গ্যাসের সংকটে রান্নাঘর সামলাবেন কীভাবে, বিশেষজ্ঞের ১০ পরামর্শ
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকটে রান্নাঘরের স্বাভাবিক ছন্দ বদলে গেছে। কখন গ্যাস আসবে, কতক্ষণ থাকবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অনেকেই। কেউ রাত জেগে রান্না করছেন, কেউ আবার একবার গ্যাস এলেই কয়েক বেলার রান্না সেরে রাখছেন। এমন পরিস্থিতিতে শুধু গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। রান্নার ধরনেও আনতে হবে কিছু পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে গ্যাসের অপচয় কমবে, সময়ও বাঁচবে।
১. প্রেশার কুকার ব্যবহার করুন
মাংস, ডাল, ছোলা, আলু বা শক্ত দানাশস্য রান্নায় প্রেশার কুকার ব্যবহার করলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়। এতে রান্নার সময় যেমন কমে, তেমনি গ্যাসও কম লাগে।
২. চাল, ডাল ও ছোলা আগে ভিজিয়ে রাখুন
রান্নার আগে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে চাল, ডাল বা ছোলা দ্রুত সেদ্ধ হয়।
সাধারণভাবে—
চাল: ২০–৩০ মিনিট
ডাল: ৩০–৬০ মিনিট
ছোলা বা বড় দানার শস্য: ৮–১০ ঘণ্টা
৩. পাত্র অনুযায়ী বার্নার বেছে নিন
ছোট হাঁড়ি বা পাতিলে ছোট বার্নার ব্যবহার করুন। বড় হাঁড়ির জন্য ব্যবহার করুন বড় বার্নার।
শিখা যেন হাঁড়ির তলা ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে না যায়। অতিরিক্ত শিখার তাপ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা গ্যাসের অপচয় ঘটায়।
৪. ঢাকনা দিয়ে রান্না করুন
রান্নার সময় হাঁড়ির ঢাকনা লাগিয়ে রাখলে তাপ ভেতরে আটকে থাকে। এতে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং কম সময় গ্যাস জ্বালাতে হয়।
৫. সবজি ছোট টুকরা করে কাটুন
আলু, গাজর বা অন্যান্য সবজি ছোট টুকরা করলে তাপ দ্রুত ভেতরে পৌঁছায়। ফলে রান্নার সময় কম লাগে।
তবে অতিরিক্ত ছোট করে কাটলে কিছু সবজির পুষ্টিগুণ কমে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কাটাই ভালো।
৬. একসঙ্গে একাধিক খাবার রান্না করুন
প্রেশার কুকার বা স্টিমিং পদ্ধতিতে একই সঙ্গে একাধিক খাবার রান্না করা যায়।
যেমন নিচে ডাল, ওপরে চাল বা সবজি রেখে একবারেই কয়েকটি পদ তৈরি করা সম্ভব। এতে একই গ্যাসে একাধিক কাজ হয়ে যায়।
৭. বার্নার পরিষ্কার রাখুন
বার্নারের ছিদ্র ময়লা বা কালিতে আটকে গেলে গ্যাস ঠিকভাবে পোড়ে না।
শিখা যদি নীলের বদলে হলুদ বা কমলা রঙের হয়, তাহলে বার্নার পরিষ্কার করার প্রয়োজন আছে। পরিষ্কার বার্নারে গ্যাসের দহন ভালো হয় এবং রান্নাও দ্রুত হয়।
৮. রান্না শেষ হওয়ার একটু আগে চুলা বন্ধ করুন
ভাত, খিচুড়ি, সেদ্ধ সবজি বা প্রেশার কুকারে রান্না করা ডালের মতো অনেক খাবার চুলা বন্ধ করার পরও কিছুক্ষণ নিজের তাপে রান্না হতে থাকে। তাই একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গ্যাস জ্বালিয়ে রাখার প্রয়োজন হয় না।
৯. ফ্রিজ থেকে খাবার আগে বের করুন
মাংস বা অন্যান্য হিমায়িত খাবার রান্নার কিছু সময় আগে ফ্রিজ থেকে বের করে রাখুন, যাতে স্বাভাবিকভাবে বরফ গলে যায়। এতে রান্নার সময় কিছুটা কম লাগে।
তবে কাঁচা মাংস দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়। প্রয়োজনের একটু আগে বের করাই নিরাপদ।
১০. রান্নার পরিকল্পনা করে নিন
গ্যাস এলেই কী কী রান্না করবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন।
সবজি কেটে রাখা, মসলা বেটে রাখা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ হাতের কাছে রাখলে গ্যাস আসার পর সময় নষ্ট হবে না।
একবারে কয়েক বেলার ডাল, ভাত বা মাংস রান্না করে নিরাপদভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলেও বারবার চুলা জ্বালানোর প্রয়োজন কমে।
গ্যাসের সংকটে যেসব ভুল করবেন না
গ্যাসের অপেক্ষায় চুলার নব খুলে রাখবেন না।
গ্যাস এসেছে কি না দেখতে বারবার নব খুলবেন না।
খালি হাঁড়ি চুলায় বসিয়ে অপেক্ষা করবেন না।
বার্নারের শিখা হলুদ বা কমলা হলে সেটি ব্যবহার চালিয়ে যাবেন না; পরিষ্কার করুন বা পরীক্ষা করান।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত এলপিজি সিলিন্ডার ঘরের ভেতরে মজুত করে রাখবেন না।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
কম বা বেশি আঁচে নয়, যেটুকু প্রয়োজন সে অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। অল্প আঁচে রান্না করতে বেশি সময় লাগবে। সেখানে উল্টো গ্যাস আরও বেশি খরচ হতে পারে। লক্ষ রাখতে হবে, আগুন নীলাভ কি না। নীলাভ মানে গ্যাস ঠিকমতো পুড়ছে। যখন দেখা যাবে আগুন নীলাভ হয়েছে, তখন সেই মাত্রায় চুলা রাখতে হবে। বড় বার্নারে গ্যাস বেশি খরচ হয়। এখন মানুষ অনেক সচেতন। আগে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখত। এখন তো আর তেমনটা হয় না।মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী, সাবেক সদস্য (গ্যাস), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন
শেষ কথা
গ্যাস সাশ্রয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রান্নার পরিকল্পনা করা, প্রয়োজন অনুযায়ী আঁচ ব্যবহার করা এবং অযথা তাপের অপচয় না করা। শুধু কম আঁচে রান্না করলেই গ্যাস বাঁচে না। সঠিক পাত্র, সঠিক বার্নার এবং সঠিক রান্নার পদ্ধতি ব্যবহার করলে একই পরিমাণ গ্যাসে আরও বেশি রান্না করা সম্ভব।
মোটকথা, গ্যাস সাশ্রয়ের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো আগুনের উচ্চতা নয়, তাপের সঠিক ব্যবহার। শিখা যেন কখনোই হাঁড়ির তলা ছাড়িয়ে বাইরে না যায়।