জৌলুশ হারিয়েছে মতিঝিল, নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলশান–বনানী
ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে একসময়কার জমজমাট মতিঝিল। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কার্যালয় নতুন ঢাকামুখী। ভবন একবার খালি হলে সহজে ভাড়াটেও মিলছে না। ঝুলছে টু-লেট। তার বদলে গুলশান–বনানীতে অফিসের চাহিদা বাড়ছে।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার গোড়াপত্তন। তারপর ধীরে ধীরে এখানে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। নির্মিত হতে থাকে বহুতল ভবন। পরে শাপলা চত্বর থেকে ইত্তেফাক মোড় পার হয়ে টিকাটুলী, আবার শাপলা চত্বর থেকে দিলকুশা ও দৈনিক বাংলা মোড় এবং আরামবাগ-ফকিরাপুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড।
ব্যাংক-বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় পুরো মতিঝিল এলাকা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। বাজারভিত্তিক অর্থনীতি এগিয়ে নিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় সরকার। তাতে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। তখন মতিঝিলে চাহিদার তুলনায় জায়গা ও ভবনসংকট, তীব্র যানজট, মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না হওয়ায় ২০০০ সালের পর ধানমন্ডি, বনানী-গুলশান, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে গুলশান-বনানী।
আর ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে একসময়কার জমজমাট মতিঝিল। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কার্যালয় নতুন ঢাকামুখী। ভবন একবার খালি হলে সহজে ভাড়াটেও মিলছে না। ঝুলছে টু-লেট। বয়স বাড়তে থাকা বহুতল ভবনগুলোর সংস্কারেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ভবনমালিকেরা। ফলে জৌলুশ হারাচ্ছে মতিঝিল।
অন্যদিকে অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে একের পর এক নতুন নতুন ঝাঁ–চকচকে সুউচ্চ ভবন গড়ে উঠছে। বনানী ছাড়িয়ে গুলশান অ্যাভিনিউ এবং তারপর গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডেও উঠছে বাণিজ্যিক ভবন। এসব অত্যাধুনিক ভবনে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বেসরকারি ব্যাংকের কার্যালয় ঠিকানা করে নিচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিসও এই তল্লাটে। সব মিলিয়ে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে গুলশান-বনানী।
মতিঝিলের একাল-সেকাল
ঢাকা চেম্বারের ঢাকার বাণিজ্যিক ইতিহাস বইয়ের তথ্যানুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা সম্প্রসারণ শুরু হয়। ইসলামপুর, চকবাজার ও মৌলভীবাজার ছিল সে সময় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। পাইকারি ব্যবসার জন্য শ্যামবাজার, বাদামতলী ও ইমামগঞ্জ প্রসিদ্ধ ছিল। ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য তখন বিখ্যাত ছিল নবাবপুর। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকা শহরের উত্তরমুখী সম্প্রসারণ হয়। তখন জিন্নাহ অ্যাভিনিউ (বর্তমান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) ও পুরানা পল্টন এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে।
পাকিস্তান সরকার ভারত থেকে আসা মোহাজের শ্রেণির ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য মতিঝিল এলাকা অধিগ্রহণ করে। তখন অল্পসংখ্যক বাঙালি ব্যবসায়ী, যেমন সিরাজউদ্দীন, চাঁদ টেক্সটাইল মিলের ফকির চাঁদ, আশেক লেনের জিল্লুর রহমান এবং বালিয়াদির জমিদার ও ব্যবসায়ী লাবিউদ্দীন আহমেদ সিদ্দিকী প্লট পেয়েছিলেন। অন্যদিকে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইস্পাহানি গ্রুপ, বাওয়ানি গ্রুপ, আমিন ব্রাদার্স, ওমর সন্স ও মুন সিনেমার মালিক প্লট পেয়েছিলেন। তাঁদের গড়ে তোলা আমিন কোর্ট, আদমজী কোর্ট বহুতল ভবন এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
আশির দশকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের ব্যবসা শুরু হয়। সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা। তবে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র ছিল মতিঝিল। ফলে আশপাশের এলাকায় কার্যালয় গড়ে তোলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
বনানী যেভাবে আবাসিক থেকে বাণিজ্যিক
ষাটের দশকে বনানী আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি)। তখন এটি ছিল মাঝারি আয়ের লোকজনের আবাসস্থল। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কামাল আতার্তুক অ্যাভিনিউতে বাণিজ্যিক স্থাপনা করার অনুমতি দেয় সরকার। তারপর ধীরে ধীরে বহুতল ভবন উঠতে থাকে। পরে বনানী ১১ নম্বর সড়কসহ আশপাশের সড়কেও শুরু হয় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ও জাপান গার্ডেন সিটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়াহিদুজ্জামানের ছেলেবেলা বনানীতে কেটেছে। ১৯৭৭ সালে তাঁর পরিবার ধানমন্ডি থেকে বনানীতে চলে আসে। এখনো তিনি পরিবার নিয়ে কামাল আতার্তুক অ্যাভিনিউর পাশের এক সড়কে বসবাস করেন।
বনানীর আবাসিক থেকে বাণিজ্যিক রূপান্তরের পুরোটাই দেখেছেন ওয়াহিদুজ্জামান। তিনি বললেন, কামাল আতার্তুক অ্যাভিনিউ সড়কে খোলা মাঠ ছিল। টেনিস কোর্ট ছিল। সেখানে তাঁরা খেলেছেন। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে প্রথম বনানীতে বাণিজ্যিক ভবন করার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে সেই ঢেউ গিয়ে লাগে গুলশান অ্যাভিনিউতে।
গুলশান অ্যাভিনিউতে পরিবর্তনের ঢেউ
ঢাকার অন্যতম অভিজাত আবাসিক এলাকা গুলশান। ১৯৬১ সালে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এই আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়। তবে ২০০৪ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন গুলশানের কয়েকটি এলাকার আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরের সুযোগ দেয়। তারপর বাণিজ্যিক স্থাপনা বাড়তে বাড়তে সবুজ, শান্ত ও সুনিবিড় আবাসিক এলাকার চরিত্র বদলে গেছে।
আবাসিকের পাশাপাশি একসময় কূটনৈতিক পাড়া হিসেবেও পরিচিত ছিল গুলশান। সে জন্য গুলশান ও আশপাশের এলাকার জমির মূল্য তুলনামূলক বেশি ছিল। পরে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠতে শুরু করলে জমির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। হাতবদল ও বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরের সুযোগে জমির মূল্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানা যায়, সত্তরের দশকে গুলশানে এক কাঠা জমির দাম ছিল মাত্র ২৫ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই জমির দাম কাঠাপ্রতি কয়েক কোটি টাকা। গুলশান অ্যাভিনিউ এলাকায় প্রতি কাঠা জমির দাম ১৫–১৮ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব কার্যালয় করার জন্য গুলশানে ২০ কাঠা জমি কিনেছে ৩৪৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ কাঠাপ্রতি ১৭ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে।
গত এক থেকে দেড় দশকে গুলশান অ্যাভিনিউর সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন সব বহুতল ভবন। সেই ঢেউ বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতেও লেগেছে। দুই পাশেই নির্মিত হয়েছে দেশের সেরা সব বাণিজ্যিক ভবন। এখানেই নিজেদের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করেছে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও দেশীয় শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক শিল্পগোষ্ঠী।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও জায়ান্ট গ্রুপের ফারুক হাসানের ছোটবেলা কেটেছে গুলশানে। তাঁর বাবা ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) থেকে ষাটের দশকে গুলশানের প্লট বরাদ্দ পান। বাড়ি নির্মাণের পর ১৯৭৯ সাল থেকে দোতলা ভবনে থাকতে শুরু করে ফারুক হাসানের পরিবার।
স্মৃতিচারণা করে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ফারুক হাসান বলেন, ‘গুলশান আবাসিক এলাকায় শুরুতে দোতলা ভবন করা যেত। পরে তিনতলা করার অনুমতি দিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আমাদের বাসাও তিনতলা করা হয়। পরে চারতলা ও ছয়তলা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, দুই দশক আগে সরকার সুযোগ দিলে অনেকে আবাসিক প্লট বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তর করেন। তারপর বহুতল ভবন নির্মিত
হতে থাকে।
নজরে এখন তেজগাঁও
জায়গাস্বল্পতায় গুলশান-বনানীকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র সম্প্রসারণের সুযোগ কমে আসছিল। তখন নতুন সম্ভাবনা দেখায় তেজগাঁও শিল্প এলাকা। পঞ্চাশের দশকে ৫০০ একরের বেশি জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ১৯৯৮ সালে তেজগাঁও-গুলশান সংযোগ সড়ককে ‘বাণিজ্যিক সড়ক’ ঘোষণা করে সরকার। ১০ বছর আগে শিল্পাঞ্চলের চরিত্র বদলে শিল্প-বাণিজ্য-আবাসন—এই তিনের মিশেলে তেজগাঁও গড়ে তোলার অনুমোদন দেয় সরকার। তারপরই এ এলাকায় দ্রুত বাড়তে থাকে বহুতল ভবন।
বর্তমানে ঢাকায় ৫০০ ফুট উচ্চতার বেশ কয়েকটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর অধিকাংশই তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তা হোল্ডিংসের পিনাকেল ও ঢাকা টাওয়ার, সেনাকল্যাণ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসের এসকেএস স্কাইরিচ ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমজিআই টাওয়ার। আরও কয়েকটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন নিয়েছে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান।
আবাসন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তারা বলেন, দুই থেকে তিন দশক আগে নির্মিত ভবনগুলো এখনকার মতো আধুনিক নয়। অনেক ভবনে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ত্রুটি রয়েছে। ফলে পুরোনো ভবন ছেড়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত আধুনিক বহুতল ভবনে বাসিন্দা হতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে। সে জন্য তেজগাঁও এলাকায় দেশের সেরা বাণিজ্যিক ভবন গড়ে তুলতে বিনিয়োগ বাড়ছে। এর শুরুটা তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোড হলেও এখন তেজগাঁওয়ের অনেক প্লটেই হচ্ছে।
বৈশ্বিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চ ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (আরআইইউ) এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ঢাকার গুলশান ও তেজগাঁও এলাকায় সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক জায়গা নির্মাণ করেছে আবাসন প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে গুলশানে ২৯ লাখ বর্গফুট ও তেজগাঁওয়ে সাড়ে ২৭ লাখ বর্গফুটের বাণিজ্যিক এলাকা নির্মিত হয়েছে। তারপরই উত্তরা, ধানমন্ডি, বসুন্ধরা, বনানী, মোহাম্মদপুর ও দিলকুশার অবস্থান। এ ক্ষেত্রে মতিঝিলের অবস্থান ১২।
প্রায় দুই দশক আগে তেজগাঁও লিংক রোডে শান্তা ওয়েস্টার্ন টাওয়ার নির্মাণ শুরু করে শান্তা হোল্ডিংস। তখন তেজগাঁওয়ের মতো এলাকায় ১৫ তলা উচ্চতার বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কথা শুনে অনেকে অবাক হয়েছিলেন। কারণ, ঢাকায় বহুতল ভবন হাতে গোনা কয়েকটি। তেজগাঁওয়ে তখনো শিল্পকারখানা চলছে।
শান্তা হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) খন্দকার মুনির উদ্দিন বলেন, ‘আমার চিন্তাভাবনা ছিল, ঢাকার অভ্যন্তরে শিল্পকারখানা থাকতে পারে না। ভবিষ্যতে এখানেই হবে ঢাকার বাণিজ্যিক জায়গা। দুই দশকের মাথায় সেটাই হয়েছে। এই এলাকায় দেশের আধুনিক শীর্ষ বাণিজ্যিক ভবন নির্মিত হচ্ছে।’