default-image
সেই বয়ঃসন্ধির কাল থেকে কানে আসতে লাগল যে ছবি আঁকলে আর্টিস্ট হওয়া যায় এবং আর্টিস্ট হলে খুব নাম হয়। লোকে আঙুল দেখিয়ে বলে ওই লোকটা খব বড় আর্টিস্ট। পয়সাও নাকি উপায় করা যায়। তবে ওটা বড়লোকদের পেশা, আর্টিস্ট হতে হলে বেশ পয়সাকড়ি খরচ করতে হয়। আবার এ–ও কানে এল যে আর্টিস্টরা খেয়ালি হয়, খাবার পয়সা জোটে না তাদের। তবুও ছবিই আঁকব, আর্টিস্ট হতেই হবে। সেই বয়সেই অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, সাধারণ পড়াশোনা আর করব না। তখনকার দিনে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে পড়তে হলে ম্যাট্রিক না পাস করলেও চলত। এ সংবাদটিও সংগ্রহ করে ফেলেছিলাম। কলকাতা শহরে থাকতাম বলেই এসব খবরাখবর জোগাড় করা সম্ভব হয়েছিল। তা ছাড়া মনটা আমার সেই বয়সেই যেন শিল্পের রসে জারিত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মাইনর স্কুল শেষ করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে ক্যালকাটা মাদ্রাসায় ঢুকতে হয়েছিল। অবশ্য মাদ্রাসা বলতে ধর্মশিক্ষা নয়, মাদ্রাসার সাথেই ছিল ইংরেজির মাধ্যমে সাধারণ বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে ড্রইং ক্লাস পেয়েছিলাম এবং আজিজার রহমান নামে একজন তরুণ ড্রইং টিচার। তাঁর কাছ থেকেও উৎসাহ এবং উসকানি দুটোই পেয়েছিলাম।

ছেলেবেলার কথা যখন এসেই গেল, তখন সেই আমার ছেলেবেলার কথাই বলি। বলি তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি, বিশ্বাস–অবিশ্বাসের কথা। এ কথাগুলো আসত না যদি না আমি মুসলমান পরিবারের সন্তান হতাম। হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন—সবই একটি করে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং এসব ধর্মাবলম্বীকে নিয়ে এক একটি সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী, আল্লাহ, রসুল (সা.), পবিত্র কোরআন, হাদিস, রোজা, নামাজ—এই সবকিছুর প্রতিই আমাকে ইমান আনতে হয়েছে। সেটাও আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো ছেলেবেলা থেকেই ধীরে ধীরে কখন আমার মনে গেঁথে বসে গেছে তা বলা মুশকিল। মুসলমান পুরুষ সন্তান হিসেবে খতনাও হয়েছিল মাত্র দেড় বছর বয়সে। সেখানে নাকি তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে ছিলাম—আব্বা, মা, বড় ভাই, মামাদের কাছ থেকে শোনা। তারপর চোখ ফুটতে আরম্ভ করল। খেলনা দেখি, গাছ দেখি, পাখি দেখি, বিড়াল-কুকুর-হাঁস-মুরগি দেখি। একে একে চিনতে পারি, এর মধ্যে বাঘ-ভালুকের কথাও শুনি, কিন্তু ওদের দেখি না। তেমনি ভূত-পেত্নী-জীন-পরীর কথাও শুনি, ওদের দেখি না। আজও দেখিনি, কেউ কেউ নাকি দেখেছে এবং ভয় খেয়ে গিয়েছিল। আবার কুকুর–বিড়ালের সাথে একসময় সাপ, ব্যাঙও হঠাৎ দেখে ফেলি এবং চিনে ফেলি। শিখে নিই সাপ ভয়ংকর প্রাণী। ব্যাঙ অতি নিরীহ প্রাণী। একটি সাপ একটি ব্যাঙকে আস্ত গিলে ফেলে—এসব ক্রিয়াকলাপ একটু বড় হতেই দেখেছি। অতএব সাপকে ভয় করতে শিখলাম, বিড়ালকে ভালোবাসতে শিখলাম। এভাবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্র জ্ঞানের উন্মেষ ঘটতে লাগল আমার মধ্যে, যা অন্য সকলেরই জীবনে ঘটে থাকে।

আজকের শিশুরা যে ধরনের খেলনা বা ওই জাতীয় খেলার যত রকম এবং যত রং–বেরংয়ের মন-মাতানো সামগ্রী পেয়ে থাকে, আমাদের কালে তা ছিল না। তখন আমার বয়স বছর কয়েক মাত্র। এর মধ্যে আমার বড় ভাই স্কুলে যাতায়াত আরম্ভ করে দিয়েছে। অতএব তার বই, স্লেট পেনসিলের ব্যবহার আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। আব্বা, মা, এবং আমরা দুটি ভাই—এই নিয়ে আমাদের সংসার। এক ছুটির দিন, সকলেই বাড়িতে, আমি বোধ হয় একটু দুষ্টমি করছিলাম। তাই আমাকে শান্ত করবার জন্যে আব্বা আমাকে আদর করে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বড় ভাইয়ের স্লেট পেনসিল সামনে ধরে বললেন, ‘আয় তোকে একটা মজার খেলা শেখাই।’ এই বলে বড় ভাইয়ের স্লেটের ওপর আমার ছোট্ট ডান হাতের পাতা উপুড় করে বসিয়ে পাঁচ আঙুলের চারপাশে পেনসিলের দাগ বসিয়ে দেওয়ার পর আমার সেই হাতের পাতাটি স্লেট থেকে ওপরে তুলে ধরতেই চোখে পড়ল স্লেটের ওপরে আমার ছোট হাতের পাঁচটি আঙুলের সুন্দর একখানি ছবি। আব্বাকে বললাম এবং নিজেই আমার হাতটা পেতে দিয়ে শিশু ভাষায় জানালাম আবার আমার হাত এঁকে দিতে। আগের ছবিটি মুছে দিয়ে আব্বা আমার হাত আবার আঁকলেন—এইভাবে বারবার আঁকা চলতে থাকল। অবসর এবং ভাইয়ার স্লেট পেনসিল হাতের নাগালে পেলেই আব্বার কাছে নিয়ে উপস্থিত হতাম। তিনিও বুঝতেন এবং স্লেটের পিঠে আমার হাতের ছবি ভেসে উঠতে থাকত বারংবার। এটা আমার নিত্যদিনের খেলা হয়ে দাঁড়াল। শেষে একদিন দেখা গেল আমি নিজেই নিজের হাত বসিয়ে আঁকছি স্লেটের ওপরে। এইভাবে খেলা করতে করতে বয়স কিছুটা বেড়ে গেল। তখন কথাও বলতে পারি। এদিকে ভাইয়ার স্লেটে নিজেই নিজের হাত আঁকা আমার নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু আঁকাতেই শেষ নয়, তা নিয়ে আব্বাকে দেখাই, অন্য সব আত্মীয়স্বজন—মামা–চাচাদেরও দেখাই। বাহবা নিই।

default-image

এভাবেই খেলার ছলে কখন আমার মনের কোণে ছবি আঁকার একটি লতাগুল্ম অঙ্কুরিত হয়েছিল তা বলতে পারি না। তারপর বয়স একটু বাড়তেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় এসে গেল। আব্বা বড় ভাইকে যে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন, সেই মডেল এম-ই স্কুলে আমাকেও ভর্তি করিয়ে দিলেন। ইনফ্যান্ট টু-তে। কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুল। সাধারণ পড়াশোনার সাথে ড্রইং আর মডেলিং ক্লাসের চমৎকার আয়োজন ছিল। আমি যেন এক নতুন আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগলাম মনের আনন্দে। ছবি আর ছবি। আজ দেখতে পাচ্ছি আমার সেই শিশুকালটাকে। নতুন দৃষ্টি মেলে। মাত্র ডিম ফেটে বের হয়েছি, চোখ ফুটেছে কিন্তু ডানা ভালো করে মেলতে পারি না, তাই উড়তে গিয়ে বারবার পড়ে যাই। হ্যাঁ, ছবি আঁকতে যাই পাখির, হয়ে যায় মাছ। এমনিভাবে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ছবির আকাশে সেই যে উড়তে আরম্ভ করেছিলাম সে ওড়ার এখনো বিরাম নাই।

সেই বয়ঃসন্ধির কাল থেকে কানে আসতে লাগল যে ছবি আঁকলে আর্টিস্ট হওয়া যায় এবং আর্টিস্ট হলে খুব নাম হয়। লোকে আঙুল দেখিয়ে বলে ওই লোকটা খব বড় আর্টিস্ট। পয়সাও নাকি উপায় করা যায়। তবে ওটা বড়লোকদের পেশা, আর্টিস্ট হতে হলে বেশ পয়সাকড়ি খরচ করতে হয়। আবার এ–ও কানে এল যে আর্টিস্টরা খেয়ালি হয়, খাবার পয়সা জোটে না তাদের। তবুও ছবিই আঁকব, আর্টিস্ট হতেই হবে। সেই বয়সেই অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, সাধারণ পড়াশোনা আর করব না। তখনকার দিনে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে পড়তে হলে ম্যাট্রিক না পাস করলেও চলত। এ সংবাদটিও সংগ্রহ করে ফেলেছিলাম। কলকাতা শহরে থাকতাম বলেই এসব খবরাখবর জোগাড় করা সম্ভব হয়েছিল। তা ছাড়া মনটা আমার সেই বয়সেই যেন শিল্পের রসে জারিত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মাইনর স্কুল শেষ করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে ক্যালকাটা মাদ্রাসায় ঢুকতে হয়েছিল। অবশ্য মাদ্রাসা বলতে ধর্মশিক্ষা নয়, মাদ্রাসার সাথেই ছিল ইংরেজির মাধ্যমে সাধারণ বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে ড্রইং ক্লাস পেয়েছিলাম এবং আজিজার রহমান নামে একজন তরুণ ড্রইং টিচার। তাঁর কাছ থেকেও উৎসাহ এবং উসকানি দুটোই পেয়েছিলাম। যার ফলে সপ্তম শ্রেণি অতিক্রম করে আর অষ্টম শ্রেণিতে যেতে পারিনি বা যেতে চাইনি বলা যায়।

অতএব ১৯৩৮ সালের জুন মাসে কলকাতার চৌরঙ্গীতে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে গিয়ে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে এলাম। ফলাফল প্রথম বিভাগেই ছিল। যে ধর্মপ্রাণ পিতা শিশুকালে খেলার ছলে বড় ভাইয়ের স্লেটে আমার হাত আঁকা শিখিয়েছিলেন, সেই নিরীহ মানুষটিকে বাধ্য করেছিলাম আমাকে নিয়ে আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপালের সাথে সাক্ষাৎ করতে। তখন এইটাই নিয়ম ছিল। আব্বা বিরোধিতাও করেননি, আবার উষ্ণতার উত্তাপ দিয়ে সমর্থনও করেননি।

১৯৩৮ সালের জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকার অনুশীলন আরম্ভ হয়ে গেল। প্রথম দিকে মনে মনে নিজেকে বিরাট কী ভাবতাম এবং সেই ভাবেই চলাফেরা করতাম। রেমব্রান্ত, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, রাফায়েল—সব নখের ডগায়। তারপর যত দিন যেতে লাগল, ততই ঘোর কাটতে লাগল। পাঁচ বছরের মধ্যেই কামরুল নামে নতুন এক শিশু হিসেবেই যেন আবার জন্ম নিলাম। এবং সেই থেকে নিউটনের মতোই সমুদ্রতীরের নুড়িপাথর সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আজ অবধি সেই পাথর স্পর্শ করা তো দূরের কথা তার আলোর ছটা এখনো দৃষ্টিগোচর হলো না। যা–ই হোক তবুও হাল ছাড়িনি। আর তা ছাড়বই বা কোন সাহসে, পেটে তো আর বিদ্যা নেই। আমার পিতা প্রায়ই আমার ছবি আঁকাকে সমর্থন করার জন্যে যুক্তি দিয়ে বলতেন, ‘ছবি আঁকাও তো হুনুরে কাজ, পেট চলেই যাবে ওর।’ সত্যিই, পেট তো চলেই যাচ্ছে। তাহলে কি পেট চালাবার জন্যে ছাব আঁকছি? এ প্রশ্নের উত্তর কি দেব? না, ছবি আঁকবার জন্যেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করেছিলাম বটে, পরে সময় যত যেতে লাগল, ততই মনে নানান প্রশ্নের তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম। নিজের ভালো লাগা সেই সাথে অন্যদেরও ভালো লাগানো। এটাতেও যেন প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেলাম না। বয়স বাড়ার সাথে কিছু কিছু রাজনৈতিক চিন্তার আঘাত পড়ল মনের দরজায়। তার মধ্যে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। সে মানুষ সর্ব সমাজের, বিশেষ করে শোষিত সাধারণ শ্রেণির, নিচের তলার মানুষের আর্তনাদ যেন অধিকতর। কিন্তু শিল্পকলা তো শুনেছি চিত্তবিনোদনের জন্যে! হ্যাঁ তার মধ্যে দিয়েই নতুন বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আমার ছবির মধ্য দিয়ে ওই কাজটি করতে হবে। এ কথাগুলো বলে ফেলা বা লিখে ফেলা যত সহজ, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটানো বড় কঠিন। তারপর আছে মাধ্যম। কোন মাধ্যমে আঁকব? জল রং, তেল রং, কাঠ খোদাই, লিথোগ্রাফ, ভাস্কর্য, না এচিং লিনোকাট? তারপর আরও আছে। দেশি ঢঙে না বিদেশি ঢঙে?

এর মধ্যে ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়লাম। সেখানে পেলাম চিত্রকলা, নৃত্য, সংগীত এবং সে সবই যেন দেশের পলিমাটি দিয়ে গড়া। অকস্মাৎ নতুন চেতনায় চোখ মেললাম। আমি যেন আমার শিকড় খুঁজে পেলাম। এদিকে পাশ্চাত্যের অনুশীলন আমার সারা দেহ মন গ্রাস করে ফেলেছিল এরই মধ্যে। ড্রইংয়ে বেশ নাম করে ফেলেছি। বাহবাও পাচ্ছি, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যিখানে মন বলে যে একটি বিমূর্ত বস্তু আছে তার অবস্থান যে কতখানি মজবুত তা বুঝতে পারলাম তখন, যখন বুঝলাম যে আমার সেই মনের শিকড় বসে গেছে দেশের মাটির গভীরে। ব্রতচারী আন্দোলনের গান গাইতে গিয়ে, নাচতে গিয়ে, পটের ছবি দেখতে গিয়ে আমার সেই মনের গভীরে নতুন বর্ষার জল সিঞ্চন হলো, যার ফলে দেখতে পেলাম আমার মনের শিকড় বাংলার মাটি থেকে রস শোষণ করে কাণ্ডে এবং পরে কাণ্ড থেকে শাখা–প্রশাখায় সঞ্চালিত করছে আর সেই সাথে আমার মনের শাখায় নতুন কচি পাতার অঙ্কুরণ দেখতে পাচ্ছি। এই তো আমি, আমার অস্তিত্ব, আমার পরিচয়।

১৯৩৮ সাল থেকে অবিরাম পথ চলতে চলতে ১৯৮৬ সালে এসে বাংলার তালতমাল, নদী নালার পাশে, ধানখেত, পাটখেতের ভেতরে পায়ে চলা পথে নানান মানুষজনের সাক্ষাৎ ঘটতে আরম্ভ হলো। সকলেই আমার আপনজন—গরু, মোষ, পাখি, মাছ, কন্যা, বধূ, মাতা, রাখাল ছেলে, গরুর গাড়ি, তার গাড়োয়ান, এরা কথা বলে, গান গায়, নাচে। পল্লিবধূরা আমাকে দেখে কলাবাগানের মধ্যে ঘোমটা টেনে মৃদু হেসে নিজেকে আড়াল করে, কিন্তু দুচোখ মেলে দেখে, নাকের ফুল দুলতে থাকে। আমার ছবির কন্যারও কলমিলতা, শাপলা ঘেরা পুকুরে স্নান করতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। মনের এবং দেহের সমস্ত আবরণ আচ্ছাদন কোথায় ভেসে যায়। নানা বয়সের কন্যারা এক অপরকে জড়িয়ে ধরে কলকলিয়ে ওঠে।

আজকাল নানান রকম পদ্ধতি চালু হয়েছে, তার সাথে নানান কথা। একেকটা রঙের একাধিক অজস্র ধারা বা শেড। তার কত হিসাব, কত অঙ্ক। আরে অঙ্কের হিসেবে কি ছবি আঁকা যায়? বাড়ির নকশা করা যায় অবশ্যিই। কেতাবে আছে নীল রঙের সাথে হলুদ মিশেল দিলে সবুজ রং হয় ঠিকই; কিন্তু আমি যে সবুজ চাই তা করতে হলে কতটা পরিমাণ নীলের সাথে কতটকু হলুদ মিশেল দিলে আমার কাঙ্ক্ষিত সবুজ হবে, সেটা তো কেতাবে নেই। আছে একটি মাত্র জায়গায়—আমার মনের কুঠুরিতে একটি ছোট্ট রঙের কৌটা, ওর মধ্যে আমার প্রাণটাও আছে বলতে পারেন। এই মন নিয়েই আমি ছবি আঁকি। আমার ভালো লাগে। ব্যস। সমালোচনার জন্য একটা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ওরা চিত্রশিল্পের পাড়ায় গোঁসাইয়ের মতো বিচরণ করেন।
default-image

আমি এই লেখার টেবিলে বসেও ওদেরকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ওরা আমার জীবন, এ জীবন আমার মৃত্যুর পরেও থাকবে। কারণ, আমার ক্যানভাসে স্কেচে ওরা তো রইল।

হ্যাঁ, ওদেরই অনেকে আমার নামে কথা বলে চলেছে। আমার ‘তিন কন্যা’ বাড়ি ফেরার বা নাইওরে যাওয়ার সময় গরুর গাড়ির ছইয়ের ফাঁক দিয়ে আশপাশের প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে গীত গায় আবার ওই গৃহবধূই গাড়িতে বসে নদীর ধারে গুন টেনে যাওয়া পেশিবহল সুঠামদেহী মাল্লাদের মাঝে তার ভাই বা আপন সন্তানকে খুঁজে ফেরে। হঠাৎ একটা বাঁশের ডগা থেকে মাছরাঙা পাখি উড়ে চলে যায়। পাঠক হয়তো ভাবছেন এ আমি কী সব কাব্যগাথা আউড়ে যাচ্ছি! আমি কি নিজেই জানি? কী লিখছি, কেন লিখছি, কার জন্য লিখছি? তবে এইটুকু জানি, আমি বাঙালি, বাঙালি শিল্পী—বাংলায় ছবি আঁকার চেষ্টায় জীবনপাত করছি। তাই এই পাখপাখালির কথা, কলমিলতার কথা, এগুলো ‘বাঙালিপনা’ বলতে পারেন, এর মধ্যেই আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকার উপাদান।
আজকাল নানান রকম পদ্ধতি চালু হয়েছে, তার সাথে নানান কথা। একেকটা রঙের একাধিক অজস্র ধারা বা শেড। তার কত হিসাব, কত অঙ্ক। আরে অঙ্কের হিসেবে কি ছবি আঁকা যায়? বাড়ির নকশা করা যায় অবশ্যিই। কেতাবে আছে নীল রঙের সাথে হলুদ মিশেল দিলে সবুজ রং হয় ঠিকই; কিন্তু আমি যে সবুজ চাই তা করতে হলে কতটা পরিমাণ নীলের সাথে কতটকু হলুদ মিশেল দিলে আমার কাঙ্ক্ষিত সবুজ হবে, সেটা তো কেতাবে নেই। আছে একটি মাত্র জায়গায়—আমার মনের কুঠুরিতে একটি ছোট্ট রঙের কৌটা, ওর মধ্যে আমার প্রাণটাও আছে বলতে পারেন। এই মন নিয়েই আমি ছবি আঁকি। আমার ভালো লাগে। ব্যস। সমালোচনার জন্য একটা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ওরা চিত্রশিল্পের পাড়ায় গোঁসাইয়ের মতো বিচরণ করেন।

বকবক করতে করতে কোন পথ ছেড়ে কোন পথে চলে এসেছি। বলছিলাম, ছবি আঁকার পেছনেও দায়িত্ববোধ থাকা দরকার। ওটা সমাজের জন্যে, সমাজের মানুষের জন্য। সেই জন্যেই তো আমার চিত্রকলা কেবল কলাই নয় বরং চিত্রকথা বলতে চাই। কারণ, আমার তরফ থেকে আমার চিত্রই তো কথা বলবে। আমি যখন নিজে উপস্থিত থাকব না তখন আমার চিত্রকথা থাকবে আপনাদের জন্যে, আপনাদের সমাজের জন্যে। এই যেমন একাত্তর সালে লড়াইটা গেল, ইয়াহিয়া খানকে দানবের চেহারায় দেয়াল-চিত্তির বানিয়ে ছেড়েছিলাম। সেই ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খানকে প্রথম সামনাসামনি দেখেই চমকে উঠেছিলাম তার মোটা মোটা এক জোড়া ঘন ভ্রু দেখে—এক্কেবারে দানব। তখন কি জানতাম ওই চমকানিটাই একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগাবার কাজে লাগবে? এঁকে ফেলব এক নরপিশাচের চিত্তির? তখন প্রয়োজন ছিল, মনেও চেয়েছিল। তাই ভাবছি আরেকটা কথা। তা হলো—যখন মনে যা চাইবে তাই-ই যেন আঁকবার ক্ষমতা থাকে। না হলে প্রথম দিকে তো কতবার তাল–নারকেল গাছ আঁকতে গিয়ে খেজুর গাছ এঁকে বসেছি! কী লজ্জার কথা। তবুও বলছি, মনে যা চায় তা–ই কি ঠিক ঠিক মিল রেখে এখনো আঁকতে পারি? পারি না। পারত সেই ফরাসি দেশের বা স্পেনের পিকাসো। নব্বই পার হয়েও অক্লান্তভাবে তুলি চালাত, স্পেন ছেড়ে ফরাসি দেশে গিয়ে বসত করেছিল। মনের মতো পরিবেশ পেয়ে গিয়েছিল। টগবগে রক্তকে স্থিত করার কত রকমেরই না উপাদান সে দেশে! আর আমাদের এই দেশে? না রং, না তুলি, না কাগজ—আঁকার কোনো মশলাই এখানে নেই।

default-image

তাই এই বয়সে এসে নতুন করে চিন্তা করছি, সত্যিই কি আমি আঁকতে পেরেছি কিছু, না আঁকতে পারি? সেই ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকাতেই স্বচ্ছন্দ বলে একটি বিশেষ মাধ্যমের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলাম। তাই আঁকি। ওইভাবে আঁকিবুকি করতে করতে কিঞ্চিৎ নাম হয়ে গেছে। কেউ কেউ চিনতে পারেন, পথে ঘাটে বের হলে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, সাদা চুলের মানুষটা শিল্পী, বেশ নামডাক আছে। হ্যাঁ, কাজীর কেতাবে আমি একজন শিল্পী বটে, কিন্তু কত বড় আকারের শিল্পী?

হঠাৎ যেন আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পাই আমারই সেই ছোটকালের কামরুলকে, এক্কেবারে দিগম্বরটি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে, ‘কি মিয়া, কটা ছবি আঁকলে?’ উত্তর দিতে পারি না। মনে মনে আমার ‘তিন কন্যা’র কথা ভাবি, নাইওরের পথে গৃহবধূর কথা ভাবি, কলাবাগানের ফাঁকে উদোম গায়ে স্নানরতা রমণীকে দেখি, পেশিবহুল লাঠিয়ালকে দেখি, গুনটানা মাঝিকে দেখি, বুড়ো জেলেকে দেখি, যার শক্ত মুঠোর মধ্যে একটা তাজা জীবন্ত মাছ ছটফট করছে, কিন্তু মৎস্য-স্বপ্নের শক্তিতে বুড়ো প্রচণ্ড শক্তিশালী। সেই বুড়ো জেলেকেও ডাকি প্রাণপণে, ‘আমাকে আমায় শিশু কামরুলের হাত থেকে বাঁচাও।’ কিন্তু কেউ তো এগিয়ে আসে না, তারা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দেখে। দেখে ‘তিন কন্যা’, দেখে লাঠিয়াল, দেখে গাড়োয়ান, ধানক্ষেতের বকগুলোও ঘাড় ফিরিয়ে দেখে। কিন্তু কোনো কথা বলে না। অথচ আমিই ওদের সৃষ্টি করেছি। ওদের জন্যেই আমার আজ যা কিছু নামডাক। কত চিত্র সমালোচক আমার গুণকীর্তন করেছেন, কিন্তু আমার সামনে দণ্ডায়মান দিগম্বর শিশু কামরুল মিটমিট করে হাসছে সেটাও তো আমারই আঁকা আপন প্রতিকৃতি। তার হাসির কোনায় তাচ্ছিল্য যেন ঠাট্টা করছে। বলছে, ‘বুড়ো মিয়া, চুল পাকিয়ে বেশ একখানা চেহারাই বাগিয়েছ, কিন্তু ছবি আঁকতে পারলে কোথায়?’ আবার যেন চমকে উঠি: শুধু কি আমিই ছবি এঁকেছি? আমার ছাত্ররা? তারা তো আজ ছবি আঁকার মাস্টার। আমারও মাস্টার। কাইয়ুম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর—ওরা তো ড্রইংয়ে আমাকে হার মানায়। দিগম্বর শিশু কামরুল বলে, তুমি তো একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু আমি যেভাবে এই পৃথিবীর মাটিতে এসেছিলাম, সেই দিগম্বরটি হয়েই কালের প্রহরী থেকে যাব। আমি নিরাভরণ, আমি অকপট। তোমার মাস্টারমশাই রমেন চক্রবর্তী তোমাকে বলতেন না, ‘অনেক, অনেক ছবি না আঁকলে দু–একটা ভালো ছবি হবে না, যেগুলো তোমার অবর্তমানে তোমার কথা বলবে।’

default-image

আজ আমার সেই দিগম্বর শিশু কামরুল নামক বিবেকের কাছে আমার সকল অহংকার লুটিয়ে চিৎকার করে বলতে চাই চিত্রকলার ক্ষেত্রে কিছুই করতে পারিনি। এই চিত্র জগতের বিরাট ক্যানভাসের বুকে তুলি চালিয়েই চলেছি, ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে করতে জীবন চলে গেল, চিত্রকলার বীজ বপন করতে পারলাম কই?

তবে আমি না পারলেও নতুন মানুষেরা যাতে পারে, তার আয়োজনের সূত্রপাত তো করে গেলাম—এটাও কি কম আনন্দের, কম শান্তির এবং সান্ত্বনার?

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন