default-image

২৭ ডিসেম্বর রাবেয়া খাতুনের জন্মদিন ছিল। প্রতিবছর তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাই। গত বছরও গিয়েছিলাম তাঁর জন্মদিনে বড় ছেলে ফরিদুর রেজা সাগরের বনানীর বাড়িতে। বড় ভালোবাসতেন তিনি আমাদের। আমরা যাঁরা নবীন লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, তাঁদের। আমরা তাঁকে ডাকতাম খালাম্মা, আমি বলতাম, রাবেয়া খালাম্মা। তিনি সাগর ভাইকে বলে দিতেন, আনিসকে আসতে বোলো। কী যে আদর করতেন আমাদের। এ কথা লিখতে গিয়ে চোখ ভিজে উঠছে। আদর পেতাম যাঁদের কাছে, সেই মানুষগুলো কত দ্রুত চলে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে যেন সূর্যগ্রহণ লেগে গেছে পৃথিবীতে!

তো মাত্র সাত দিন আগে, তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে অনলাইনে শুভেচ্ছাবাণী পাঠালাম ভিডিও করে। কী বললাম? আমি ছোটবেলায় শিশু একাডেমির পত্রিকা শিশু নিয়মিত পড়তাম। সেই পত্রিকায় একবার একটা উপন্যাস বেরোল। নাম সুমন ও মিঠুর গল্প। সেই কাহিনি পড়ে কত যে কান্নাকাটি করেছিলাম। বড় হয়ে ঢাকায় এলাম। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে আমাকে একটা কাজ দেওয়া হলো। একটা গল্প থেকে নাটক লিখে দিতে হবে। গল্প আর কোনোটাই নয়, সুমন ও মিঠুর গল্প। আমি কী যে খুশি হয়েছিলাম ওই গল্পের নাট্যরূপ দেওয়ার দায়িত্ব পেয়ে। রাবেয়া খালাম্মাও খুব খুশি হয়েছিলেন আমাকে এই দায়িত্ব পালন করতে দেখে।

বিজ্ঞাপন

রাবেয়া খাতুন স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন (২০১৭), পেয়েছেন একুশে পদক। কিন্তু রাবেয়া খাতুনের দুটো বড় অবদানের পরিমাপ পুরস্কার দিয়ে করা যাবে না। জন্ম তাঁর ১৯৩৫-এ। ব্রিটিশ আমলে। ছেলেবেলা কেটেছে ব্রিটিশ শাসনাধীন, তারুণ্যে দেখেছেন পাকিস্তানের জন্ম এবং আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। সেই সময়ে ঝকঝকে ভাষায় আধুনিকতম কথাসাহিত্য রচনা করতে থাকেন তিনি। একেবারে শুরু থেকেই প্রগতিশীল এবং আধুনিক ধারার সঙ্গেই পথ কেটে পথ চলেছেন তিনি। দ্বিতীয়ত সেই অবগুণ্ঠনময় সময়ে একজন নারী হয়েও তিনি বেছে নিয়েছিলেন সিনেমা পত্রিকার কাজ এবং কথাসাহিত্য করার জীবন। কল্লোল-যুগোত্তর পূর্ব বাংলার ‘নতুন সাহিত্য’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। তাঁর উপন্যাস মধুমতী প্রকাশের পর কলকাতার কাগজ দেশ লিখেছিল, ‘ঢাকাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। মধুমতী উপন্যাসে এই সমাজের ছবি। ধর্মে ইসলাম হলেও পূর্ববঙ্গের তাঁতিরা মুসলমান সমাজে অপাঙ্‌ক্তেয়। ...লেখিকার ভঙ্গি অনায়াস এবং কাহিনির গতি স্বচ্ছন্দ।’ দেশ পত্রিকার এই লেখা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সেই পাকিস্তান আমলেই রাবেয়া খাতুন উপন্যাসের বিষয় হিসেবে তাঁতিদের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। আর রাবেয়া খাতুন সম্পর্কে এই কথা শতমুখে বলা যাবে যে তাঁর ভাষা ঝরঝরে, তকতকে, আধুনিক। তাঁর লেখা একাত্তরের নয় মাস থেকে ১৬ মার্চ ১৯৭১ -এর স্মৃতিকথার একটা অংশ তুলে ধরি, ‘মহিলাদের সংখ্যা কম হলেও মিছিলের মুখ তাদের দিয়েই। পূর্ব পাকিস্তান লেখক সংগ্রাম শিবিরের বিরাট ব‌্যানারের একদিকে দণ্ড ধরে লায়লা সামাদ। অন্যদিকে কাজী রোজী এবং আমি। মাঝে ফেস্টুন হাতে সুফিয়া কামাল। ফেস্টুনে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

অস্ত্রের ভাষা অস্ত্রে চলবে

এসো সশস্ত্র অস্ত্রের পথ ধরি...

সুফিয়া কামালের দুপাশে শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা, নতুন লেখক সুফিয়া খাতুন, আরও কবি, কথাশিল্পী এবং কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পী।’...‘ঘাড় ঘুরিয়ে একপলকে দেখেছিলাম অনেক চেনামুখ। কামরুল হাসান, শামসুর রাহমান, কাইয়ুম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, শামসুজ্জামান...।’

এই উদ্ধৃত স্মৃতিকথাংশ থেকে রাবেয়া খাতুনের ভূমিকা যেমন বোঝা যাচ্ছে, তেমনি এতে তাঁর ভাষার স্বচ্ছতা ও উপলব্ধির স্পষ্টতা ফুটে উঠেছে। বায়ান্নো গলির এক গলির মতো অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন তিনি।

১৯৮২ সালে তিনি সন্ধানী ঈদসংখ্যায় লিখলেন ‘নীল নিশীথ’।

আমার মনে আছে, আমি তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র, ঈদসংখ্যাগুলোর জন্য মুখিয়ে থাকতাম, সেই উপন্যাস পড়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। রাবেয়া খাতুন তাঁর ‘জীবন ও সাহিত্য’ শীর্ষক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সচিত্র সন্ধানীর ঈদসংখ্যা বেরুনোর পর আমি পড়ে গেলাম দুঃস্বপ্নের ঝড়ের মধ্যে।...কাহিনিতে যত গুণই থাক, যৌনতা দোষে দুষ্ট।...শিল্পের সঙ্গে ধোলাই হচ্ছে শিল্পী। গায়ের জ্বালার মুখ্য কারণ মনে হলো, লেখক পুরুষ নন। যে পুরুষ নয়, তার হাতে কেন আসবে এমন নির্জলা নগ্ন সামাজিক ছবি।’

রাবেয়া খাতুন প্রচুর লিখেছেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি—তাঁর রচনাসমগ্র অনেক বিশাল।

রাবেয়া খাতুন আমাদের কথাসাহিত্যের প্রথম আধুনিকদের একজন। আমাদের শৈশব তারুণ্যে তিনি আমাদের মন গড়ে দিয়েছেন। শেষ দিন পর্যন্ত আধুনিক মন ও মননটিকেই তিনি ধারণ করে গেছেন।

আমাকে যে বিশেষ রকম স্নেহ করতেন, সেই কথাটা মনে হতেই বুকটা ভেঙে আসছে। ২০২১–এর ৩ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বনানীর বাড়িতে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। হৃদ্‌রোগে নাকি আক্রান্ত হয়েছিলেন। ফরিদুর রেজা সাগর আর ফরহাদ রেজা প্রবাল ভাই তো দেশে নেই।

রাবেয়া খালাম্মা, এবার জন্মদিনে আপনার বাসায় না গিয়ে যে কত বড় ভুল করলাম। আর তো দেখা হবে না। আমি আপনার জন্মদিনে কী উপহার দেব, ভেবে না পেয়ে একবার আপনার প্রতিকৃতি এঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই প্রতিকৃতিটার দিকে তাকিয়ে আছি। তার পরিচিতি লিখেছিলাম, চিরসবুজ রাবেয়া খালাম্মা।

রাবেয়া খাতুন, আপনি চিরসবুজ এবং আপনার সাহিত্য চিরসজীবই থেকে যাবে।

রাবেয়া খাতুনের মরদেহ আজ সোমবার বিকেলে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে। এর আগে বেলা তিনটায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে জানাজা। সর্বস্তরের মানুষের শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মরদেহ রাখা হবে দুপুর ১২টায়।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন