ইঁদুরটার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছিল। তাকে খাঁচা-ফাঁদে আটকানোর উদ্দেশ্য ছিল মেরে ফেলা। কিন্তু সে বেঁচে গেল। বেঁচে গেল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া ভারতীয় এক মনীষীর কারণে। যেকোনো প্রাণ হরণের বিরুদ্ধে তিনি একটি নীতিশিক্ষা প্রচার করেছিলেন: ‘পাণাতিপাতা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি’। অর্থাৎ, ‘প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকব এই শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।’
প্রীতিময়ের কাছে ইঁদুর একটা জঘন্য প্রাণী। কুটকুটে চোখে যখন সে সন্ত্রস্তভাবে এদিক-ওদিক তাকায় আর বাজিগরের চোঙার মতো সামনের দিকে বাড়ানো কানগুলো একটু একটু নাড়ে, তখন রক্তচোষা বাদুরের কথা মনে পড়ে। সুচালো নাক, মুখ এবং চোয়ালের চারপাশে বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অ্যান্টেনা-সদৃশ কেশগুলো নাড়ালে যেন পৃথিবীর তাবৎ শস্যদানা শিউরে ওঠে। শিউরে ওঠে বুকের খাঁচার ভেতর লাফাতে থাকা প্রীতিময়ের হৃৎপিণ্ডটা। ইঁদুরটা ওটাকে শস্যদানা মনে করে কি না, কে জানে।
জঘন্য এই প্রাণিকুলের একটা সদস্য, একটা নেংটি ইঁদুর মাত্র, যখন প্রীতিময়ের রুমে এসে আত্মপ্রকাশ করল, তখন তার জীবনসঙ্গিনীতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় থাকা বান্ধবী সুমনা দর্শনীয়ভাবে লাফিয়ে উঠল। এক লাফে চৌকির ওপর উঠে ঠ্যাং দুটো দ্রুত আছড়াতে আছড়াতে চিৎকার করতে লাগল, যেন জামার ভেতরে ভয়ংকর একটা কিছু ঢুকেছে।প্রীতিময় অবাক হয়ে বলল, ‘কী হয়েছে, এমন লাফাচ্ছ?’
কান্না পাচ্ছে না আর আঁতকে ওঠার মতো ভয়ও লাগছে না, তবু এমন বিষয়কে ভয়াবহ ও গুরুতর ব্যাপার হিসেবে উপস্থাপন করতে একটু নাকি সুরে কান্নার ঢঙে বলাটাই এর গুরুত্ব বোঝানোর যথাযথ স্টাইল মনে করে সুমনা। ওই ভঙ্গিমায় অভিযোগ করল, ‘তুমি কম্বলটা কয় বছর ধরে গায়ে দাও না?’
উত্তরের বদলে উল্টো প্রশ্ন খাওয়া। প্রীতিময় ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল, ‘এই তো সেদিন, সারা রাত ধরে বৃষ্টি হলো না...’
সুমনা চৌকিতে বসতে বসতে বলল, ‘তাহলে কম্বলের ভাঁজে ইঁদুর আসে কোত্থেকে?’
প্রীতিময় হেসে উঠল, ‘ওহ্, তাই বলো। দুই দিন ধরে ছাদে কট্কট্ কট্কট্ করছিল তাহলে এই ব্যাটাই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট না পেয়ে হলের পাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন টিনশেড একটা কটেজের সিঙ্গেল রুমে অন্যদের চেয়ে দেড় গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে থাকে প্রীতিময়। রুমটা বাগাতে হয়েছে রীতিমতো যুদ্ধ করে। রুমের ছাদটা বাঁশের বেড়ার তৈরি।
সুমনা কৃত্রিম ভয় নিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি মেরে ফেলো, কেটে সব শেষ করে দেবে। নেংটি ইঁদুর ছোট বলে কাটায় বেশি ওস্তাদ।’
মারার জন্য কোনো একটা জুতসই অস্ত্র খুঁজতে খুঁজতে প্রীতিময় শেষ পর্যন্ত নিজের পায়ের পাতায় থাকা চপ্পলের এক পাটি খুলে ইতস্তত চটাস চটাস করে মারল। কিন্তু ইঁদুরটা বাজে রকমের ছোট এবং যাচ্ছেতাই দৌড়াতে পারে। জীবন বাঁচানোর পক্ষে যথেষ্ট উপযুক্ত কোনো আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। প্রীতিময় আর খুঁজে পেল না।
সুমনার পরামর্শে বাজার থেকে বিষটোপের বদলে একটা খাঁচার ফাঁদ কিনে আনার তিন ঘণ্টা পরে নিজের কাণ্ডজ্ঞানকে স্পর্শ করার কোনো উপায় নেই জেনে, যে চটির ঘায়ে ইঁদুরটাকে মারার চেষ্টা করেছিল, সেই চটি দিয়ে দাঁত-মুখ খিঁচে নিজের কপালে চটাস চটাস করে বসিয়ে দিল কয়েক ঘা। ফাঁদের মধ্যে আটকাবে কী, ইঁদুরটা খাঁচার ভেতর দিয়ে এপাশ-ওপাশ হার্ডলস রেস দৌড়ায়।
মানুষের কাণ্ড দেখে ইঁদুরটা কিচকিচ শব্দে হেসে উঠল। প্রীতিময়ের পিত্তি জ্বলে গেল। আটকাতে পারলে ইঁদুরটাকে গৃহছাড়া করা ছাড়া অন্য কোনো পরিকল্পনা মাথায় ছিল না। এবার সে মনে মনে ইঁদুরটার মৃত্যুদণ্ড জারি করল। মানুষের সামর্থ্য নিয়ে উপহাস করার বোকামি যে তাকে মরণদায়ী একটা ভয়ংকর শপথের গেরোতে আটকে দিল, ইঁদুরটা সেটা বুঝতে পারল না। প্রীতিময় এক কয়েল তার কিনে নতুন করে বুনল খাঁচাটা।
এমন দিনে ইঁদুরটা ফাঁদে আটকাল, যেদিন ছিল আষাঢ়ী পূর্ণিমা। প্রীতিময় ক্লাস থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে দিয়েছিল ঘুম। বিকেলে সুমনা এসে জাগিয়ে দিল। বিশ্বশান্তি প্যাগোডায় যাবে।
ধর্মকর্মের ব্যাপারে সুমনা বেশ সজাগ। পূর্ণিমা-অমাবস্যানির্ভর ধর্মীয় রীতি-আচার পালনে খুব বেশি মনোযোগ নেই বলে তথ্যগুলো প্রীতিময়ের মাথায় থাকে না। তার মাঝেমধ্যে বিরক্ত লাগে। সম্পর্কের খাতিরে সহ্যও করে, নিজেকে উদার প্রমাণের প্রচেষ্টায় আত্মবিসর্জন দেয়।
ইঁদুর ধরার খাঁচাটা দেখে সুমনা বলল, ‘তোমার ইঁদুরটা এখনো ধরতে পারনি?’
‘না, ব্যাটা প্রতিদিন খাবার খেয়ে পালায়।’
‘বোঝো এবার, কেমন পুরুষ তুমি, একটা ইঁদুরই ধরতে পার না।’ সুমনা খোঁচা দেয়।
‘পুরুষের কাজ বুঝি ইঁদুর ধরা?’
‘তো কী?’
‘বিড়াল মারা।’
‘হুম, যে ইঁদুরই ধরতে পারে না, সে মারবে বিড়াল! আগে বাপের কাছে যাও। সাবালকত্বের সার্টিফিকেট জোগাড় করো।’
‘বাবারা হচ্ছেন সবচেয়ে বড় স্বৈরশাসক। বোঝেন যে ছেলে সাবালক হয়েছে, কিন্তু স্বীকৃতি দিতে চান না।’
‘বাস্তবতার কাছে এসব সান্ত্বনাবাক্যের কোনো গুরুত্ব নেই। বাবার তিন মাসের কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে। তিন মাস পর ভান্তেদের বর্ষাবাস শেষ হলে তিনি মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতিতে নেমে পড়বেন।’
‘শুধু নিজের কথা বলছ কেন, আমার বাস্তবতা একবার ভাব। যে বাবা অনেক কষ্টে মাসে দুই হাজার টাকা ছেলেকে পাঠান, তিনি নিশ্চয় চাকরির বদলে পুত্রবধূর ভার কাঁধে নিতে চাইবেন না।’
‘তোমার বাস্তবতা বুঝি না তা নয়, তোমার সিরিয়াসনেসের ডেপ্থ দেখার চেষ্টা করছি।’
‘কী দেখলে?’
‘সে তুমি ভালো বোঝো। হ্যাঁ-না কিছু করতে না পারলে আমি কিন্তু বাস্তবতাকেই নিয়তি বলে মেনে নেব।’
‘মেনে যে নেবে, সে তোমার হেঁয়ালি দেখেই তো বুঝতে পারছি। আমেরিকান ডিবি পাত্র, এ তো দুর্দমনীয়, ঠেকাবে সাধ্য কার। নিশ্চয় দুটো ফিরতি টিকিট কেটে ক্রিসমাস ছুটির অপেক্ষায় আছে।’
কোনো জবাব না দিয়ে সুমনা হুটহাট করে বেরিয়ে গেল। প্রীতিময় বুঝল, এত বেশি বলা ঠিক হয়নি। রসিকতাচ্ছলে কথাবার্তা হঠাৎ সিরিয়াসের দিকে মোড় নিল। কিন্তু সে আর কী করতে পারে? মাস্টার্স শেষ করার আগে একটা কিছুতে লেগে পড়ার চেষ্টা কম তো করছে না। চাকরির উদ্দেশে ছোড়া তিরগুলো ব্যর্থতার বিষ মেখে কেবল বুমেরাং হয়ে তার বুকে কষ্টের আঘাত নিয়ে ফিরে আসছে। সুমনার চাপ ও ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় জমতে জমতে অসহ্য বোঝায় পরিণত হয়েছে। তাদের দুজনের আলোচনার প্রধান বিষয় এখন একটাই—শুধু বিয়ে আর বিয়ে। একটি বিয়ে করা নিয়ে, অন্যটি না করা নিয়ে।
ভার্সিটির দুই নম্বর গেটে এসে রিকশা থেকে নেমেও দুজনের মৌন মুহূর্ত কাটে না। প্যাগোডায় ঢুকে কোনো কথা না বলে পঞ্চশীল প্রার্থনায় বসে যায়। পঞ্চশীল গ্রহণ শেষে চলে তিরিশ মিনিটের ধ্যান অনুশীলন। প্রীতিময় চেষ্টা করে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বিক্ষিপ্ত মনটাকে শান্ত করতে।
সে যখন রুমে ফিরল, তখন রাত বারোটা। টিউটোরিয়াল নোট শেষ করার জন্য চেয়ারে বসল, কিন্তু মাথায় তখন অন্ধ চিন্তার ঘূর্ণি। হাওয়াদীর্ণ উত্তাল মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করা যাবে না দেখে শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে বুঝতে পারল, আজকে ঘুমেরাও মেঘ হয়ে মেলে দিয়েছে ডানা, হাওয়ায় উড়ছে...তবু বেড সুইচটা অফ করে দিল প্রীতিময়।
কিছুক্ষণ পর ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো। উঠে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না প্রীতিময়, বরং পূর্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে শব্দের একটা সহজ সমাধান করল, ‘কুত্তার বাচ্চা ইঁদুরটা আবার খাবার নিয়ে পালিয়েছে।’ নিজের কথায় নিজেরই হাসি পেল। ইঁদুরের বাচ্চাকে বলছে কুত্তার বাচ্চা। মনে মনে নিজেকেই সে বলল, গাধা কোথাকার! মানুষ অসীম ক্ষমতাবান হতে পারে, কিন্তু অনেক সময় সঠিক উপমা প্রয়োগের মতো তুচ্ছ ক্ষমতাগুলোও তার থাকে না।
কিছুক্ষণ পর কিচকিচ আর খচখচ আওয়াজে বুঝল গরবর আছে কিছু একটা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দেখল, ইঁদুরটা আটকা পড়েছে। মুহূর্তে সুমনার প্রতি অক্ষম অভিমানজাত ক্ষোভের ঝাপটা গিয়ে পড়ল ইঁদুরটার ওপর। সকাল হলে লেজে সুতো বেঁধে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেবে। ক্ষুধার্ত কাকের খাবার হোক।
পরক্ষণে আবার একটা চিন্তা এসে দখল করল তার মনের কর্মতৎপরতা। নীতিশিক্ষাটা তাকে বাধা দিল। ‘প্রাণ হরণ করবে না’ শপথ নিয়েছে এখনো বারো ঘণ্টা হয়নি। ধর্মের নিয়ম ভাঙলে হয়তো পাপ হয়, কিন্তু নৈতিক দায় এড়ানো যে অপরাধ।
অসহায় মনে কখনো কখনো দয়ার শিশির জমে। প্রীতিময়ের মনে জমা শিশির ঝরল ইঁদুরটার ভাগ্যের ওপর। ভয়ার্ত ইঁদুরকে দেখে এইবার তার মনে হলো, একটা ইতর প্রাণীর ওপর এত বিদ্বেষ পোষণ করে কী লাভ? সবাই বাঁচতে চায়। হোক না সে অতি তুচ্ছ নেংটি ইঁদুর। ইঁদুরটা নিশ্চয় ক্ষুধার্ত। না হলে খাবারের সন্ধানে মৃত্যুফাঁদে ঢুকবে কেন?
রাত জাগলে খিদে পায় বলে রুমে ফেরার সময় হাতে করে পাউরুটি আর কলা নিয়ে এসেছিল। সেখান থেকে এক পিচ পাউরুটি ছোট ছোট টুকরো করে খাঁচার ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
ইঁদুরটাকে ছেড়ে না দিয়ে পরদিন থেকে খাবার-পানি সরবরাহ করে যেতে লাগল।
রোজার বন্ধ শুরু হবে কয়েক দিন পরে। প্রীতিময় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাড়ি যাবে না। চাকরির কালোবাজারে দান মারবে। সুমনার সঙ্গে আপাতত বিরোধ মিটে গেছে। সে-ও বাড়ি যাবে না, চেষ্টা করবে কিছু একটা করার। দুজনের একজনও যদি চাকরির সংস্থান করতে পারে, তাহলে বাবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে আর বেশি কিছু লাগবে না।
একদিন শুক্রবার, ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই। রাত তিনটা পর্যন্ত তাস খেলে সকালে দেরিতে উঠবে বলে দেরিতে ঘুমিয়েছে প্রীতিময়। ভেবেছিল যতক্ষণ মন চায় ঘুমাবে, তারপর প্রশান্তির আবেশ দু-চোখে মেখে পাখির শুকনো পালকের মতো ফুরফুরে মন নিয়ে উড়তে উড়তে উঠবে ঘুম থেকে। তার বদলে মনটা বিরক্তিতে কাচের মতো ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল টুকরো টুকরো হয়ে। ঘুমজড়ানো চোখে দরজা খুলল প্রীতিময়। দেখল মামাতো ভাই আর্যমিত্র হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। বয়সে তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। মামাতো ভাই কিংবা হাসিমুখ—কোনোটা দেখে সে প্রীত হলো না। তার মনে হলো, কেউ তাকে ধাক্কা মেরে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে।
অসহায় মানুষ কতভাবে না ভাগ্যের পিণ্ডি চটকায়। চাকরির জন্য যেখানে এখন সে নিজে পাগলা কুকুর, সামনে দৃষ্টিগ্রাহ্য যা পায় কামড়ে দাঁতের জ্বালা মেটায়; সেখানে আর্যমিত্র এসেছে তার কাছে—নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার আবদার নিয়ে। প্রীতিময় কী করবে ভেবে পেল না। তার জীবনের সমস্ত সমীকরণ এখন এক জায়গায় এসে ঠেকেছে। তুলাদণ্ডের এক প্রান্তে সুমনা, অন্য প্রান্তে চাকরি। সুমনাকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে তার বিপরীত পাল্লায় দুই মাসের মধ্যে চাকরির বাটখারা চাপাতেই হবে। না পারলে ভারসাম্য হারিয়ে জীবন থেকে চিরদিনের জন্য অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে সুমনা।
কারও জন্য প্রক্সি দেওয়ার কাজটি প্রীতিময় করতে চায় না। কিন্তু আর্যমিত্র কাঁচা লোক নয়। প্রীতিময় রাজি হবে না জেনে তার বাবার কাছ থেকে কড়া নির্দেশ-সংবলিত একটা চিঠি নিয়ে এসেছে। সে বুঝতে পারল, তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। এর আগেও একবার এই আর্যমিত্রের জন্য প্রক্সি পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল তাকে। সেবার প্রিলিমিনারিতে টিকিয়েও দিয়েছিল। পরে সে আবার লিখিত পরীক্ষায় বসার আবদার নিয়ে এলে প্রীতিময় পরীক্ষার অজুহাত দেখিয়ে রাজি হয়নি। ফলে আর্যমিত্র লিখিত থেকে ছিটকে যায় আর পুরো আত্মীয়মহলে বলে বেড়াতে থাকে যে প্রীতিময়ের অসহযোগিতার কারণে তার চাকরিটা হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রীতিময়কে জনে জনে অবশ্য এর জবাবও দিতে হয়েছিল। এমনকি তার বাবা পর্যন্ত বলেছেন, ‘পরীক্ষাটা দিতে গেলে কী এমন ক্ষতি হতো? মানুষ ভাইয়ের জন্য এটুকু করে না?’
লোকজনের আচরণ দেখে সে অবাক হয়ে গিয়েছিল। একজনও তার পক্ষে বলেনি, বলেনি যে এটা অপরাধ। উল্টো সবাই তাকে দোষী বানিয়ে দু-কথা শুনিয়ে দিয়েছিল অনাত্মীয়সুলভ আচরণের জন্য। তাদের এ কথা বলতেও বাধেনি, বেশি পড়ালেখা করার কারণেই তার এই অধঃপতন। অসহায় প্রীতিময়ের সামনে সবার মুখচ্ছবি একটা ফ্রেমে এসে আটকে গিয়েছিল যেন, ‘অবক্ষয়িত একেকটা মাংসপিণ্ড, যাদের হৃৎপিণ্ডে নৈতিক মূল্যবোধের এক কণা লবণও অবশিষ্ট নেই।’
ভাইয়ের সঙ্গে প্রীতিময় এমন শীতল আচরণ করল, সভ্য সমাজে যা অশোভন। আর উষ্ণ আচরণ যেটা করল, তার শেষ বাক্যটা ছিল এ রকম, ‘এই শেষবার, জীবনে আর কখনো এ ধরনের কাজ নিয়ে আমার কাছে আসবেন না।’ প্রীতিময় ভেবেছিল এ কথায় আর্যমিত্র প্রতিক্রিয়া দেখাবে, কিন্তু আশ্চর্যজনক বিনয় দেখিয়ে সে রাহা খরচ আর নকল প্রবেশপত্রটা রেখে চলে গেল হাসিমুখে। সঙ্গে ইঁদুর বিষয়ে দু-একটা বিষপিঁপড়ে মার্কা উপদেশ। অপ্রিয় মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উপদেশের চেয়ে অপছন্দের জিনিস দুনিয়াতে আর কী আছে?
প্রীতিময় পরীক্ষা দিতে গেল ঢাকায়। যাওয়ার আগে বাইরে নিয়ে ইঁদুরটাকে ছেড়ে দিলে সেটা দৌড়ে চলে গেল ঝোপের মধ্যে। ঢাকায় সপ্তাহখানেক থেকে নিজেও চাকরির চেষ্টায় এক-দুজনের কাছে তদবিরে যাবে।
২.
তিন মাস পরে ঢাকা থেকে ফিরল সে। পরীক্ষাটা ছিল ডেপুটি জেলার পদের। ধরা পড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের মেয়াদ দিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্য জেলখানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জামিনে বেরিয়ে দেখল, বদলে গেছে তার পৃথিবীর রং। নিয়মিত ব্যাচের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে না পেরে পিছিয়ে পড়ল। সুমনার জন্য আর কখনো তাকে চিন্তা করতে হবে না। সে দায়িত্ব এখন অন্যজনের। নিষিদ্ধ হয়ে গেছে সরকারি চাকরি নামের গুপ্তধনের সন্ধান। মনোবেদনায় পুড়তে থাকা প্রীতিময় খেয়াল করল, এমন বিপর্যয়ে অদ্ভুতভাবে তার ভাইটি একবারও দেখা করার সময় করতে পারেনি।
ক্যাম্পাসে যখন ফিরল, রুমের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিন মাসের বদ্ধ অনভ্যস্ত হাওয়া তাকে চেনে না বলে জানাল। ধুলোবালি, ঘুণ, মাকড়সার জাল, ফাঙ্গাসের পরত—এসব জঞ্জাল; আবাসের সঙ্গে জীবনকে পর্যন্ত আঁকড়ে ধরতে এগিয়ে এল। ঝাড়া-মোছার কাজ সেরে জীবনের এই পর্যন্ত অর্জিত মূল্যবান সার্টিফিকেট, মার্কসশিটের ফাইলটা হাতে নিয়ে ওল্টাতেই হতাশায় একেবারে বিমূঢ় হয়ে গেল সে। ইঁদুর তার মূল্যবান সব সার্টিফিকেট কুচি কুচি করে কেটে নরম গদির বিছানা বানিয়ে আঙুলের ডগার সমান ছয়টা গোলাপি রঙের বাচ্চা দিয়েছে। ইঁদুর সম্পর্কে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বীভৎস বোধটা আবার ফিরে এল তার মধ্যে। সঙ্গে মনঠেঙানো বিদ্বেষ। তার ইচ্ছে হলো, পায়ের তলে সব কটাকে একেবারে পিষে ফেলে। কী ভেবে ফাইলটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল বাইরে । ছানাগুলো ছিটকে গিয়ে কিচকিচ আওয়াজ তুলে হাত-পা ছুড়ে আশপাশে ঘুরতে থাকা কাকগুলোকে আকৃষ্ট করে ফেলল। কা-কা করতে করতে একটি আরেকটিকে ডাক দিচ্ছে। এর মধ্যে সাহসী একটা এসে ছোঁ মেরে একটা ছানা তুলে নিয়ে গেল। অন্য ছানাগুলো অসহায়ভাবে চিৎকার করেই চলেছে। হয়তো সাহায্য চাইছে। সাড়া পেয়ে জড়ো হওয়া কাকগুলোর তৎপরতা দেখে প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র হারানোর শোক ও ক্ষোভ সত্ত্বেও প্রীতিময়ের কেন যেন মনে হলো, ইতর-বোধবুদ্ধিহীন বাচ্চাগুলোরই-বা কী দোষ, যারা এখনো পৃথিবীর আলো দেখার দৃষ্টি পর্যন্ত লাভ করেনি? যাদের বোধবুদ্ধি আছে, তারাই-বা কত দূর মানবিক আচরণ করেছে? কী পেয়েছে তাদের কাছ থেকে?
ছানাগুলো কুড়িয়ে এনে মা ইঁদুরের কাছে ফিরিয়ে দেবে ভাবতে ভাবতে রুমের বাইরে পা ফেলতেই প্রীতিময় দেখল, কয়েকটা কাক ছানাগুলোর উদ্দেশে মেহগিনি গাছের ডাল থেকে ঝাঁপ দিয়েছে।