নস্টালজিয়া-ড্রিভেন ট্রিপ কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে
নস্টালজিক জায়গাগুলোতে বারবার ফিরে যাওয়া—ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে এ প্রবণতা; যাঁরা প্রতিবছর একই জায়গায় বেড়াতে যান, একই হোটেলে ওঠেন, একই ক্যাফেতে কফি খান, আগে আসা কোনো রেস্তোঁরায় বসে একই খাবার অর্ডার করেন। বিবিসি ট্রাভেল স্টোরিজ ভ্লগ এ প্রবণতার নাম দিয়েছে নস্টালজিয়া-ড্রিভেন ট্রিপ, স্মৃতিতাড়িত সফর। একই জায়গায় ফিরে ফিরে যেতে কেন আমাদের এত ভালো লাগে?
বিয়ের দুই মাসের মাথায় আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম দার্জিলিং। দুজনেরই তখন নতুন চাকরি, নতুন সংসার। মনে পড়ে, এক মুড়ির টিন বাসে করে রংপুরের পাটগ্রাম হয়ে সড়কপথে গিয়েছিলাম চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত, তারপর শিলিগুড়ি হয়ে শেয়ারের জিপে দার্জিলিং। উঠেছিলাম ম্যালের কাছে মাঝারি মানের এক হোটেলে।
দার্জিলিংয়ের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, আলোকোজ্জ্বল ম্যাল, টয় ট্রেন আর মেঘের রাজ্যে বসবাস হৃদয়ে গভীর এক ছাপ ফেলেছিল। রোজ বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে ম্যালে এসে একটি বেঞ্চে বসতাম, শীতল হাওয়া জেঁকে ধরত, সামনেই ছিল একটি বইয়ের দোকান। মাঝের খোলা চত্বরটাতে কত রকমের মানুষ দেখতাম বসে বসে।
কখনো গ্লেনারিজে বসে কফি খেতাম, হঠাৎ মেঘ এসে ঘিরে ফেলত চারদিক। ঘন মেঘ আর বৃষ্টির কারণে সেবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাইনি। দার্জিলিংয়ের বিখ্যাত সূর্যোদয় না দেখার আফসোস নিয়েই ফিরে আসতে হয়েছিল।
১৬ বছর পর ২০১৭ সালে একটি কনফারেন্সে গোয়া যাব বলে ভিসা নিয়ে দূতাবাস থেকে বেরিয়ে দেখি, ফুটপাতে পা মচকে গোড়ালির হাড় ভেঙে ফেলেছে স্বামী! অগত্যা যাত্রা বাতিল। পুরো এক মাসের বেডরেস্ট, পায়ে প্লাস্টার।
আমাদের আর গোয়া যাওয়া হলো না। অনেক উদ্বেগ আর মানসিক চাপ পেরিয়ে সে বছর ডিসেম্বরে সন্তানদের স্কুল ছুটি হলে দুজনেই ভাবছিলাম—উফ, কয়েক দিনের জন্য কোথাও ঘুরে এলে বেশ হতো।
সামনে বড়দিন, তারপর নিউ ইয়ার। ছুটি ছুটি আমেজ। ভাঙা পা–ও একটু ভালোর দিকে। কোথায় যাওয়া যায়? মনে পড়ল ভিসার মেয়াদ তো আছে এখনো। দুজনেরই প্রথম যে জায়গাটার কথা মনে এল, তা হলো দার্জিলিং!
ছেলে–মেয়ে, মা–বাবাসহ ঝটিকা পরিকল্পনা করা হলো। এবার বিমানে ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে শিলিগুড়ি। উঠলাম ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ভাইসরয় হোটেলে। ডিসেম্বরের তীব্র শীত। ক্রিসমাসের জন্য অপূর্ব আলোকসজ্জায় সেজেছে গোটা শৈলশহর।
থার্টি ফার্স্ট নাইটে ম্যালে কনসার্ট হচ্ছে। মাথা–মুখ ঢেকে গ্লাভস পরে রাত অবধি সেই গান শুনছি। সেই টয় ট্রেনে আবার চড়া ও শিশুদের মতো আনন্দ পাওয়া। সেই গ্লেনারিজ, সেই ধোঁয়া ওঠা কফি খেতে খেতে মেঘের রাজ্যে ঢুকে পড়া। ম্যালের সেই কাঠের বেঞ্চটা এখনো তেমনই আছে, তার সামনে বইয়ের দোকানটাও।
১৬ বছর পর সেই বেঞ্চে বসে আবার ছবি তোলা। সূর্যোদয় দেখতে গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার উদ্দেশে আবার যাত্রা। নিউ ইয়ার বলে এবার লোকে লোকারণ্য। মনে আশংকা, এবার দেখতে পাব তো! ভয়ংকর শীত।
সোয়েটার, জ্যাকেট ও মাফলারে একেবারে জবুথবু অবস্থা। একটু পর পাহাড়ের পেছন থেকে বছরের প্রথম সূর্যোদয় হতে শুরু করল। এমন আশ্চর্য সেই রং যেন তাল তাল সোনা। ঝকমক ঝকমক করে উঠছে গোটা পাহাড়।
চারদিকে হাততালি আর ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ। তাহলে এ জন্যই নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা! নামকরণের সার্থকতা একেই বলে। প্রথমবারের চেয়েও যেন বেশি আনন্দ হলো এবার। এত দিনের সব স্ট্রেস দূর হলো।
কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, ঝটিকা সফরে আবার সুযোগ পেলে কি দার্জিলিং যাবেন? মনটা নেচে উঠবে—নিশ্চয়ই যাব। বারবার যাব। সুযোগ পেলেই আবার যাব।
ফিরে ফিরে যাই
এই যে ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে বারবার ফিরে যাওয়া, নস্টালজিক হওয়া—ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে এই প্রবণতা। হিলটনের গ্লোবাল ট্রাভেল রিপোর্ট বলছে, ৫৮ শতাংশ ট্রাভেলার তাঁদের সন্তানদের নিয়ে নিজেদের শৈশবের কোনো গন্তব্যে ভ্রমণ করতে চান।
প্রাইসলাইন ভ্রমণকারীদের নিয়ে একটি জরিপ করেছে সম্প্রতি। প্রশ্ন ছিল ২০২৬ সালে কোথায় ভ্রমণ করতে চান? আশ্চর্য ব্যাপার, ৭৩ শতাংশ ট্রাভেলার চেয়েছেন পুরোনো জায়গায় ঘুরতে যেতে, যেখানে আগেও এক বা একাধিকবার বেড়াতে গেছেন।
ট্রাভেলারদের মধ্যে নতুন জায়গা এক্সপ্লোর করার আগ্রহ দিন দিন যেন কমছে। বিবিসি ট্রাভেল স্টোরিজ ভ্লগ এই প্রবণতার নাম দিয়েছে নস্টালজিয়া-ড্রিভেন ট্রিপ, স্মৃতিতাড়িত সফর। এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়, যাঁরা প্রতিবছর একই জায়গায় বেড়াতে যান, একই হোটেলে ওঠেন, একই ক্যাফেতে কফি খান, আগে আসা কোনো রেস্তোঁরায় বসে একই খাবার অর্ডার দেন।
কেন এই ফিরে যাওয়া আমাদের এত ভালো লাগে? প্রতিবার নতুন আনন্দ, নতুন তৃপ্তি নিয়ে হাজির হন একই পুরোনো জায়গায়, পুরোনো রেস্তোঁরায়, পুরোনো ক্যাফেতে?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর কারণ দুটি। নস্টালজিয়া আর কমফোর্ট। যে জায়গাটা একবার কারও খুব ভালো লেগে যায়, মনে ধরে যায়, বারবার সেখানে ফিরে যেতে তার মস্তিষ্কের রিওয়ার্ডিং সার্কিট বার্তা দিতে থাকে। ভালো লাগা স্মৃতি তাঁকে মনে করিয়ে দেয় যে ওখানে গেলে মানসিক চাপ কমবে, জীবন সহজ মনে হবে।
শার্লট রাসেল ভ্রমণ মনোবিজ্ঞানী। তিনি লিখেছেন, পুরোনো সুন্দর স্মৃতির কাছে ফেরা আধুনিক মানুষের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। একটি চেনা নিরাপত্তাবোধ, একটি চেনা নির্ভরতা মানুষকে বারবার সেসব জায়গায় ফিরে যেতে বাধ্য করে।
এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, কাছাকাছি প্রজন্মের মানুষের আজকাল নতুন গন্তব্য, নতুন অ্যাডভেঞ্চার আবিষ্কার করার আগ্রহ কমে গেছে। ছুটি বা রিলাক্স করার সময় নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নিতে তারা আর রাজি নন।
নিত্যদিনের স্ট্রেসফুল জীবন থেকে একটু রেহাই পেতে তাঁরা এমন গন্তব্য বেছে নেন, যা তাঁদের চেনাজানা ও নির্ভরতার জায়গা, যে জায়গা তাঁদের আগেও ভালো লেগেছে।
কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের নস্টালজিয়াও কি কাজ করে না? মনে পড়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য মুভেবল ফিস্ট–এর শেষ অধ্যায়ের কথা। দুনিয়ার সেরা ভ্রমণকাহিনিগুলোর মধ্যে এ বইটিকে সব সময় রাখতে চাই আমি।
প্রিয় শহর প্যারিস ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি লিখেছেন, ‘সেটিই ছিল প্যারিসে প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি। প্যারিস আর কখনোই আগের মতো থাকবে না, যদিও প্য্যারিস সব সময়ই প্যারিস। ওটা বদলালে তুমিও বদলাও।
প্যারিসের কিছু কখনো শেষ হয় না। আমরা যা–ই হয়ে উঠি না কেন, আমরা সব সময়ই সেসব স্মৃতির কাছে ফিরে যাই।’ (চলমান ভোজের শহর: ভাষান্তর ফারুক মঈনুদ্দীন)
দূরের কোনো শহরে বা অচেনা দূর কোনো রাস্তায় ফেলে আসা একটুখানি স্মৃতি, একটু ভালো লাগা মুহূর্ত, বহু দূরের কোনো রেস্তোঁরার এক কাপ চা বা কফি—এভাবেই আমাদের জীবনে ফিরে ফিরে আসতে চায়।
আমরা তখন ‘নস্টালজিয়া–ড্রিভেন ট্রিপের’ পরিকল্পনা করতে পারি। হেমিংওয়ে যেমন বলেছেন, ‘জায়গা যেমন বদলায়, আমরাও ততবার বদলাই; কিন্তু সেই ভালো লাগা কখনো শেষ হয় না।’