একটি বিদেহী আত্মার প্রসঙ্গ

একটি বিদেহী আত্মার প্রসঙ্গ
বিজ্ঞাপন
আত্মস্মৃতিমূলক এই লেখায় ধরা আছে এক ব্যক্তির জীবন। আর সেই জীবনের মধ্যে পুরোনো দিনের গন্ধ যেমন আছে, তেমনি আছে পুরোনো সমাজের চিহ্ন।

নানির কথা মনে হলে মনে পড়ে একটা সাদাকালো ছবির কথা, গাছের তলায় শাল মুড়ি দিয়ে দুই জা বসে আছে—মাস্টার নানি আর আমার নানি (চিনি)। চিনি নানির আয়তাকার কপালজুড়ে লেপটানো নিরুদ্বিগ্ন সাধুতা, মুখের ভাব প্রশান্ত, ঠোঁট নির্লিপ্ত। আমার এই নানি পরিপাটি থাকত, সাজগোজ করত না, স্বাস্থ্যবিধি একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। মুখস্থ জানত কত কবিতা, ‘দাদখানি চাল মুসুরির ডাল' থেকে শুরু করে ‘চৈত্র মাসের দুপুরবেলা আগুন হাওয়া বয়’ হয়ে ‘কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে কে গাহিল গান’ পর্যন্ত।


নানির রান্নাঘরে গেলেই দেখা যেত উবু হয়ে বসে শাপলার আঁশ ছাড়াচ্ছে কিংবা কড়াইয়ে ফুটছে আলু-করল্লা দিয়ে পোয়া মাছের ঝোল, অম্লান বদনে নানি রাঁধতে ব্যস্ত। নানির রান্না ছিল জোলো, মা বলত, ‘বিক্রমপুরের দিকে এত নদীনালা তাই এরা ঝোল ঝোল পেট ঠান্ডা করা তরকারি রাঁধে আর খায়, আর তোদের বাপের দিকে কেবল শুকনা ডাঙা আর আইট্যাল মাটি বলে চেনেও খালি ভুনা আর ভাজি।’  মাছ-মাংসের ঝোল রাঁধবার শেষে নানি ভাজনাবাটা বলে একটা জিনিস দিয়ে নামাত, সামান্য পেঁয়াজভাজা-টালা জিরা কি পাঁচফোড়নের গুঁড়া...একে বলত ভাজনা, খুব স্বাদ খুলত তাতে। মাছের ঝোল কিংবা ভাজি-তরকারি নানি যা বানাত, তা-ই আমার ভালো লাগত খুব। আঙুলের ছাপ যেমন আলাদা, গায়ের গন্ধ যেমন আলাদা, মানুষের হাতের রান্নাও তেমন আলাদা। নানির রান্নার কথা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ বুকটা চমকে দিয়ে মনে হলো, একেকজন মানুষ যখন চলে যায়, তাদের রাঁধবার হাতটাও নিয়ে যায়, আর কোনো দিন তেমনটি হবে না। অনেক সময় মায়ের রান্নার মতো করে মেয়ের রান্নার স্বাদ হয়, কিন্তু আমার নানির হাত আম্মার থেকে আলাদা। বরং নানির তত্ত্বাবধানে যেসব মেয়ে কাজ করত বাড়িতে, তারা অবিকল তার মতো করে রান্না শিখেছিল, তাদের কাউকে খুঁজতে যাব কখনো।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আমার এই চিনি নানির ভালো নাম শামসুন্নাহার, শামস উন নিহার, মানে দিবাসূর্য। ওই রকম গনগনে। নানির নামে আর কী আছে? আক্তার নাকি খাতুন নাকি খানম? আমি জানি না। নানির জন্মদিন কবে? জানি না। তার মা-বাপের নাম কী? মায়ের নাম বেগম মরিয়ম, এইটুকু জানি, বাকিটা জানি না। নানির বাবাকে আমি শৈশবে দেখেছি, গলার স্বর স্থায়ীভাবে ভাঙা, কপালে দু-চারটা বসন্তের গর্ত, মুখে সরল হাসি। নানিরা সাত বোন, এটুকুই জানি। ছোটবেলায় কখনো শুনেছি নানি খুব রাগী—ছেলেমেয়েরা খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে আগে এক ঘা মার খেত তার হাতে, কখনো শুনেছি ফ্রিজিড—ছেলেমেয়েদের কাউকে ঠিক জড়িয়ে ধরত না, কখনো দেখেছি তাকে পুরুষতন্ত্রের একাগ্র পুরোহিত হিসেবে। কিন্তু এসব বাক্সের বাইরে যে মানুষ, যাকে কোনো বাক্সেই আঁটানো যায় না, তার চেহারা কেমন? আমি যাকে চিনেছি সেই নানির জীবনে সাধুতা আর সততা খুব বড় শব্দ বলে সে অকুতোভয়; পরচর্চার অবকাশহীন, অসামান্য তার বাকসংযম, কর্মযোগী সংসারী স্ত্রীলোক।


শৈশবে কত মামা-খালা থাকে, যারা ক্রমাগত শিশুকে নাচতে-গাইতে বলে মজা দেখে। আমাকে তো গাইতে বললেই গাইতাম, নাচতে বলার আগেই নাচতাম, আমার মতো আর কোনো বাচ্চা এমন করলে মুখে কাপড়চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে নানি বলত, ‘তুমার মতোন বেলাজ হইছে ভাই!’ আরে, আমি নাকি ওর বেলাজপনা মাপার বাটখারা! নানির গায়ে যত রাগই থাকুক, আমি গিয়ে ভীমের গদার মতো আছড়ে পড়তাম সেই গায়ে, নানি কই রাগত না তো, খিলখিল করে হাসত, দাঁতগুলো মজবুত, পরিপাটি সারি।
হাঁটু বাইয়া পড়া কুঞ্চিত কেশ ছিল কন্যার, পিঁড়িতে বসতে পারত না চুলের যন্ত্রণায়। তার পিঠের শিরদাঁড়া সটান সোজা একটি অগভীর পরিখার মতো, গুরুনিতম্ব সম্রাট জাহাঙ্গীরের দোয়াতের মতো সুগোল, হাত সদা সচল, একটা হালকা ভ্রুকুটি অবশ্য থাকত চৌকো কপালে, সেই কপালের তলায় নাকটা নৌকার দাঁড়ের বাঁশ যেন এমনি মসৃণ। সেকালের মেয়েরা কিছু গয়না পরতই, নানির গলার হারে ছিল একটা চুনি বসানো কাটাই কাজের সোনার ধুকধুকি, দুকানে চুনির সোনাবাঁধানো ছোট্ট মামুলি দুল, হাতে দুগাছা মলিন সোনার চুড়িতে মসজিদের খিলানের মতো নকশা। প্রিন্টের শাড়ি পরে চুল বেঁধে ছেলেপক্ষের সামনে এসেছিল সে পঞ্চাশের দশকে, আষাঢ়ের ইছামতী পাড়ি দিয়ে কনে দেখতে এসেছিল লোকে, কোর্মার মসল্লা জিজ্ঞেস করেছিল কেউ তাকে, নানা খুব রূপবান ছিল বলে পাড়ার লোকে খুব উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল, সাড়া পড়ে গেছিল কন্যার অভিভাবকদের ভেতর—কার মেয়েকে বিয়ে করবে এই লোক, নানির বিয়ের তত্ত্বে ছিল পন্ডস কোল্ডক্রিম আর বিয়ের শাড়ি ছিল সবুজ সিল্ক ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু আমি তো আরও জানতে চাই। জানতে চাই, তের বছরের বিবাহে অনিচ্ছুক, সহবাসে অনিচ্ছুক কিশোরীর মন কে বদলায়, তরুণ স্বামী না বৃদ্ধ সমাজ, কতটা ধীরে কেমন করে তাতে রং ধরে। রং কি আসলেই ধরে, নতুন সূর্যের সাদা উত্তাপে ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলে, নাকি জোর করে ফাটানো ফুরুশফুলের কলি হয়ে যায়। জানার কোনো উপায় নেই, কোনো মন্ত্রেই তার গোপনীয়তার মালিকানা বদলাবে না, গচ্ছিত থাকবে তার স্মৃতিতেই। অনেক চাপাচাপির পর শুধু আস্তে আস্তে বলেছিল, ‘আমারে দ্যাখতে আইস্যা যাওনের সময় আমাগো আঙিনার হাস্নুহেনা গাছের একটা ডাল ভাইঙ্গা নিয়া গেছিল তোমার নানা, নিজের বাড়িতে লাগাইব!’ এই দৃশ্য আমার দেখার প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু আমি যেন দেখতে পেলাম আমার উদাসী-আলাভোলা নানা একটা ফুলন্ত ডাল হাতে করে চলে গেল, একটা সিম্বলিক শটের মতো, এই ডাল ওর আঙিনায় একদিন সুগন্ধী ঝোপ হয়ে উঠবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
নানির রান্নার কথা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ বুকটা চমকে দিয়ে মনে হলো, একেকজন মানুষ যখন চলে যায়, তাদের রাঁধবার হাতটাও নিয়ে যায়, আর কোনো দিন তেমনটি হবে না। অনেক সময় মায়ের রান্নার মতো করে মেয়ের রান্নার স্বাদ হয়, কিন্তু আমার নানির হাত আম্মার থেকে আলাদা। বরং নানির তত্ত্বাবধানে যেসব মেয়ে কাজ করত বাড়িতে, তারা অবিকল নানির মতো করে রান্না শিখেছিল, তাদের কাউকে খুঁজতে যাব কখনো।

এমনিতে নানি ছিল অসম সাহসী, খুব তীব্র নীতিবোধ ছাড়া ওই রকম সাহস হয় না মানুষের, স্যাকরাতে ও রকম সোনা পেলে খুবসে সোহাগা মেশায়। সাহসী মানুষকে অনেক মিথ অনুসরণ করে। এই যেমন বাড়িতে চোর এসেছে মনে হলেই নানা নাকি নানিকে জাগিয়ে দিত, নানি লাঠি নিয়ে চলল চোর তাড়াতে—এই নিয়ে আমরা হাসতাম কত! নানি ছিল কঠিন নিয়মনীতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, শাসনের ঘেরাটোপে নিজের হাতে নিজেই বন্দী, মৌসুমের ওষধি—ঠান্ডাসর্দির বাসকপাতা—ভাতের খোরাক সামান্য—সাথে শাক-ডাল-ভাঙা মাছের তরকারি—রাতে অবধারিত রুটি তরকারি। খাওয়ার সময় পানি খাওয়ার নিয়ম ছিল না, নিয়মানুবর্তী নানির বিধান—ভাত খাওয়ার আধ ঘণ্টা পরে পানি খেলে হজম ভালো হয়। কেবল ভালো করে রাঁধা ইলিশ মাছ ছাড়া আর কিছুর প্রতি নানির আসক্তি কাজ করত না, ইলিশ মাছ খাওয়া চাই দু-টুকরা। শোয়াটাও নানির মতে ঠিকমতো হওয়া চাই, খাটে ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরবে কেন ঘুমন্ত মানুষ, কেন যুক্তাক্ষরের মতো গা তুলে দেবে অন্যের গায়ে...নানি ঘুমন্ত আমাকে পর্যবেক্ষণ করে রায় দিয়েছিল, আমার শোয়াটা ঠিকঠাক, এই সনদ পেয়ে আমার খুশি দ্যাখে কে!
তবে হ্যাঁ, মেয়েলি সংস্কার তো কিছু ছিলই। যে খাটে কেউ ঘুমোচ্ছে না সেই খাটের মাঝখানে শলার ঝাড়ু রেখে দেওয়াটা ছিল, আমার ছোট্টবেলার কপালে তেল-কাজলের টিপে পাউডার পাফ বুলিয়ে সেটা স্থায়ী করাটা ছিল। ছিল শরৎকালের সকালে খালি পেটে পিত্তনাশক চুনের পানি খাইয়ে দেওয়াটা। শিশুবেলায় আমাকে জলপাই তেলে প্রতিদিন জবজবে করে ফেলাটা ছিল, আর ছিল সকালবেলা কেউ ওঠার আগেই গুয়ে-কাঁথা ধুয়ে সারা উঠান শুকোতে দেওয়াটা। বড় হওয়ার পরেও যতবার নানিবাড়িতে এসেছি, রাতে নানি উত্তরের ঘরে গুটিগুটি এসে হাজির, একা মেয়েকে নাকি শুতে দিতে নেই। নানির পাশে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম, কেন একা শুতে দিতে নেই? দেও আসে? নাকি দেবতা? দুইয়েরই অভ্যাস বেশ খারাপ অবশ্য। নানি বিক্রমপুরের ভাষায় ‘এমরা’ ‘ওমরা’ (এই মুড়া, এই দিক) বলত আর আমি সেটা নকল করতাম ছোট্টবেলায়, পাশের বাড়ির নীপাকে ডাকার সময় কেন ‘নীপ্যা’ হয়ে যাচ্ছে, লোক কেন ‘লুক’, এসব নিয়ে কত মাথা ঘামাতাম। কাউকে খারাপ বলতে হলে নানির কপালে সামান্য খাঁজ দেখা দিত, অথবা নানি হেসেই ফেলত, উভয় ক্ষেত্রে এরপর বলত ‘জবর দুষ্ট!’ নাতিনাতনিও জবর দুষ্ট, ব্যাংক ডাকাতও জবর দুষ্ট। উত্তরের ঘরের পুবদিকের জানালা দিয়ে নিমগাছের ডালপালা টপকে স্ট্রিটলাইটের আলো আসত, নানি সেই আলোকে ডাকত ‘জুশনা’, স্ট্রিটলাইটের সেই নীলাভ আলোর নাম জোছনা হবে না তো কী হবে!


নানির নানান বাতিক ছিল, গজার মাছ নাকি মানুষের ছাও খেয়ে ফেলে, অতএব গজার মাছ খাওয়া যাবে না, বোয়াল মাছ সুযোগ পেলে ছুঁচো-ইঁদুর খেয়ে ফেলে, বোয়াল মাছের পেট কাটলে ইঁদুর পিলপিলিয়ে বের হয়, অতএব বোয়াল মাছও চলবে না। শোল মাছ দেখতে সাপের মতো চক্রাবক্রা, বাইম মাছও কদাকার, পাঙাশ মাছ অতিরিক্ত তৈলাক্ত, টাকি মাছ কোন কারণে নিষেধ, সেটা মনে নেই। শোল মাছ লাউ দিয়ে আর বাইম মাছের কোর্মা রাঁধত আমার দাদি, কিন্তু নানি এই মাছগুলো এড়িয়ে যেত। শিং-মাগুরও খেত কি না, মনে নেই। নানিকে যদি দেখানো যেত যে ফরাসি নদীতে দৈত্যাকার মাগুর মাছ তীরের কাছে আসা কবুতর ধরে খায়! এসব বাতিক নানিতেই স্থির ছিল না, কন্যাসূত্রে প্রবাহিত হয়েছিল, আমরাও খেতাম না। বাছবিচারের এই গল্প শুনে খোদ ফ্রয়েড সাহেবকে ডেকে এনেছিল আমার এক বন্ধু, রাগ করেছি বলে থেমে গেছে।
নানির প্রসঙ্গে নানা পরিহাস করে বলত, ‘ওই যে দেখতেসো সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ায়া সালাম নিতেসে, আসলে কিন্তু তাকায়া আছে পায়ের দিকে, জুতা নিয়া ঘরে ঢুকলা কি না তাই দ্যাখে!’ আমরা নানির পরিচ্ছন্নতার বাতিকের কথা জানতাম। নানির পেটেন্ট স্টোনের লাল মেঝে ছিল হাত-আয়নার মতো চকচকে। নানির শাড়ি ফটফটে সাফ, মাড় দেওয়া আর আব বা আফসান ছিটানো। নানির বিছানায় ধুলপায়ে ওঠার কথা ভুলেও ভাবা যেত না। মাছকাটা বঁটিতে যেসব বাড়িতে আম কেটে দেয়, সেসব বাড়িতে নানি আম খেত না। নানি আমাকে এঁটো গ্লাসের পানি খেতে দেখলে খেপে যেত। কত মানুষের সঙ্গে যে এই মেয়ের ভাব হবে (পানীয় ভাগ করে খেলে সৌহার্দ্য জন্মে বলা হয়)! অথচ আমি নানান মানুষের এঁটো গ্লাসের পানিই একত্র করে এক গেলাসে ঢেলে খেতাম। ছোটবেলা থেকেই ‘গোয়িং গ্রিন’, তখনি যেন জানি আগামীর বিশ্বযুদ্ধ হবে পেয় পানির দখল নিয়ে ইত্যাদি। হারপিকের আগে বাজারে এসেছিল ‘ভিম’, এসব ব্লিচ দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করতে করতে নানি বলত, ‘হারপিক এক ফোঁটা হাতে পড়লে নাকি হাতের পিঠ দিয়ে ফুটো হয়ে সেটা বেরিয়ে আসবে এমনি!’ আমরা প্রায় যুদ্ধজয়ের আনন্দ পেলাম যখন ছোট মামার ছেলে হিসি পেলে নানির তকতকে বিছানায় গিয়ে হিসি করে আসা শুরু করল। কে জানত আমাদের জীবনের তকতকে অঙ্গনে ধুলোট সেরে আসা কত লোকে গড়িয়ে যাবে, ধুলোময়লা ঝেড়ে কূল পাব না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রোদের দিনে নানি চিনামাটির বয়ামে সুতি কাপড়ের ঢাকনা বেঁধে তাতে লেবুর জারক রাখত, মাটির হাঁড়িতে ঘষে ছালতোলা লেবু লবণে জড়িয়ে লেবুর তেল বের করে আনা সেই জারক, অসুখের পর যখন মুখের স্বাদ মরে যায়, তখন সামান্য ভেঙে খেতে হয়। আমসত্ত্ব শুকানো হতো বাঁশের চাটাইয়ে, আমসত্ত্বের গায়ে লেগে যেত সেই বাঁশের বা বেতের বুনোট। আমতেল থাকত বয়ামে। আচার রোদে না দগ্ধ করলে তার ঘ্রাণ বের হয় না, তাই সারি সারি আচারের বোতল রোদ খেয়ে সুগন্ধী হয়ে উঠছে। চালতার আচার চলে গেছে ফ্রিজের অতল গহ্বরে। আমটা গাছের, জলপাইটাও গাছের, চালতাটা বোধ হয় বাজারের। দক্ষিণে ছিল বড়সড় জলপাইগাছটা, জলপাই পাতা পেকে কাঠবাদামের পাতার মতো তীব্র কমলা হয়ে গেলে তেতলার ঘর থেকে হাত বাড়িয়ে ছিঁড়ে নিতাম আমি, অবিকল জলপাইয়ের ঘ্রাণে মুখের ভেতরটা ভরে যেত। আর শীতের রাতে ছাদে উঠে নানির মাটির চুলায় পিঠা বানানোর সময় যে গন্ধটা বাতাসে পেতাম, কুয়াশার-জোছনার-জলের- খড়পোড়ার-গুড়ের সম্মিলিত গন্ধ…সেটাই শীতের গন্ধ, আমার প্রিয় সুবাসগুলোর প্রথমটি।


খুব চমৎকার ডাল রাঁধত আমার মা, তার চেয়েও ভালো ডাল রাঁধত আমার চিনি নানি। সুসিদ্ধ মুগ-মসুর ডাল এক চুলায় টগবগ করছে, আরেক চুলায় কড়াইয়ের তেলে ছেঁচা আদা-খোসাসহ দিশি রসুনকুচি-পেঁয়াজকুচি আর তেজপাতার সম্ভার দিয়ে নানি ঢেলে দিত ডালে, তারপর এক হাতা ডাল কড়াইয়ে নিয়ে ছড়াৎ করে ছেড়ে দিয়ে সেটা কাঁচিয়ে ঢেলে দিত ডালে, পুনরায়। কখনো বাগাড়ে পাঁচফোড়নও দিত। ডালে কাঁচা আম বা আমচুর বা আমসি, ডালে আমের মুকুল, ডালে চালতা, ডালে ইউক্যালিপটাস এই সব নানান টক চলত। নানির ডাল আমার এত প্রিয় ছিল, আমি ওখান থেকে আসার সময় এমনকি ফ্লাস্কে করে ডাল নিয়ে আসতাম, যা ভালোবাসি তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে আমি নির্লজ্জ, বরাবরই।


আমাদের সিনেমা দেখার সঙ্গী ছিল নানা, মামা, খালা, যাদের নানির মতো এমন শুচিবাই ছিল না। নানা নিমগাছের ছায়ায় কালো কাঠের চেয়ারে বসে বসে বলত, ‘নার্গিস হইল গুজা (কুঁজো), সব থেকে সুন্দর হইল সুরাইয়া, যেমন সুন্দর চাঁদের মতোন মুখ, তেমন তার গলার গান। লক্ষ্মীপ্রতিমার সঙ্গে সরস্বতী না হইলে কি মানায়!’ খালারা দেখত জয়া প্রদা কিংবা রতি অগ্নিহোত্রী কোন ছাঁটে সামান্য ফ্রিঞ্জ কাটে চুলে, আর কেমন নূপুর পায়ে দিয়ে তারা রিনিঝিনি ছুটে যায় ঝোপের পেছনে; সেই সব নকল করে খালারা উড়ে গিয়েছিল যার যার পিঞ্জরে। মামারা অবিবাহিত যুবক অতএব যুবতীদের তুলনায় নেহাত আকাট, ‘গীতমালা’তে আজগুবি জংলিদের নৃত্য দেখতেই তাদের স্পৃহা ব্যয় হতো, ওসব শুরু হলে আমাদের ঘর থেকে বের করে দিত মামারা। সে বাড়িতে নানির সঙ্গে টিভির একটা আশ্চর্য সম্পর্ক ছিল। আমরা এক সমীক্ষায় বের করেছিলাম, নানি যতবার ফ্রিজ থেকে সবজি বের করতে আসে, ততবার সে ঘরে চলতে থাকা সিনেমার সবচেয়ে ‘আপত্তিকর’ দৃশ্যগুলো শুরু হয়, এমনকি যদি সিনেমাতে একটিমাত্র চুমু থাকে, সেটাও হবে ঠিক নানি আসার সঙ্গে সঙ্গে। নানি উত্ত্যক্ত হয়ে বলবে, ‘পোলাপাইন কী সব দ্যাখে দিনভর।’ নানি উন্মুখ হয়ে দেখত ‘মাটি ও মানুষ’, আর দেখত খবর, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সে নানির মাথা একেবারে মুচমুচে ছিল।
একটা কথা না বললেই নয়, নানা জীবনে বহুবার তার বিদ্যোৎসাহী বড় ভাইকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল নিঃশব্দে, বিধবা বোনের একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল সঞ্চয় ভেঙে। খুব যে সচ্ছল ছিল নিজে, তা-ও তো নয়। সংসারে এসব অর্থনৈতিক সহায়তা দান করা অসম্ভব হতো, যদি নানির সায় না থাকত। নানাবাড়িতে এসে পুরোনো কাজের লোকেরা দুঃখের শতরঞ্চি খুলে বসত—খেত-মাখতো, কাশেমের মায়ের বাতের ব্যথা, কাশেমের একশিরা, কাশেমের বোন সোনাভানের বিয়ে, কাশেমের মামাতো বোন রহিমার স্বামীর বিদেশযাত্রা...এসব নিয়ে নানা-নানি ব্যস্ত থাকত, স্থায়ী সম্বন্ধ ছিল এদের সঙ্গে তাদের দুজনের। কোনো দিন নানা-নানিকে নিজমুখে তাদের দানধ্যানের কথা বলতে শুনিনি আমি, নানিকেও দেখিনি এই নিয়ে হা-হুতাশ করতে। উপকারের প্রতিদানে কৃতঘ্নতা পেয়ে দারুণ আঘাতে কাঁদতে দেখেছি নানাকে, কিন্তু নানির শোকে কাতরতা ছিল না, সংবরণ করে নিত। যেন এমন হতেই পারে, জীবন এই সব দান-প্রতিদানের চেয়ে বৃহৎ ও মহৎ শক্তি, সে চলিষ্ণু।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
কাউকে খারাপ বলতে হলে নানির কপালে সামান্য খাঁজ দেখা দিত অথবা নানি হেসেই ফেলত, উভয় ক্ষেত্রে এরপর বলত ‘জবর দুষ্ট!’ নাতিনাতনিও জবর দুষ্ট, ব্যাংক ডাকাতও জবর দুষ্ট। উত্তরের ঘরের পুবদিকের জানালা দিয়ে নিমগাছের ডালপালা টপকে স্ট্রিটলাইটের আলো আসত, নানি সেই আলোকে ডাকত ‘জুশনা’, স্ট্রিটলাইর সেই নীলাভ আলোর নাম জোছনা হবে না তো কী হবে!

ভারী মিষ্টি মিষ্টি সব কথা হতে পারে নানা-নানিকে নিয়ে। কিন্তু তাদের চরিত্রের একটি বিশাল দিক ছিল পুরুষতন্ত্রের প্রতি অকাট্য আনুগত্য, সেটা না বললে এই চিত্রণ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। কালো মেয়ে হিসেবে বাংলাদেশে যা যা শুনতে হয়, তার সবই ছোট খালা শুনেছে আজীবন, নানি তাকে ডাকত ‘কালী’। ঘা লাগত নিশ্চয়ই ছোট খালার হৃদয়ে। তার পিঠাপিঠি ভাইটিও ছিল ঘোর কালো, অথচ তাকে নানি কালো ডাকত না। মেয়েদের সঙ্গে নানা-নানির ছিল মান-অভিমানময় সম্বন্ধ, বড় মামা আর ছোট মামার সঙ্গে ছিল আত্মিক ভরসার যোগ, এই ভরসা পুন্নাম থেকে ত্রাণ করার ভরসা। নানার মৃত্যুর পর আমার আম্মা তার ডায়েরি এনে দিয়েছিল আমাকে, আমার উত্তরাধিকার। খুলে দেখি পাতার পর পাতা কেবল সংসারের জমা-খরচ, কাজের লোকের নাম-সাকিন, আর ছেলের ঘরের নাতিদের আধো আধো বোল নিয়ে মুগ্ধ স্মৃতিচারণা। আমি যে তার নয়নমণি ছিলাম, আমি কই? একটি পাতায় শুধু লেখা—কাল রাতে আমি এসেছিলাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, সকালে চলে গেছি। আরেকটি পাতায় শিস কলমে ফুল-লতাপাতা এঁকে লেখা মেজ খালার মেয়ের গায়েহলুদের কথা লেখা এক লাইনে। আমাদের নিত্যকাকলীর আড়ালে অন্তসার ছিল এইটুকু মাত্র? আহা, তার চেয়ে সুখের গল্প হোক। একদিনের কথা, বাজার থেকে ফিরেছে নানা, গলদঘর্ম, পাখার তলায় বসতে না বসতেই নানি এসে বলল, ‘এত করে বললাম, চিনি আনতে, চিনি আনো নাই?’ ভাঙা দাঁতে মৃদু হেসে নানা উত্তর দিল, ‘চিনি তো আমার ঘরেই’ (আমার নানির নাম যে চিনি), আর দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী নানি এক মুহূর্ত অপ্রতিভ হয়ে লজ্জা পেয়ে চলে গেল।
এনামেলের হলদে মগে চায়ের কথা আমার চা-স্পৃহ চাতকী চিনি নানির প্রসঙ্গে আসবেই। মার্শেল প্রুস্ত এক টুকরো ম্যাডেলিন চায়ে ভিজিয়ে খেতে গিয়ে ফিরে গেছিলেন তাঁর সোনালি অতীতে, রচিত হয়েছে ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম-এর সেই প্রতিবর্তী অতীতচারণের প্যারাগ্রাফ, এই ‘প্রুস্তিয়ান রাশ’-এর সঙ্গে নানির সেই এনামেলের মগের চায়ের কী নিবিড় যোগ। আমাদের বাড়িতে চায়ের চল ছিল না। যা খয়েরি ও সুরভিত, যার বিলীয়মান ধোঁয়ায় বুঁদ হয়ে গভীরভাবে কিছু পরিকল্পনা করা যায় কিংবা করা যাওয়ার ভান, যার পূর্ণ কাপটি হাতে নিয়ে পাড়ি দেওয়া যায় পৃথিবীর বেশির ভাগ কথোপকথন। যে প্রপস ছাড়া আমার চিনি নানির মরচে লাল-বোতলসবুজ-কালো-খড়রঙা প্রিন্টের শাড়ি পরা মূর্তির ছবি আমি কল্পনাও করতে পারি না। রকমারি চা নিয়ে বিলিতিদের ‘হুইটার্ড’ কোম্পানির অন্তহীন আদিখ্যেতাকে কেউ টেক্কা দিতে পারবে না, হুইটার্ডের বড় একটি নীল হাতলের পোল্কা ডটের টি-পট কিনেছিলাম চিনি নানির জন্য, আমার শৈশবের একমাত্র চাখোর ব্যক্তি। যত দিন গেছি তার কাছে তদ্দিনে নানি আর হলুদ টিনের মগ ভরে চা খায় না, বার্ধক্যের কারণে এমনিই ঘুম আসে না, মৃদু হেসে টি-পটের মসৃণতায় আঙুল বোলাতে বোলাতে বলেছিল, ‘তোমার নানা আমারে কইসিল, নিজে খাইতাসো খাও, আমার পোলাপানডি জানি না শিখে চা খাওন।’ আমি সেই বিষণ্ন বিকেলে হাবিজাবি চায়ের গল্প করলাম কিছুক্ষণ। তাইওয়ানিরা সাবুদানা দিয়ে এক রকমের চা বানায়, তার নাম পার্লমিল্ক টি, ফ্রিজিয়ার লোকে দেয় মিছরি, মরিশানরা দেয় ভ্যানিলা, বিলেতের উত্তর-আফ্রিকান চাখানাগুলোতে মিসরীয়-মরক্কানরা চায়ে দেয় এন্তার পুদিনাপাতা। যে চা টি-হাউসে রাজা উজির মারার সারথি, তার ট্যালটেলে প্রসঙ্গ আমাদের সন্ধ্যাকে পাকিয়ে তুলল। যে গহ্বর চা-পানের স্নায়বিক উত্তেজনা পুরিয়ে দিতে পারে না, সেই গহ্বরের সামনে আমরা চুপচাপ বসে রইলাম, দু-একবার মশা তাড়াতে তাড়াতে আমার মনে পড়ল ইংরেজিতে না একটা বাগধারা আছে, ‘টি অ্যান্ড সিমপ্যাথি’? আমার নানা তদ্দিনে মারা গেছে। আমার নানির জীবদ্দশায় চা ঘিরে আবর্তিত সামাজিক সভা—চা বসানোর তোড়জোড়ে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যথাবেদনাকে দূর করার সংরক্ত সখ্য—সেটা নানার সঙ্গে কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। আর হবেও না।
শেষবার যখন আমার সঙ্গে দেখা হলো, তখন শরীর আচমকা সেরে গেছে নানির, গালে শৈশবে অপুষ্টির বাদামি ঢেউগুলো চোখে পড়ে না কিংবা চোখের ঢালাও ক্লান্তির কালির পোঁচ এসে মিশে গেছে বলে তারা আর আলাদা মেঘ হয়ে ভেসে ওঠে না। বাসাবোর বাড়ি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, ছেলেরা চলে গেছে পরবাসে, মেয়েদের ঘরে ঘুরেফিরে থাকে, কখনো পুরোনো অভ্যাসবশত নানি বলেও ফেলে, ‘খসরুরে বল আমারে বাসাবো দিয়া আসতে।’ বলেই হয়তো বোঝে ভুল কথা বলেছে, নাকি বোঝে না! মাঝে মাঝে স্মৃতি খর, স্মৃতি নির্ভুল, পুনরপি স্মৃতি এক আবর্ত। তখন নানি সংসার কর্তব্যের চাপমুক্ত, ঢালাও অবসরের ক্লান্তি নেমেছে সন্ধ্যার মতো, কেল্লার প্রাচীর যেন ভেঙেছে আর হই হই করে ভেতরের চাতালে ঢুকেছে সবুজ...তবু অন্ধকারে বোঝা যায় এখানে একদিন দুর্গ ছিল, বুলন্দ ইমারত ছিল। মুখের দিকে দেখি, আর কত কী মনে পড়ে। বলি, ‘তুমি কী খেতে চাও বলো।’ আধখানা হাসি দেয় জবাবে, বলল, ‘জীবনে কত খাইলাম ভাই! আর কত! আমার কাছে থাকো ভাই, থাকলেই আমি খুশি!’ আবারও সেই ‘ভাই’ ডাক। এরা বোনেরা সব্বাই ‘ভাই’ ডাকত আমাকে। শেষবার ফোনে আমি তাকে বলেছিলাম, ‘তুমি শুধু বেঁচে থেক!’ আর আবারও মৃদু হাসি শুনেছিলাম আমি, ‘আর কত বাঁচব ভাই, অনেক তো বাঁচলাম!’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

নানির কাছে থেকেছিলাম সে দিন রাতে, নানিকে তখন ঘিরে আছে মেয়েরা, আমার মা আর মেজ খালা। নানির কোল ঘেঁষে শুয়ে শুয়ে বলি, ‘নানাকে ছাড়া আমরা ১০ বছর কাটিয়ে ফেললাম।’ নানির মুখে বেদনার নির্ভুল ছায়া, কিন্তু দুর্গ তার দীর্ঘশ্বাস গোপন করে, সে অমনই। বলি, ‘নানার যৌবনের গল্প করো।’ সঙ্গে সঙ্গে আম্মা বলে, ‘আব্বা খুব সুন্দর ছিল।’ মেজ খালা বলে, ‘আব্বার স্বাস্থ্য সুঠাম আছিল।’ তারপর আমি জিজ্ঞেস করি, ‘নানি, তোমার বিয়ের শাড়ি কী ছিল?’ স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মতো আম্মা জবাব দেয়, ‘বেনারসি’, মেজ খালা বলে, ‘না না, কাতান’, নানির ক্ষীণ গলার ‘মুর্শিদাবাদী সিল্ক’ ডুবে যায়। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘নানি, তোমাকে দেখতে আসার গল্প করো।’ আম্মা বলে, ‘আম্মার কিছু মনে নাই এতকাল পর!’ আর মেজ খালা তক্ষুনি কিছু বলার জন্য উসখুস করে উঠছে দেখে আমি সক্রিয় হই, একখানা চাঁদ দুভাগ করে মাথাপিছু একটি অর্ধচন্দ্র না দিলে এই দুই বোনকে ডিঙিয়ে নানির কোনো কথাই শোনা যাবে না। চেঁচামেচি করে নানির মেয়েদের ঘর থেকে বিদায় করি। সামান্য নির্জনতার সুযোগে আবার জিজ্ঞেস করি, ‘তোমার বিয়ের শাড়ির রং কী ছিল?’ নানি পরনের প্রিন্টের শাড়ির জমিনে দাঁতনের মতো খড়খড়ে আঙুলের ডগা দিয়ে খুঁজতে চেষ্টা করে এক রকমের সবুজ, ‘কিমুন একখান সবুজ আছিল, সিল্কের সবুজ!’ নানির পরনে আর সেই সবুজ পাওয়া গেল না, অনেক রকম খয়েরি আছে। শান্তিনগরের রাস্তা হচ্ছে তখন, পাথর ভেঙে...সেই আমলের সবুজ যেন কেমন? এক খালার বিয়ে হলো খুব বড় বাড়িতে, ‘তারা বাইশ বলদে চষে/ তারা সোনায় দশন ঘষে’... বড় ঘরে সেকালে ডাকাতি হতো খুব...ডাকাতের হাতে মার খেয়ে বর পাগল হয়ে গেল, ধুলোরং হয়ে ওঠা সবুজ মাঠ পার হলো নানা আর মাস্টার নানা—মাঝে তাদের মুলুক চাঁদ ভাইয়ের মেয়ে...পাগল স্বামীর ঘর থেকে ফিরিয়ে আনছে তার কাকারা, পঞ্চাশের দশকের সেই মাঠের সবুজ যেন কেমন নবীন! নানি সেসব সবুজ খুঁজতেই থাকে।


আমার নানির নামের অর্থ প্রদীপ্ত দিবাসূর্য, সূর্য অস্ত গেছে। আশির ওপর বয়েস হলে আমরা ধরে নিই তারা একটি সম্পূর্ণ জীবন উপভোগ করে তারপর মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু কাছের মানুষ যে বয়েসেই যাক না কেন, কিং লিয়ারের মতোন করে সমস্ত হৃদয় হাহাকার করে ওঠে—কেন একটা গুবরে পোকা বেঁচে থাকবে, কেন মাদাগাস্কারের কচ্ছপ বেঁচে থাকবে, কেন গ্রিনল্যান্ড শার্ক তিন শ বছর বাঁচবে, কেন তুমি নও? লোকে যখন বলে, আল্লাহ নানিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে জায়গা দিও, জান্নাতুল ফেরদৌসের শ্রেষ্ঠ স্থানে জায়গা দিও...আমি চমকে উঠি, আমার মনে পড়ে অন্ধকারে আর জুশনায় মৃদু-নিবিড় গলায় নানা-নানি দুইখ্যার গল্প বলছে, যাকে মা বলে দিয়েছিল ‘শ্বশুরবাড়ি গিয়ে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় বসবি’...তা মায়ের কথায় দুইখ্যা গিয়ে খড়ের গাদায় আসীন হলো। ওইসব সর্বশ্রেষ্ঠ আসনে সর্বোচ্চ স্থানে আর অত আলো অত ঝকমারিতে আমার নানি কেমন থাকবে? ওরা দুজনই তো অল্পে পরিতুষ্ট মানুষ ছিল, শান্তিতেই তাদের সুখ। যেখানে কষ্ট নেই তেমন যেকোনো নহরের পাশে বসলেই তো নানি খুশি হয়ে উঠবে, তাই না? ইলিশ মাছ আরেক টুকরা হলেই তো শুকরিয়া করবে নানি, সবুজ দেখে আনন্দিত হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পড়ন্ত বেলায় নানা-নানি একসঙ্গে বসে বাংলা সিনেমা দেখত, প্রতিভা বসুর ‘পথে হলো দেরী’তে নানির প্রিয় সুচিত্রা সেন ডাক্তার জয়ন্তকে ব্যাকুল হাতে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতে করতে বলছে, ‘আমি ভাবিনি, আমি আছি কিন্তু তুমি আমার থাকবে না!’ আমিও তো ভাবিনি, এই হাস্নুহেনা-ভরা জুশনা-জ্বলা পৃথিবীতে আমি থাকব কিন্তু নানি থাকবে না। জানতাম জগতের নিয়ম আয়ুর নিয়ম ইত্যাদি নিয়মে তাই হওয়ার কথা একদিন, কিন্তু ওসব নিয়ম ছিল বাইনোকুলার ভিশনে সামান্য সরে থাকা পাশের জিনিসের মতো দৃষ্টিসীমার একটু বাইরে, একটু ঝাপসা, তাই হয়তো আপাত-অস্বীকার্য।


জানেন, যে যায় সে সব নিয়ে যায়, তার গলার আওয়াজ, তার চুলের গন্ধ, তার রান্নার হাত, তার মেজাজ-মর্জি, রাগ-অভিমান-আদর! যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, সেটা নিকিয়ে তোলা বর্তমান, সেখানটা পরিপাটি করতে হৃদয়ের কত রক্তক্ষয়ী প্রয়াস ব্যয় হয়, তা আপনি-আমি প্রত্যেকে গোপনে জানি। তবু আজ সেই নিকোনো আঙিনা খুঁড়ে সুড়ঙ্গ কাটি, কেটে কেটে অবশেষে চলে যাই সুদূর অতীতে—যেখানে যতটুকু গেলে আমি তার বুকে কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়তে পারি। যেন সে সেখানেই বুক পেতে আছে, যেখানে তাকে রেখে এসেছি, সে আছে স্থির, অপরিবর্তিত, উত্তাপমুখর। তার গায়ের ঘামের গন্ধ সেখানে অক্ষয়, গলার আওয়াজ সেই বায়ুশূন্যতায়ও অনায়াসে স্পন্দিত। বাইরের দুনিয়ার শত সহস্র বদলে সে এতটুকু বদলায়নি।

অন্য আলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন