১৮ বছর আগে ব্রাজিলে জার্সি কিনতে গিয়ে যা হয়েছিল
ভেবেছিলাম, ব্রাজিলে পা দিয়েই দেখব বড় বড় বিলবোর্ডে তারকা ফুটবলারদের ছবি। পেলে-রোনালদোর দেশ বলে কথা! রিও ডি জেনিরোতে যাওয়ার উদ্দেশ্য যদিও ছিল ভিন্ন, কিন্তু ব্রাজিল নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় আসে ফুটবল; আর খোদ ব্রাজিলে পা দিয়েই চোখ-কান-মন ফুটবলের কোনো চিহ্ন খুঁজবে, তা কি আর অসম্ভব কিছু? কিন্তু বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত তো নয়ই, অন্য সময়ও পথঘাটে ফুটবলের কোনো ছিটেফোঁটা চোখে পড়েনি। তবে ছেলের জন্য ফুটবল জার্সি কেনা নিয়ে একটা ঘটনা ঘটেছিল, সেটাই মনে পড়ল এত বছর পরও।
সে অনেক দিন আগের কথা। ২০০৮ সালে শিশু-কিশোরদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্ব সম্মেলনে সংবাদকর্মী হিসেবে ইউনিসেফের আমন্ত্রণে যোগ দিতে গিয়েছিলাম ব্রাজিল (এটা শুনে প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক উৎপল শুভ্র পর্যন্ত আড়ে আড়ে তাকিয়েছিলেন!)।
আমার সঙ্গী ছিলেন ডেইলি স্টারের রাফাত বিনতে রশীদ। বাংলাদেশ থেকে সরকারি-বেসরকারি অন্য প্রতিনিধিরাও গিয়েছিলেন।
তখন বাংলাদেশে ব্রাজিলের কোনো দূতাবাস ছিল না। ভারতের দিল্লিতে পাসপোর্ট পাঠিয়ে তা আনতে হতো। ইউনিসেফের তৎকালীন ঢাকাস্থ কর্মকর্তা আরিফা শারমিনের সহযোগিতায় সবই হলো।
বহু দূরের যাত্রা। তারপর যেতে যেতে যেতে…ঢাকা থেকে দুবাই…দুবাই থেকে সাও পাওলো, সাও পাওলো থেকে রিও ডি জেনিরো।
আন্তর্জাতিক সম্মেলন। বহু দেশের বহু মানুষের আগমন। উদ্বোধন করেছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুই দফায় প্রেসিডেন্ট থাকা ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টির অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এরপর ক্ষমতার বাইরে কঠিন সময় পার করেছেন।
কী আশ্চর্য! এত বছর পর যখন ব্রাজিলের স্মৃতি লিখছি, তখন আবারও প্রেসিডেন্ট লুলা ক্ষমতায়। রাজা আসে রাজা যায়!
ব্রাজিলের সাধারণ মানুষ খুব অমায়িক। পথে অচেনা মানুষ দেখলেও হাসিমুখে স্বাগত জানায়। কিন্তু বাদ সাধে ভাষা। ইংরেজি মোটেও জানে না। তারা মূলত কথা বলে পর্তুগিজ ভাষায়। অল্প কিছু মানুষ স্প্যানিশ জানে। তাই হোটেলের অভ্যর্থনার দায়িত্বপ্রাপ্ত দু-তিনজন আর স্থানীয় সাংবাদিকেরা ছাড়া অন্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে মূলত আকারে-ইঙ্গিতে।
দোকানি হাত দিয়ে দুটি নাম দেখাচ্ছেন আর পর্তুগিজ ভাষায় কিছু বোঝাচ্ছেন। গাইড খোলাসা করলেন। বিপত্তিটা জার্সির উপকরণ বা সাইজে নয়। দোকানির শরীরী ভাষাটা এমন, ‘আরে ভাই, বোঝেন না কেন, কাকার হিসাব আলাদা।’
সেমিনারের বক্তব্য শুনেছি কানে অনুবাদ যন্ত্র লাগিয়ে। মনে আছে, সম্মেলনস্থানের বাইরের মাঠে প্রেসিডেন্ট নামলেন ছোট্ট একটা প্লেনে করে। ছোট মানে ছোটই। আমাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুই পাশে দুটি ডানা লাগালে যে রকম সাইজ হতো।
শহরের যানজট থেকে মুক্তি পেতে এই ছোট প্লেনেই তাঁর যাতায়াত। শুরুতেই ব্রাজিলের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা। সুরটা চেনা চেনা লাগল। আরে তাই তো, ফুটবল বিশ্বকাপে বদৌলতে এ সুর তো চেনাই!
সেমিনারের সময় শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে যায়, এর মধ্যে মিডিয়া সেন্টারে গিয়ে লেখা শেষ করে ঢাকায় অফিসে ফ্যাক্স করা (তখন লেখা পাঠানোর আর কোনো বিকল্প ছিল না)। কিন্তু এর মধ্যেও রিও শহর দেখা চাই। দেখলামও, আমাদের হোটেলের অভ্যর্থনার দায়িত্বে থাকা ইংরেজি জানা এক ভদ্রলোকের সহযোগিতায়।
ডিউটির বাইরেও ওই ভদ্রলোক গাড়ি চালিয়ে আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে গেলেন। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের নিদর্শন মেঘে ঢাকা ক্রাইস্ট দ্য রিদিমার দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। শহরের বুকে বিশাল প্রাকৃতিক উদ্যান ঘুরে বনের মাঝখানে বসে কফি খেলাম। উপভোগ করলাম আটলান্টিক মহাসাগর আর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সৌন্দর্য।
কাকার দাম বেশি
ফেরার আগে ছেলের জন্য একটা ব্রাজিলের জার্সি তো নিতেই হবে। ঝকঝকে বিপণিবিতানে জার্সি নেই। আমাদের গাইড নিয়ে গেলেন একটা স্ট্রিট মার্কেটে। ‘অতঃপর মিলিল বটে।’ নিয়ে নিলাম। রাফাত তখন হস্তশিল্পের একটা দোকানে কী যেন কিনছিল, ফিরে এসে বলল, ‘জার্সি পেয়েছ? কত?’
দাম বললাম। ও তখন বলল, ‘তাহলে আমিও একটা নিই।’
দোকানিকে বলা হলো আরেকটা দিতে। এবার ও আমার সমান দাম দিতে গেলেই দোকানি হাত দিয়ে দেখালেন আরও বেশি দিতে হবে।
আমরা বললাম, একই তো জার্সি। দোকানি নাছোড়বান্দা। বেশি নেবেনই। পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলেন, রাফাত বাংলায়, ‘কেন দিবা না? ওকে দিছ, আমাকে কেন দিবা না? আমি কেন বেশি দেব?’
দোকানি হাত দিয়ে বোঝাচ্ছেন, আরও বেশি দিতেই হবে। দুজনের কাছে দুই দুর্বোধ্য ভাষা, কেউ কারও কথা বুঝছে না। বেশি টাকা নেওয়ার যুক্তিও বোঝার উপায় নেই। একই জার্সি।
এবার ডেকে আনা হলো আমাদের গাড়ির চালক কাম গাইডকে। তিনি আসার পর দোকানি আমার হাতের প্যাকেট থেকে জার্সি বের করে উল্টো করে বিছালেন, তারপর রাফাত যেটা নিয়েছিল, সেটাও উল্টো করে রাখলেন। সম্ভবত আমারটার পেছনে লেখা ছিল রোনালদিনহো, রাফাতেরটার পেছনে কাকা।
দোকানি হাত দিয়ে দুটি নাম দেখাচ্ছেন আর পর্তুগিজ ভাষায় কিছু বোঝাচ্ছেন। গাইড খোলাসা করলেন। বিপত্তিটা জার্সির উপকরণ বা সাইজে নয়। পেছনে যে খেলোয়াড়ের নাম লেখা, তার বর্তমান মর্যাদা, দামের ওপরেই জার্সির দাম নির্ধারিত।
দোকানির শরীরী ভাষাটা এমন, ‘আরে ভাই, বোঝেন না কেন, কাকার হিসাব আলাদা।’
পরে উৎপল শুভ্রর কাছ থেকে জেনেছি, আগের বছরই কাকা ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। জিতেছিলেন ব্যালন ডিঅর। হতে পারে সেটাই কারণ!
ব্রাজিল থেকে ফিরে কত কিছুই ভুলে গেছি, কত দিন আগের কথা, কিন্তু একজন ফুটবলার তাঁর মর্যাদা, তাঁর কীর্তির ছোঁয়া একজন সাধারণ দোকানির মধ্যেও কীভাবে ছড়িয়ে দেন, সেই গল্প ভুলিনি আজও।