default-image

ঢাকার চিন্তাজগৎ ও শিল্পসাহিত্যের জগৎ দুই তরফ থেকে উপনিবেশায়নের শিকার হয়েছে। এক তরফ ইউরোপ এবং অন্য তরফ কলকাতা। প্রথম তরফের ধাক্কার প্রকাশ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। আর দ্বিতীয় তরফের ধাক্কাটা আসে ভাষা আন্দোলনের পরে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান থেকে সংগত কারণেই ক্রমে সাহিত্যরুচি, ভাষা, জাতীয়তা এবং অপরাপর চিন্তাচেতনার প্রশ্নে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা ছিল দারুণ এক তাকতের ব্যাপার। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, মুখ ফিরিয়ে নিল বটে, কিন্তু সে নিজে তার কোনো অভিমুখ তৈরি করতে পারল না। সেই দুঃসাধ্য সাধনার পথে গেল না। সে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণের ক্ষণে যার মুখের দিকে চেয়েছে, সে কলকাতা। ফলে, ঢাকার চিন্তাচেতনা ও শিল্পসাহিত্য কলকাতার অনুসরণে নিবিষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের খুব কম কবি-সাহিত্যিক দেখা যাবে যাঁদের প্রেরণার উৎস কলকাতা নয়। এই হিসাবে ঢাকা দুবার উপনিবেশায়নের শিকার হয়েছে। ঢাকার নিজস্ব সাহিত্য ও চিন্তাচেতনার ফুরসতই যেন মেলেনি। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের মূলধারার প্রগতিবিষয়ক চিন্তাচেতনা ও সাহিত্যরুচি মোটা দাগে কলকাতার পথেই হেঁটেছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ তাদের চৈতন্য আর সাহিত্যরুচির ব্যাপারে নিজের দিকে, নিজের চারপাশের দিকে তাকাতে চেয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ সেই কেউ কেউয়ের একজন। নিঃসন্দেহে জহির রায়হানরা এ ব্যাপারে তাঁর পূর্বসূরি।

হুমায়ূন আহমেদের ঔপন্যাসিক জীবনের শুরু হয়েছে নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসে মধ্যবিত্ত জীবনের রূপায়ণের মধ্য দিয়ে। এটিই হুমায়ূনের প্রধান প্রবণতা। কিন্তু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি কোথাকার? তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে এই শ্রেণিটি আচরণে, উচ্চারণে, সংস্কৃতিতে একেবারেই ঢাকার মধ্যবিত্ত। সৈয়দ শামসুল হকও মধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে কোনো কোনো উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু সেই মধ্যবিত্তকে স্বাদে-গন্ধে-সংস্কৃতিতে হুমায়ূনের মতো এত ঢাকার মনে হয় না। এমনকি সৈয়দ হকের বা আরও অনেকের মধ্যবিত্ত জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের চরিত্রদের বোঝার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলেরই যেন প্রয়োজন পড়ে না। হকের উপন্যাসে যেন আগে জীবনবোধ পরে চারপাশ, সমাজ, মানুষ, সংস্কৃতি। এ কারণে হকের উপন্যাস ভাষার দারুণ লীলালাস্য, জীবনবোধের একধরনের গভীরতা সত্ত্বেও যেন ভূগোলচিহ্নিত নয়; আইডিয়াল আর আরোপণমূলক মনে হয়। কিন্তু হুমায়ূনকে পড়তে গেলে একটি কমিউনিটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এসে ধরা দেয়, যার নির্দিষ্ট দেশ-কাল-সংস্কৃতির ব্যাকরণ থাকে। সেই নির্দিষ্ট দেশের নাম বাংলাদেশ, কালের নাম সমকাল আর সংস্কৃতির নাম বাংলাদেশের মানুষের আকাঁড়া সংস্কৃতি।

বিজ্ঞাপন

নির্দিষ্ট পরিপার্শ্বের সঙ্গে নিজে লীন থেকে যাপিত জীবনকে চারপাশে চারিয়ে দিয়ে উপন্যাস লেখার কারণেই হুমায়ূনের উপন্যাসে বাংলাদেশ, তার সমাজ, সংস্কৃতি এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মোহাম্মদ আজম তাঁর হুমায়ূন আহমেদ: পাঠপদ্ধতি ও পর্যালোচনা বইয়ে হুমায়ূনের এই বৈশিষ্ট্যকে বলেছেন, ‘নিজ অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দৈনন্দিনতাকে আবিষ্কার।’ আজম ঠিকই বলেছেন, আবু রুশ্দ থেকে শুরু করে রাজিয়া খান হয়ে মাহমুদুল হাসান প্রমুখ ঢাকার কোনো লেখকই এ কাজটি করতে পারেননি। মোহাম্মদ আজমের ভাষায়, ‘জহির রায়হানই ঢাকার প্রথম লেখক, যাঁর অনেক লেখায় এই শহরের সাদামাটা দৈনন্দিন জীবনের ছবি আঁকার উদ্যোগ ও সাফল্য আছে। হুমায়ূনে এসে এ ধারাটা, বলা যায়, এক সর্ববিস্তারী চেহারা পেল। তাঁর কালের লেখকদের মধ্যে এ ক্ষেত্রে তুলনীয় মঈনুল আহসান সাবের। ঢাকার প্রেক্ষাপটে প্রচুর লিখলেও ইমদাদুল হক মিলন এ তালিকায় পড়বেন না। কারণ, তাঁর লেখায় ঢাকার জীবনকে অন্তরঙ্গ কায়দায় আবিষ্কারের কোনো সাফল্যই নাই।’ (পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)

এ তো গেল মধ্যবিত্তের জীবন রূপায়ণের প্রসঙ্গ। হুমায়ূন আহমেদের ভাষার প্রসঙ্গই বা বলি না কেন! তিনি ঈর্ষণীয় সরল গদ্যে উপন্যাস লিখতেন। ঢাকায় ভালো গদ্যের উদাহরণ আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ। আনিসুজ্জামান সরল বাক্যের সরল গদ্যে লিখতেন। তাঁর গদ্যের চাল, সংযম একেবারে মাপা। লক্ষ্যভেদী, দারুণ, স্মার্ট, স্বাদু কিন্তু যান্ত্রিক। আনিসুজ্জামানের গদ্য প্রমথীয় গদ্য। এটি ভালো বোঝা যাবে প্রমথ চৌধুরীর আত্মচরিত আর আনিসুজ্জামানের বিপুলা পৃথিবী বা কাল নিরবধি পাশাপাশি রেখে পড়লে। সৈয়দ শামসুল হকের গদ্য উপাদেয়, অব্যর্থ কিন্তু ইংরেজির সঙ্গে তার ভাব বেশি। আবার ঢাকায় আরেক ধরনের গদ্যের চর্চা আছে। সেই গদ্যটি কলকাতায় উপনিবেশের কোলের মধ্যে বেড়ে ওঠা গদ্যেরই ধারাবাহিক সংস্করণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ ঔপন্যাসিক মূলত সেই ভাষাকাঠামোতেই তাঁদের উপন্যাস লিখেছেন। এমনকি ঢাকাইয়া ভাষার ব্যাপক প্রয়োগ সত্ত্বেও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষার মূল কাঠামোও কিন্তু ওইটিই। কিন্তু হুমায়ূন এসবের বাইরে গিয়ে একধরনের ন্যাচারাল গদ্যে তাঁর উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁর গদ্য সরল। খাঁটি সরল বাক্যের গাঁথুনিতে তা বিশিষ্ট। প্রমথীয় গদ্যের মতো অত স্মার্ট না। আবার রাবীন্দ্রিক গদ্যেরও কোনো সংস্করণ না। এই সরল গদ্য বাংলাদেশের প্রকৃতির মতো জোলো, আর্দ্র, একটু যেন ভরাট, মেঘমেদুর এবং অবশ্যই ন্যাচারাল। পূর্ব বাংলার জীবন আর প্রকৃতির সঙ্গে এর একটা অব্যাখ্যেয় রক্তের সম্পর্ক আছে। হুমায়ূনের গদ্যসম্পর্কিত আলোচনায় এটি বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে বলে মনে করি।

শুধু ভাষার প্রশ্নে নয়, জীবন রূপায়ণের ব্যাপারেও হুমায়ূনের মধ্যে আছে একটা খাঁটি পুব বাংলাপনা। উদাহরণ হিসেবে তাঁর অচিনপুর, ফেরা, লীলাবতী, মধ্যাহ্ন ইত্যাদি উপন্যাসের উল্লেখ করা যায়। উপন্যাসগুলো গভীরভাবে পড়লে বোঝা যাবে, এগুলোকে পৃথিবীর অন্য কোনো ভূগোলের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা একেবারেই অসম্ভব। প্রতিটি উপন্যাসেই হুমায়ূন ভাটি অঞ্চলের (চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ ছাড়া বাংলার প্রায় পুরো অঞ্চলই তো ভাটি অঞ্চল!) জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ‘লোকাল কালার’, রাজনীতি ও জনস্বরকে ধরতে চেয়েছেন। হুমায়ূনের অপরাপর উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে দেখা যাবে, এসব উপন্যাসে বিধৃত পাঠই বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে তাঁর প্রধান পাঠ। এই পাঠে উঠে এসেছে নদ-নদী-হাওর-বাঁওড়-জল-জঙ্গলসহ একটা দারুণ সান্দ্র প্রকৃতি; যার কথা নীরদচন্দ্র চৌধুরী পূর্ব বাংলার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিভিন্ন সময় তাঁর বিভিন্ন লেখায় বলেছেন। আর উঠে এসেছে একটা অসাম্প্রদায়িক চৈতন্য। যে অসাম্প্রদায়িকতার পাঠ হুমায়ূন কোনো ইউরোপীয় বই পড়ে নেননি। ঢাকায় চলতি তথাকথিত ‘প্রগতি’র ধারণা থেকেও পাননি। তিনি এই বোধটি পেয়েছেন পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ছেঁকে। যে জীবনে হিন্দু ও মুসলমান যে আলাদা, এই বোধ খুবই স্পষ্ট। কিন্তু এ জন্য তাঁদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কোনো সমস্যা হয় না। ধর্মীয় আচারে পার্থক্য জেনেও এখানে হরিচরণ মুসলমানের ছেলে জহিরকে বাঁচাতে ঝাঁপ দেয় পুকুরে। মুসলমানের অসুস্থ ছেলেকে ঠাকুরঘরে কোলে নিয়ে তার সুস্থতা কামনা করে। সমাজ তাকে একঘরে করে। কিন্তু তার তাতে সমস্যা হয় না। তাকে দেখভালের জন্য জুটে যায় মালজোড়া গানের বাউল গায়কের মেয়ে জুলেখা। তাঁর উপন্যাসেই লঞ্চঘাটের মামুলি টিকিটবাবু বলে, ‘জাইত জিনিসটা কী বুঝায়া বলেন। শরীরের কোন জায়গায় এই জিনিস থাকে, ক্যামনে যায়? জিনিসটা কি ধুঁয়াশা?’ বলছিলাম, হুমায়ূনের মধ্যাহ্ন উপন্যাস সম্পর্কে। মধ্যাহ্নতে বিধৃত পূর্ব বাংলার জনসমাজে যখন এই সব ঘটনা ঘটে, তখন বাংলার হিন্দুরা বাংলাভাগের বিপক্ষে ফুঁসে উঠছে, মুসলমানরা চাচ্ছে বাংলা ভাগ হোক। আলোচনা চলছে পূর্ব বাংলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের। আর হিন্দুরা বলছে, ‘পূর্ব বাংলা চাষার দেশ, তারা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী করবে?’ কিন্তু হুমায়ূন এসব ক্যারিক্যাচারের বাইরে গিয়ে তাঁর উপন্যাসগুলোতে দেখেছেন অন্য এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সেই বিরল কথাসাহিত্যিক যিনি ‘মহৎ’, ‘প্রগতি’, ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ইত্যাদি বিষয়ে পূর্বধারণার প্রাদুর্ভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত। এ কারণেই নিজের ভূখণ্ডের মানুষ ও প্রাণপ্রকৃতির স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যগুলো উপন্যাসের ক্যানভাসে নিয়ে আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। অন্য অনেক কিছু বাদ দিলেও বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক–সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নার্ভটি ঠিক ঠিক ধরে ফেলার জন্য হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েই থাকবেন বলে মনে হয়। কিন্তু হায়! সেভাবে হুমায়ূন পাঠ করতে কি আমরা প্রস্তুত!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0