যে দুটি ভিডিও প্রকাশ করে সবার কাছে পরিচিতি পেলেন ‘বৃক্ষবন্ধু’ আজহারুল ইসলাম খান

বোটানিক্যাল গার্ডেন, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ দেশের বনে ও জঙ্গলে নানা প্রজাতির গাছের খোঁজে ঘুরে বেড়ান আজহারুল ইসলাম খান। ভিডিওতে তুলে ধরেন অচেনা কোনো গাছ বা ফুল, বর্ণনা করেন তাদের গুণাগুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বৃক্ষবন্ধু’ নামে পরিচিত পাওয়া এই মানুষটির গল্প শোনাচ্ছেন কাজী আলিম-উজ-জামান

বনে ও জঙ্গলে নানা প্রজাতির গাছের খোঁজে ঘুরে বেড়ান আজহারুল ইসলাম খানছবি: আজহারুল ইসলাম খানের সৌজন্যে

জিন্দা পার্কের ক্যানটিনে চায়ে চুমুক দিয়েছেন মাত্র, পাশের টিভিরুম থেকে ভেসে এল তাঁরই কণ্ঠ! উঁকি মেরে দেখলেন, ১৫-১৬ জন তাঁর ভিডিও দেখছে। একজন তাঁকে চিনেও ফেলল। তারপরই কানাকানি, পরক্ষণেই সবাই তাঁকে ঘিরে ধরল। কেউ বলছে, ‘স্যার, আমি দশটা গাছ লাগিয়েছি’, কেউ বলছে, ‘আমার ছেলেটা এখন প্রতি শনিবার বাগান করে।’

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সেই পার্কে বসে আজহারুল ইসলাম খানের মনে হলো, প্রায় দেড় যুগের চেষ্টা কিছুটা হলেও সার্থক।

তিনটি বাগানবিলাস

অনেক দিন ধরেই ফেসবুকে তাঁর ভিডিও দেখি। সৌম্যদর্শন, স্মিত কণ্ঠ। কখনো বলছেন শিশুদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে হেলেঞ্চা কতটা সহায়ক, কিংবা পেটের সমস্যায় থানকুনি পাতার গুণের কথা। কখনো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন কালোকেশীগাছের রস ব্যবহার করে চুলকে ঘন ও কালো রাখার প্রাচীন রীতির কথা। কখনো বলছেন, অচেনা কোনো গাছের কথা, ফুলের কথা।

সেই সূত্রেই যোগাযোগ ও পরে আলাপ।

আজহারুল ইসলাম খানের জন্ম ময়মনসিংহের নান্দাইলের সগ্রাদী গ্রামে, ১৯৭০ সালে। তাঁর হেলথ ইন্সপেক্টর বাবার ছিল বাগান করার নেশা। তখন তাঁর বয়স ১৩ বছর। বাবা শখ করে তিনটি বাগানবিলাসের গাছ লাগান। এই গাছে সাধারণত পানি দিতে হয় কম। কিন্তু এটা বোঝার মতো বয়স তখনো তাঁর হয়নি। বেশি করে পানি দিতেন আজহারুল। তিনটি গাছের মধ্যে দুটিই মরে গেল। এটা তাঁকে খুব কষ্ট দিয়েছিল।

পরে তাঁর বাবা একদিন বাগানবিলাসের একটা কাটিং হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘রোপণ করো, দেখবে লাল ফুলে ভরে উঠবে।’

আজহারুল ইসলাম কল্পনায় সেই ফুল দেখে মনের ক্যানভাসে একটা ছবি এঁকে ফেলেছিলেন। পরে গাছে ফুল এলে সেই ছবি বাস্তবে রূপ নিয়েছিল।

পড়াশোনা ফেলে গোলাপের বাগানে ডুবে থাকতেন তিনি। পড়াশোনার ক্ষতির কথা চিন্তা করে বাবা দিলেন বকুনি। রাগ করে একবার বাড়ি থেকে পালিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু বাগানের টানে ফিরে এসেছিলেন আবার।

গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যায় ভর্তি হলেন। ক্লাসরুমের বাইরেও গাছ নিয়ে চলতে থাকল নানা আলোচনা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদগুলো তাঁকে বিস্মিত করত। মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে কাটিয়ে দিতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উদ্ভিদের পত্রগঠনসহ বিভিন্ন আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদের (শৈবাল, ছত্রাক) গঠন দেখতেন আর অবাক হতেন।

পড়াশোনা শেষে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি নিয়েছিলেন। ২৭ বছর চাকরি করেছেন। ফাঁকে ফাঁকে, ছুটির দিনে, যতটুকু সময় পেয়েছেন, ভিডিও মাধ্যমে করেছেন বৃক্ষবন্দনা। ২০০৮ সাল থেকে ফেসবুকে আছেন। একসময় বৃক্ষ নিয়ে লিখতেন, ছবিও দিতেন। আত্মীয়স্বজনের বাইরে তেমন একটা সাড়া পেতেন না। তবু থামেননি। কারণ নেশা, তাঁর ভাষায় ‘অ্যাডিকশন’।

আজহারুল ইসলামের একটাই বার্তা—প্রকৃতিকে ভালোবাসুন
ছবি: আজহারুল ইসলাম খানের সৌজন্যে

মাথার ওপর সাপ

২০২৩ সালে ‘বুদ্ধ নারিকেল’ আর ‘ইলেকট্রিক ডেইজি’ গাছের দুটি ভিডিও করলেন। ফেসবুকে প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া। দিনে দিনে প্রথমটির ভিউ হলো ৬০ লাখ, দ্বিতীয়টির ১ কোটি ৬০ লাখ। বাড়তে থাকল ফলোয়ার। এখন ফেসবুকে তাঁর অনুসারী ১৪ লাখের বেশি।

নিয়মিত ভিডিও তৈরি করতে তিনজনের ভিডিও টিম আছে। এখন সব ভিডিওই মানুষ দেখে, প্রতিক্রিয়া দেয়। তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ যখন দেখেন কোনো তরুণ তাঁর ভিডিও দেখে গাছ লাগিয়েছে।

উদ্ভিদের বাংলা নাম নিয়ে যে বিভ্রান্তি, একই নামে একাধিক গাছ, অনেকেই এখন এটা নিয়ে কাজ করছেন। আজহারুলও তাঁদের একজন। বৃক্ষ নিয়ে তাঁর ঘরে আছে বইপত্রের বড় সংগ্রহ। নতুন কোনো বই বের হলে জোগাড় করার চেষ্টা করেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুরা তো রয়েছেই। কোনো বিষয়ে বিভ্রান্তি হলে তাঁদের সহায়তা নেন। কাজ করতে গিয়ে দ্বিজেন শর্মাসহ বহু নিসর্গীর সান্নিধ্য পেয়েছেন।

ভিডিও করতে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ২০২৩ সালে বোটানিক্যাল গার্ডেনে একবার ভিডিও করার সময় মাথার ওপর সাপ ফণা তুলেছিল। তবু ভিডিও থামাননি। ভিডিও শেষে দৌড়ে পালানোর ভিডিওটিও ফেসবুকে আছে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার। থাকেন মিরপুরে। বড় মেয়ে যারীন তাসনিম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ছোট ছেলে মাশরাফি বিন আজহার এবার এইচএসসি দেবেন। স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার জাহান ঘর সামলান। ছেলেমেয়ে দুজনও নাকি বাবার মতোই বৃক্ষপ্রেমী। একজনকে সঙ্গে নিয়ে অনলাইনে ভেষজ পণ্য বিক্রির দুটি প্রতিষ্ঠান করেছেন আজহারুল ইসলাম। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই পণ্যের বিক্রি ভালো।

গাছই তাঁর মূল জায়গা। গাছের কাছে গেলে আজহারুল ইসলাম খানের মনে হয় আপন ভুবনে আছেন। গাছ রোপণের আগে ও পরের নানা বিষয়ে অনলাইনে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

দেশের নানা প্রান্তের স্কুলের শিশুদের নিয়ে জঙ্গল ভ্রমণ করা তাঁর একটি ইচ্ছা। উদ্ভিদের প্রতি শিশুদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে চান তিনি।

আজহারুল ইসলামের একটাই বার্তা—প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। আপনার প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে গাছ লাগান।

আরও পড়ুন