আনিসুজ্জামানের ছবি অবলম্বনে
আনিসুজ্জামানের ছবি অবলম্বনে

চুরাশি বছর বয়সে আনিসুজ্জামানের জীবনাবসানকে অকালপ্রয়াণ বলা চলে না, তবে অসময়োচিত মৃত্যু নির্দ্বিধায় বলা যায়। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে তাঁর খ্যাতি দেশের সীমানা ছাড়িয়েছিল। তাঁর রচনা সম্ভার বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। এর বাইরে একটি ন্যায়পরায়ণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষায় তাঁর চিন্তা ও কর্ম ছিল অসামান্য মনস্বিতায় পূর্ণ। ‘ইহজাগতিকতা’ নামক আলোচিত প্রবন্ধে আনিসুজ্জামান লিখেছেন:
‘যে-জগৎ ইন্দ্রিয়গোচর ও যুক্তিগ্রাহ্য এবং যে-জীবন জন্ম ও মৃত্যুর সীমায় আবদ্ধ, সেই জগৎ ও জীবন সম্পর্কে উৎকণ্ঠাকেই বলা যায় ইহজাগতিকতা। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এ এক সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরলোক ও পরকাল সম্পর্কে কিংবা অতিপ্রাকৃত ও আত্মা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা প্রশ্রয় পায় না। পৃথিবী ক্ষুদ্র হোক আর বিপুলা হোক, জীবন পদ্ম পত্রে নীর হোক আর জীবকোষের সমাহার হোক, এই পৃথিবীতে সুখদুঃখ-বিরহমিলন-পরিপূর্ণ মানবজীবনের সাধনাই ইহজাগতিকতার মূল কথা।’

এই ভাষ্য অনুযায়ী আপাদমস্তক ইহজাগতিকতাবাদী ছিলেন আনিসুজ্জামান। পাশ্চাত্যে ব্যবহৃত ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দের অর্থ ‘ইহজাগতিকতা’ যার মানে দাঁড়ায় ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিযুক্ততা। যেকোনো কারণেই হোক আমাদের সংবিধানে ও আচার-অনুষ্ঠানে ‘সেক্যুলারিজম’–এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। অর্থ যা-ই হোক না কেন চিন্তায় ও কর্মে সেক্যুলারিজমের বলিষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন আনিসুজ্জামান। ইহজাগতিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা সমার্থক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর কথা ও লেখায়।

ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি আনিসুজ্জামান কৈশোরেই অর্জন করেছিলেন। ‘কাল নিরবধি’,‘আমার একাত্তর’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’র মতো স্মৃতিভাষ্য বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত সম্পদ হয়ে আছে। তাঁর আত্মকথার প্রথম পর্ব ‘কালনিরবধি’তে বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের মানসিক বিবর্তনের এক অসামান্য চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। দেশভাগপূর্ব কাল থেকেই একজন অনুসন্ধিৎসু কিশোরের দৃষ্টিতে তিনি অবলোকন করেছেন সমাজ ও ইতিহাসের রূপান্তরের ছবি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্যন্ত উত্তাল সময় বিধৃত হয়ে আছে এই অসাধারণ স্মৃতিভাষ্যে। প্রথাগত ধর্মবিশ্বাস হারিয়ে কীভাবে মানুষকেন্দ্রিক ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি অর্জন করেছিলেন, এরও বিবরণ আছে এ বইয়ে।

বিজ্ঞাপন

কলেজের ছাত্রাবস্থায় যে অসাম্প্রদায়িক ও ইহজাগতিক মননের তিনি অধিকারী হলেন সেই মননবোধই তাঁকে পরবর্তী সময়ে চালিত করেছে গবেষণার ক্ষেত্র নির্বাচনে। দেশ-বিদেশের সভা-সেমিনারে, সাহিত্যচর্চায়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আনিসুজ্জামানের অবস্থান বরাবরই ছিল ইহজাগতিকতা ও মনুষ্যত্বের পক্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ‘আনন্দমঠ ও বঙ্কিম প্রসঙ্গ’ নামে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের অধিবেশনে পাঠ করলেন তিনি। সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে এটি ছিল এক সম্ভাবনাময় তরুণের দুঃসাহসের পরিচয়। ‘বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের ঐতিহ্য’ তাঁর এই বক্তব্য ক্ষুব্ধ করেছিল অনেককে। সেই অধিবেশনে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে একজন বক্তা বললেন, তাঁকে পাকিস্তান থেকে বের করে দেওয়া উচিত। অন্য কেউ হলে হয়তো এমন প্রতিক্রিয়ার পর এ–জাতীয় প্রবন্ধ লেখা থেকে বিরত থাকতেন। কিন্তু স্থিতধী ও ধীমান আনিসুজ্জামান তা করেননি। এই প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়া তাঁকে চিন্তার নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিল। উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমানদের লেখায় ফুটে ওঠা সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে গবেষণার প্রস্তুতি নিলেন তিনি। আনিসুজ্জামানের প্রথম গবেষণার শিরোনাম ‘ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯১৮)’। এটি পরবর্তীকালে ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ নামে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:
‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অবদানে সমৃদ্ধ। এর তুলনায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের পশ্চাৎপদতা বিস্ময়কর। বাংলা সাহিত্যের উৎসাহী পাঠকমাত্রই লক্ষ করেছেন যে ১৮০০ থেকে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের প্রস্তুতি পর্বে বাঙালি মুসলমান সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। অথচ তাদের সাহিত্যানুরাগ বা সৃষ্টিক্ষমতা যে লোপ পায়নি, তার প্রমাণ আরবি-ফারসি শব্দবহুল কাব্যধারার মধ্যে পাওয়া যায়।’

এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। তিনি যথার্থই বুঝেছিলেন, ইংরেজ আমলে বাংলাদেশে যে নবজাগরণের সূচনা হয়, বাংলার সমৃদ্ধ আধুনিক সাহিত্য তারই ফল। এই জাগরণ দেখা দিয়েছিল বাংলার হিন্দু সমাজে। আলোচ্য সময়ে বাঙালি মুসলমানের প্রবণতা ছিল প্রাচীন ধর্মজীবনের আদর্শে প্রত্যাবর্তন। ফলে আধুনিক জীবনাদর্শের সঙ্গে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। বর্তমান কাল সম্পর্কে তাঁদের আগ্রহ দেখা দেয় ১৮৭০-এর দিকে; সেই সময় আধুনিক শিক্ষার প্রতিও তাঁরা মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তখন থেকেই আধুনিক সাহিত্যে তাঁদের মনোনিবেশ ঘটে। তবে বিদ্যাসাগর, মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের মতো প্রতিভাবান লেখকের অভাবে এই সময়ের সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান নিষ্প্রভ ছিলেন। আনিসুজ্জামান মনে করেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে আমাদের সাহিত্যবিচার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নের ব্যাপারে এই অসম্পূর্ণতা বা অভাবকেই তিনি দূর করতে চেয়েছেন। কালের বিবর্তনে বাঙালি মুসলমান-মানসের যে রূপান্তর ঘটেছে, ঐতিহাসিক পেক্ষাপট থেকে এর বস্তুনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ আনিসুজ্জামানের অসামান্য কৃতিত্ব।
‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম দশকের মধ্যে রচিত বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যকর্মে প্রতিফলিত তাঁদের মানস-পরিচয় অনুসন্ধান করেছেন আনিসুজ্জামান। বাঙালি মুসলমানের মানস গঠনে সমাজ-রাজনীতি-ধর্মচেতনার প্রভাব ছিল। ‘মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্রে’ও উনিশ ও বিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের সমাজ-রাজনীতি-বিশ্ববীক্ষা কীভাবে তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তা বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। ‘স্বরূপের সন্ধানে’তে তিনি দেখিয়েছেন পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ কীভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া চিন্তা-দ্বন্দ্বের মীমাংসা করে তাঁদের ভাষাভিত্তিক সত্তাকে প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোনো জাতির স্বরূপ-অন্বেষণ সরল রৈখিক নয়। ইতিহাসের বিভিন্নকালে বাঙালি মুসলমান যে-অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তাতে তাঁদের তাদের স্বরূপ-চিন্তায়ও পরিবর্তন-বিবর্তন ঘটেছে। ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ এবং ‘মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্রে’ যথাক্রমে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য রচনায় ও তাঁদের সম্পাদিত পত্রপত্রিকায়, বাঙালি মুসলমানের মানসজগতের যে পরিচয় আনিসুজ্জামান অনুসন্ধান ও উদঘাটন করেছেন, তারই ক্রমপরিণতি পরিলক্ষিত হয় তাঁর অন্যতম রচনা ‘স্বরূপের সন্ধানে’তে।

আনিসুজ্জামানের বিশেষত্ব এই যে ইহজাগতিকতাকে তিনি নিজের জীবনদর্শন হিসেবে স্থির করেছিলেন। এটি শুধু তাঁর বিশ্বাসের বিষয় ছিল না, একে তিনি কর্মে রূপায়িত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সংবিধান প্রণয়নের কাজে আন্তরিকভাবে শ্রম দিয়েছিলেন। চারটি মূলনীতি-বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় ছিল তাঁর অবিচল আস্থা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে নির্ভীক ভূমিকা পালন করে গেছেন আমৃত্যু।

তাঁর গবেষণার ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, কোনো স্বাতন্ত্র্যচেতনা থেকে তিনি ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্যে’ এবং ‘মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্রে’ বাঙালি মুসলমানের স্বরূপ সন্ধান করেননি। বাঙালি-মানসের যে-পরিচয় ইতিপূর্বে বিভিন্ন পণ্ডিত-গবেষকেরা দিয়েছেন, সেটি ছিল খণ্ডিত পরিচয়। তাতে বাঙালি মুসলমানের মানসজগৎ প্রায় অনুপস্থিত। তাঁদের জীবন ও মানসের সন্ধান না পেলে বাঙালি-মানসের সমগ্রতার পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। আনিসুজ্জামান বাঙালি-মানসের সেই প্রত্যাশিত সমগ্র রূপই আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। এই সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার ‘স্বরূপের সন্ধানে’ বইয়ে।

ধারাবাহিকভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণ করে স্বরূপ বা আত্মপরিচয়ের বহুমাত্রিকতাকে আনিসুজ্জামান উপস্থাপন করেছেন। পাকিস্তান আমলে বাঙালি মুসলমানের জীবনে আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে পরস্পরবিরোধী ভূমিকা পালন করেছে, এর নির্মোহ বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এরই পরিণতিতে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের বাঙালি হয়ে ওঠার ঐতিহাসিক সত্যকে উপস্থাপন করেছেন। ইহজাগতিকতার অনুরাগী আনিসুজ্জামান শুধু গবেষণা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে নয়, কর্মজীবনেও তাঁর আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শনের পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনবিষয়ক প্রথম পুস্তিকার লেখক তিনি। ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই আন্দোলন পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছে। ষাটের দশকে সরকারি উদ্যোগে যখন রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার ঘৃণ্য চক্রান্ত শুরু হয়, তখন আনিসুজ্জামান রুখে দাঁড়ান চিন্তায় ও কর্মে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য হিসেবে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন, ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ১৯ জন নাগরিকের বিবৃতিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ ও তা প্রকাশের ব্যবস্থা এবং ১৯৬৮ সালে প্রবন্ধ-সংকলন ‘রবীন্দ্রনাথ’ সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

আনিসুজ্জামানের বিশেষত্ব এই যে ইহজাগতিকতাকে তিনি নিজের জীবনদর্শন হিসেবে স্থির করেছিলেন। এটি শুধু তাঁর বিশ্বাসের বিষয় ছিল না, একে তিনি কর্মে রূপায়িত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সংবিধান প্রণয়নের কাজে আন্তরিকভাবে শ্রম দিয়েছিলেন। চারটি মূলনীতি-বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় ছিল তাঁর অবিচল আস্থা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে নির্ভীক ভূমিকা পালন করে গেছেন আমৃত্যু। শিক্ষকতা, গবেষণা, লেখালেখির পাশাপাশি তিনি যেসব সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেগুলোর লক্ষ্য ছিল একটি উদার ও যুক্তিবাদী সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। ২০০১ সালে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সংখ্যালঘু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে গঠিত প্রতীকী গণ–আদালতে তিনি অভিযোগনামা পাঠ করেছেন। এ কারণে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা পেতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একজন মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ইহজাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে যুক্তিনির্ভর প্রবন্ধ ও পুস্তিকা লিখেছেন।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি ধার্মিকতা ও সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। ধার্মিকতা ও সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। যিনি ধার্মিক তিনি ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করেন, তার শ্রেষ্ঠতে আস্থা স্থাপন করেন, কিন্তু অন্যের ধর্ম পালনে বাধা দেন না। যিনি সাম্প্রদায়িক তিনি ধর্ম পালনের চেয়ে নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে বেশি উৎসাহী থাকেন, অন্য ধর্মের বিশ্বাস-আচার-অনুষ্ঠানের অসারতা প্রমাণে তৎপর থাকেন এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্বাসীদের সেগুলো পালনে বাধা দেন। এভাবেই তাঁর মধ্যে ধর্মান্ধতা ও সহিংস উগ্রবাদের জন্ম হয়। ‘বাংলাদেশে ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র’ প্রবন্ধে আনিসুজ্জামান যথার্থই বলেছেন:
‘ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার কী পরিণাম হয়েছে বাংলাদেশে? শুধু যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন, তা নয়। দেশের সকল নাগরিক আর আইনের চোখে নিজেদের সমান ভাবতে পারছেন না, এটাই হয়েছে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। বাংলাদেশকে যদিও ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়নি, কিন্তু সংবিধানের একটা আপাত-ইসলামি আকৃতি রচনা করা হয়েছে। তার ফলে নাগরিকেরা প্রথমে বিভক্ত হয়েছেন মুসলমান-অমুসলমানে।...ধর্ম ও রাজনীতির সংযোগ তাই বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ঐক্য নষ্ট করেছে।’

সাম্প্রদায়িকতার বীজ একসময়ে বিষবৃক্ষে পরিণত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা তথা উগ্রবাদ বিস্তার লাভ করেছে। ‘ধর্ম অবমাননার’ কথিত অভিযোগে প্রাণ হারাতে হচ্ছে নিরীহ মানুষকে, সহিংসতার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে জাতীয় সম্পদ। পাকিস্তান আমলে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন অধ্যাপক অজিতকুমার গুহসহ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা। স্বাধীন বাংলাদেশে এই ধরনের মানুষের স্বল্পতা হতাশ করেছে আনিসুজ্জামানকে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বলতার সুযোগে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মের অপব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর বিপদ সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। ‘সাম্প্রদায়িকতার ভাবাদর্শ’ প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন করেছেন:
‘নীতিগতভাবে যাঁরা ধর্মকে রাজনীতিক্ষেত্রে টেনে আনার বিরোধী, তাঁদের আচার-আচরণ দেখে মনে হচ্ছে না যে ধর্ম ও রাজনীতিকে তাঁরা পৃথক রাখতে পারবেন। সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ প্রতিহত করতে যাঁদের অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, তাঁরা মনে হয়, অনেকখানি দ্বিধাগ্রস্ত। এমন দ্বিধার পরিণাম আমাদের সকলের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। অজিত গুহের মতো মানুষ তাঁর কালে যে-ঝুঁকি নিয়েছিলেন, আমরা কি নিজেদের কালে সাহস করে সে-ঝুঁকি নিতে পারব না?’

এই প্রশ্ন তাঁর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি ইহজাগতিক ও উদার মানবতাবাদী রাষ্ট্র নির্মাণে আনিসুজ্জামান ও তাঁর সহযোদ্ধারা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বিবেকবান বুদ্ধিজীবী হিসেবে যেকোনো সংকটে সমাধানের উপায় নির্দেশ করেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইহজাগতিকতার সংকটকাল অতিক্রম করছি আমরা। এই সংকট নিরসনে আনিসুজ্জামানের মতো ঝুঁকি কি আমরা নিতে পারব না?

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন