাদেশের জন্য বেছে নিই তানজিং হিলারি এভারেস্ট ম্যারাথন। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অনুষ্ঠিত ম্যারাথন হিসেবে পরিচিত। এভারেস্ট বেজক্যাম্প থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় নামচে বাজারে।
অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
তপনতোষ চক্রবর্তী: অতি উচ্চতায় অক্সিজেনস্বল্পতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কাঠমান্ডু থেকে ১৯ দিনের এই যাত্রার উদ্দেশ্যই ছিল ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেওয়া। আমরা ১৭টি দেশের ১৩৬ জন দৌড়বিদ অংশ নিই। লুকলা বিমানবন্দর থেকে আমরা ৯ দিন ধরে ট্রেক করে বেজক্যাম্পে পৌঁছাই। শেরপাদের রান্না করা খাবার খেতাম, পাহাড়ি লজে রাত কাটাতাম। ছোটবেলা থেকেই আমার হৃদ্যন্ত্র দুর্বল। অতি উচ্চতায় শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো হয়ে পড়েছিলাম। এক সহদৌড়বিদ প্রধান শেরপাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি আদৌ ম্যারাথন শেষ করতে পারব কি না। শেরপা কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘ওকে দুর্বল দেখাচ্ছে, কিন্তু (দৌড় শেষ করার জন্য) যা দরকার, ওর ভেতরে তা আছে!’
বেজক্যাম্পে অস্থায়ী তাঁবুতে ছিলাম দুই রাত। এরপর শুরু হয় ৪২.২ কিলোমিটার দৌড়। ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতার বেজক্যাম্প থেকে নিচে ৩ হাজার ৪৪০ মিটার উচ্চতার নামচে বাজার পর্যন্ত নামি। মূলত নিচের দিকে নামার দৌড়ই ছিল সেই ম্যারাথন।
পরে তো অ্যান্টার্কটিকায় গেলেন...
তপনতোষ চক্রবর্তী: পরের বছর রাশিয়ার একটি অভিযাত্রী জাহাজে করে অ্যান্টার্কটিকায় গিয়েছিলাম। সেখানে দৌড়ানোর কাজটাও সহজ ছিল না। কানাডায় বরফ আর তুষারে অনুশীলন করলেও অ্যান্টার্কটিকায় গিয়ে বুঝেছি কাজটা কঠিন। অর্ধেক পথই দৌড়াতে হয়েছে পিচ্ছিল কাদার মতো বরফের ওপর দিয়ে। ২০১৪ সালের ১০ মার্চ ভোর তিনটায় দৌড় শুরু করে ৬ কিলোমিটার পার হতেই মাংসপেশিতে টান লাগে, কিন্তু থামিনি।
আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানতে চাই
তপনতোষ চক্রবর্তী: চাঁদপুরের মতলবে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এখন কানাডার ক্যালগেরিতে আছি। ১৯৮০ সালের নভেম্বর থেকে এখানেই বসবাস, মাঝখানে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে সাড়ে তিন বছর ছিলাম। এডমন্টনে আলবার্টা রিসার্চ কাউন্সিলে গবেষণা প্রকৌশলী হিসেবে অয়েল স্যান্ড থেকে বিটুমেন উত্তোলনের নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতাম। পরে ৩৫ বছরের বেশি সময় ক্যালগেরিতে ইম্পেরিয়াল অয়েল লিমিটেড (আইওএল) এবং হিউস্টনে তাদের মূল প্রতিষ্ঠান এক্সনমবিলে কাজ করেছি। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে উৎপাদনশীল উদ্ভাবক হিসেবে অবসর নিয়েছি।
আমি বিবাহিত। আমাদের দুই সন্তান—এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে সফটওয়্যার প্রকৌশলী। মেয়ে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অধ্যাপক।
আমার স্ত্রী মাধুরী চক্রবর্তীই মূলত আমাকে সময় করে দেয়, যাতে আমি নিয়মিত অনুশীলন করতে পারি। ২০১৫ সালে হার্টে স্টেন্ট বসানোর পর এক বছর পুনর্বাসনে ছিলাম। সেই সময় বাদে বাকি সময় দৌড়ে চলেছি।