এমআইটিতে আমি অধ্যাপক টমাস প্যালাসিওসের অধীন মাইক্রোসিস্টেমস টেকনোলজি ল্যাবরেটরিতে গ্যালিয়াম নাইট্রাইড সি-মস টেকনোলজি নিয়ে গবেষণা করি। সেই গবেষণার ওপরই পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছি। গবেষণা শেষে দেশে চলে আসি। বুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিই। করোনার কারণে গত কয়েক বছর এমআইটির সমাবর্তন হয়েছিল ভার্চ্যুয়ালি। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক থাকায় এ বছর সমাবর্তন সরাসরি উপস্থিতিতে হবে বলে ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। স্বপ্নের সমাবর্তনে অংশ নিতে বুয়েট থেকে ছুটি নিয়ে সরাসরি এমআইটি ক্যাম্পাসে হাজির হই। আমার সহধর্মিণী তাকিয়ান ফখরুলও সমাবর্তনে অংশ নেন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয় ‘আয়রন গার্নেট থিন ফিল্মস’।

সমাবর্তনের সকালটা অন্যান্য দিনের মতোই ছিল। শুধু আমাদের পরনে ছিল রঙিন পোশাক। নানা দেশের শিক্ষার্থী, সবার চোখেমুখে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ করার আনন্দ। সবার সঙ্গেই আছে পরিবার আর স্বজন। এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি নিশ্চয় সবার জীবনেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই আমরা সকালের নাশতা সেরে নিই। অনেক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়। ক্যাম্পাসে যেসব ভারতীয় বন্ধুর সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি, তাদের মধ্যে অনিরুদ্ধ ও সুহাস সুব্রামানিয়া কৌশিকের সঙ্গে কথা হলো। পিএইচডি শেষ করে দুজনই যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাচ্ছে। আমি দেশে ফিরছি শুনে দুজনই অবাক হলো।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তৃতা পর্ব। প্রথম আলোর ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতায় অনেক সমাবর্তন বক্তার বক্তব্য পড়েছি। তাই নিজের সমাবর্তন বক্তব্য নিয়ে স্বভাবতই বেশ আগ্রহ ছিল। আমাদের সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন ড. ড্যারিও গিল। তিনি আইবিএমের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডিরেক্টর অব রিসার্চ। কাকতালীয়ভাবে আমি যে ল্যাব থেকে গবেষণা করেছি, সেই ল্যাব থেকেই পিএইচডি করেছেন তিনি। নিজের বক্তব্যে জীবনের নানা সংকটের কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘পড়াশোনা ও গবেষণা লেগে থাকার কাজ। আমি এমআইটিতে পড়ার সময় আবিষ্কার করার মধ্যে চ্যালেঞ্জ জয়ের অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম। পড়ার সময় আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে, সেগুলো জয় করতে হবে। এই পৃথিবীর অনেক সমস্যা আছে। প্রকৌশলী ও গবেষকেরা পৃথিবীতে পরিবর্তন আনতে কাজ করছেন। সবার দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে। জীবনে কোনো সহজ উত্তর ও সাফল্যের শর্টকাট নেই। নাগরিক হিসেবে সবার কিছু দায়িত্ব আছে, এই দায়িত্ব নিতে হবে।’

বক্তব্য শেষে প্রথমে মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এরপর পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দেওয়া হয়। সবার মাথায় বিশেষ হুড ও গলায় সমাবর্তন উত্তরীয় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সমাবর্তন মাঠে বিভাগভিত্তিক তাঁবু টানানো থাকে। ডিগ্রি নেওয়া শেষে দুপুরে আবারও আমরা সেই তাঁবুতে ফিরে আসি। সবার সঙ্গে দেখা হয়। আমি সেরা থিসিসের পুরস্কার পেয়েছিলাম বলে মাইক্রোসিস্টেমস টেকনোলজি ল্যাবরেটরির পরিচালক অধ্যাপক হ্যারি লির কাছ থেকে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করি।

এমআইটিতে যাদের সঙ্গে পড়েছি, তারা নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করবে। আমি দেশে ফিরে যাব শুনে সবাই খুব উৎসাহ দিল। বুয়েটে ফিরে গিয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেব শুনে অনেক বন্ধু ‘অধ্যাপক’ বলে ডাকতে শুরু করল। কেন দেশে ফিরছি, জানতে চেয়েছিল অনেকে। আমি বলেছি—দেশে ফিরে এখানে গবেষণা ও শিল্প খাতে উন্নয়নের একটা সুযোগ আছে; সেই সুযোগই কাজে লাগাতে চাই।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন