default-image

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে (১৯৩২-২০১৪) নিয়ে লিখতে গিয়ে এই শিরোনামই মনে আসে। সৈয়দ আজিজুল হক কাইয়ুম চৌধুরী: শিল্পীর একান্ত জীবনকথা (প্রথমা, ২০১৫) বইয়ে বলেছেন, ধ্রুপদি সংগীতের ঘরানা-বাহিরানায় বিমুগ্ধ কাইয়ুম চৌধুরী ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর ‘বাজুবন্দ খুল খুল যায়’-এর মর্মমাধুরীতে স্নাত ছিলেন। আর আমরা তো জানি, ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর আর্মি স্টেডিয়ামে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ধ্রুপদি সংগীতের আসরে বক্তৃতা দিতে দিতেই কাইয়ুম চৌধুরী ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। এ যেন জীবনের সুর থেকে মৃত্যুর অমৃতলোকে যাত্রা। কাইয়ুম চৌধুরীর সারা জীবনই ছিল আনন্দিত শিল্পজীবন; কবিতা-ছড়া-আলোকচিত্র-চলচ্চিত্র-সংগীত-ভ্রমণ-আড্ডার আভায় ছাওয়া।

ফেনীতে জন্ম নেওয়া কাইয়ুম চৌধুরী বাবার বদলির চাকরিসূত্রে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নড়াইল, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী, ফরিদপুরে থেকেছেন; বাংলার বিচিত্র অঞ্চলে বসবাসের আলো-হাওয়া, রোদ-ছায়া যেন তাঁর শিল্পভুবনে বাংলাদেশের আত্মার ছবি ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

বিজ্ঞাপন

নিজের শিল্পচর্চার সূচনা সম্পর্কে বলেছেন:

‘আমি যখন স্কুলের ছাত্র, স্বপ্ন ছিল আর্ট স্কুলে ভর্তি হব। স্কুলে থাকতেই আঁকাআঁকি। দেয়ালপত্রিকায় ছবি আঁকি। বই-পুস্তক আর পরীক্ষার খাতা পর্যন্ত আঁকার ব্যাপ্তি। একটা নেশার মতো।’ (কাইয়ুম চৌধুরী, জীবনে আমার যত আনন্দ, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬)

এই নেশা ক্রমশ গড়িয়েছে চিত্রকলায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায়; আবার তার সমান্তরালে ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, অর্থাৎ মানবমুক্তির অভিযাত্রায় শামিল ছিলেন যেনবা সহজিয়া ছন্দে। কারণ, শুরু থেকে শিল্প তাঁর কাছে ছিল স্বাধীনতার ভাষা। এ দেশের আপামর মানুষের সংকটে-সংকল্পে, লড়াইয়ে-উত্থানে আর অব্যাহত অগ্রগমনে কাইয়ুম চৌধুরী জড়িয়ে আছেন অঙ্গাঙ্গিভাবে। তাঁর সুদীর্ঘদিনের সুহৃদ প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের তাই যথার্থ বিস্ময়, ‘একজন কত দিতে পারে!’

১৯৫৪ সালে শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে যেন প্রবেশ করেন পৃথিবীর পাঠশালায়, শিল্পশালায়। আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে আর শিল্পজীবনের প্রারম্ভপথে তাঁর বন্ধুবৃত্তে ছিলেন চিত্রকর, কবি, কথাশিল্পী, সংগীতজ্ঞসহ শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের সেরা মানুষেরা।

শিল্পী আমিনুল ইসলামের অনুরোধে কিশোরগঞ্জ থেকে প্রকাশিত প্রতিভা নামের শিশু-কিশোর কাগজের প্রচ্ছদ করেছিলেন যে উদীয়মান শিল্পী কাইয়ুম, পর্যায়ক্রমে তাঁর হাতে অঙ্কিত হয় প্রথম আলোসহ একটি দেশের একগুচ্ছ জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকপত্রের লোগো। ২৫ বছর বয়সে জহুরুল হকের সাত সাঁতার বইয়ের প্রচ্ছদ রচনা করে যিনি বিস্মিত করেছিলেন অনেককে; সৈয়দ আজিজুল হকের তথ্যমতে, সেই শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বই, পত্রিকা, সংকলন ইত্যাদি মিলিয়ে সাত হাজারের বেশি প্রচ্ছদ অঙ্কনের ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এক জীবনে এ এক অনন্য অর্জন।

বিজ্ঞাপন
default-image

জসীমউদ্‌দীনের জীবনকথা থেকে হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে; বাংলা সাহিত্যের সেরা বহু সৃষ্টি পাঠকের স্মৃতির সংগ্রহে স্মরণীয় হয়ে আছে কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পছোঁয়ার জন্যও।

এক জীবনকে তিনি যাপন করেছেন বহুবর্ণিল উদ্ভাসনে। চলচ্চিত্র ছিল তাঁর প্রিয় এক পরিব্রাজনস্থল। প্রবল ভালো লাগা থেকে ১৫-১৬ বার দেখেছেন সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, নিজেকে মনে করেছেন ‘নিশ্চিন্দিপুরের সেই অপু’। আবার সমান আকর্ষিত হয়েছেন রোমান হলিডে আর গ্রেগরি পেক-অড্রে হেপবার্নেও:

‘অড্রে হেপবার্নের সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরীর প্রথম পরিচয় রোমান হলিডেতে। হেপবার্নের সেটি প্রথম ছবি। জীবনের স্মরণীয় সব মুহূর্ত। ঢাকার সিনেমা হলে রোমান হলিডে দেখে কাইয়ুম চৌধুরীর মনে সে কী গভীর রোমান্টিক আবহ। তাঁর সেই স্বপ্নের রাজকুমারীকে দেখতে পেলেন আবার ঢাকাতেই। হেপবার্ন এসেছিলেন ইউনিসেফের ভ্রাম্যমাণ দূত হিসেবে। চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিশুদের টিকাদানের ওপর

পোস্টার প্রদর্শনী উদ্বোধন করেছিলেন তিনি। কাইয়ুম চৌধুরী তাঁকে সম্বোধন করেছিলেন “এক্সেলেন্সি ইওর হাইনেস” বলে। অটোগ্রাফ নিয়েছিলেন তাঁরই ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি ছবির লংপ্লে রেকর্ডের ওপর। যতক্ষণ হেপবার্নকে দেখছিলেন, ততক্ষণ গ্রেগরি পেকও ছায়ার
মতো তাঁর পাশে পাশেই ছিলেন বলে মনে হয়েছিল কাইয়ুম চৌধুরীর।’ (উদ্ধৃত, সৈয়দ আজিজুল হক)

চলচ্চিত্রের নিমগ্ন দর্শক শুধু নন, বন্ধু সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে মাটির পাহাড়, শীতবিকেল, ফির মিলিঙ্গে হাম দুনোর মতো চলচ্চিত্রের পরিচালনা, পোস্টার অঙ্কনের পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন অবাস্তবায়িত কেরায়া চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনায়।

বর্ণাঢ্য পেশাজীবনে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অধ্যাপনার পাশাপাশি নানা সময়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন পত্রপত্রিকার কাজের সঙ্গেও। এমনই এক পত্রিকা সচিত্র সন্ধানী, যে পত্রিকায় মূলত কাইয়ুম চৌধুরীর অনুরোধেই শহীদজননী জাহানারা ইমাম লিখলেন হৃদয়রক্তের দলিল একাত্তরের দিনগুলি। কাইয়ুম চৌধুরীর হাতেই তো প্রাণ পেয়েছে কত কত একুশের সংকলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের বজ্রে বাজে বাঁশীর প্রচ্ছদপট কিংবা সবুজ স্বদেশের জমিনে মাথায় লাল গামছা বাঁধা খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তিযোদ্ধা-প্রতিকৃতি।

প্রাণের আনন্দে ছড়া তো তিনি লিখতেন বহু আগে থেকেই, জীবনের গোধূলি-গগনে ভ্রমণের আনন্দিত প্রহরে তাঁর হাতে যেন ছবির মতোই আঁকা হতে লাগল কবিতার অবয়ব:

‘মেঘের আনাগোনা, বৃষ্টি একটানা/ দৃশ্যাবলি মুছে যায়, মেঘরাজ্যে বসবাস/ ঘন হয়ে আসে ছায়া রং ছায়া/ আঁকার অপেক্ষায় যেন সাদা ক্যানভাস।’

সাদা ক্যানভাসজুড়ে জীবনভর তাঁর রেখা ও রং সৃজনের ব্যাকরণসীমা ছাপিয়ে বাঙ্ময় করেছে বাংলাদেশের নদী-মাঠ-ঘাট-মানুষ ও অসীম আকাশ। আলোকচিত্রও ছিল তাঁর এক প্রিয় মাধ্যম। আমরা যখন গভীর চোখ রাখি তাঁর বিচিত্র চিত্রগুচ্ছের দিকে, তখন কখনো মনে আসে তাঁর একেকটি চিত্রকর্মে যেন ফটোফ্রেমে বাঁধাই করা বাংলাদেশই বলিষ্ঠতা ও মমতায় ভাস্বর।

বিজ্ঞাপন

কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রকর্ম তাই অনায়াসেই বিষয় হয়ে ওঠে বাংলা কবিতার প্রকৃতিলগ্নতায়। আল মাহমুদের ‘খড়ের গম্বুজ’ কবিতার কথা সহজেই মনে আসে: ‘পাতার প্রতীক আঁকা কাইয়ুমের প্রচ্ছদের নিচে’। বেলাল চৌধুরীর ‘কাইয়ুম চৌধুরীর শাদা-কালো রেখাঙ্কনে সুন্দরবন’ কবিতায় সুন্দরবনের রহস্যসুন্দর যেন প্রাণ পায় কাইয়ুমীয় চিত্রবিভায়:

‘অজানা পাখির অচেনা শিসের মধু ঝরে/ খুনি স্তব্ধতাকে চিরে মিশে যায় দিগন্তে।’

আর সৈয়দ শামসুল হকের ‘নৌকোর চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরী’ কবিতায় বাংলা কবিতা আর কাইয়ুম চৌধুরীর জলবতী চিত্রকলা এভাবেই একাত্ম হয়ে যায়:

‘আপনার ক্যানভাস থেকে, নৌকোর গলুই থেকে,/ চিত্র আর চিত্রিতের ব্যবধান থেকে/ একদৃষ্টে চেয়ে আছে পঙ্খহীন একক এ চোখ;/ আমার কবিতা থেকে, কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের শরীর থেকে,/ উচ্চারণ আর নীরবতার ভেতর থেকে/ এখন তো বয়ে যাচ্ছে মৃত সব নদীর নিশ্বাস।’

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে কাইয়ুম চৌধুরীর পিতার সহপাঠী ছিলেন গানের রাজকুমার শচীন দেববর্মন। নানান লেখায়, বক্তৃতায় তিনি বলতেন, শচীন দেবের ‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ গানের কথা। কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পসাধনা, সংগ্রাম এবং স্বপ্নকল্পনায়ও তো চিত্রছন্দে মুহুর্মুহু বেজে উঠেছে বিজয়ী বাংলাদেশেরই আনন্দিত আত্মা।

মন্তব্য করুন