বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অনেক স্মৃতির ভিড়ে একটা ঘটনা এখনো মনে আছে। কেন জানি সবকিছু বাদ দিয়ে আমি আলমারি থেকে হ্যাঙ্গারগুলো নিয়ে দরজার দিকে রওনা হয়েছিলাম; কিন্তু বাবা আমার কাছ থেকে সেগুলো কেড়ে নিয়ে জোর করে আমার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলেন।

ট্যাক্সিটা রওনা দিল। প্রায় ১০ মিনিট চলার পর পাশের এলাকা থেকে আরও একটি পরিবারকে উঠিয়ে আমরা পশ্চিমের পেশোয়ার শহরের দিকে যাত্রা করলাম। ভোরের প্রায় শুরুতে আমরা পেশোয়ার পৌঁছালাম। সেখানে একটা দোতলা বাড়ির সামনে আমাদের ট্যাক্সি থামল। তাড়াহুড়া করে বাড়ির ভেতর ঢোকার পর বাইরে থেকে দরজা লক করে দেওয়া হলো। খবর পেলাম, আমাদের পেছনে একদল গোয়েন্দা লেগেছে, যাদের কাজ হচ্ছে বাংলাভাষী যারা পাকিস্তান থেকে পালানোর চেষ্টা করছে, তাদের আটক করা।

আমরা জানতাম, এর ভেতর অনেক বাঙালি পরিবার খাইবার পাখতুনখাওয়া দিয়ে কাবুলে পালিয়ে গেছে। পাখতুনখাওয়া পরিচিত ছিল উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার নামে। বিকেলে আমাদের সঙ্গে থাকা সেই দুই পশতুন ঘরে ঢুকে কিছু নান-ই-আফগান বা আফগানি নান দিয়ে গেল, সঙ্গে একটু চিনি। আমাদের বিশ্রাম নিতে বলে তারা জানাল আমাদের পরবর্তী যাত্রা শুরু হবে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের গন্তব্য হিন্দুকুশ পর্বতমালা। প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাহাড়ের সারির শুরু উত্তর পাকিস্তানে। সেখান থেকে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে সেই তাজিকিস্তানে। এই রাস্তা দিয়েই একসময় বাবর ভারতবর্ষে এসে মোগল সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটিয়েছিলেন।
রাতের অন্ধকার চাদরে সব ঢেকে যাওয়ার পর আমাদের প্রস্তুতি শুরু হলো। গাদাগাদি করে দুই পরিবারকে তোলা হলো একটা লরির পেছনে। এরপর সামনে তোলা হলো কিছু মহিষ, যাতে করে মনে হয় লরিতে করে মহিষ পরিবহন করা হচ্ছে। পরে শুরু হলো অন্ধকারের ভেতর নিজের দেশের উদ্দেশে যাত্রা। পুরো নিজের একটা দেশ, আমার বাংলাদেশ!

স্বর্গ ভয়ংকর

গভীর রাত। আমাদের লরি অন্ধকারের চাদর ভেদ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। সারা দিনের ক্লান্তিতে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু বড়দের চোখে ঘুম নেই, সেখানে শুধুই আতঙ্কিত আশঙ্কা। তারপরও একটানা গাড়ির দুলুনিতে মাঝেমধ্যে আব্বা-আম্মাও একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন। হঠাৎ করে রাস্তার মাঝখানে কড়া ব্রেকে সবার তন্দ্রা ছুটে গেল। আশপাশে কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই; যাকে বলে ‘মিডল অব নো ওয়ার’। বড়দের আতঙ্কে মেশানো চোখের দৃষ্টিতে আমরা ছোটরাও সন্ত্রস্ত; সবার মনে একই প্রশ্ন, ‘গাড়ি থামল কেন?’ একটু পর লরির ড্রাইভার আর তার সঙ্গী পেছনে এসে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল আমরা কেউ ‘কাহওয়া’ খেতে চাই কি না। প্রশ্ন শুনে সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল; অনেকটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা।

আমাদের গাইডরা তারস্বরে তাদের ভাষায় চিৎকার শুরু করল, যার মানে অন্য কোনো উপজাতীয় দলের ডাকাতেরা আমাদের দলের ওপর হামলা করেছে। এই ঘটনা যখন ঘটছে, তখন সারা দিনের ক্লান্তিতে খচ্চরের পিঠে আমি অর্ধেক ঘুমে বিভোর। আমাদের সঙ্গের বড়রাও ঘটনার আকস্মিকতায় যেন একটু চুপসে গেছে।

‘কাহওয়া’ হলো এক প্রকার স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত সবুজ (গ্রিন) চা, যা পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাশ্মীর উপত্যকা এবং মধ্য এশিয়ায় কিছু স্থানে বেশ জনপ্রিয়। একে একে আমরা লরি থেকে নেমে এলাম। রাস্তার পাশে ছোট দোকানটার সামনে পেতে রাখা অনেকগুলো ভাঙা বেঞ্চি। সেগুলোর একটাতে বসে চুমুক দেওয়া সেই ‘কাহওয়া’র স্বাদ এই মধ্য বয়সে এসেও ঠোঁটে লেগে আছে। চা খাওয়া শেষে আবার আমাদের লরির যাত্রা শুরু হলো। গাড়ির দুলুনিতে কখন যে বাবার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি, টেরই পাইনি।

ঘুম ভাঙার পর চোখের সামনে ফুটে উঠল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। আমাদের ঠিক সামনে কারাকোরাম পাহাড়ের সারি চলে গেছে যত দূরে দৃষ্টি যায়। আমরা একটা উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে একটা সরু পানির ধারা আর তার দুপাশে আকাশছোঁয়া সব পাহাড়ের সারি। কারাকোরাম রেঞ্জে ১৮টি পাহাড় আছে, যাদের উচ্চতা ২৪ হাজার ৬০০ ফুটের ওপর; এর মাঝে চারটি আছে ২৬ হাজার ফুট ছাড়িয়ে গেছে। এভারেস্টের পর এখানেই পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া কে-২ অবস্থিত, যার উচ্চতা প্রায় ২৮ হাজার ২৫১ ফুট। পাহাড়ের চূড়াগুলো সাদা বরফে আচ্ছাদিত; মাঝেমধ্যে সূর্যের রশ্মি ঠিকরে পড়ে একরকম সোনালি বিভ্রম তৈরি করছে। যে একবার এই দৃশ্য দেখেছে, তার পক্ষে তা ভোলা সম্ভব নয়।

default-image

এই পাহাড়ের সারি পেশোয়ারের উপত্যকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, যা শেষ হয়েছে আফগানিস্তানের লওরাহ উপত্যকায় গিয়ে। সেই লওরাহই হচ্ছে আমাদের প্রথম গন্তব্যস্থল, যেখানে আমরা নিজেদের কিছুটা নিরাপদ মনে করতে পারি। সেই সময়ে আমাদের কারও বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না সামনের এই বিপদসংকুল পথ কীভাবে আমরা পাড়ি দেব। যাত্রাপথে কিছু কিছু জায়গায় পাকা রাস্তা তো পরের কথা, কোনো কাঁচা রাস্তাও নেই।

অনেকক্ষণ চলার পর শেষ পর্যন্ত আমাদের লরি এসে থামল একটা ছোট গ্রামে। স্থানীয় লোকজন পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গুহায় বসবাস করে। দিন শেষে আস্তে আস্তে চারদিক আঁধারে ঢেকে আসছে। আমাদের সঙ্গে গাইডরা আমাদের জানাল যে রাতটুকু আমাদের কাটাতে হবে গুহার ভেতর। গুহার ভেতরের মাটিতে পাথর দিয়ে ঘেরা ছোট একটা চারকোনা জায়গায় আগুন জ্বালানো আছে উষ্ণতার জন্য; আর আছে মাটিতে শোয়ার জন্য তুলা দিয়ে বানানো খুবই চিকন তোশক। শীতের শেষে তখন প্রকৃতিতে বসন্তের আমেজ। গুহার ভেতর আগুন জ্বলানো থাকলেও বাইরে তেমন একটা ঠান্ডা নেই; বরং মৃদু বাতাসের ছোঁয়া এনে দিচ্ছে আরামদায়ক অনুভূতি। মনে হচ্ছে পৃথিবীর বুকে স্বর্গ নেমে এসেছে।

কিন্তু আমরা বাচ্চারা ঠিকই বুঝতে পারছিলাম এর মধ্যেও কোথাও যেন একটা সমস্যা আছে। আমাদের সঙ্গের বড়রা নিজেদের ভেতর গলা নামিয়ে কথা বলছে। সেখান থেকে বুঝতে পারলাম তারা কেউ গুহার ভেতর রাত কাটানো নিরাপদ মনে করছে না।

তাদের মনে ভয়, যদি বাইরে থেকে স্থানীয় পশতুনরা গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়! শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, আমরা খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাব; আমাদের গাইডরা আমাদের জন্য কিছু খাটিয়া জোগাড় করে আনল। যদিও আমাদের গাইডরাও ছিল পশতুন গোত্রের, আমাদের সঙ্গে থাকা বড়রা ঠিক স্থানীয়দের বিশ্বাস করতে পারছিল না। আমরা তখন সভ্যতা থেকে বেশ দূরে। পাকিস্তানের এসব জায়গায় সরকার বা রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে উপজাতীয় নেতাদের কথাই আইন।
মনে মনে সবাই প্রস্তুতি নিলাম লম্বা একটা রাত কাটানোর।

‘এ লং ওয়াক টু ফ্রিডম’

পরদিন সকালে সূর্যের আলো যখন আমাকে ডাকছে, তখন আমি আধো ঘুম আর আধো জাগরণের ভেতর আছি। বিরক্ত হয়ে চোখের ওপর আলো ঢাকতে মুখের ওপর কাঁথা বা লিহাফ টেনে দিলাম। চারদিকে মানুষের পায়ের শব্দ আর বাচ্চাকাচ্চাদের কিচিরমিচিরের মধ্যে অবশ্য বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকা গেল না। মুখ থেকে কাঁথা সরিয়ে চারপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কেন সবার এত চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটেছে; যা দেখলাম তার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। আশপাশে দেখলাম, আরও কিছু বাঙালি পরিবার জড়ো হয়েছে, যারা আমাদের মতোই পালিয়ে এসেছে; এদের অনেককেই আমরা আগে থেকে চিনি; অনেকেই আমার প্রিয় মুখ। খুব দ্রুত মুখ-হাত ধুয়ে নাশতাপর্ব শেষ হলো। নাশতা বলতে দোদায় (তন্দুর রুটি) এবং ট্রিওয়াই, এক রকম পানীয়, যা দই আর পানির মিশ্রণে তৈরি। অনেক ঝাঁকানোর পর পুদিনাপাতা মিশিয়ে এই পানীয় পরিবেশন করা হয়।

এরপর শুরু হলো আমাদের পথচলা; অনেকটা নেলসন ম্যান্ডেলার সেই বইয়ের মতো, ‘এ লং ওয়াক টু ফ্রিডম’।

প্রথমে আমরা উপত্যকার মাঝ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম; আমাদের এক পাশে ছোট্ট পানির ধারা বয়ে চলেছে; এত স্বচ্ছ প্রবাহ যে একেবারে নিচ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। দুই পাশে বিশাল মৌন পর্বতের সারি। হাজার বছরের স্মৃতি নিয়ে তারা খুব উন্নাসিকের মতো আমাদের দেখছে। আমাদের মোটামুটি বিশাল দল; বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে হাঁটার পর সবাই ঘোষণা দিল আর সম্ভব নয়; পানিবিরতির জন্য একটু থামা দরকার।

সবাই মিলে পাশের পানির ধারার দিকে ছুটে গেল; আমরা যারা ওয়াসার পানি খাই তাদের পক্ষে বোঝা একটু মুশকিল যে সেই পানি কতটা সুস্বাদু এবং তৃপ্তিদায়ক। সবাই আঁজলা ভরে পান করলেও আমাদের দলে এক বুদ্ধিমান ছিল যে পানির ভেতর মুখ ডুবিয়ে জিব দিয়ে পান করার চেষ্টা করছিল। তখন কি আর সে জানত যে পানি খেতে গিয়ে সে ফাও একটা ব্যাঙাচিও খেয়ে ফেলবে!

আবার হাঁটা শুরু হলো। অনেক মাইল অতিক্রমের পর আমরা এমন এক জায়গায় এসে উপস্থিত হলাম, যেখানে প্রথমবারের মতো সমতল ছেড়ে আমাদের পাহাড়ে চড়তে হবে। আমাদের গাইড আগেই সাবধান করে দিয়েছিল যে এই কাজ বেশ বিপজ্জনক ও কষ্টকর।

সারাজীবন ‘খচ্চর’ শব্দটাকে গালি হিসেবে শুনে এসেছি। এই নামে যে আসলেই কোনো প্রাণী আছে, সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। আমার সামনে যেই প্রাণীটাকে হাজির করা হলো, তা ঠিক গাধা নয়, আবার ঘোড়াও নয়। প্রাণীটার শরীরটা অনেকটা ঘোড়ার মতো, কিন্তু কানগুলো এবং সাইজ গাধার মতো ছোট। প্রতিটি খচ্চরে একজন করে বড় এবং সঙ্গে একজন করে বাচ্চাকে বসানো হলো।
তারপর শুরু হলো খচ্চরের পিঠে আমাদের পরবর্তী পর্যায়ের যাত্রা।

ডাকাতের খপ্পরে

খচ্চরের পিঠে চড়ে দুলতে দুলতে পথচলা যে খুব একটা আনন্দকর অভিজ্ঞতা নয়, সেটা আমরা একটু পরেই টের পেলাম। কাদামাখা রাস্তার এক পাশে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল আর অন্য পাশে গহিন খাদ; কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা এত সরু যে একটু কমবেশি হলেই সোজা উপরের দিকে যাত্রা করতে হবে! প্রতিটি খচ্চরের সঙ্গে একজন করে এসকর্ট লাগাম ধরে হাঁটছে; আপাতদৃষ্টে শান্ত প্রাণীগুলোর কাফেলা লাইন ধরে এগিয়ে চলছে। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে আমরা হাঁটছি; মাঝেমধ্যে শুকনো খাবার দিয়ে উদর-পূর্তি, জল পান বা জলত্যাগের জন্য ক্ষণিকের যাত্রাবিরতি। পশ্চিম দিকে ধীরে ধীরে সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাত নেমে এল। মনে হলো যেন হাজার বছরের অন্ধকার আমাদের ঘিরে ধরেছে।

প্রায় মাঝরাতের দিকে হঠাৎ করে আমাদের ‘কাফেলা’র গতি কমে এল। আমাদের সঙ্গের গাইডরা সবাইকে চুপ হওয়ার নির্দেশ দিল। কয়েক মুহূর্ত পরেই বুঝতে পারলাম সামনের দিকে কোনো কিছু নিয়ে তর্ক বেঁধেছে; এর পরেই আমাদের গাইডরা তারস্বরে তাদের ভাষায় চিৎকার শুরু করল, যার মানে অন্য কোনো উপজাতীয় দলের ডাকাতেরা আমাদের দলের ওপর হামলা করেছে। এই ঘটনা যখন ঘটছে, তখন সারা দিনের ক্লান্তিতে খচ্চরের পিঠে আমি অর্ধেক ঘুমে বিভোর। আমাদের সঙ্গের বড়রাও ঘটনার আকস্মিকতায় যেন একটু চুপসে গেছে। একটু পর আবার খচ্চরের কাফেলা সামনে যাওয়া শুরু করল। সারা জীবন জেনে এসেছি জান বাঁচানো ফরজ। একটু পর তার প্রমাণ পেলাম যখন বুঝলাম আমাদের সঙ্গের গাইডরা সব আগেই পালিয়ে গেছে এবং আমরা আসলে আমাদের হামলাকারীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অন্য দিকে যাচ্ছি। বুঝতে পারলাম ঘটনা ভয়াবহ। আমাদের সঙ্গে বড়রাও হাওয়া বুঝে চুপ মেরে গেছে।

পুরো কাফেলা মুহূর্তের ভেতর যেন বরফের মতো জমে গেল। আমার ভাইকে নিয়ে সেই পশতুন তরুণ গায়েব হয়ে গেছে। হঠাৎ পাহাড়ের দিক থেকে একটা বাচ্চার কান্না শুনে সঙ্গের একজন স্থানীয় দৌড়ে গিয়ে দেখল সেই পশতুন আমার ছোট ভাইকে নিয়ে পালাচ্ছে। তার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা।

আমাদেরকে পরে ছোট একটা রাস্তার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো; মনে হচ্ছিল তাদের গ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে অন্ধকার ফিকে হয়ে আমি পাহাড়ি বনমোরগের ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। আমরা যখন কাছাকাছি চলে এসেছি, তখন প্রথমেই চোখে পড়ল গ্রামের প্রবেশপথের পাশে এক বিশাল জলপ্রপাত। আমার মা আমার কানে কানে বলে উঠলেন, ‘আরে, এই জায়গাটাই আমি কয়েক দিন আগে স্বপ্নে দেখেছি।’

আমাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হলো একটা ছোট টিলার ওপর; একটা বড় উঠানের চারপাশ দিয়ে অনেকগুলো কুঁড়েঘর, একটা মসজিদ আর একটা গভীর পানির কুয়া। এক পাশে বেশ বড় একটা ঘর। মনে হলো এরা ডাকাতদের সঙ্গের নয়, বরং ভিন্ন কোনো উপজাতীয় গোত্রের লোক।

অনেকক্ষণ পথচলার ফলে আমাদের খচ্চরগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বেচারাদের ওপর থেকে নামার পর মনে হলো তারা কিঞ্চিৎ শান্তি পেয়েছে। আমাদের এরপর বড় বাসাটার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো; ভেতরে হোস্টেলের মতো সারি সারি বিছানা পাতা। আটককারীরা আমাদের বিশ্রাম নিতে বলল। এতক্ষণ পর আমাদের দলের বড়রা তাদের অনুরোধ করল অভুক্ত বাচ্চাদের যেন কিছু খেতে দেওয়া হয়। কথার মধ্যে হঠাৎ দেখলাম একজন বয়স্ক লোক ঘরে প্রবেশ করলেন, মুখে লম্বা ধূসর দাড়ি আর মাথায় পশতুনদের বিশাল পাগড়ি। মনে হলো বৃদ্ধকে দেখে সম্মানবশত সবাই চুপ হয়ে গেল; আমার নিজেরেও মনে হলো এই লোকের কাছে আমরা নিরাপদ।

বৃদ্ধ ছিলেন সেই গোত্রের নেতা; তিনি একে একে আমাদের দলের পুরুষদের সবার সঙ্গে পরিচিত হলেন। একজন দোভাষীর মাধ্যমে উর্দু আর পশতুতে তাঁর সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা হলো। একটু পর সেই বৃদ্ধ আমাদের দলের সব নারীদের তাদের মাথা আর মুখ যতটুকু ঢাকা সম্ভব তা ঢাকতে বললেন। একই সঙ্গে তিনি তার লোকদের নির্দেশ দিলেন আমরা সাধারণত যে খাবার খাই তাই যেন পরিবেশন করা হয়।

এরপর শুরু হলো অপেক্ষা। খাবার তো আর আসে না। খিদেয় সবার নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাওয়ার অবস্থা। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর কয়েকজন লোক কিছু বিশাল বিশাল প্লেট নিয়ে প্রবেশ করল। প্লেটের ভেতর মহিষের বিশুদ্ধ দুধ দিয়ে তৈরি মাখন আর ঘি দিয়ে আধা সেদ্ধ ভাত রান্না করা। লোকগুলো এত যত্ন করে খাবার বানিয়ে আনল, কিন্তু কপাল খারাপ যে সেই আধা সেদ্ধ ভাত আমাদের পক্ষে খাওয়া সম্ভব ছিল না।

পালানোর পথে

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরেও কেন জানি সামনের সেই বিশাল কুয়োটার কথা ঘুরেফিরেই মনে আসছিল। দুপুরে জোহরের নামাজের ঠিক আগে হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার বাবা এবং দলের কোনো পুরুষকেই আর আশপাশে দেখা যাচ্ছে না। বুকটা ধক করে উঠল। বাবা কোথায় গেলেন? এদিক–ওদিক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল, সবাই মিলে তারা মাঝখানের কুয়াতে অজু করতে গেছেন। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি আর আমার দুই বছরের ছোট ভাই, যে কিনা আমার সব দুষ্টুমির সাথি, দৌড়ে গেলাম কুয়ার কাছে। সেখানে গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম, যার জন্য আমি ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। আমার বাবা উবু হয়ে বসে অজু করছেন দলের অন্যদের সঙ্গে, আর তাদের ঘিরে রেখেছে স্থানীয় কিছু ছোট বাচ্চা। বাচ্চাগুলোর গায়ের রং ঠিক আপেলের মতো লাল; সবাই স্থানীয় সালোয়ার–কামিজের মতো কাপড় পরে আছে, মাথায় পশতুনদের পাগড়ি। বাচ্চাগুলো খুব কৌতূহলের সঙ্গে কুয়ার পাশের আগন্তুকদের দেখছে।

এক বাচ্চার সঙ্গে আমার বাবা টুকটাক আলাপ পাড়লেন। এর মাঝে স্থানীয় এক লোক এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন যে উনি মুসলমান কি না। আমার বাবা মৃদু হেসে জানালেন শুধু তিনিই নন, বরং আমাদের দলের সবাই মুসলিম। স্থানীয় মানুষটিকে মনে হলো এই উত্তরে বেশ সন্তুষ্ট।

সেই দিন বিকেলে আমরা এর বিপরীতে এক ভয়াবহ গল্প শুনলাম। কিছুদিন আগে এই একই রাস্তায় আর একদল বাঙালি পালাচ্ছিল। যখন সেই দলের এক ভদ্রলোক কুয়ার পাড়ে বসে অজু করছিলেন, বাচ্চাগুলো তাকে মজা করে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ফেলে দিয়েছিল। এই গল্পে পুরো দলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

আর খাবার ব্যাপারে আর কী বলব! আমাদের সবাই রীতিমতো হাতজোড় করে আমাদের আশ্রয়দাতাদের অনুরোধ করেছিল, যাতে করে আমাদের আর ঘিয়ে ভাজা ভাত দেওয়া না হয়; বরং আমরা দোদে খেতেই বেশি আগ্রহী।

সেই রাতে খচ্চরের পিঠে আবার যাত্রা শুরু হলো। যখন আমরা প্রায় পাকিস্তান-আফগান সীমানায় পৌঁছে গিয়েছি, সবাইকে বলা হলো মাথা নিচু করে পাহাড়ের ঢাল থেকে দূরে থাকতে; কারণ কাছেই পাকিস্তানি সৈন্যরা পাহারায় আছে। সেই রাতে আর নতুন কোনো ঘটনা ঘটল না। পরদিন সূর্য তখনো মাথার ওপরে ওঠেনি, এমন সময় আমরা মোটামুটি সমতল এক জায়গায় উপস্থিত হলাম। এখান থেকে আমাদের চারপেয়ে বন্ধুদের বিদায় জানানো হলো। কয়েক দিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে অবলা প্রাণীগুলোর ওপর একরকম মায়া পড়ে গিয়েছিল; হাজার হলেও এরা না থাকলে এই বিশাল পর্বত ডিঙিয়ে এই পাশে আসাটা প্রায় অসম্ভব ছিল।

default-image

শুরু হলো হেঁটে চলা। বড়দের পক্ষে মালপত্র নিয়ে এই রাস্তায় চলাটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল; আর নারীরাও তাদের বাচ্চাদের কখনো এই কোল, কখনো ওই কোল করে রীতিমতো নাস্তানাবুদ হচ্ছিলেন। আমার মায়ের দুরবস্থা দেখে এক তরুণ পশতুন এগিয়ে এল এবং আমার দুই বছরের ছোট ভাইকে কোলে তুলে নিল। আমার মা তো মহা কৃতজ্ঞ; কিন্তু সুখ বেশিক্ষণ সহ্য হলো না। একটু পরেই দেখি মা তারস্বরে চিৎকার করে বলছেন, ‘আমার বাচ্চা কোথায়?’ পুরো কাফেলা মুহূর্তের ভেতর যেন বরফের মতো জমে গেল। আমার ভাইকে নিয়ে সেই পশতুন তরুণ গায়েব হয়ে গেছে। হঠাৎ পাহাড়ের দিক থেকে একটা বাচ্চার কান্না শুনে সঙ্গের একজন স্থানীয় দৌড়ে গিয়ে দেখল সেই পশতুন আমার ছোট ভাইকে নিয়ে পালাচ্ছে। তার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা। যাহোক, আমার ভাইকে উদ্ধার করা হলো; আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট দেখতে পাই আমার মা–বাবার সেই উদ্বেগে ভরা আতঙ্কিত চাহনি।

আরও ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর আমাদের চোখের সামনে হাজির হলো কাবুল নদী। সেই স্মৃতি, সেই স্বস্তি আর আনন্দ আমি এখনো ভুলতে পারিনি। একে তো নিরাপত্তার দেখা মেলা, অন্যদিকে কাবুল নদীর সৌন্দর্য, দুই মিলে মনে হলো যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। কাবুল নদী প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ; শুরুটা মাইদান ওয়ার্দাক অঞ্চলের হিন্দুকুশ পর্বতে। আর শেষ হয়েছে পাকিস্তানের আঁটকে।

নদীর সামনে অনেকগুলো ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল, বোঝা গেল আমরা বাদেও আরও বাঙালিরা পালাচ্ছে। কাবুল নদীর পাশের লম্বা হাইওয়েতে উঠে নিজেকে মনে হচ্ছিল সুরাইয়া শাহজাদা খানমের মতো; যিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আফগানিস্তানের রানি। দীর্ঘ শ্বাপদসংকুল পথ শেষে নিরাপত্তার স্বপ্নে তখন আমরা বিভোর। কে জানত, রাস্তা তখনো অনেক বাকি!
তবে সেই নদীর সৌন্দর্য আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই।

কাবুলের পথে

হাইওয়েতে সারি বেঁধে আমাদের ট্যাক্সিগুলো চলছে। পরপর তিনটি ট্যাক্সিতে আমাদের দলের সবাই। হঠাৎ মনে হলো, দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি। নদীর স্রোত যেন একই সঙ্গে আমার ছোট মনের গত কয় দিনের সব ভয়–ভীতি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভ্রমের সৃষ্টি হচ্ছে; মনে হচ্ছে স্রোতগুলো নদীর মধ্যে বড় বড় পাথরের চাঁইয়ের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে ঢেউ তৈরি করে যেন নিজেই নিজের সঙ্গে খেলা করছে। এই অতিপ্রাকৃতিক দৃশ্য জীবনে ভোলার না।

কয়েক ঘণ্টা টানা গাড়ি চলার পর আমরা কাবুলে প্রবেশ করলাম। আমি যেই সময়ের কথা বলছি, তখন কাবুলে এখনকার মতো দুঃস্বপ্নের দিন ছিল না; বরং কাবুল ছিল খুবই প্রাণবন্ত একটা শহর। যদিও ইসলামাবাদের সঙ্গে তুলনা হয় না কারণ ইসলামাবাদ ছিল খুবই কম জনবসতিপূর্ণ সাজানো–গোছানো শহর এবং সেটা মূলত তৈরিই করা হয়েছিল গুটি কয়েক সামরিক ও বেসামরিক আমলার জন্য। আমাদের ওঠার কথা একটা গেস্টহাউসে। সেটার কাছে আসতেই ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে আনল, যাতে করে কোনোরকম দুর্ঘটনা না ঘটে। কারণ আমরা তখন বেশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়েছি। আশপাশে খোলা আকাশের নিচে কয়েকটা দোকান আর চায়ের স্টল চোখে পড়ল। একটা ক্যাফের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেতর থেকে কানে ভেসে এল উর্দু গান। পুরুষ আর নারীর মিলিত সেই কণ্ঠে আমি চনমনিয়ে উঠলাম; গান শোনার অনুভূতি আমাকে মনে করিয়ে দিল, স্বাধীনতা আর অল্প কিছু দূরে অপেক্ষা করছে, যদিও ভালো করেই জানি দেশ সেখান থেকে বহুদূরে।

গানের গায়ক বা গায়িকাটা কে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। নূরজাহান, রুনা লায়লা, আহমেদ রুশদি বা মেহেদি হাসান কারও সঙ্গেই তো মেলে না। গানটা ছিল ‘পানি-রে-পানি তেরা রাং ক্যায়সা’; অনেক রকম বাদ্যযন্ত্রের মিলিত কম্পোজিশনে গানটা ছিল অসাধারণ একটা ক্লাসিক। যদিও সেই ছোট বয়সের আমি সব বাদ্যযন্ত্রের নামও জানতাম না; পরে যখন ১৯৭৭–এর দিকে আমাদের পরিবার দিল্লিতে গিয়ে থাকা শুরু করে, তখন আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারি যে কাবুলের সেই সোনালি সকালে আমি শুনেছিলাম সেতার, ভায়োলিন, পিয়ানো, চেলো, তবলা, বাঁশি, ঘুংরু, ক্লারিনেট, হারমোনিয়াম এবং আরও কত কিছুর সংমিশ্রণে এক অসাধারণ সুর। যা হোক, দিল্লির সেই গল্প নাহয় আরেক দিন হবে।

কিছুক্ষণ পর মনে হলো, এ আমি কোথায় এলাম! আশপাশে দেখে মনে হচ্ছে পাশ্চাত্যের কোনো দেশে চলে এসেছি। মহিলারা সব স্কার্ট (হ্যাঁ, পাঠক, ঠিকই পড়ছেন) পরে ঘুরছে, গায়ের রং আমাদের থেকে কিছুটা হালকা। আশপাশে বিভিন্ন জাতি আর চেহারার মানুষজনের চলাফেরা। এদের ভেতর পশতুনরা ছিল আফগানিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি। পুরো জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ ছিল পশতুন, ২৭ শতাংশ তাজিক, ৯ শতাংশ হাজারা, ৯ শতাংশ উজবেক, ৪ শতাংশ আইমাকস, ৩ শতাংশ তুর্কি, ২ শতাংশ বালুচ এবং বাকিরা সবাই মিলে ৪ শতাংশ।

মোহাম্মদ জহির শাহ ছিলেন আফগানিস্তানের তখনকার রাজা। ১৯৭৩ সালে তিনি যখন ইতালির ইস্কিয়ায় ছিলেন, সেই মুহূর্তে তাঁরই একসময়ের প্রধানমন্ত্রী দাউদ খান সেনাবাহিনীর সাহায্যে তাঁর বিরুদ্ধে ক্যু করে বসে। রক্তপাতহীন সেই অভ্যুত্থানে রাজতন্ত্র হটিয়ে ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক আফগানিস্তানের’ ঘোষণা দেওয়া হয়। রাজাও ঠিক করেন তিনি এর বিরুদ্ধে কিছু করবেন না এবং সেই বছরের আগস্টে তিনি তাঁর সিংহাসন ত্যাগ করেন। রাজা শেষ পর্যন্ত ইতালিতেই নির্বাসিত জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং এর সঙ্গে সঙ্গে ১৭৪৭ সালে গঠিত প্রায় ২০০ বছরের দুররানী সাম্রাজ্যের অবসান হয়।

কাবুলের দিনগুলো

‘প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় জানা গেছে, আমাদের জীবনের বিভিন্ন শিক্ষার শতকরা ৯০ শতাংশের ভিত্তি অভিজ্ঞতা আর পারস্পরিক সম্পর্ক।’ এ কথাগুলো যে পুরোপুরি সত্য, সেটা প্রমাণের জন্য কাবুলে থাকার সময়টাই যথেষ্ট।
দিনগুলো ছিল যেন স্বপ্নের মতো। আমরা দুই ভাই, ৫-১৬ বছর বয়সের বিভিন্ন আকারের কিছু ছেলেপেলের সঙ্গে জুটে গেলাম। সারা দিন আমাদের কাটে ক্রিকেট, পিত্থু, পিড্ডি-পিড্ডি আর কুতকুত (আমার বোনের বান্ধবীদের সঙ্গে) খেলে। কখন যে সময় চলে যায়, তার কোনো খবরই নেই আমাদের। মাঝেমধ্যে ঘুড়ি ওড়ানো আর মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে অন্যদের হাতে পিটুনি খাওয়া ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। বালাই বাহুল্য যে আমাদের পিটুনি খাওয়ার অন্যতম কারণ আমাদের ‘ক্ষুদ্র’ আকার! মাঝেমধ্যে আমরা সিঁড়ি বা মই ছাড়াই ছাদে উঠে পড়তাম। কোনো কোনো দিন সুযোগ বুঝে বাবার পুড়ে যাওয়া সিগারেটের গোড়াটা অ্যাশট্রে থেকে তুলে চুপি চুপি চলে যেতাম গলির শেষ মাথার পাহাড়টার পেছনে।

আহা, জীবন ছিল আনন্দের!

এই বয়সের ছেলেদের যা হয়; আমরা ছিলাম একে অপরের জ্ঞান বিতরণের শিক্ষক। এখানেই প্রথম জানতে পারলাম পৃথিবী গোল না চ্যাপ্টা; কে পাকিস্তানের বন্ধু আর কে শত্রু! মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জুলফিকার আলী ভুট্টো, রিচার্ড নিক্সন, শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী, নুরুল আমিনসহ আরও অনেকের নাম জানলাম, যাঁরা আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ভেতর শেষের জন মাত্র ১৩ দিনের প্রধানমন্ত্রিত্বের মাথায় পাকিস্তানকে নিয়ে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন ১৯৭১ সালে; ভাগ্যিস জড়িয়ে পড়েছিলেন! আমার মা–বাবা নুরুল আমিন নামের ‘ভদ্রলোককে’ পছন্দ করতেন না; কেন সেটা অবশ্য সেই বয়সে বোঝার ক্ষমতা হয়নি। এমনকি কয়েক দিনের ভেতর মানবজন্মের রহস্যও আর আমার অজানা থাকল না।

সেই রাতে খচ্চরের পিঠে আবার যাত্রা শুরু হলো। যখন আমরা প্রায় পাকিস্তান-আফগান সীমানায় পৌঁছে গিয়েছি, সবাইকে বলা হলো মাথা নিচু করে পাহাড়ের ঢাল থেকে দূরে থাকতে; কারণ কাছেই পাকিস্তানি সৈন্যরা পাহারায় আছে। সেই রাতে আর নতুন কোনো ঘটনা ঘটল না। পরদিন সূর্য তখনো মাথার ওপরে ওঠেনি, এমন সময় আমরা মোটামুটি সমতল এক জায়গায় উপস্থিত হলাম। এখান থেকে আমাদের চারপেয়ে বন্ধুদের বিদায় জানানো হলো। কয়েক দিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে অবলা প্রাণীগুলোর ওপর একরকম মায়া পড়ে গিয়েছিল; হাজার হলেও এরা না থাকলে এই বিশাল পর্বত ডিঙিয়ে এই পাশে আসাটা প্রায় অসম্ভব ছিল।

আমার বেশির ভাগ জ্ঞানের শিক্ষক ছিল রানা, মান্না, পান্না আর পলাশ ভাই। তাদের কাছে ছিল মার্ভেল আর ডিসির এক বিশাল কমিকস সংগ্রহ। আমরা দুই ভাই যখনই সময় পেতাম, সেসব কমিকসের পাতায় ডুবে যেতাম। পড়ার বয়স হয়নি, কিন্তু বিভিন্ন ছবি দেখে দেখে বুঝে নিতাম কী হচ্ছে; সুপারহিরোদের সঙ্গে হারিয়ে যেতাম পৃথিবী রক্ষার যুদ্ধে। রানা ভাইয়ের কাছে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল; দেখতে অনেকটা জুতার বাক্সের মতো। মাঝেমধ্যে তিনি আমাদের গলার স্বর সেখানে রেকর্ড করে আমাদের চমকে দিতেন। কী যে অদ্ভুত ছিল ব্যাপারটা! মান্না ভাই ছিলেন ভাইদের ভেতর সবচেয়ে ‘জটিল’ বা কুল। মারগাল্লা পাহাড় থেকে ঝরনার পানি এসে নুল্লা নামের একটা ছোট খালে এসে মিশত; তার পাড়ে দুই গাছের মাঝখানে হ্যামক ঝুলিয়ে মান্না ভাই আমাদের বিভিন্ন মজার মজার গল্প শোনাতেন। এখনো আমার চোখে ভাসে সেই সব দিনের স্মৃতি।

সপ্তাহখানেক থাকার পর আমাদের সঙ্গে আরও কিছু দল এসে যোগ দিল; সবাই আমরা অপেক্ষায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের দিল্লি ফ্লাইটের জন্য। পরে জানতে পারলাম আমাদের মতো আরও অনেক শরণার্থী পরিবারও টিকিটের লম্বা লাইনে অপেক্ষা করে আছে।

এক দিন সকালে আমি হাঁটতে হাঁটতে আমাদের গেস্টহাউসের পেছনে চলে গেলাম, সঙ্গে আমার ছোট ভাই। গিয়ে দেখি দুজন মানুষ পা দিয়ে নানরুটির মণ্ড বানাচ্ছে; যেটা কিছুক্ষণ পর নাশতায় আমাদের দেওয়া হবে। এই গল্প শোনার পর মা–বাবা আমাদের জন্য রুটি আর ডিম নিয়ে এলেন। এর পরের সাত দিন নাশতায় ডাবল ডিমের পোচ খেতে খেতে মনে হলো, জীবনটা মন্দ নয়!

এর মাঝে একদিন সবাই মিলে ঠিক করল শহর ঘুরতে বের হবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। ট্যাক্সি জোগাড় করে সবাই বের হয় পড়লাম। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর একটা বাজারের সামনে ট্যাক্সি থামল। ঘুরতে ঘুরতে এক দোকানে আমার মা দলের আরও কয়েক মহিলাকে নিয়ে আফগান দোকানির সঙ্গে উর্দু-বাংলা মিলিয়ে দরদাম শুরু করে দিলেন।

হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে দোকানি খাঁটি নোয়াখালীতে বলে উঠল, ‘আন্নরা কোনাই থন আইছেন, আর কোনাই যাইবেন?’ আমার মা জীবনে মনে হয় এত অবাক হননি। এমনিতেই আমার মা সারাজীবন নোয়াখালীর ব্যাপারে একটু দুর্বল; যেহেতু তিনি এবং তাঁর স্বামী দুজনেই সেই ‘স্টেট’ থেকে এসেছেন! দোকানির মুখে নোয়াখাইল্লা ভাষা শুনে সেই দুর্বলতা সমীহতে পরিণত হলো। যখন আমরা গেস্টহাউসে ফিরে এলাম তখন আমার মা আনন্দে ঝলমল করছেন। আমি ঠিক নিশ্চিত না আনন্দের কারণ কী তার নোয়াখালী দেশি ভাইয়ের সঙ্গে মোলাকাত নাকি কেনাকাটা করার জন্য বাবার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত টাকাপয়সার বরাদ্দ!

পশ্চিম থেকে পূর্বে

জীবনে প্রথমবার আমি প্লেনে চড়ি ঢাকা থেকে দিনাজপুরের পথে দাদাবাড়ি যাওয়ার সময়। দিনাজপুরে সেবার আমরা প্রায় ছয় মাস ছিলাম; সময়টা ছিল ’৬৯-’৭০–এর দিকে। বাবা সেই সময় কোনো একটা ট্রেনিংয়ে দীর্ঘদিন টোকিওতে ছিলেন। সেই সময় প্লেনে চড়াটা ছিল বিশাল একটা ব্যাপার, কিন্তু কোনো এক আশ্চর্য কারণে আমি আমার জীবনে প্রথম প্লেন যাত্রাটা বেমালুম ভুলে গিয়েছি।

কিন্তু কাবুল থেকে দিল্লির যাত্রাটা ছিল ভিন্ন রকম, ভিন্ন সময় আর ভিন্ন পরিস্থিতির! চোখ-মুখ ফোটার পর সেটা ছিল আমার জীবনের সত্যিকার অর্থে প্রথম প্লেনযাত্রা। প্লেনে ওঠার পর চার ভাইবোনের ভেতর রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল; সবার লক্ষ্য জানালার পাশের সিটটা দখল করা। আগে যেহেতু প্লেনে আমার বমি করার ইতিহাস আছে, তাই আমার কপালের শিকা ছিঁড়ল না, আমি পেলাম আইলের সিট।
পরবর্তী বছরগুলোর কথা যখন চিন্তা করি, তখন একটা ব্যাপার খুব অবাক লাগে। ’৮০-এর দশকের মাঝামাঝি আমি যখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেছি, তখন আমার ইনস্ট্রাক্টর অনেক রকম কসরত করেও আমার পেট থেকে বমি তো দূরের কথা, কিছুই বের করতে পারেননি।

default-image

কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমাদের প্লেনটা আকাশে ওড়ার একটু পরেই হাস্যোজ্জ্বল কেবিন ক্রু বিভিন্ন রকম টফি নিয়ে সবাইকে বিতরণ শুরু করল। আমাকে আর পায় কে! যখন আমার পালা এল, আমি দুই হাতে ভরে যতগুলো টফি নেওয়া যায়, সব পানির মতো আঁজলা করে তুলে নিলাম; কিন্তু এর পরেই মাথায় একটা কড়া চাপড় খেয়ে তাকিয়ে দেখি বাবার অগ্নিজ্জ্বল দৃষ্টি। কড়াভাবে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো যে বড়জোর দুটো আমার জন্য বরাদ্দ।

দুই ঘণ্টা পর আমাদের প্লেন পালাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা এখন ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে পরিচিত, সেখানে নামল। আমাদের চার ভাইবোনের ভেতর আবার হুড়োহুড়ি পড়ে গেল কে কার আগে নামবে। যে মুহূর্তে বিমানের দরজায় দাঁড়ালাম, মনে হলো একটা আগুনের হলকা এসে আমার মুখে এসে ধাক্কা দিল।

পশ্চিমের আফগানিস্তান-পাকিস্তানের উঁচু মালভূমি থেকে শীতল বাতাস যখন উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় ভূমিতে নেমে আসে, তখন মাত্র এক হাজার কিলোমিটারের ব্যবধানে এর তাপমাত্রা ৮ থেকে ৩০ ডিগ্রিতে উঠে যায়। পরে ’৭০–এর দশকের শেষ দিকে এবং আবার ২০১৫-১৬ সালের দিকে দিল্লিতে থাকার সময় এ আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খেতে আমাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে!

নয়াদিল্লির গেস্টহাউসে যাওয়ার জন্য আমরা সবাই ৩৫ সিটের মিনিবাসে উঠে পড়লাম। যাওয়ার পথে এক জায়গায় সবার নজর দেখি বাইরের দিকে; সবাই খুব উত্তেজিত। আমার মা বিফলভাবে অনেক চেষ্টা করলেন বাইরের সেই জিনিসটা আমাকে দেখাতে। নিজেকে একটু বোকা বোকা লাগছিল; সবাই দেখতে পারছে কিন্তু আমি পারছি না কেন!

পরে জেনেছিলাম ‘জিনিসটা’ ছিল বিখ্যাত কুতুব মিনার। ৭৩ মিটার উচ্চতায় কুতুব মিনার যেন সবাইকে ডেকে তালগাছের মতো বলার চেষ্টা করছে, ‘আমি এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব মিনার ছাড়িয়ে…’। ১১৯৯ সালে তুর্কি বংশোদ্ভূত স্লাভ বংশের কুতুব-উদ-দিন আইবেক এই মিনার তৈরি শুরু করেছিলেন আজান দেওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রথমে তিনি কাজ শুরু করলেও পরে এটাকে আরও উঁচু করেছিলেন তাঁর উত্তরাধিকার এবং জামাতা শামস-উদ-দিন ইলতুতমিশ (১২১১-৩৬)। এই মিনার বানানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের আগমনের সগর্ব ঘোষণা দেওয়া। শেষ হিন্দু শাসকের পরাজয়ের পর তখন ভারতে সবে মুসলিম শাসন শুরু হয়েছে। প্রায় ৮০০ বছর ধরে কুতুব মিনার সারা ভারতের ভেতর সবচেয়ে উঁচু মিনার হিসেবে যেন সেই সময়ের কথা সবাইকে মনে করিয়ে দেয়।

গেস্টহাউসে পৌঁছানোর পর আমি প্রথম যে কাজটা করলাম, সেটা হলো বাথরুমে গিয়ে পানির কল খুলে দিয়ে তার নিচে অনেকক্ষণ বসে থাকা। বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালে গ্রামে-গঞ্জের পুকুরে যেসব বাচ্চা দাপাদাপি করে বেড়ায়, তারাই শুধু সত্যিকারভাবে বলতে পারবে আমার সেই সময়ের প্রকৃত অনুভূতি।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন