দুই জাপানি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এসে যে অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলেন

ঢাকার রাস্তায় জাপানের দুই শিক্ষার্থী দাইকি ইশিকা ও আকারি সুয়েনোছবি: সংগৃহীত

কার্জন হলের বারান্দায় আমি, আমার বোন আর কয়েকজন বন্ধু নিজেদের কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ দেখি দুজন মানুষ আমাদের দিকে হেঁটে আসতে আসতে হাত নাড়ছেন। কাছে আসতেই বোঝা গেল দুটো মুখই অচেনা। বিদেশি যে সেটাও স্পষ্ট। কৌতূহল চেপে রাখা গেল না। আমরাও এগিয়ে গেলাম। শুরু হলো কথোপকথন।

কথায় কথায় জানা গেল, তাঁরা জাপানের আকিতা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। নাম দাইকি ইশিদা ও আকারি সুয়েনো। বাংলাদেশে এটাই তাঁদের প্রথম আসা। কোথায় যাবেন, কী দেখবেন—সেসবের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও নেই। শুধু ঘুরে দেখা, নতুন কিছু জানা আর যেভাবে দিন আসে, সেভাবেই কাটিয়ে দেওয়া।

কর্মসূত্রে বাংলাদেশে থাকেন আকারির বাবা। সেই সূত্রেই দেশটিকে নিজের চোখে দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই আগ্রহ থেকেই বন্ধু দাইকি ইশিদাকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি। ছয় দিন এ দেশে ছিলেন দুজন। কার্জন হল, নিউমার্কেট, পুরান ঢাকা, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা ঘুরে, দেখে, খাবার খেয়ে আর মানুষের সঙ্গে কথা বলেই কেটেছে তাঁদের দিনগুলো।

এক কাপ চা

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফিতে দুই জাপানি শিক্ষার্থী
ছবি: সংগৃহীত

নিউমার্কেটে চায়ের দোকান খুঁজতে খুঁজতে নাকি পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন দুই জাপানি তরুণ। এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি শুধু পথ দেখিয়ে থেমে থাকেননি, দোকান পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে চা-ও খাইয়েছেন। ছোট ছোট এই আন্তরিকতাই মুগ্ধ করেছে দুই পর্যটককে।

আকারির ধারণা ছিল, বাংলাদেশ হয়তো খুব একটা উন্নত নয়। তবে এখানে এসে তাঁর ধারণা বদলেছে। দাইকিকে নাকি অবাক করেছে বাংলাদেশের জামা-কাপড়ের দোকান। দোকানে পোশাক কিনতে গেলে চা-কফি খেতে দেয়, এমনটা নাকি জাপানে কখনো দেখেননি!

রাস্তার খাবার নিয়ে কিছুটা ভয়েই ছিলেন আকারি। তাঁর মনে হয়েছিল, খেয়ে না জানি শরীর খারাপ হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় কেটেছে তাঁর ভ্রমণ। এই ভ্রমণের বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুড।

দুই দেশ, দুই আয়না

বাংলাদেশের খাবার ‘সুস্বাদু’ লেগেছে তাঁদের কাছে
ছবি: সংগৃহীত

জাপান আর বাংলাদেশকে পাশাপাশি রাখলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোথায়? দাইকির মত, জাপানে মানুষ অনেক বেশি সময় কাটায় স্মার্টফোনে। বাংলাদেশে এসে দেখেছেন, অপরিচিত মানুষও সহজেই কথা বলে, হাসে, যোগাযোগ তৈরি করে। জাপান যদি বাংলাদেশ থেকে একটি জিনিস ধার করতে পারত, তাঁর মতে, সেটি হওয়া উচিত ‘মিশে যাওয়ার ক্ষমতা’।

তবে বাংলাদেশের সবকিছুই যে ভালো লেগেছে, তা নয়। ট্রাফিক ব্যবস্থা খুবই বিশৃঙ্খল ও বিপজ্জনক মনে হয়েছে। তাঁর মনে হয়েছে, স্থানীয় ব্যক্তিদের জন্যও এই ট্রাফিক নিরাপদ নয়।

বাংলাদেশিরা জাপান সম্পর্কে কী ভাবেন, সেটিও ছিল তাঁদের আগ্রহের বিষয়। অ্যানিমে নিয়ে খুব বেশি আড্ডার সুযোগ হয়নি। তবে মানুষের মুখে জাপানের এত প্রশংসা শুনে দুই বন্ধু নাকি একটু লজ্জাই পেয়েছেন!

স্বাদ ও শব্দ

বাংলাদেশি পোশাকে ঘুরেছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ছেড়ে জাপানে ফিরে গেলে কোন স্বাদটা সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে? দাইকি দ্বিধা না করে বলেন, নান রুটি ও বিরিয়ানি। জাপানে নান পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের নানের স্বাদ ও গঠন তাঁর কাছে আলাদা, দামও কম।

ভাষার ক্ষেত্রেও দুজনের ঝুলিতে জমেছে বেশ কিছু শব্দ। দাইকি শিখে নিয়েছেন ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ধন্যবাদ’ ও ‘দাম কত’। এসব শব্দ ও বাক্য তাঁর কাছে বাংলাদেশ সফরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আকারি এমন একটি শব্দ শিখেছেন, যা খাবারের সঙ্গে বেশ মানানসই—‘সুস্বাদু’।

ইচিগো ইচি

সফরটিকে এককথায় প্রকাশ করতে বলা হলে দাইকি বেছে নেন জাপানি প্রবাদ ‘ইচিগো ইচিয়ে’ অর্থ ‘একবার, এক সাক্ষাৎ’। প্রতিটি সাক্ষাৎকে লালন করা উচিত; কারণ একই সাক্ষাৎ, একই মুহূর্ত আর কখনো হুবহু ফিরে আসে না। বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতাকে এই শব্দের সঙ্গে মেলানোর কারণও স্পষ্ট। কার্জন হলে হঠাৎ পরিচয় হওয়া বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, নিউমার্কেটে অচেনা মানুষের কাছ থেকে পাওয়া চা—সবই এমন কিছু মুহূর্ত, যা একইভাবে আর ফিরে আসবে না।

আরও পড়ুন