আমাদের অভিধানে ‘কর্মী’ নেই, সবাই ‘সহকর্মী’
দেখতে দেখতে ১২ বছর পূর্ণ করেছে ফ্যাশন ব্র্যান্ড লা রিভ। ২০০৯ সালে ‘ওয়্যার ইয়োর ড্রিম’ ট্যাগলাইন নিয়ে যাত্রা শুরু রিভ গ্রুপের এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের। মাত্র এক যুগের ব্যবধানে দেশের একটি শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে লা রিভ। অর্জন করেছে ভোক্তার আস্থা। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে একাধিক দেশে রেখেছে পদচিহ্ন। এই সাফল্যের পুরোটাই চড়াই ছিল ভাবলে ভুল করা হবে; উতরাইও ছিল। তবে সেসব উতরানো সম্ভব হয়েছে সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনায়। আসিয়ানের পর মধ্যপ্রাচ্যে বাজার ছড়িয়েছে এই ফ্যাশন ব্র্যান্ড। এসব নিয়েই রিভ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম রেজাউল হাসান এবং রিভ গ্রুপের পরিচালক ও লা রিভের প্রধান নির্বাহী মন্নুজান নার্গিসের সঙ্গে কথা হলো। এখানে প্রকাশিত হলো দীর্ঘ সেই আলাপচারিতার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: লা রিভের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কেমন?
রেজাউল হাসান: কোভিডের সময়টা বাদ দিয়ে বললে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। পুরোটাই আসলে লার্নিং এক্সপেরিয়েন্স।
প্রথম আলো: লা রিভের একটা সুনাম আছে, লা রিভে কেউ যোগ দিলে সহজে চাকরি ছাড়তে চান না।
মন্নুজান নার্গিস: কোভিডের সময়ের একটা স্মৃতি শেয়ার করি। যখন লকডাউন এবং হোম অফিস শুরু হলো, আমাদের সহকর্মীরা এসে বললেন, ম্যাডাম, বাসায় কীভাবে থাকব? বাসায় থাকতে ভালো লাগে না! আমরা অফিসে আসতে চাই! কথাটা শুনে আমার খুব গর্ব হয়েছে। মানুষ যেখানে অফিস ফাঁকি দিয়ে বাসায় থাকার চেষ্টা করে, সেখানে আমার সহকর্মীরা বলছেন তাঁদের অফিসেই ভালো লাগে। প্রতিযোগিতা আছে, আমরা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি। কিন্তু শেষে আমরা সবাই বন্ধু। সবাই একই অফিসে কাজ করি। একজনের আরেকজনের প্রতি সহযোগিতা ও সমমর্মিতা আছে, কিন্তু কাজের বেলায় সবাই প্রফেশনাল, সবার মধ্যেই নিজেকে সেরা প্রমাণের প্রয়াস আছে। আমি বলব, এটাই লা রিভের জন্য বড় অর্জন। ব্র্যান্ড ভ্যালুতেও এর ছাপ আছে!
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: পরের ১২ বছরে কোথায় থাকতে চান?
মন্নুজান নার্গিস: আগামী ১২ বছরের মধ্যে লা রিভকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে দেখতে চাই। এইচ অ্যান্ড এম বা জারার মতো ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাজার নিতে চাই। বাইরের মানুষও লা রিভের একটা পোশাক পরে হাইস্ট্রিটে হাঁটবে। বলবে, আমি এটা লা রিভ থেকে কিনেছি। নিউইয়র্ক বা প্যারিসের রাস্তায় লা রিভের পোশাক দেখা যাবে। সিঙ্গাপুরের মানুষকেও যখন দেখি লা রিভের পোশাক পরে হাঁটছে, ভীষণ ভালো লাগে। চীনারা বিয়ের আগের দিন একটা টি-পার্টি করে, সেখানে সবাই একটু স্টাইলিশ আর অন্য রকম পোশাক পরে যায়। একবার একজন তাঁর টি–পার্টিতে পরার জন্য সব অতিথির পোশাক কিনলেন লা রিভ থেকে। সেদিন খুব গর্ব হচ্ছিল। এটাই আমাদের ভিশন—বাংলাদেশের ব্র্যান্ডকে ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দাঁড় করানো।
রেজাউল হাসান: সুখস্মৃতি আরও আছে। যথাযথভাবে ট্রেন্ড অ্যানালিসিস করার ফলে কী হয়, সেটাই বলি। বাইরের দেশে আলাদা আলাদা সিজনের প্রিন্ট স্টোরিতে আপনি মোটামুটি একই রকম মোটিফ দেখতে পাবেন। একবার আমি এবং ম্যাডাম (মন্নুজান নার্গিস) নিউইয়র্কের একটা হাই ফ্যাশন স্টোরে ঘুরছি, সেখানে সিজনের সবচেয়ে আপডেটেড যে প্রিন্ট দেখা যাচ্ছে, সেটাই আমরা দেশে লঞ্চ করেছি কয়েক দিন পরে। আসলে আমরা সঠিকভাবে ফ্যাশনকে দেশে যথাসময়ে উপস্থাপন করতে পারছি। আমাদের ক্রেতাদের দিতে পারছি। এই অনুভূতিটা খুব ভালো লাগে।
আপাতত আমরা সার্ক, আসিয়ান ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় আমাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাই। আসিয়ানের মধ্যে সিঙ্গাপুরে আমরা আছি। সেখানকার আইসেতান নেক্স মলে লা রিভের নিজস্ব পপ আপ স্টোর আছে। একই সঙ্গে ২০২০ সালে গুরুত্বপূর্ণ আসিয়ান দেশগুলো যেমন হংকং, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় অনলাইনে পোশাক সেল শুরু করেছি আমরা। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যেও আমরা উপস্থিত হয়েছি। আপাতত কোনো স্টোর করছি না। ই-কমার্সের মাধ্যমে গত মাস থেকে লা রিভের পোশাক বিক্রি শুরু হয়েছে। দুবাইতে লা রিভের নিজস্ব ওয়্যার হাউস করা হয়েছে। ফলে ইউএই থেকে যে কেউ অনলাইনে লা রিভের পোশাক সংগ্রহ করতে পারবেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: তৈরি পোশাক খাত থেকে অনেকেই এসেছেন স্থানীয় বাজারে। কিছু দিন আগে বলেছিলেন, উল্টোটা করতে চান আপনারা। স্থানীয় বাজারের সাফল্যকে সঙ্গী করে তৈরি পোশাক খাতে পা রাখতে চান। কী ভাবছেন এই পরিকল্পনা নিয়ে।
রেজাউল হাসান: না, সেটা এখন আর আমরা ভাবছি না। আপাতত আমার মনে হয় না সেটা করা ঠিক হবে। আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যে আমরা ইতিমধ্যে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছি। সার্কের দেশগুলোতেও যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। আমরা নিজেরাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। ফলে, অন্য ব্র্যান্ডগুলো আমাদের কাছে আসবে না। কারণ, ট্রেন্ডগুলো প্রায় কাছাকাছিই থাকে। আর ওসব ব্র্যান্ড যেখানে থাকবে, আমাদের উপস্থিতিও থাকবে সেখানে। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে আমার মনে হয় ওটা আমাদের দরকারও পড়বে না।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: পৃথিবী এখন যেদিকে যাচ্ছে, যেমন: পুনর্ব্যবহার, টেকসই, মূল্যবোধের ফ্যাশন—লা রিভ এ ক্ষেত্রে কতটা প্রস্তুত?
মন্নুজান নার্গিস: টেকসই ফ্যাশন করতে চাইলে পরিবেশবান্ধব বয়নের প্রয়োজন পড়ে। আমাদের দেশে সেটা এখনো সুলভ নয়। আমরা এখনো সোর্সিং করছি, চীন থেকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আর কোভিডের পরে বিশ্ব কয়েকটা ফ্যাশনের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। রিল্যাক্সওয়্যার, অ্যাথলেজার, ইয়োগা স্যুট আর ইকো-ফ্রেন্ডলি ও রিসাইকেলড পোশাক। আমাদের দেশ এখনো এ ক্ষেত্রে প্রস্তুত নয়, ফ্যাশন হাউসগুলোকেই এটা নিয়ে কাজ করতে হবে। বিষয়টা আমাদের মাথায় আছে। চেষ্টা থাকবে যত দ্রুত সম্ভব এগুলো নিয়ে কাজ শুরু করার।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: নিজেদের ডিজাইনার, সহকর্মী, সেল অ্যাসোসিয়েটদের কীভাবে নতুন পৃথিবীর জন্য তৈরি করছেন?
মন্নুজান নার্গিস: আমরা ১২ বছরে একটা সিস্টেম দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, কোম্পানি ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে সিস্টেমনির্ভর হবে। এই সিস্টেমেই আমাদের একটা আইডেনটিটি তৈরি হয়েছে। নতুন কোনো ডিজাইনার হাউসে ঢুকেই নিজের ইচ্ছামতো ডিজাইন দিয়ে দিতে পারছেন না। তাঁকে আমরা একটা প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় ঢুকিয়ে দিই। সেখানে তিনি সিলুয়েটের সঙ্গে পরিচিত হন, কালার প্যালেট, ডিজাইন ও প্যাটার্নের সঙ্গে পরিচিত হন, তারপর নিজের আউটপুট দেন। ধাপে ধাপে মোডিফিকেশন তো চলতেই থাকে। দক্ষ মানুষ পাওয়া সব সময়ই আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ। তবু ফ্যাশন হাউস হিসেবে যে সিস্টেমটা আমরা আনতে পেরেছি, সেটাতেই প্রডাকশন বেড়েছে, গ্রোথ বেড়েছে, ১৮টি স্টোর তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই সিস্টেম নিয়ে আমরা খুশি।
রেজাউল হাসান: ট্রেনিংয়ের অপশন সব সময়ই থাকে। শার্টের কলার ডিজাইন করানোর জন্য একবার আমরা সুইডেন থেকে এক্সপার্ট নিয়ে এসেছিলাম। ডিজাইন টিমের পুরোটাই ম্যামের (মন্নুজান নার্গিস) হাতে। এখনো তাঁর নির্দেশনাতেই সবাই কাজ করতে পারছেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: তিনটি পয়েন্ট বলেন, যে কারণে লা রিভ অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র?
মন্নুজান নার্গিস: ফিউশন ডিজাইন, কাপড়ের মান ও মানসম্মত প্রিন্ট। প্রিন্ট আমরা নিজেরাই ডেভেলপ করি।
রেজাউল হাসান: এখানে দুটি বিষয় আমি যোগ করতে চাই। প্রথমত, কাল যদি লা রিভের একটি জামা পরে অফিসের মিটিংয়েও যোগ দেন, আপনার কখনোই মনে হবে না আপনি আউট অব ফ্যাশন। সব সময় ট্রেন্ডকে আপডেটেড রাখাই লা রিভের পোশাকের বৈশিষ্ট্য। আরেকটা বিষয় হলো, আমরা আমাদের সহকর্মীদের প্রাণবন্ত রাখতে চাই। সে জন্য আমাদের হেড অফিস এবং প্রতিটি স্টোরের প্রত্যেককেই বাধ্যতামূলক মেডিটেশন করতে হয়। সকালে একজন সেলস পারসন মেডিটেশন করে দিন শুরু করলে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য লাগে। ইতিবাচক আত্মবিশ্বাস নিয়ে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এভাবেই ছোট ছোট বিষয় আমাদের স্বতন্ত্র করছে।
প্রথম আলো: মেয়েদের জন্য আপনারা প্রিমিয়াম লাইন নিয়ে এসেছেন। ছেলেদের জন্য এমন কোনো হাই-এন্ড লেবেল তৈরির প্ল্যান আছে?
মন্নুজান নার্গিস: ছেলেদের ডিজাইনের প্রধান ফিচার ফেব্রিক। মেয়েদের জন্য এক্সক্লুসিভ ফেব্রিক হিসেবে যেমন মসলিন নিয়ে আসা যায়, ছেলেদের জন্য তো আনা যায় না। এ জন্য আমরা সর্বোচ্চ মানের কাপড়ের সন্ধানে আছি। পেয়ে গেলে ছেলেদের একটা প্রিমিয়াম লাইন হতেই পারে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: লা রিভ কি ফ্যাশন ব্র্যান্ড থেকে লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে? অনেকে আগে থেকেই আছে। এ ক্ষেত্রে লা রিভের অনন্যতা কী হবে?
মন্নুজান নার্গিস: জি, লা রিভকে আমরা লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি। পোশাকের পাশাপাশি তাই বেডশিট, কুশনকভার, ফুলদানি এরই মধ্যে আমাদের স্টোরগুলোয় বিক্রি শুরু করেছি। তবে হ্যাঁ, আমরা যখন কোনো পণ্য নিয়ে আসি, তখন স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক মান ও ট্রেন্ডকে ধরার চেষ্টা করি। ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে লা রিভের সে বিশেষত্ব ছিল, লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবেও সেটা থাকবে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: কোভিডেও আপনারা কোনো কর্মী ছাঁটাই করেননি।
রেজাউল হাসান: এটা শুধু লা রিভেই নয়, পুরো গ্রুপেই এমন প্রচুর সহকর্মী আছেন। অনেকেই শুরু থেকেই লা রিভে কাজ করছেন। এর মানে এই নয় যে আমরা পারফরম্যান্স-ওরিয়েন্টেড নই। কর্মীদের পারফরম্যান্স নিয়ে জবাবদিহি করতে হয় কারণ, আমাদের ভোক্তাদের সেবা দিতে হয়। আমি মনে করি, আমাদের একটা সংস্কৃতি আছে। আমরা একে অন্যকে কেয়ার করার চেষ্টা করি। আমরা কখনো বলি না যে ‘আমি করেছি’, বরং বলি ‘আমরা করেছি’। আমাদের অভিধানে ‘কর্মী’ নেই, সবাই ‘সহকর্মী’। আর কাউকে ‘তুমি’ সম্বোধনের চল নেই। আমরা সবাইকেই ‘আপনি’ করে বলে থাকি। এ ছাড়া আমাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই আমরা সকালে অফিস শুরুর আগে সম্মিলিতভাবে মেডিটেশন করি। এভাবেই ছোট ছোট নিয়ম আমরা অনুসরণ করি, যেগুলো সবাইকে এক সুতায় বেঁধে রাখতে পেরেছে।
মন্নুজান নার্গিস: লা রিভের ১২ বছরে আমরা একটা বিশেষ ভিডিও তৈরি করেছি। ১২ বছরেই মানুষ ইউনিক স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, দায়িত্ব নিতে চায়। লা রিভের এখন ১২ বছর, ১২ বছরে আমরাও আমাদের প্যাশন, মিশন ও ভিশনকে বহন করব। এর মাধ্যমে গঠনমূলক কিছু কাজ করব। সমাজের যাতে কাজে লাগে, এমন কিছুই লা রিভ আগামী ১২ বছরে করবে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: এই প্রসঙ্গের রেশ ধরেই জানতে চাই, লা রিভের কোনো সমাজসেবামূলক কার্যক্রম আছে?
রেজাউল হাসান ও মন্নুজান নার্গিস: হ্যাঁ আছে। আমরা সিএসআর নীতিমালা অনুসরণ করি। এ জন্য বিশেষ বিশেষ সময়ে আমরা আমাদের গ্রাহক এবং সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রক্তদান শিবির আয়োজন করি। আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্রেস্ট ক্যানসার নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। লামাতে কোয়ান্টাম স্কুলের আড়াই হাজার শিশুকে আমরা ঈদের পোশাক তৈরি করে দিয়েছি।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: লা রিভের জন্য অভিনন্দন ও শুভকামনা। সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
রেজাউল হাসান ও মন্নুজান নার্গিস: আপনাকেও ধন্যবাদ।
ছবি: লা রিভের সৌজন্যে পাওয়া