নামচেবাজার থেকে ডোলে যাওয়ার পথে শুরুর দিকে পাইনবন খুব ঘন। ডোলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পাইনবন প্রায় শেষ হয়ে আসে। শেষের দিকে গাছগুলোর উচ্চতা কম। বনও পাতলা। হিমালয়ের এই অরণ্যে পাহাড়ি হরিণ দেখতে পাওয়ার কথা। আমরা চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে হাঁটি। কিন্তু যাওয়া বা আসার পথে কেউ কোনো হরিণ দেখতে পাইনি। সারা পথে নানা রকম পাখির ডাক শুনেছি। নেপালের জাতীয় পাখি মোনাল আর বেশ কয়েকটা বনময়ূর দেখেছি। আর দেখেছি পাহাড়ি ছাগল, খুবই স্বাস্থ্যবান আর বড়। প্রথমে কাছাকাছি অল্প কয়েকটা দেখি। তারপর দূরের ঝোপঝাড়ে দেখতে পাই অনেকগুলো, দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হরিণের মতোই তাদের গায়ের রং।

পাহাড়ি পথে দিনে ঘণ্টার ঘণ্টা ট্রেক করার পরিশ্রমও লক্ষ্যে পৌঁছানোর মতোই আনন্দের
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

তেজকে জিজ্ঞেস করি, এখানে তো একটু দূরে দূরেই ছোট লোকালয় দেখতে পাই। কেউ মারে না? তেজ জানায়, এমনিতেই ওরা বেশ নিরাপদে আছে। তা ছাড়া এই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর পাহারা রয়েছে। আছে চেকপোস্ট ও ক্যাম্প। একটু পরেই সেই ক্যাম্প এলাকা পার হই আমরা। ক্যাম্পের সৈনিকেরা আমাদের পর্যটনের অনুমতিপত্র দেখেন, হাসিমুখে স্বাগত জানান। কিন্তু সেখানে যথারীতি ছবি তোলা নিষেধ।

আরও পড়ুন

হিমালয়ের হাতছানি

আরও দুঘণ্টা হেঁটে ৪০৩৮ মিটার উচ্চতায় ডোলে পৌঁছাই। নামচে ছিল ৩৪৪০ মিটার, তার মানে ৬০০ মিটার উঁচুতে উঠে এসেছি। নামচে থেকে ডোলে পৌঁছাতে প্রায় সারা দিন লেগে গেল। এই যাত্রাপথে এক দিনে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ পথ—২৬ হাজার ৫০০ পদক্ষেপ। নামচে থেকে এখান পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছি সাত ঘণ্টায়। পাহাড়ি পথে চড়াই-উতরাই ধরে এক দিনে এই পরিমাণ ট্রেক করে এতটা ওপরে উঠে আসা সত্যিই কষ্টকর। কিন্তু দিন শেষে সেই শ্রান্তি ছাপিয়ে আনন্দটা অসামান্য হয়ে দেখা দেয়।

মাছেরমোতে ৪ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় আমাদের স্বাগত জানায় তাশিদেল লজ
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

যে কথা বলা হয়নি

আগেই বলা উচিত ছিল, লুকলা থেকে গোকিওর দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে গোকিও রি-র শিখর আরও ৪ কিলোমিটার। অর্থাৎ এবারের ট্রেকে আমাকে পায়ে হেঁটে, এই ৪৯-৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে ছয়-সাত দিনে। পার্বত্য পথে বন-পাহাড় ডিঙিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলে অন্তত দুদিন সেখানে থাকব। ফেরার সময় আবার এই দূরত্বটুকু পায়ে হেঁটে পার হতে হবে পাঁচ দিনে। সংক্ষেপে এই হচ্ছে এবারের ট্রেকে আমার লক্ষ্য। ওই পথ যাঁরা দেখেননি, হিমালয়ের পাহাড়ি পথে যাঁরা ট্রেক করেননি, তাঁদের পক্ষে দূরত্ব, উচ্চতা অথবা এই কদিনের ট্রেকের তাৎপর্য ঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এয়ারপোর্টে হেলিকপ্টারে

তেমনি যাঁরা বয়সে নবীন অথবা যাঁদের ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা বুঝতেই পারবেন না আমার জন্য এটা কত বড় চ্যালেঞ্জ। আমার মতো বেশির ভাগ মানুষ কোনো দিন গ্রামের মেঠোপথে কিংবা শহরের রাজপথে একটানা দুঘণ্টা হাঁটেনি। অফিসে, কারখানায়, বাড়িতে, গাড়িতে, হোটেলে, জাদুঘরে, বিমানবন্দরের লাউঞ্জে, প্লেনে, ল্যাপটপে, স্মার্টফোনে কেটে গেছে সারা জীবন। হঠাৎ ৬৩ বছর বয়সে ট্রেক করে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে (ইবিসি) পৌঁছে যাওয়া অথবা ৬৫ বছর বয়সে গোকিওর পথে ট্রেক করে চলার চেষ্টা করতে গিয়ে এমন মানুষের যে প্রাণান্তকর অবস্থা হয়, সেটা অন্য কেউ বুঝতেই পারবেন না। প্রতিদিনের ট্রেক শেষ হলে যে আনন্দ হয়, সেটাও অপরিসীম। এ কারণেই হয়তো ঢাকার বন্ধু-স্বজন ও ‘স্বাভাবিক’ মানুষেরা আমাকে কিঞ্চিৎ উন্মাদ ভাবেন।

তাশিদেল লজের লাউঞ্জে
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ওয়াই-ফাই কাজ করছে না

ডোলেতে আমার ঠিকানা ইয়েতি ইন। লজটার পাশে ঠিক একই আকারের অন্য একটা লজ দেখতে পাই। আমার ব্রিটিশ সহযাত্রীরা ওই লজে উঠেছে। নামচে থেকে এভারেস্ট লিংক কার্ড কিনেছিলাম বাকি সব পথের লজ ও রেস্তোরাঁতে ওয়াই-ফাই ধরার জন্য কাজে লাগবে বলে। এখানে এসে শুনলাম ওয়াই-ফাই কাজ করছে না। তাহলে বাড়িতে যোগাযোগ করব কীভাবে? প্রতিদিন বা দিনের শেষে যাদের খবর দেওয়া দরকার, তাদের কীভাবে জানাব?

নামচে থেকে এখান পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছি সাত ঘণ্টায়। পাহাড়ি পথে চড়াই-উতরাই ধরে এক দিনে এই পরিমাণ ট্রেক করে এতটা ওপরে উঠে আসা সত্যিই কষ্টকর

আগেই নেপালের সিম নিয়ে কথা বলা ও ডেটা ব্যবহারের একটা প্যাকেজ কিনে রেখেছিলাম। এখানে পাহাড়ের ওপরে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকবে, আশাই করিনি। তাই এভারেস্ট লিংক কার্ড কিনেছি, তা কাজ করছে না বলে তেজ একটু বিব্রত। এ অঞ্চলের সব বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও অসুবিধা ওর জানা। তেজ বলল, লজের বাইরে গিয়ে পাঁচ-সাত মিনিট হেঁটে একটা পাহাড়ের কিছুটা ওপরে উঠলে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে। এত উঁচুতে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে? আমাদের এমনই অভ্যাস, ফোন, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকে এতই আসক্তি যে ওই প্রবল শীতসন্ধ্যায় জ্যাকেট গায়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের উঁচুতে গিয়ে দাঁড়াই।

আরও পড়ুন

পাইনের বনে, পাহাড়ের পথে

আমাদের লজটা বেশ রিসোর্টের মতো। ঘরগুলো পার্বত্য অঞ্চলের অন্য সব লজের ছোট ছোট শোবার ঘরের তুলনায় বেশ বড়। বিছানায় ইলেকট্রিক ব্ল্যাঙ্কেট আছে। সেটা ঘুমের সময় ব্যবহার করব। আপাতত এসে লাউঞ্জে বসি। ফায়ারপ্লেসের আগুনের উষ্ণতা উপভোগ করতে করতে রাতের খাবার খেয়ে নিই। তারপর রুমে যাই। বাইরে শীত বাড়ছে কিন্তু এখানে আমার রাত বেশ আরামে কেটে যায়।

আরও পড়ুন

পর্বতারোহীরা কেন থামেন নামচে বাজার

পরের দিন ভোরে যথাসময়ে ডোলের ইয়েতি ইন থেকে যাত্রা শুরু। এই দিনের ট্রেক সম্ভবত সবচেয়ে ছোট। দূরত্ব কম হলেও উচ্চতা বাড়ছে। অনেকখানি চড়াই পার হতে হয়। ট্রেকারের সংখ্যা কম। জনবিরল পাহাড়ের উঁচুতে ওঠার সময় তেজের তোলা দু-একটা ছবিতে দেখি চারপাশের তুলনায় আমি কত ছোট। ভেবেছিলাম চার ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছে যাই। ৪৪৭০ মিটার উচ্চতায় মাছেরমো। মাছেরমোতে আমরা যেখানে থাকব, তার নাম তাশিদেল লজ।

তাশিদেল লজে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসেও ঠান্ডায় কম্পমান
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

পাথরের দেয়ালের বাইরে শীতল বাতাস

নামচেবাজার থেকে শীত বোধ করছিলাম। এখানে তা প্রবল হলো। সারাক্ষণ ডাউন জ্যাকেট পরে থাকতে হয়। তারপরও তীব্র শীত। বিছানায় ইলেকট্রিক ব্ল্যাঙ্কেট নেই। বাইরে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। কয়েক সপ্তাহ আগেও এই এলাকা তুষারে ঢাকা ছিল। এখন মে মাসের শুরুতে তুষার নেই, কিন্তু ঠান্ডা অনেক।

আরও পড়ুন

‘থ্যাংক ইউ, আমি তোমাকে বালোবাসি’

তারই মধ্যে তেজের তাড়নায় বিকেলে বেশ খানিকটা হেঁটে উঁচুতে উঠে আবার নেমে আসি। এটাই এ দিনের এক্লাইমেটাইজেশন হাইক। তেজ বড় কঠোর, সে বলে এটুকু কষ্ট না করলে শরীর খারাপ হতে পারে। দিনে রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এলে ও জানতে চায় আমি কি ঘুমিয়েছিলাম। দিনে ঘুমানো নিষেধ। এমনিতেও আমি দিনে শুতে চাই না। এখানে তো তার প্রশ্নই নেই।

ব্রিটিশ তরুণ-তরুণীদের ছয়জনের দল, ভারতীয় দুটি মেয়ে আর আমি—সবাই এই তাশিদেল লজে উঠেছি। আমাদের সঙ্গে আছে আমাদের গাইড ও পোর্টার। বিকেলে ও সন্ধ্যায় লাউঞ্জে বসে আমরা গল্প করি অনেকক্ষণ। বিকেল থেকেই সে ঘরে ফায়ারপ্লেস জ্বালানো হয়। সন্ধ্যায় খাওয়ার সময় পুরো ঘরটা গরম হয়ে ওঠে। অন্যান্য লজে যেরকম নির্দিষ্ট সময়ে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালানো হয়, তার তুলনায় এখানে আগুন জ্বলে অনেক আগেই।

আরও পড়ুন

৬৩ বছর বয়সে হিমালয় যাত্রা

প্রথমে শিবা এসে আগুনের পাশে বসে। জোহরার কাছে সে শুনেছে আমি ওষুধশিল্পে কাজ করেছি। এবার শিবার পেশাজীবনের গল্প শুনি। সে যে ওষুধের ট্রায়ালের কাজে ঢাকাতেও গেছে, সে কথা জানাতে ভোলে না। তারপর অবশ্য বেশির ভাগ গল্প ট্রেকিং নিয়ে। কে কোন পথে কোন গন্তব্যে যাব, তা নিয়ে যেমন গল্প হয়, তেমনি গল্প হয় এর আগে কে কোথায় গিয়েছি তা নিয়ে। ইবিসি ট্রেকে যাওয়া ছাড়া আমার পুরোনো কোনো গল্প নেই। তার আগে তেমন কোনো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমার ছিল না, গৃহপালিত জীবনে ও হোটেল-লালিত পর্যটনে কোনো অভিযান কাহিনি থাকা সম্ভব নয়।

মাছেরমো থেকে দেখা সকালের থামশের্কু ও অন্যান্য পর্বতশিখর
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

জোহরা ও শিবা জানায়, প্রতি মাসে একটা দিন ওরা নিজের মতো করে ডে-হাইক করতে যায় বেঙ্গালুরু শহরের আশপাশে কোনো জায়গায়। বছরে একবার ছুটি নিয়ে দূর দেশে কোনো পাহাড়ে সোলো ট্রেক করে অথবা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেক করতে চলে যায়। জোহরার দুঃখ এই যে ডে-হাইক অথবা দূরের ভ্রমণে শিবা যতটা নিয়মিত, ও ততটা হতে পারেনি।

বেন-মাইকেলের দল রাতের খাবারের অর্ডার দেয় একটু দেরি করে। তখন আমার ও অন্যদের খাওয়া শেষ। কেউ আরাম করে বসে বই পড়ে। কেউ খেলাধুলায় ব্যস্ত। তেজ তার অক্সিমিটার দিয়ে আমার পালস ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন মেপে দেখে। রাতের এই সময়টাতে হিমালয়ের কোলে ফায়ারপ্লেস ঘিরে কজন মানুষ আর স্বপ্নের মতো অলীক একটা শান্ত-মধুর পরিবেশ। এ সময় তেজ ও আমার রুটিন হলো পরের দিনের ট্রেক, গতিপথ, পথের ধরন, কতক্ষণ লাগবে, কোথায়, কখন থামা হবে—এসব নিয়ে আলোচনা করা। আগেরবার তেজ ছোট করে বক্তৃতা দিত, আমরা চুপ করে শুনতাম, দু-একটা প্রশ্ন করতাম। এবার আমি একলা বলে অল্পেই কথা শেষ হয়ে যায়।

অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮৪ শতাংশে নেমে এলেও ওই উচ্চতায় তাকে মেনে নিতে হয়
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে গাইড ও পোর্টারদের খাবার দেওয়া হয়। তখন থেকেই শোবার ঘরের শীত নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সবার খাওয়া শেষ হলে ধীরে ধীরে নিভে আসে ফায়ারপ্লেসের আগুন। এখানে ওয়াই-ফাই কাজ করছে না। একটু পরে আমরা যার যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি। ফ্লাস্কভর্তি গরম পানি কিনে নিয়ে রেখেছি রুমে। কিন্তু সেই পানি ঠান্ডা হয়ে যেতে সময় লাগে না। রাতে হাড়কাঁপানো শীত। সত্যি সত্যিই শীতে কেঁপে উঠি। পাথরের দেয়ালের বাইরে শীতল বাতাস, পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ও অন্ধকার। সারা দিনের শ্রান্তি শরীরে নিয়ে আমি শুয়ে থাকি, শান্ত করে রাখি মন। একটু পরে বিছানা উষ্ণ মনে হয়। কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি, টের পাই না।