‘করোনার বছরে আমরা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছি’
দেখতে দেখতে ১২ বছর পূর্ণ করেছে ফ্যাশন ব্র্যান্ড লা রিভ। ২০০৯ সালে ‘ওয়্যার ইয়োর ড্রিম’ ট্যাগলাইন নিয়ে যাত্রা শুরু রিভ গ্রুপের এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের। মাত্র এক যুগের ব্যবধানে দেশের একটি শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে লা রিভ। অর্জন করেছে ভোক্তার আস্থা। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে একাধিক দেশে রেখেছে পদচিহ্ন। এ সাফল্যের পুরোটাই চড়াই ছিল ভাবলে ভুল করা হবে; উতরাইও ছিল। তবে সেসব উতরানো সম্ভব হয়েছে সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনায়। আসিয়ানের পর মধ্যপ্রাচ্যে বাজার ছড়িয়েছে এ ফ্যাশন ব্র্যান্ড। এসব নিয়েই রিভ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম রেজাউল হাসান এবং রিভ গ্রুপের পরিচালক ও লা রিভের প্রধান নির্বাহী মন্নুজান নার্গিসের সঙ্গে কথা হলো। এখানে প্রকাশিত হলো দীর্ঘ সেই আলাপচারিতার প্রথম পর্ব।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: আপনারা তো সফটওয়্যার খাত দিয়ে শুরু করেছিলেন। কখন এবং কেন মনে হলো এমন একটি পোশাক ব্র্যান্ড আপনারা করবেন?
মন্নুজান নার্গিস: আমরা শুরু করেছিলাম ২০০৯ সালে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দা আমরা দেখেছি। অথচ ওই সময়েই আমাদের একটি সফটওয়্যার (মোবাইল কমিউনিকেশন) বৈশ্বিকভাবেই ছিল শীর্ষ তিনে। মন্দায় আমাদের সমস্যা হয়নি। তবু ওই সময়ে আমাদের মনে হলো এ ধরনের পরিস্থিতি পুনরায় এলে আমাদের হাতে বিকল্প থাকতেই হবে। এ ভাবনা থেকে প্রয়োজনীয় গবেষণা করে পোশাক নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। এর একটা বড় কারণ, আমাদের মনে হয়েছিল বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। আবার বর্তমানেও তৈরি পোশাক খাত যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে দক্ষ জনবল পেতে সমস্যা হবে না। আরও একটা বিষয় ছিল, আমরা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম প্রোডাক্ট ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যাপারে। কারণ, সবাই যে সময় আউটসোর্স করেছে, আমরা তখন সফটওয়্যার প্রোডাক্ট তৈরি ও নিজেদের ব্র্যান্ডে বিপণন করেছি। তা ছাড়া ওই সময় বাংলাদেশে তেমন কোনো রিটেইল ফ্যাশন ব্র্যান্ড দেখিনি, যারা গুছিয়ে এ ব্যবসায় পা রেখেছে। আমরা সেই কাজটা করার চেষ্টা করেছি। শুরু থেকেই আমাদের মাথায় ছিল এমন একটা ফ্যাশন ব্র্যান্ড, যেটাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাব। এইচঅ্যান্ডএম বা জারার মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিজের জায়গা করে নেব।
রেজাউল হাসান: আমরা প্রোডাক্ট ব্র্যান্ডিং করে অভ্যস্ত। এটাই আমাদের গ্রুপের স্ট্রেংথ। ২০০৪-০৫ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতীয় উদ্যোক্তারা তথ্যপ্রযুক্তিতে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন, কিন্তু প্রোডাক্ট নিয়ে কিছু করতেন না। মূলত আউটসোর্স-ফোকাসড ছিল। ওই সময়ই আমরা এ খাতের জন্য প্রোডাক্ট করেছি। তা ছাড়া বাংলাদেশে পোশাকের জেনেটিক্যাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই মনে হলো কেন নয়? তবে সন্দেহ নেই, শুরুতে এটা একটা অ্যাডভেঞ্চারাস আইডিয়া ছিল। তবে মূল লক্ষ্য ছিল গ্রুপের পুরো বিনিয়োগকে একটি পকেটে পুরে না রেখে ডাইভার্সিফাই করা। বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনীতিতে বড় হতে চাইলে আমাদের জন্য জরুরি ডাইভার্সিফিকেশন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: আপনারা কিন্তু গতানুগতিকভাবে এথনিক ওয়্যার নিয়ে বাজারে আসেননি। এর পেছনে কী কারণ ছিল?
মন্নুজান নার্গিস: এখানে রিভের ইউনিক সেলিং পয়েন্টটা কাজ করেছে। সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে আগেই বলেছি, আমাদের সমসাময়িকেরা সরকারি কাজ কিংবা আউটসোর্সিং করেছে, আমরা তৈরি করেছি প্রোডাক্ট। আর সেই প্রোডাক্টকেই মার্কেট করেছি। সেই হিসেবেই বুঝেছি, আমরা এথনিক ওয়্যার দিয়ে শুরু করলে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। কারণ, প্রতিযোগীরা তো আগে থেকেই আছেন। ফলে আমরা কী করব, সেটা নির্দিষ্ট করে ফেলি। আমরা সিদ্ধান্ত নিই ফিউশনওয়্যার করার। কারণ, বাইরে ওয়েস্টার্ন ফ্যাশন চলে, এখানে এথনিক ফ্যাশন চলে। এ দুয়ের মাঝামাঝি থাকতে চেয়েছি, যেখানে আধুনিকতাও থাকবে, ট্রেন্ডিও হবে, আবার মডেস্ট ফ্যাশনও অগ্রাধিকার পাবে। এভাবেই মূলত এগিয়ে যাওয়া।
রেজাউল হাসান: এখানে একটু বলে রাখি, আমরা রেডি টু ওয়্যার করেছি মডেস্ট ফ্যাশনকে প্রাধান্য দিয়ে। কারণ, এ ধরনের পোশাকের চাহিদা দেশেও যেমন আছে, তেমনি বিদেশেও। তা ছাড়া বরাবরই লক্ষ্য ছিল আমরা আমাদের ব্র্যান্ডকে দেশের বাইরে নিয়ে যাব; সেটা আজ হোক বা কাল। সেভাবে চিন্তা করেই স্টাইলিং ঠিক করেছি। সিঙ্গাপুরে আমাদের ফিজিক্যাল প্রেজেন্স আছে, সেখানে ফিজিক্যাল স্টোর যেমন আছে, তেমনি শীর্ষ সারির ই-কমার্সে বিক্রি করছি। অন্যদিকে, আমাদের আউটলেট কিন্তু সেখানকার বাংলাদেশিদের কথা ভেবে করা হয়নি। বরং আমরা অন্যদের কথা ভেবেছি। ফলে আমাদের পোশাক নিয়মিতই কিনে থাকেন চীনা, মালে বা ভারতীয়রা। অন্যরা হয়তো আমাদের একটা কুর্তি ট্রাউজার দিয়ে পরেন, তবে চীনারা হয়তো সেটা করেন না। তাঁরা আমাদের সিলুয়েট পছন্দ করেই পরছেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: ওই সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে স্থানীয় বাজারে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও কিন্তু বাইরের বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার বিষয়টি আমলে নেননি। অথচ আপনারা নিয়েছেন। এভাবে ভাবার কারণ কী?
রেজাউল হাসান: আমরা কিন্তু হঠাৎ শুরু করিনি। দীর্ঘ গবেষণার মধ্য দিয়ে তবেই মূল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। একটা বিষয়ে একটু কৃতিত্ব আমরা নিতেই পারি, কারণ এ খাতে অনেকেই একটা সাধারণ ভুল করেন। সেটা আন্ডারকস্টিং। কারণ, ঠিকমতো চিন্তা করে না। যে কারণে মার্জিন কত রাখতে হবে, তা নির্ধারণ করে উঠতে পারেন না। না পারার ক্ষেত্রে আরও প্রভাবক হয় কিছু বিষয়কে আমলে না নেওয়া। কারণ, কী পরিমাণ বিক্রি হবে না, কী পরিমাণ ওয়েস্টেজ হবে, আবার কতটা ছাড়ে বিক্রি করতে হবে, সেসব হিসাব যথাযথ হতে হয়। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, শুরু থেকেই এই গাণিতিক মডেল আমরা ঠিকমতো তৈরি করতে পেরেছি। আগেই বলেছি, আমাদের একটা লক্ষ্য ছিল—বাইরের বাজারে প্রতিযোগিতা করা। এ জন্য আমরা ভিজুয়াল মার্চেন্ডাইজিংয়ে (ভিএম) অনেক খরচ করেছি। যেমন ২০১১ সালে সিঙ্গাপুর থেকে একজন ইউরোপিয়ান ভিএম বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসেছিলাম। পরে ভারত থেকেও একজনকে আনি। আমাদের বেঞ্চমার্ক নির্ধারিত ছিল, বাইরের বাজারে পা রাখার লক্ষ্য ছিল, তাই প্রয়োজনমাফিক যেখানে যাকে পেয়েছি, আমরা নিয়েছি। ম্যাডাম (মন্নুজান নার্গিস) ফার্মেসি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ডিজাইনে ফোকাস করে পড়াশোনা করেছেন। এটাও আমাদের পরিকল্পনার অংশ।
মন্নুজান নার্গিস: রিভ সিস্টেমে শুরু থেকেই আমরা একটা করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। ২০০৭ সালেই রিভের বহুজাতিক অবস্থান ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার সংস্কৃতিটাও আমাদের জানা ছিল। উপরন্তু, আমাদের নীতি হলো যেখানে যে বিষয়ের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, তিনি যেখানেই থাকুন, আমাদের নিতে হবে। একই নীতি আমরা লা রিভের ক্ষেত্রেও অনুসরণ করেছি। সে জন্যই তো আমার এনআইএফটি থেকে পাস করা একজন ভারতীয় ডিজাইনারকে নিয়েছি, যাঁর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। তা ছাড়া থিম, ডিজাইন ও ফেব্রিক ট্রেন্ড জানা প্রয়োজন। আপডেটেড থাকা জরুরি। এভাবেই গবেষণানির্ভর কর্ম ও সৃজন-সংস্কৃতি আমরা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। হয়তো ভুলও হয়েছে। কিন্তু আমরা সেটা থেকেও শিখেছি।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: পণ্যদূত হিসেবে তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নেওয়াও কি সেই সিদ্ধান্তের অংশ ছিল?
রেজাউল হাসান: আমাদের মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে সাকিব আল হাসানই তখন একমাত্র এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সুপারস্টার। সে জন্যই তাঁকে নেওয়া হয়েছিল। তবে ওই সময় সাকিব ছাড়াও টয়া ও তানভীরও আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। চুক্তিবদ্ধ থাকা অবস্থায় তাঁরা অন্য ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না—এ মর্মে তাঁদের সঙ্গে আমাদের চুক্তিও ছিল।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: ১২ বছরের অভিযাত্রা, কেমন সেই অভিজ্ঞতা?
মন্নুজান নার্গিস: অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে ১২ বছরে পৌঁছেছি। দুটি আউটলেট নিয়ে শুরু করে এখন ১৮টি। আমরা মনে করি, আমাদের দেশের ক্রেতারা অনেক ফ্যাশনমনস্ক। তাঁরা ফ্যাশন বোঝেন। আমরা শুরু থেকেই কালেকশন ফোকাস করে কনটেন্ট লেখা, ক্রেতাদের সিলুয়েট সম্পর্কে অবগত করার কাজ করে আসছি। ১২ বছরে আমরা যে যে খাতে কাজ করেছি, সেখানে মান উন্নয়নের চেষ্টা করেছি, সুচারুভাবে ফ্যাশনকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। ক্রেতারা এটা খুশিমনে নিয়েছেন। কোভিডের মধ্যেও আমরা সিজন অনুযায়ী কালেকশন লঞ্চ করেছি। আমরা মনে করি, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য নতুন সংগ্রহ আনতে না পারা মৃত্যুর শামিল।
রেজাউল হাসান: এর ফলও কিন্তু অসাধারণ। করোনার বছরে আমরা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছি। এটা আরও বেশি হতো বৈশাখ ও রমজানের লকডাউনের ওই ২০ দিন পেলে। তবু আমরা সর্বোচ্চ সেল করেছি।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: ভালো কিংবা মন্দ স্মৃতি; কোনো প্রেরণা?
মন্নুজান নার্গিস: অন্য অনেক ব্র্যান্ডের মতোই আমরাও পুরুষদের পোশাককে প্রাধান্য দিয়েই শুরু করেছিলাম। তবে এ পরিকল্পনা পুরোপুরি ফলদায়ক ছিল না। যদিও সেটা ঠিক মন্দ স্মৃতি নয়, বরং অভিজ্ঞতা। কারণ, ওই অভিজ্ঞতাও আমাদের ভুল শুধরানোর একটি অংশ। পরে আমরা নারীদের পোশাককে প্রাধান্য দিয়েছি। এখন মেয়েদের পোশাক ৬০ ও পুরুষের ৪০ শতাংশ। এই অনুপাতে আমরা ভালো সাড়াও পাচ্ছি।
রেজাউল হাসান: আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি তরুণদের জন্য ট্রেন্ডি এবং মডেস্ট পোশাককে গুরুত্ব দিতে। একটা মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিন যে ড্রেসটা পরে যাবে, বন্ধুদের আড্ডায় যেটা পরে যাবে, সেটাই আমরা তৈরি করি; কিন্তু আমাদের সিলুয়েট মডেস্ট। মজার অভিজ্ঞতাও আছে। একবার একটা স্লিভলেস পোশাক ডিজাইন করা হলো। নিয়েও আসা হলো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বিক্রি ভালো না। পরে সেটার জন্য আলাদা হাতা দেওয়া হলে দ্রুতই শেষ হয়ে গেল। বস্তুত ভোক্তার মনোভাব জানাটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁরাই ব্র্যান্ডের ভ্যালু ক্যারি করেন। সিঙ্গাপুরের ক্রেতাদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের মানুষ আমাদের পোশাকের খুব প্রশংসা করেন। তাঁরা বলেন, তোমাদের পোশাক আর ডিজাইনগুলো খুব ভালো। আমাদের ম্যাডামকেও (মন্নুজান নার্গিস) দেখি রাত জেগে পোশাকের নতুন ডিজাইন নিয়ে পড়ছেন, স্যাম্পল ট্রাই করছেন, ডিজাইনারদের ফিডব্যাক দিচ্ছেন। এ প্যাশন একান্ত জরুরি। ডিজাইন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্যাশন ছাড়া ফ্যাশন হয় না।