জিন নাকি বেড়ে ওঠার পরিবেশ, মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে কোনটির প্রভাব বেশি
মানুষ কেমন হবে—তার চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ বা ব্যক্তিত্ব—এসব কি জন্মগতভাবে ঠিক হয়ে যায়, নাকি পরিবেশ ও জীবনের অভিজ্ঞতা এগুলো তৈরি করে?
এ নিয়ে বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। কারও স্বভাব কি মূলত জিন বা ডিএনএর কারণে তৈরি হয়, নাকি পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ও জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে গড়ে তোলে, এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।
সাম্প্রতিক গবেষণায় মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব তৈরি হয় জিন ও পরিবেশ—দুইয়ের মিলিত প্রভাবে। অর্থাৎ শুধু জন্মগত বৈশিষ্ট্য বা শুধু পরিবেশ নয়, বরং দুটো একসঙ্গে কাজ করে আমাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে।
২০০৯ সালে ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরের রাস্তায় খারাপ মন্তব্য করায় একজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন আবদেল মালেক বায়ুত নামের এক ব্যক্তি। এ অপরাধে তাঁকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাজা কমাতে তাঁর আইনজীবী একটি ব্যতিক্রমী আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, বায়ুতের ডিএনএতে ‘ওয়ারিয়র জিন’ বা যোদ্ধা জিনের উপস্থিতি রয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার উল্লেখ করে তিনি জানান, এ জিনের মিউটেশনের কারণে এমন আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন বায়ুত। তাই এ অপরাধের জন্য তাঁকে সম্পূর্ণ দায়ী করা যায় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আদালত আপিলটি গ্রহণ করেন। বায়ুতের সাজা এক বছর কমিয়ে দেওয়া হয়।
নব্বই দশক থেকেই সহিংস আচরণের সঙ্গে মনোঅ্যামাইন অক্সিডেজ এ বা ‘এমএওএ’ নামক একটি জিনের ভ্যারিয়েন্টের যোগসূত্র পেতে শুরু করেন গবেষকেরা। ২০০৪ সালে এসে গণমাধ্যমে এটি ‘ওয়ারিয়র জিন’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে বিষয়টিকে যতটা সরল ভাবা হয়েছিল, আসলে তা নয়। জিন কীভাবে মানুষের বৈশিষ্ট্য ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সে বিষয়ে দিনে দিনে ধারণা আরও স্পষ্ট হয়। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউএমসির সহকারী অধ্যাপক ও জিনতত্ত্ববিদ আয়সু ওকবে বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে করা হতো যে মানুষের আচরণ কয়েকটি অত্যন্ত প্রভাবশালী জিনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বর্তমানে ধারণাটি পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
বংশগতিগত পার্থক্যের সমস্যা বা মিসিং হেরিটেবিলিটি রহস্য
মানব জিনোম একটি বিশাল ও জটিল বিষয়। এটি হলো মানুষের শরীরের গঠন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জিনগত তথ্যের সমষ্টি। এটি মূলত ডিএনএ দিয়ে তৈরি এবং এর মধ্যেই মানুষের বৃদ্ধি, বৈশিষ্ট্য, রোগপ্রবণতা ইত্যাদির নির্দেশনা থাকে।
এতে ২৩টি ক্রোমোজোম রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার জিন থাকে। সব মানুষের ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ একই, যার অর্থ হলো জিনোমের মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ অংশই আমাদের মধ্যকার পার্থক্যের জন্য দায়ী। গত ১৫ বছরে জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডিজের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
এটি এমন এক পদ্ধতি যা মানুষের মধ্যে ভিন্ন হতে পারে এমন জিনোমের লাখ লাখ ক্ষুদ্রতম অংশ পরীক্ষা করে এবং এগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের সংযোগ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
কিন্তু এ ভিন্নতার সুনির্দিষ্ট প্রভাব খুঁজে বের করা কঠিন। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিত্ব ‘পলিজেনিক’, অর্থাৎ হাজার হাজার ছোট জেনেটিক ভ্যারিয়েশন মিলেই ব্যক্তিত্ব গঠন করে।
পরিবেশের ভূমিকা কতটা?
শুধু জিন নয়, ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবেশেরও প্রভাব রয়েছে। তবে বিষয়টা একটু জটিল। একসময় মনে করা হতো, বড় কোনো পরিবর্তন যেমন দুর্ঘটনা, চাকরি হারানো বা আর্থিক উন্নতি মানুষের ব্যক্তিত্ব বদলে দিতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায় যে মানুষের ব্যক্তিত্বে এসব ঘটনা খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে।
বরং শৈশবের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক বেশি প্রভাবিত করে। ছোটবেলার মানসিক চাপ, অবহেলা বা কঠিন পরিবেশ ভবিষ্যতে মানুষের মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের একক ঘটনা ততটা গভীর চাপ ফেলে না।
জন্মের আগের প্রভাব
গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক চাপ শিশুর স্বভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একে বলা হয় ‘ফিটাল প্রোগ্রামিং’। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি মানসিক চাপের মধ্যে থাকা মায়েদের শিশুদের মধ্যে ভয় ও দুঃখের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, শুধু জিন কিংবা শুধু পরিবেশ—কোনোটাই এককভাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে না।
বরং পরিবেশ ও জিনের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াই মানুষকে অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশই জিনের প্রভাব কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে এ নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের জেনেটিক গবেষণা হয়তো এ জটিল সম্পর্ককে আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।
সূত্র: বিবিসি