বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেল। হঠাৎ এক বিকেলে আমরা সবাই ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডের সামনের মাঠে সাতচাড়া খেলছিলাম। গেটের বাইরে এক অন্ধ লোক মোটা গলায় রোজি, রোজি, রোজি বলে ডাকছে। লোকটির গলার আওয়াজ পাওয়ামাত্র রোজি কিছুটা ভীত আর কিছুটা স্তম্ভিত হলো। মাত্র কয়েক সেকেন্ড! তারপরই যেন তার মুখের পেশিগুলো দৃঢ় সংকল্পে শক্ত হয়ে গেল। একলহমায় মুখ ঘুরিয়ে সে আমাদের বলল, ‘বলে দাও, এখানে রোজি থাকে না।’ বলেই সে দ্রুত সফেদাগাছটাকে পাশ কাটিয়ে, কাজের লোকেদের চলাচলের পথটা দিয়ে বাড়ির পেছনের উঠান পেরিয়ে রান্নাঘরের ছাদে জামগাছের নিচে সোজা হয়ে শুয়ে থাকল। আমরা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম. ভয়ংকর দেখতে লোকটা! দুটো চোখই অন্ধ, গায়ের রং রোদে পুড়ে মিশমিশে কালো। তার হাতে একটা মোটা লাঠি। পরনে ফতুয়া; যা কখনো হয়তো সাদা ছিল। লুঙ্গিটাও তেমনি মলিন। লোকটির পায়ের পাতাটা অস্বাভাবিক রকমের মোটা এবং মরা চামড়ায় ধূসর। এখন খানিকটা নুয়ে পড়লেও একসময় লম্বা ছিল বলেই মনে হয়। ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ করেই চলে গেল সেই লোকটা।

default-image

রোজিকে গিয়ে খবর দিতেই সে ছাদ থেকে নেমে এল। নির্বিবাদ জানাল, লোকটি তার বাবা কিন্তু সে তার সঙ্গে যাবে না। কারণ সে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ভিক্ষা করে। অন্ধ বলে রোজিকে তার দরকার, লাঠিটা ধরে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, ভিক্ষার চাল আর টাকা গুছিয়ে রাখার জন্য। রোজিরা বরিশালের। কয়েক মাস পরপর এভাবে তার বাবা তাকে নিয়ে ঢাকায় আসে। যেখানে রাত হয়, সেখানেই রাস্তার পাশে তাকে নিয়ে শুয়ে পড়ে। ভালো লাগত না রোজির এভাবে থাকতে। তাই সে একবার পালিয়ে ঢুকে পড়ে আমার মামার বাসায়। মামা–মামি অনেক চেষ্টা করেছেন, কার সঙ্গে সে এসেছে, সেই খোঁজ নিতে। কিন্তু রোজি কিছুতেই জানায়নি। কয়েক দিন পর মামা রোজিকে নানার বাসায় রেখে যান। এরপর আরও বার দুই এসেছিল রোজির বাবা। কিন্তু রোজি তার মত বদলায়নি।
রোজি আমার অন্য খেলার সঙ্গীদের চেয়ে ছিল একেবারেই আলাদা। তার সঙ্গে খেলতে আমি খুব ভালোবাসতাম। অন্য নিম্নবর্গীয় বন্ধুদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তার তুমুল ঝগড়া বেধে যেত। অভিযোগ—সে বিভিন্ন মামা-খালার ঘর থেকে ছোটখাটো জিনিস যেমন পাউডার, রুমাল ইত্যাদি চুরি করে নিয়ে লুকিয়ে রাখত অন্যদের বাক্সে। তার সহজ উত্তর—তার তো কোনো বাক্স নেই। যেন চুরি করাটা অপরাধ নয়, অন্যের বাক্সে রাখাটাই অপরাধ। আমার বয়সী আমার এক ভাই হাঁস, মুরগি ইত্যাদি পুষত। একদিন মুরগির ডিম না পেয়ে সে ধরেই নিল রোজি নিয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, রিয়া, রোজি নিয়েছে তাই না রে? আমিও কিছুটা সন্দেহের বসে হ্যাঁ বা না কোনোটাই জোর দিয়ে বললাম না। রোজি বসে ছিল রান্না আর খাবার ঘরের দাওয়ায়। আর যাবে কোথায়, বাড়ির কোনো এক ঝি তাকে পেছন থেকে লাথি দিয়ে ফেলে দিল মাঠে, ‘ডিম চুরি খরসোস কিতার লাগি?’ সেও রাগত স্বরে বলে উঠল, ‘কে দেখছে আমারে ডিম চুরি করতে?’ ভাইটি সহসাই বলে বসল, রিয়া দেখেছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলাম, কিন্তু বলতে পারলাম না যে ‘না, আমি দেখিনি।’ রোজির কাছে আমি যেন খুব ছোট হয়ে গেলাম।

আমাদের ছোট খালা রাজিয়া হক থাকতেন পশ্চিম পাকিস্তানে। ছোট খালার মেয়ে শিখু জন্মালে তাকে কোলে–কাঁখে রাখার জন্য খাম্মা গ্রীষ্মের ছুটিতে এসে রোজিকে পাকিস্তানে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগের কয়েকটা দিন আমাদের জন্য রোজির মন খারাপ হলেও প্লেনে চড়ে অচিন দেশ দেখার উত্তেজনায় সে ছিল শিহরিত। শিখুকে সে ভালোই রাখতে পারত। কিন্তু শিখুর কান্নাকাটি সে মোটেই বরদাস্ত করতে পারত না। একবার কান্না না থামাতে পেরে এতই রেগে গেল যে তার হাতটা মটকে দিল। অগত্যা খাম্মা তাকে দেশে নিয়ে এলেন। রোজিকে ফেরত পেয়ে আমরা ছোটরা আবার ফুর্তিতে ভেসে গেলাম। তবে রাতে শুয়ে ঘুমের ভেতর খাম্মার একটা কথা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। তিনি মঞ্জু খালাকে বলছিলেন, রোজিকে ফেরানো অনেক কঠিন কাজ। তার অতীত তাকে বারবার তাড়া করে ফিরবেই। কী তার অতীত? কী তাকে তাড়া করে ফিরবে?

কে নেবে রোজির দায়িত্ব? বড় খালা তার সহকর্মী শিক্ষাবিদ নূর জাহান খালার বাসায় ওকে দিয়ে এলেন। ইতিমধ্যে রোজি ১২ থেকে ১৩–তে পা দিচ্ছে। একটু একটু প্রেম–ভালোবাসা হচ্ছে। নূর জাহান খালার অশীতিপর বৃদ্ধ মা এসব সহ্য করবেন কেন? শুরু হলো জোর বকাবকি। রোজির আর সহ্য হলো না। একদিন যখন বৃদ্ধা নামাজ পড়ছিলেন, তাঁর মাথায় লাঠির এক বাড়ি দিয়ে সে পালিয়ে এল আমাদের ধানমন্ডির বাড়িতে। বেশ কিছুদিন হাসপাতালে কাটাতে হলো খালার মাকে। আমার বড় খালার সঙ্গে নূর জাহান খালার এত দিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। এরপর যতবার আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে, তিনি বলেছেন, আয়শা এই ডাকাত মেয়েকে কেন দিয়েছিল? কোথায় বা লুকিয়েছে তাকে?

অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেল। নানা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। একই সঙ্গে ভাঙতে থাকল নানার একান্নবর্তী পরিবার। মেজ মামার এখন আলাদা সংসার। বড় খালার পোস্টিং হয়ে গেল রাজশাহীতে। কে নেবে রোজির দায়িত্ব? বড় খালা তার সহকর্মী শিক্ষাবিদ নূর জাহান খালার বাসায় ওকে দিয়ে এলেন। ইতিমধ্যে রোজি ১২ থেকে ১৩–তে পা দিচ্ছে। একটু একটু প্রেম–ভালোবাসা হচ্ছে। নূর জাহান খালার অশীতিপর বৃদ্ধ মা এসব সহ্য করবেন কেন? শুরু হলো জোর বকাবকি। রোজির আর সহ্য হলো না। একদিন যখন বৃদ্ধা নামাজ পড়ছিলেন, তাঁর মাথায় লাঠির এক বাড়ি দিয়ে সে পালিয়ে এল আমাদের ধানমন্ডির বাড়িতে। বেশ কিছুদিন হাসপাতালে কাটাতে হলো খালার মাকে। আমার বড় খালার সঙ্গে নূর জাহান খালার এত দিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। এরপর যতবার আমার মায়ের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘আয়শা এই ডাকাত মেয়েকে কেন দিয়েছিল? কোথায় বা লুকিয়েছে তাকে? আমি তো তাকে অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের দায়ে জেলে দেব।’

সে সময় জানতে পারি রোজির অতীত। তার বাবা ছিল বরিশালের এক নামকরা ডাকাত। বহু ডাকাতি সে করেছে। রোজি এবং তার পরিবারের কাছে ডাকাতি ছিল আর দশটা পেশার মতোই একটা পেশা। একবার ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়লে স্থানীয় লোকেরা তার চোখ উপড়ে ফেলেছিল। সেই থেকেই রোজির পরিবারে অভাব। ভিক্ষা ছাড়া অন্নসংস্থানের গতি নেই তার বাবার।

default-image

আমাদের বাড়িতে এসেও রোজির প্রেমে পড়াটা কমল না। একদিন বেশ রাতে তাকে আমাদের বাড়ির পেছনে পাশের বাড়ির গৃহকর্মীর সঙ্গে দেখা গেল। বাড়ির পুরুষ গৃহকর্মীরা নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা হয়ে গেল। রোজির কিন্তু কোনো বালাই নেই। ভাবটা—‘আমি এমনই।’ অর্থাৎ সে ডেয়ারিং অ্যান্ড লিবারেটেড। এখন অনুমান করি, বাড়ির পুরুষ গৃহকর্মীদের একটা প্রচ্ছন্ন হিংসাও কাজ করেছিল। তাদের পছন্দ না করে পাশের বাড়ির ছেলে কেন? বড় খালা ঢাকায় বদলি হয়ে এলে তাকে আমাদের বাসা থেকে আবার ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডে নিয়ে যান। ১৯৭১-এর যুদ্ধের সময় সেখান থেকেই এক রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাব হয় রোজির এবং তার সঙ্গে সংসার করার জন্য পালিয়ে যায় সে। তার একটি মেয়েসন্তান জন্মায়। রোজি ওর নাম রেখেছিল রিনা। তার স্বামীকে নিয়ে প্রায়ই সে বেড়াতে আসত আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাড়িটা যেন ছিল তার বাপের বাড়ি।

১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসের ১৯ বা ২০ তারিখের দিকে বড় বড় চকচকে দুটি ট্রাংকভর্তি জিনিস উপহার নিয়ে আমাদের বাড়িতে এল সে। ভেতরের বারান্দা গলে সোজা মায়ের বেডরুমে উপস্থিত হয়ে খুলতে বসল ট্রাংকগুলো। মাসহ আমাদের সব ভাইবোনের চক্ষু একেবারে চড়কগাছ। বাক্সভর্তি বিছানার চাদর, কুশন কভার, টেবিল ক্লথ, কাচের বাসন, পেয়ালা আরও সব অত্যন্ত দামি জিনিসপত্র। সে বলল, ‘আম্মা, আপনার জন্য আনছি।’ মা চিৎকার করে উঠলেন, ‘সে কী, কই পেলি তুই এসব!’ তার কথা থেকে যা বোঝা গেল, তা হলো—ধানমন্ডিতে থাকা কোনো উর্দুভাষী পরিবার তাদের বাড়িতে তালা দিয়ে ডিসেম্বরের এয়ার রেইডের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। কয়েক দিন ধরে সেই বাড়ি লুট হয়েছে। সেখান থেকেই সে তুলে এনেছে এই সব। অনেক কিছুই সে তার বাড়িতে নিয়েছে কিন্তু এই জিনিসগুলো নাকি আমাদের বাড়িতেই বেশি মানাবে। তাই সে ভালোবেসে নিয়ে এসেছে। মা যখন তাকে বকা দিয়ে দূর দূর করে জিনিসপত্র নিয়ে যেতে বললেন, সে কী অভিমান তার! স্পষ্টই বলল, নিয়েছে তো কী হয়েছে, সে না নিলে অন্য কেউ তো নিতই!

একটা কমলা রঙের সিক্স ফোর ফোর শাড়ি পরে বিয়েতে গিয়েছিলাম। সেটি আমার প্রথম শাড়ি। দুপুরের বিয়ে। এসে শাড়িটা খোলা হয়নি। রোজি সেদিন বেড়াতে এল। বারবার শাড়িটায় হাত দিয়ে অনুভব করল আর বলল, ‘কী সুন্দর শাড়ি গো। কোথায় পেলা এটা? এই শাড়িটা পুরোনো হলে তুমি কিন্তু আমাকে দিবা।’ সন্ধ্যায় সে চলে গেল। কাকতালীয়ভাবে আমার শাড়িটাও হারিয়ে গেল। বাসাসুদ্ধ সবাই বলল, রোজি নিয়ে গেছে। আমি জোরের সাথে বললাম, ‘না, সে নেয়নি। আমার জিনিস সে কখনো নেবে না।’ মনে হলো, যেন আমার পাপস্খলন হলো। বিনা অপরাধে ডিম চুরির দায়ে তাকে মার খাইয়েছিলাম। শাড়ি যদি নিয়েও থাকে, এ যেন শোধবোধ হয়ে গেল।

আশ্চর্য! ওই ঘটনার পর রোজি কিন্তু আর আসেনি। মা বছরখানেক পরে খোঁজ করতে লোক পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে পুরোনো ঠিকানায় আর পাওয়া যায়নি। যে রোজি অতটুকু বয়সে বাঁচার তাগিদে নিজের বাবাকে অস্বীকার করার শক্তি রাখে, ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডের নিম্নবর্গীয়দের সঙ্গে একা লড়াই করে জিততে পারে, সে কেন আর এল না? তুচ্ছ এক শাড়ির শখ পূরণ করেছে বলে? নাকি তার প্রিয় খেলার সাথি অর্থাৎ আমার কাছে ছোট হবে না বলে? কেমন আছে সে? তেমনি অদমিত আছে তো? কোনো অঘটন ঘটে যায়নি তো? সাতচল্লিশ বছর পেরিয়ে গেল। আজও আমি তাকে খুঁজে বেড়াই।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন