আম পাড়াই এখন রুহুল আমীনের কাজ, দিনে কত মণ পাড়তে পারেন?

বছরের অন্য সময় যে কাজই করুন না কেন, মৌসুম শুরু হলেই আমবাগানে ফিরে আসেন রুহুল আমীন। তখন আম পাড়াই তাঁর মূল কাজ। প্রয়োজন হলে ঝুড়ি সাজানো, আম বাজারে পাঠানোসহ সব কাজই করেন তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই আমশ্রমিকের গল্প শোনাচ্ছেন আনোয়ার হোসেন

আমবাগানে কাজ করেন রুহুল আমীনছবি: আনোয়ার হোসেন

গাছে যখন আম পাড়তে উঠি, সবচেয়ে পাকা আমটা আগে হাতে নিয়ে খাই। মনে শান্তি লাগে। যত ইচ্ছা ততই খেতে পারি। বাড়িতেও নিয়ে যাই। আম না কিনেও নানা জাতের আম খাওয়ার সুযোগ পাই এই কাজ করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খাঁটি আঞ্চলিক টানে ৩৫ বছরের রুহুল আমীন যা বললেন, তার অর্থ এমনই। রুহুলের বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলার চকনরেন্দ্র গ্রামে। বর্তমানে কাজ করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের আমবাগানে।

প্রতিবছর নিলামে বিক্রি হয় এই বাগানের আম। এবার বাগানটি কিনেছেন পৌর এলাকার ফুলকুঁড়ি মহল্লার ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন আহমেদ। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী অংশীদার হিসেবে আছেন। রুহুল আমীন প্রায় ১৮ বছর ধরে সালাউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁর মতো আরও প্রায় ২০ শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে এই দলেই যুক্ত।

সালাউদ্দিনের আরও কয়েকটি আমবাগান আছে। প্রয়োজনে সেসব বাগানেও কাজ করেন রুহুল আমীন ও তাঁর সহকর্মীরা। মৌসুমে আম পাড়া, গাছ থেকে নামানো, ঝুড়ি সাজানোসহ নানা কাজ থাকে। মৌসুম শেষে বাগানের পরিচর্যাও করতে হয়। সব মিলিয়ে বছরে ছয়-সাত মাস কাজ থাকে। বাকি সময় তাঁরা কেউ কেউ অন্য কাজে যুক্ত থাকলেও আমের মৌসুম শুরু হলে আবারও বাগানেই ফিরে আসেন। রুহুলের ভাষায়, ‘ডাক দিতে হয় না, নিজেরাই চলে আসি। এটা আমাদের নেশার মতো হয়ে গেছে।’

মাত্র ১২ কি ১৩ বছর বয়সেই আমবাগানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রুহুল আমীনের জীবন। দিনমজুর বাবা তাঁকে পড়াশোনা থেকে সরিয়ে আমবাগানের কাজে লাগিয়ে দেন। প্রথম দিকে ভোলাহাট সীমান্ত এলাকার বড় একটি বাগানে কাজ করতেন তিনি।

সেই সময় বাগানের ভেতরে পাহারার ছোট কুঁড়েঘরে থাকতে হতো। চারপাশের নিস্তব্ধতায় ভয়ও পেতেন অনেক সময়। ধীরে ধীরে সেই ভয় কাটিয়ে উঠেছেন। ‘গরিবের জীবন তো এমনই’—তাঁর কণ্ঠে সহজ স্বীকারোক্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমবাগানের জীবনই হয়ে ওঠে তাঁর ভালো লাগার জায়গা। মৌসুমে শুধু আয় নয়, পরিবার নিয়ে আম খাওয়ার আনন্দও আছে। নিজেরা যেমন খেতে পারেন, তেমনি পরিবারকেও খাওয়ান। বিয়ের পর নতুন স্ত্রীকে নানান জাতের আম খাইয়েছেন তিনি—বউভোলানী, বউসুন্দরী, রানীপসন্দ, গোলাপখাস, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগসহ নানা নামের অজানা ও সুস্বাদু আম। এর সঙ্গে তো আছেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া ও ফজলি। ‘আমবাগানের কাজে না থাকলে এগুলা কীভাবে খাইতাম,’ হাসতে হাসতে বলেন রুহুল আমীন।

গাছে উঠে হাত দিয়ে ও ঠুসি (তল্লা বাঁশের লম্বা ও পাতলা লগির মাথায় লাগানো জাল) দিয়ে আমি পাড়তে হয়। রুহুল আমীন দিনে ক্ষীরসা, গোপালভোগজাতীয় আম পাড়তে পারেন চার-পাঁচ মণ আর ফজলি ও আশ্বিনাজাতীয় আম পাড়তে পারেন ছয়-সাত মণ।

বছরে ছয়-সাত মাস আমবাগানে কাজ করে মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করেন রুহুল আমীন। আমন মৌসুমে ধান কাটেন, বাকি সময়ে যা কাজ পান, তা–ই করেন। তাতে সংসার মোটামুটি চলে যায়।

রুহুলের এক ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, মেয়ে এখনো ছোট। সন্তানদের ভালোভাবে পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করাই এখন তাঁর স্বপ্ন।

আরও পড়ুন