বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনি তখন ভুলে যাবেন সদ্য গরমে চরমে ওঠা বিরক্তি। আপনি তখন কথার জাদুতে মোহাবিষ্ট এক বর্ণিল জগতে প্রবেশ করবেন। সেখানে বস্তুগত জগতের ক্লেদ নেই, আছে ভাবনা ও বোধের নিস্তরঙ্গ প্রবাহ। তিনি তা পারতেন। এ কারণেই তিনি একক এবং এখনো পর্যন্ত অদ্বিতীয় আমাদের অনেকের কাছে। তাঁর সেই প্রজ্ঞার সান্নিধ্যে যাঁরা গেছেন, শুধু তাঁরাই তা জানেন। বলছি, অধ্যাপক ড. আফসার আহমদের কথা।

একাধারে তিনি কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, অনুবাদক, গবেষক, তাত্ত্বিক, নির্দেশক, সমালোচক, সংগঠক ও শিক্ষক। বর্ণিল বহু গুণের অধিকারী আফসার আহমদ জাগতিক মায়া কাটিয়ে হঠাৎ চলে গেলেন ৯ অক্টোবর ২০২১, একটু আগেভাগে, অকালে।

শিক্ষাজীবনে অসামান্য সাফল্যের অধিকারী আফসার আহমদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানার জামশা গ্রামে। ১৯৮০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও ১৯৮১ সালে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি। ১৯৮৪ সালে তিনি একই বিভাগে যোগদান করেন প্রভাষক হিসেবে। ১৯৮৫ সালে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দেশের প্রথম নাটক ও নাট্যতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ বিভাগ। আমৃত্যু তিনি ওই বিভাগেই শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগেরও প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

তাঁর লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবনে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় বিচরণ হলেও তাঁর মূল মনোযোগ ছিল নাটক রচনা ও গবেষণায়। বাংলাদেশে বর্ণনাত্মক নাটকের তুলনামূলক সমালোচনার ধারাটি সূচিত হয় তাঁর হাত ধরে। যার উজ্জ্বল নিদর্শন ‘মঞ্চের ট্রিলজি’ শিরোনামে রচিত প্রবন্ধ। ঔপনিবেশিক অবলেশ ঝেড়ে ফেলে বাংলা নাটকের হাজার বছরের কৌলীন্য সেলিম আল দীনের নেতৃত্বে যে কয়েকজন মানুষ তাঁদের মেধা, মনন ও শ্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আফসার আহমদ তাঁদের মধে৵ অগ্রগণ্য। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, মান্দাই, মান্দি প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর নাট্য নিয়েও নিরলস গবেষণা করেছেন। অবহেলিত, নিজভূমে পরবাসীর মতো আচরণ পাওয়া ওই জাতিগোষ্ঠীগুলোর নাট্যনমুনা ও ইতিহাস সযত্নে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন নিরলস গবেষণায়।

তাঁর আকস্মিক প্রস্থান আমাদের নাট্যশিক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে সুবিশাল ক্ষতি। বাংলা নাট্যের নৈয়ায়িক সূত্রগুলোর দিশাদানকারী অন্যতম এই ব্যক্তিত্বের শূন্যতা অপূরণীয়। আমাদের মঞ্চে যত দিন বাংলা নাট্য উদ্ভাসিত হবে, তত দিন তিনি নেপথ্যে স্মিত হাসি হয়ে রইবেন, কখনো বিভ্রান্ত হলে তাঁর রচনা হয়ে উঠবে আমাদের দিশা। শরীরী কাঠামোয় না থেকেও তাই তিনি আমাদের সব সময়ের নাট্যদিশারি!

এর প্রমাণ তাঁর ‘বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী নাট্য’ শীর্ষক সুবিশাল গ্রন্থ। আধুনিক জীবনের টানে, রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য অভিঘাতে এই বর্ণিল জাতিগুলোর নিজস্বতা ক্রমশ বিলীয়মান।

default-image

আফসার আহমদের গবেষণাগ্রন্থের মাধ্যমে তাঁদের স্বাতন্ত্র্যের অভিজ্ঞানগুলো চিরকালের জন্য রক্ষিত হয়ে যায়। এ ছাড়া মারমা ‘জ্যা’ অবলম্বনে তিনি রচনা করেন ‘আলংনাবাহ’ ও ‘মা চ ক্যান’। মান্দিদের কাহিনি নিয়ে লিখেছেন ‘মীমাংচিনা’। তিনি একজন বিচক্ষণ অনুবাদকও। মূল গ্রিক ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন ইউরিপিদিসের ‘ওরেস্তেস’। তাঁর রচিত বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চসফল। এগুলোর মধ্যে ‘মনসার কথা’, ‘চন্দ্রাবতী’, ‘ঘুমকুমারী’, ‘মীমাংচিনা’, ‘প্রেমপুরাণ’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া লিখেছেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন অবলম্বনে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, মৈমনসিংহ গীতিকার কাহিনি অবলম্বনে ‘কাজলরেখা’ ও মহাকবি আলাওলের পদ্মাবতী অবলম্বনে ‘পদ্মাবতী’।

লিখেছেন বেশ কিছু টেলিভিশন নাটক। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ। তিনি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার স্টাডিজ জার্নালের সম্পাদক, ঢাকা থিয়েটারের সদস্য ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।

সবকিছুর পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর সবচেয়ে প্রভাববিস্তারী সত্তা হলো তাঁর শিক্ষকসত্তা। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রিয়তম শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাঁর এই প্রিয়তা শুধু নিজ বিভাগের গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেগোনা যে কয়েকজন শিক্ষক নিজ বিভাগ ছাড়িয়ে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি তাঁদের একজন। আফসার আহমদের ক্লাস মানেই অন্যরকম প্রস্তুতি, ভিন্ন অভিজ্ঞতা। চিন্তার শৃঙ্খলা তাঁর ভেতরে খুব সহজে চিত্রায়িত; ফলে তাঁর ভাষণ দেওয়ার ভাষাও সহজ ও বোধগম্য। দীর্ঘদিনের অনুশীলনেও যে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহজে ধরা দেয় না, আফসার আহমদের ঘণ্টাব্যাপী নেওয়া একটি ক্লাসই সেই সংকট দূর করে দিতে সক্ষম ছিল। তাঁর আকস্মিক প্রস্থান আমাদের নাট্যশিক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে সুবিশাল ক্ষতি। বাংলা নাট্যের নৈয়ায়িক সূত্রগুলোর দিশাদানকারী অন্যতম এই মানুষের শূন্যতা অপূরণযোগ্য। আমাদের মঞ্চে যত দিন বাংলা নাট্য উদ্ভাসিত হবে, তত দিন তিনি নেপথ্যে স্মিত হাসি হয়ে রইবেন, কখনো বিভ্রান্ত হলে তাঁর রচনা হয়ে উঠবে আমাদের দিশা। শরীরী কাঠামোয় না থেকেও তাই তিনি আমাদের সব সময়ের নাট্যদিশারি!

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন