বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মতামত প্রকাশ বা লেখালেখির স্বাধীনতাকে অনেকে সংবাদপত্রশিল্পের বিষয় হিসেবে গুলিয়ে ফেলে। বাস্তবে ছাপাছাপির প্রযুক্তি আসার বহু আগে থেকে এটা জরুরি বিষয় হিসেবে ছিল। শাসনকাজে একে জরুরি ভাবা হতো। কাগজ ও কালির ব্যবহার শুরুর আগের শাসকদের ব্যবস্থাপনাতেও তথ্যের আদান-প্রদান এবং লেখক-ভাবুকদের মতামতের দরকারি জায়গা ছিল। ভাবুকতা ও মতামতকে রাজ্য বিস্তার ও রাজ্য চালনার স্বার্থে কাজে লাগানো হতো, তাকে বশ করে রাখার জিনিস মনে করা হতো অতি বিরল সময়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় লেখালেখি ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা দলনের চর্চা আইনি পদ্ধতি হিসেবে এসেছে বহিরাগত ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে। ১৭৮০ সালে কলকাতায় বেঙ্গল গেজেট চালু ও বন্ধ হওয়ার দুই বছরের ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। ও রকম নিয়ন্ত্রণের পক্ষে চারপাশে আজ যত যুক্তিতর্ক শোনা যায়, তার গোড়া ঔপনিবেশিক ওই অতীতের গর্ভে হৃষ্টপুষ্ট।

কেবল শাসন রক্ষাই নয়, উপনিবেশ স্থাপনকারীরা স্থানীয় ভাবুকতা দমন করত স্থানীয় সমাজের জ্ঞান-ঐতিহ্য বদলে দেওয়ার লক্ষ্যেও। এভাবেই এসেছে লাইসেন্সের ধারণা, সেন্সরশিপের প্রয়োজন। এভাবেই এশিয়া-আফ্রিকা তার জ্ঞানকাণ্ডের অনেকখানি হারিয়েছে বহু আগে। এভাবেই ‘কালি ও কলম’ উপনিবেশিত দেশগুলোতে সমাজের হাত থেকে ছুটে ‘রাষ্ট্র’-এর বিষয় হয়ে যায় এবং রাজনৈতিকভাবে ‘স্বাধীন’ হওয়ার পরও সেই ‘ঐতিহ্য’ বদলাচ্ছে না। অথচ ইউরোপ-আমেরিকার অনেক স্থানে চিত্রটি অনেক আলাদা। স্বাধীনতার মানে যে ঔপনিবেশিক দখলদারদের আইন-কানুন-সংস্কৃতি থেকেও মুক্তি, সেটা আজও আমাদের বোধে আসেনি।

আশার দিক হলো, কোভিডতাড়িত বিশ্বে নতুন করে ‘কমিউনিটির মতামত’ এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব কিছুটা হলেও ভাবাচ্ছে। আবার তার ওপর আঘাত বাড়তেও দেখছি আমরা একই সময়ে।

গত দেড় বছর ভাইরাসের মোকাবিলায় দেশে দেশে সরকারগুলোর বড় এক সহায় ছিল সাংবাদিকদের কলম, কি-বোর্ড ও ক্যামেরা। মহামারি থেকে মানুষ বাঁচানো কোনো প্রশাসনের পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না যদি না প্রচারযন্ত্রগুলো মানুষকে সচেতন করতে কাজ করত। ভারতে অক্সিজেন–সংকটের তাৎক্ষণিক সংবাদ দিয়ে সরকার ও বিচার বিভাগকে জাগিয়ে তুলে লাখ লাখ জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রেখেছেন সাংবাদিকেরা। যদিও সেখানে লেখার স্বাধীনতার জন্যও একই পেশাজীবীদের দিনরাত লড়তে হচ্ছে রাজনৈতিক আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে।

কলমের স্বাধীনতাকে সহিংসতাবিরোধী বাহিনী হিসেবেও পাই আমরা মাঝেমধ্যে। বর্তমান বিশ্বে সহিংসতার নতুন রূপ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিথ্যা সংবাদ প্রায়ই প্রশাসনের জন্য বড় দুর্ভাবনার কারণ হয়। মিথ্যা তথ্য মোকাবিলার সহজ রাস্তা হলো মূলধারার লেখক-সাংবাদিকদের অবাধে কাজ করতে দেওয়া। গুজবের অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশেই কেবল মিথ্যা সংবাদের রাজত্ব কায়েম হয়। অনাগত এসব ভেবেই হয়তো অন লিবার্টিতে স্টুয়াট মিল ‘সবার মত শোনার সুযোগ’কে ‘যেকোনো জনপদের মানুষের মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি শর্ত’ ভেবেছিলেন। কিন্তু মিলের ওই কথা বলার ১৬২ বছর পর দ্য ইকোনমিস্ট-এর তৈরি সর্বশেষ ‘গণতান্ত্রিক সূচক’-এ দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কেবল পূর্ণ গণতান্ত্রিক আবহে জীবন যাপন করতে পারছে। ৩৬ ভাগকেই থাকতে হচ্ছে চরম কর্তৃত্ববাদী আবহে।

চলতি সভ্যতার উৎকর্ষ নিয়ে চারদিক বেশ গর্ব কাজ করলেও এর বড় দুর্ভাগ্যের দিক হলো সব ধরনের ‘কর্তৃপক্ষ’ এখানে স্বাধীনতার চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ও দমনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নানা দেশে বিভিন্ন সময় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এসেও সেই মনোভঙ্গি বদলায়নি। বছরে প্রায় দুই হাজার বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এখন অস্ত্র কেনায়। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় চার ভাগ যাচ্ছে গোলাগুলি সংগ্রহে। সেই তুলনায় দেশে দেশে সংবাদমাধ্যমের পেছনে, লেখালেখির বিকাশে কতটা সম্পদ যাচ্ছে? উত্তরটি আমরা জানি না বটে, কিন্তু অনুমান করতে পারি। অস্ত্রপ্রেম ও কলমবিদ্বেষের মধ্যে সম্পর্কটি প্রায় অবিচ্ছেদ্য। এ দুয়ের মাঝখানে নাগরিক সমাজ এখনো তার শত্রু-মিত্র খুঁজে যাচ্ছে। এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি তারা, কারণ ‘জাতীয় স্বার্থে’র নামে প্রতিমুহূর্তে কলমের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি জারি রাখা হয়।

বৈশ্বিক অস্ত্র ব্যবসার স্বার্থেই দেশে দেশে প্রাণ-প্রকৃতির শত্রু-মিত্র সম্পর্কে নানা ছদ্ম ধারণা ছড়ানো হচ্ছে। ফলে সাবমেরিন, মিগ-২১ ও কলমের মধ্যে কোনটি বেশি শক্তিশালী ও দরকারি, সে বিষয়ে দিশা পায় না সমাজ। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বরিশালের মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট সম্প্রতি গবেষণা শেষে দেখেছে, ওই অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উজানে ব্যাপক লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। বলা বাহুল্য, এত উজানের দিকে লবণাক্ততার নানা বিধ্বংসী প্রভাব পড়তে থাকবে কৃষিসমাজে। যেকোনো দেশের জন্য এ রকম অবস্থা বিদেশি শক্তির বোমা হামলার চেয়ে কম বিপদের নয়। কিন্তু এ রকম খবরকে বড় কোনো প্রতিরক্ষা ইস্যু হিসেবে দেখতে আমাদের মন প্রস্তুত হয়নি আজও। যদি হতো, তাহলে স্থানীয় সাংবাদিক এম জসীম উদ্দিন ৬ মে এই সংবাদ প্রচারের জন্য তারকাখ্যাতি পেতে পারতেন। তাঁর এই সংবাদের পর বরিশালজুড়ে লবণাক্ততা রোধে তুমুল কর্মযজ্ঞ শুরু হতো। জসীম উদ্দিনের কলম সেই সুযোগ করে দিয়েছিল আমাদের।

বিশ্বব্যাপী এ রকম হাজার হাজার জসীম উদ্দিন প্রাণ-প্রকৃতির স্বার্থে কাজ করছেন। যেখানে যতটুকু স্বাধীনতা পাচ্ছেন, ততটুকুই তাঁদের সম্বল। কিন্তু অনেক দেশেই তাদের কলমকে ‘জাতীয় স্বার্থে’র বিপরীতে খলনায়ক হিসেবে দেখার রেওয়াজ রাজত্ব করছে।

কলম যে তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী, সে তো আমরা হামেশাই শুনেছি। বেশ পুরোনো একটা কথা রয়েছে, ‘যদি বিশ্বকে ইতিবাচক কিছু দিতে চাও, তাহলে কলমটা হাতে নাও।’ মানুষের শক্তির ভরকেন্দ্র চিন্তাক্ষমতায়। তারই প্রকাশ কলমে, তুলিতে, ক্যামেরায়, কি-বোর্ডে। কিন্তু প্রতিবছরই লেখক-সাংবাদিকদের জেলে ভরার হার বাড়ছে। করোনার বছর এটা আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস সূত্রেই এসব তথ্য মিলছে।

গোপন তথ্য আড়াল করার কাজ থামাতেই কলম ও ক্যামেরার এত হয়রানি। অথচ তথ্য উন্মুক্ত হলে প্রশাসনিক কাজেরই সুবিধা হয়। বিশেষত যখন কোনো প্রশাসনের ঘোষিত নিয়ত থাকে ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ করা; কলম ও ক্যামেরাকে গরাদে ভরার ভয়ে রেখে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার সুযোগ কীভাবে হতে পারে?

জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ধারণা এসেছে মানব উন্নয়নের সেই ধারণার সূত্রে, যেখানে মনে করা হয় উন্নয়ন মানে পছন্দ ও বাছাইয়ের সুযোগ। বাছাইয়ের অধিকারহীনতাই দারিদ্র্য। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বড় এক শর্ত তথ্যকর্মীদের ভীতিমুক্ত করা। এটা বেশ পুরোনো গবেষণা-উপসংহার যে বিশ্বের বহু দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যা থামানো যেত আশপাশে কলম ও ক্যামেরার ব্যবহার অবাধ থাকলে। মানুষ বাঁচানোর মতো পর্যাপ্ত শস্য থাকার পরও দুর্ভিক্ষ হয়েছে—এমন উদাহরণ বাংলাভাষীদের হাতের কাছে আছে। কোনো সরকারই দুর্ভিক্ষের দায় নিতে চায় না সচরাচর। কিন্তু তারা লেখককে ভয়ে রাখে বলে খাদ্যাভাবের তথ্যও পায় না সময়মতো।

একই রকম বাজে সংযোগ দেখা যায় স্বাধীনতাহীন সংবাদমাধ্যম ও গণহত্যার। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় যখন জঘন্যতম গণখুনোখুনি চলছিল, তখন দেশটি প্রেস ফ্রিডমে ১৮০ দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ২৫-এ ছিল।

গণহত্যা ছাড়াও বিশ্বে গণনির্যাতনের বহু ধরন আছে এবং তার সব কটির পেছনে আছে কলমের স্বাধীনতার আর্তচিৎকার। এ মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ৮ থেকে ১০ কোটি লোক সহিংসতার কারণে বাস্তুভিটা থেকে উৎখাত হয়ে আছে। তার বড় এক অংশ অন্য দেশে শরণার্থী। এমন একটা দেশও পাওয়া যায় না, যেখানে লেখালেখির ভালো স্বাধীনতা ছিল অথচ বিপুল নাগরিককে শরণার্থী হতে হয়েছে। সমসাময়িক কালে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ইত্যাদি দেশ থেকে বড় সংখ্যায় দেশান্তর ঘটছে মানুষের। এ অবস্থার বড় এক কারণ এসব জনপদ মুক্ত গণমাধ্যমের বধ্যভূমি হয়ে উঠেছিল আগেই। কলমের স্বাধীনতা বিশ্বজুড়ে এ রকম অনাচারের রক্ষাকবচ। সেই বিশ্বাসের দিকে মানুষ এগোবে কি না, সেটা আমরা আদৌ জানি না।

রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান বা সিরিয়া এবং তাদের মতো হতে চাওয়া দেশগুলো বিশ্বসমাজের জন্য প্রকৃতই এক বোঝা। নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও বিশ্বে নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি হিসেবে মানবাধিকার বিষয়ে কিছু ঐকমত্য আছে। এ রকম সব দলিলের অপরিহার্য এক উপাদান বলা ও লেখার স্বাধীনতা। কিন্তু অনেক দেশ এবং সেখানকার মুরব্বিরা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য বৈশ্বিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথকে বেছে নিতে গিয়ে শেষমেশ পুরো জনপদকে দমবন্ধ অবস্থায় ঠেলতে থাকে। কর্তৃত্ববাদের হাতের তালুতে বন্দী হতে থাকা এমন দেশগুলোর মানুষের সামনে তখন বিকল্প থাকে মাত্র দুটি। হয় তারা উত্তর কোরিয়া বা সোমালিয়ার মতো হবে, কিংবা ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ডের পথে এগোবে। নিশ্চয়ই শেষের দেশগুলোর লেখক-সাংবাদিকেরা সম্পূর্ণ বাধাহীন নন। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সহনীয় এক সমাজে নিজেদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান তাঁরা এবং সেই সুযোগ আরও বাড়ানোর কথা বলতেও পারেন। এটাই সে সমাজের মূল সৌন্দর্য। কলমের স্বাধীনতা ও মতামতের বৈচিত্র্যকে সেখানে সুন্দরের দরকারি এক মাপকাঠি বিবেচনা করা হয়—কেবল উঁচু উঁচু দালানকোঠা কিংবা বৈদ্যুতিক ট্রেনকে নয়।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন