কেপ ভার্দের ম্যারিয়েনের জন্য অভিনন্দন
কেপ ভার্দে দেশটা আমি চিনতামই না। যখন চিনলাম, তখন ২০২৪ সালের জানুয়ারি। সেই থেকে এ দেশের একজনের নামই আমি জানি—ম্যারিয়েন।
গতকাল ১৫ জুন রাত, অর্থাৎ ফুটবল বিশ্বকাপে স্পেনের সঙ্গে কেপ ভার্দে ড্র করার পর থেকে ম্যারিয়েনকে মনে মনে কতবার যে অভিনন্দন জানিয়েছি, তা যদি তিনি জানতেন! একজন সাধারণ মানুষ কী করে একটা দেশের হয়ে যায়, সেই গল্পই বলি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে পরিবারের সঙ্গে গিয়েছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে। যা হয়, এ–বাড়ি ও–বাড়ি পাড়া বেড়ানোর মতো লং আইল্যান্ড, বোস্টন হয়ে রোড আইল্যান্ড গেলাম বন্ধুর বাড়িতে।
আমাদের বন্ধু তাপস, সেখানকার মেয়রের অফিসে কাজ করে আর গান নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ–বিদেশ। বর্ষীয়ান মা আর ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। ওর মা আমাদের অঞ্জলী পিসি। লড়াকু নারী। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে একাই মানুষ করেছেন চার সন্তান। অকালে চলে গেল তাপসের স্ত্রী নীতা। অতঃপর পিসি এসে নাতির জীবনে রানি (দিদাকে তাপসের ছেলে এই বলেই ডাকে) হয়ে রইলেন।
পিসির বয়স হয়েছে, প্রায়ই চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হয়। যদিও মানসিকভাবে হেরে যাওয়ার পাত্র তিনি নন। কিন্তু বয়স্ক মানুষের সেবাযত্ন তো অপরিহার্য। মা–ভক্ত তাপস দুশ্চিন্তায় থাকে।
সেবার গিয়ে দেখলাম, সরকার থেকেই পিসির জন্য একজন কেয়ার গিভার আসেন। দিনের একটা সময় পর্যন্ত পিসির সঙ্গে থাকেন। হাসিখুশি ভদ্রমহিলা গাড়িটা পার্ক করে রেখে বরফে ঢাকা চিলতে মাঠ পেরিয়ে জুতায় ভরা বরফকুচি ঝাড়তে ঝাড়তে দরজার ওপাশ থেকেই পিসির সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন।
পিসিও বান্ধবীর মতো বলতে থাকেন, ‘আগে গরম চা খাও…।’ ভদ্রমহিলা এসেই ওভারকোট খুলে কাজে লেগে পড়েন। পিসির খাবার গরম করা, বিছানা পরিপাটি করা, ওষুধ খাওয়ানো আর গল্প করতে করতে উচ্চ স্বরে হেসে পরিবেশটা আনন্দময় করে তোলেন। সবটা মিলেই একটা পারিবারিক আবহ। মাঝেমধ্যে পিসি বাংলায় কথা বললেও ম্যারিয়েন ঠিক বুঝে যান, কী চান তিনি।
আমার সঙ্গে পরিচয় হলো ম্যারিয়েনের। একপর্যায়ে বললেন, ‘তোমার দেশের খাবার খুব ভালো, গান খুব মিষ্টি। আমি এখানে খেয়েছি, শুনেছি।’
তারপর বললেন, ‘আমার দেশ কেপ ভার্দে, তুমি চেনো?’
সংকোচ বোধ করলাম। কিছুই যে জানি না! পাশের ঘর থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে সৃজন জোরে বলে উঠল, ‘আফ্রিকার এই দেশের রাজধানীর নাম প্রাইয়া। তোমাদের পতাকাও আমি চিনি। ইউনেসকোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটা ঐতিহ্যবাহী জায়গা আছে ওই দেশে।’
ভদ্রমহিলার চোখ চকচক করে উঠল, ‘তুমি আমার দেশের এত কিছু জানো?’
আবেগে হাত ধরল ছেলের। তারপর তিনি তাঁর ফোন বের করে এটা–সেটার ছবি দেখাতে লাগলেন ছেলেকে। তাঁর দেশ সম্পর্কে দূরদেশের একটা ছেলে এত কিছু জানে, এটা তাঁর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। এরপর দুজনে গল্প জুড়ে দিল। আমি মনে মনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
ফেরার দিন বেশ খানিকটা পথ এসে আবিষ্কার করলাম, পাসপোর্টের ব্যাগটাই ফেলে রেখে এসেছি আমরা। ট্রেনে নিউইয়র্কে ফিরছি। আবার উল্টো পথে গেলে অবধারিত ট্রেন ফেল। ঘাম ছুটে গেল।
এরপর বন্ধু তাপসের একটা ফোনেই ম্যারিয়েন তাঁর গাড়ি করে ব্যাগটা পৌঁছে দিয়ে গেলেন স্টেশনে। এ শুধু সম্পর্কের দান! দেশে ফিরে ম্যারিয়েনের জন্য একটা দেশি উপহার পাঠালাম। তাপস সেটার সঙ্গে ম্যারিয়েনের ছবি তুলে পাঠাল। ম্যারিয়েন অধ্যায় শেষ। বদলে গেছে পিসির কেয়ার গিভার।
ছেলের মতো নানা দেশের ভূগোল–ইতিহাসের খোঁজ রাখার শখ আমার নেই। স্বীকার করতে দ্বিধাও নেই, আমার কাছে কেপ ভার্দে মানেই ছিল ম্যারিয়েন। বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে খেলছে, এই খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে ম্যারিয়েনকেই মনে পড়েছে আবার।
আর শক্তিশালী স্পেনের সঙ্গে খেলার প্রধমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর আমার আর ছেলের খেলা দেখার উৎসাহ বেড়ে গেল। ম্যারিয়েনের দলের গোলরক্ষকের জন্য জোর সমর্থন দিয়ে খেলা দেখতে লাগলাম।
অতঃপর ম্যারিয়েনের জন্য অভিনন্দন। ম্যারিয়েন যদি তা জানতেন! একটা একক মানুষ কীভাবে একটা দেশের মুখ হয়ে গেল। অচেনা দেশ, অচেনা মানুষ, কীভাবে আপন হয়ে উঠল।