![সেলিম আল দীন [১৮ আগস্ট ১৯৪৯—১৪ জানুয়ারি ২০০৮], প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল](http://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2014%2F01%2F10%2F52ceffa206bd0-13.jpg?w=640&auto=format%2Ccompress)
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা নাট্যভুবনে সবচেয়ে দীপ্র নাম সেলিম আল দীন (১৯৪৯-২০০৮)। হাজার বছরের বাংলা নাটক যেসব মেধাবী নাট্যকারের হাতের স্পর্শে সমৃদ্ধ হয়েছে, নিঃসন্দেহে সেলিম আল দীন তাঁদের অন্যতম। কৃত্যমূলক বর্ণনাত্মক নাট্যধারায় তিনি সঞ্চার করেছেন নতুন মাত্রা। মধ্যযুগের বাংলা নাট্য-বিষয়ে গবেষণা করে প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলা নাটকের উদ্ভব ও বিকাশসংক্রান্ত স্বতন্ত্র এক ব্যাখ্যা। পশ্চিমা রীতির পরিবর্তে তিনি খুঁজেছেন দেশীয় নাট্যরীতি। বাংলার লোকজীবনকে অঙ্গীকার করে দেশীয় রীতির নব রূপায়ণে তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর আরাধ্য ফর্ম। ঔপনিবেশিক নাট্যরীতি ও নাট্যভাষাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, নিরলস সাধনায় নির্মাণ করেছেন বাংলা নাট্যের মহাকাব্যিক এক সংগঠন। কেবল নিজেই তিনি কৃত্যমূলক বর্ণনাত্মক নাটক লেখেননি, এ ধারায় নাট্যচর্চায় অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, প্রভাবিত করেছেন বাংলা ভাষার সমকালীন নাট্যকারদের।
সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনার তাত্ত্বিক কাঠামো প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বে। বিষয়টিকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: ‘গ্রিক রিচুয়াল থেকে যদি গ্রিক ট্র্যাজেডির জন্ম হতে পারে এবং তা নিয়ে উত্তরকালে মানববর্তী শিল্পতত্ত্ব রচিত হয়, তবে প্রাচ্যেও ধর্মতত্ত্ব থেকে কেন শিল্পতত্ত্ব পরিস্রুতরূপে অনুসৃত হবে না বা হতে বাধা কোথায়? তুরস্ক, ইরাক, ইরানের সুফিতত্ত্বের ধারায় বাংলায় চৈতন্যদেব ‘অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামে যে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের প্রচলন করেন, আমি তাকেই আধুনিক কালের করে তুলেছি।...বস্তুতপক্ষে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের আবিষ্কারের পরে বা ওই শিল্পতত্ত্বের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস জন্মানোর ফলে আমি চলতি অর্থে নাটক লিখি না। আমার লেখাগুলো ঐতিহ্যবাহী বাংলা পাঁচালি ও কথকতার ধারায় সমকালীন প্রয়াস।’
সেলিম আল দীন সাহিত্যে বর্গ-বিভাজন বা শাখা-বিন্যাস মানেননি। একটি লেখার মধ্যে কবিতা, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতি আঙ্গিকের উপস্থিতি তাঁর উদ্ভাবিত দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের মূল কথা। তিনি ভেঙে দিয়েছেন ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত সাহিত্যের বর্গ-বিভাজন রীতি, নাটকের ক্ষেত্রে বর্জন করেছেন ঔপনিবেশিক ফর্ম। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় তাঁর নিম্নোদ্ধৃত ভাষ্য: ‘...ধরা যাক চাকা। নাটকটির গঠন-কৌশলে উপন্যাসের সকল শর্তই রক্ষিত আছে। কিন্তু আবার এতে নাটকের প্রাচ্যদেশীয় শিল্পরূপটিও অক্ষুণ্ন রয়েছে। অন্যদিকে চাকাকে কবিতাকারেও সাজানো যায়। আরও এক পা এগিয়ে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি চাকা কবিতাকারে সাজানোর পর তা গীত-বাদ্যযোগেও পরিবেশিত হতে পারে। যৈবতী কন্যার মন, হরগজ একই ধারায় লেখা। বনপাংশুল-এ সুনির্দিষ্টভাবে আমি বাংলা পাঁচালিরীতির অনুসরণ করেছি। এতে কথা, পদ, বোলাম, লাচাড়ি প্রভৃতি সংযুক্ত হয়েছে। আধুনিক কালে এ ধরনের কোনো শিল্প-আঙ্গিকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেনি। একটি রচনা যখন মঞ্চে পরিবেশিত হওয়া ব্যতিরেকেও উপন্যাসের সকল বৈশিষ্ট্য আত্মসাৎ করে, তখন তা কেন কথাসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হবে না?...সাহিত্যে বর্গ-বিভাজন ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত। ও আমি মানি না। কারণ, আমাদের শিল্পরুচি চিরকালই দ্বৈতাদ্বৈতবাদী।’
সেলিম আল দীন তাঁর সৃষ্টিতে ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত বর্গ-বিভাজন রীতি অস্বীকার করেছেন, অস্বীকার করেছেন নাটকের ক্ষেত্রে স্পেস-সংকোচনের ঔপনিবেশিক রীতিকেও। ঔপনিবেশিক নাট্যরীতি আমাদের প্রচলিত নাট্য-পরিবেশনা ধারাকেই পরিবর্তন করে দেয়, সংকুচিত করে আমাদের চারদিক-খোলা বিশাল স্পেসকে। প্রসেনিয়ামের ফলে বৃহত্তর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নাটক, ঐতিহ্যিক শিল্প থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নিম্নবর্গের মানুষ। ঔপনিবেশিক এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই ছিল সেলিমের সংগ্রাম। নাট্য-পরিবেশনায় তিনি পুনরায় শিকড় সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন আমাদের ঐতিহ্যিক নাট্য-মৃত্তিকায়। নাট্যমঞ্চের সংকুচিত স্পেসটিকে তিনি বিশাল করতে চেয়েছেন—মধ্যবিত্তের গণ্ডি অতিক্রম করে নাটককে নিতে চেয়েছেন নিম্নবর্গের মানুষের কাছে, দলিত নারীর কাছে, উপেক্ষিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে। বর্ণনাত্মক রীতির উজ্জীবনের মাধ্যমে তিনি ব্যাপ্ত করতে চেয়েছেন নাট্য-পরিসরকে। উপনিবেশ-উত্তরকালে বাংলা নাট্যধারায় এই স্পেস পুনরুদ্ধারই সেলিমের দ্রোহের বিশিষ্ট এক প্রান্ত।
সেলিম আল দীন সাহিত্যে গদ্য-পদ্যের বিভাজন মানতেন না—একইভাবে অস্বীকার করেছেন চিত্রকলা, সংগীত ও নৃত্যের ভেদও। খণ্ড খণ্ড ভাবনা দিয়ে তিনি আসলে ধরতে চেয়েছেন অখণ্ড জীবনকে। তিনি বলতেন, যে আলো দিয়ে আমরা পৃথিবী দেখি, সে আলোও সাতটি বর্ণের সমষ্টি। আলো কখনো একবর্ণিক, একরৈখিক কিংবা একদেশদর্শী হতে চায় না। দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পাদর্শও জীবনকে কেবল একটা ফর্মের মধ্য দিয়েই দেখে না—দেখে নানা রঙে, নানা ভাষ্যে। নাট্য-রচনায় সেলিম আল দীন গ্রহণ করেছেন বর্ণনাত্মক রীতি। সংলাপের পাশাপাশি তিনি নাটকের মধ্যে নিয়ে আসেন কথাসাহিত্যের বর্ণনাধর্মিতা। এই নাট্যকোবিদ মনে করেন, চেতন-অবচেতনের অনেক কিছুই সংলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই অভাববোধ থেকেই তিনি বর্ণনামূলক নাট্যরীতি প্রবর্তনের প্রয়াস পান। তাঁর নাটক প্রকৃত প্রস্তাবে কথানাট্য। তিনি বিশ্বাস করেন, কথানাট্যই মানবচিত্তে সঞ্চারিত করতে পারে মহাজাগতিক বোধ।
‘এপিক রিয়ালিজম’ সেলিম আল দীনের নাট্যশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য এপিক মন্থন করে জীবন সম্পর্কে যে বিশালতার ধারণা তিনি লাভ করেছেন, লাভ করেছেন যে বিস্তৃত ও পরমসূক্ষ্ম অনুভূতি—নাটকে তা উপস্থাপনের এক অনন্যপূর্ব প্রয়াস পেয়েছেন। মহাকাব্যিক বিশালতায় তিনি রচনা করতে চেয়েছেন বাঙালি জীবনের চিরকালের মহানাটক। নাটকে কীভাবে মহাকাব্যিক পটভূমি ব্যবহার করেছেন, তা বলতে গিয়ে সেলিম জানাচ্ছেন এই কথা: ‘...কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল ও হাত-হদাই—এ এয়ী নাটকের অনুপ্রেরণার স্থল চিরায়ত এপিক ও ধর্ম। বিশেষত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জীবনচেতনা। এমনকি আঙ্গিক পর্যন্ত এপিক বা মহাকাব্যের শীর্ষ বিন্দুতে মিশে গেছে। আমার মনে হয়েছে, বৌদ্ধ জাতকের গল্প, ওভিদের মেটামরফসিস, পাপ ও কর্মফলের শ্লাঘা, শিল্প-লেখা, ডিভাইন কমেডিয়া ও মহাভারতের নরক-কল্পনা এ কালের বাস্তবতার সঙ্গে মেলানো সম্ভব। আমার কাছে মনে হয়েছে, ওডিসি, ইনিড কিংবা সিন্দাবাদের সমুদ্রভ্রমণ দ্বৈতাদ্বৈতের টঙ্কার তোলে। বাস্তবতা আমার লক্ষ্য নয়। বর্তমানও আমার অবলম্বন মাত্র। এ ত্রয়ী নাটকের মাধ্যমে প্রাচ্যমানবের আকার অঙ্কনে প্রয়াসী ছিলাম। এ নিয়মটাকেই আমি মহাকাব্যিক বা এপিক রিয়ালিজম হিসেবে শনাক্ত করেছি।’
বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির পাশাপাশি সেলিম বর্ণনামূলক অভিনয়রীতির কথাও জোরের সঙ্গে প্রচার করেছেন। ভরত ব্যাখ্যাত অভিনয়রীতির ধারায় তিনি বর্ণনাধর্মী অভিনয়রীতি নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নিজের নাটকের মঞ্চায়নেও আকাঙ্ক্ষা করেছেন ওই বর্ণনাত্মক অভিনয়-কৌশল।
পরিবেশন ও অভিনয়-রীতির পাশাপাশি নাট্যভাষা নির্মাণেও সেলিম আল দীন পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। ঔপনিবেশিক সমাজকাঠামোতে বেড়ে-ওঠা মধ্যশ্রেণীর ভাষার পরিবর্তে তাঁর নাটকে প্রাধান্য পেয়েছে লোকভাষা। নাটকে লোকভাষার ব্যবহার তাঁর দ্রোহী-চেতনার ভিন্ন এক মাত্রা। অন্যদিকে শক্তির প্রাবল্যে ক্ষমতার ক্রমধারায় উচ্চে আছে বলে বাঙালি ধ্বংস করেছে আদি নৃগোষ্ঠীর ভাষা। সেলিম তাঁর নাটকে বাংলাদেশের আদি নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষা পুনরুদ্ধারেও রেখেছেন প্রাতিস্বিক ভূমিকা। চাকা, বনপাংশুল, একটি মারমা রূপকথা, হাত-হদাই প্রভৃতি নাটকে সংলাপ নির্মাণে, বর্ণনায় বাঙালির এবং আদি নৃগোষ্ঠীর লোকভাষাকে তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেছেন।
আন্তরিকভাবে তিনি প্রয়াসী ছিলেন একটি দেশজ নাট্যশৈলী ও নন্দনরীতি উদ্ভাবনে। এ ক্ষেত্রে ঐতিহ্য-ঋদ্ধ বাংলা নাট্যরীতি ছিল তাঁর প্রধান ভরসা। দৃঢ় প্রত্যয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘আমি এই প্রত্যয়ে বদ্ধমূল যে হাজার বছরের বাংলা নাটকের আঙ্গিক সাধনাতেই আমদের জাতীয় নাট্যরীতির প্রকৃত উজ্জীবন সম্ভব। পূর্বাঞ্চলীয় জনপদের প্রাকৃত ও কর্মমুখর ভাষাতেই রচিত হবে আগামী দিনের মহানাটক।’ পাশ্চাত্য শিল্পরীতিকে অস্বীকারের প্রবণতা থেকেই সেলিম আল দীন জাতীয় নাট্যরীতির কথা ভেবেছেন, অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদের ধারণায় বাংলা নন্দনতত্ত্বের কথা কল্পনা করেছেন।