বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ বইটির শুরুতে তৎকালীন গেরিলানেতা সন্তু লারমার সঙ্গে বিপ্লব রহমানের হাইড আউটে সাক্ষাৎ করার নিবন্ধটি নিঃসন্দেহে যে কাউকে রোমাঞ্চিত করবে। সাক্ষাতে যাওয়ার যাত্রাপথের প্রতিটি বিবরণে যেন রোমাঞ্চকর মুহূর্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল! সত্যি বলতে, আড়াই দশক আগে পাহাড়ের পরিস্থিতি ও পরিবেশটা প্রকৃত অর্থে সে রকমই ছিল। সামনে এক কদম ফেলার আগে তিন সেকেন্ড ভেবে নিতে হতো সামনে-পেছনে কেউ নজর রাখছে কি না। কিন্তু ‘বাঙাল’ বিপ্লব সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। তাই তো নিজের সম্পর্কে বিপ্লব রহমান কৌতুকের ছলে বলেছেন, ‘বাঙাল বিপ্লব লঙ্ঘিল গিরি...!’

বিপ্লব রহমানই প্রথম সাংবাদিক, যিনি তৎকালীন গেরিলানেতা এবং পাহাড়ে আন্দোলনরত মানুষের মনের কথাগুলো প্রথম প্রকাশ্যে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বিগত দীর্ঘ আড়াই দশকে বিপ্লব বহুবার পাহাড়ে গিয়েছেন, বহু ঘটনার পেছনের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় পত্রিকার পাতায় তুলে এনেছেন। পাহাড়ে অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বহু ঘটনার দিন-তারিখ আমাদের মন থেকেও মুছে যাচ্ছে। তবে ‘পাহাড়ের বিপন্ন জনপদ’ বইটি আপনাকে আবার সেসব লোমহর্ষক ঘটনায় নিমেষেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। বিপ্লব রহমান তাঁর বইয়ের প্রতিটি চ্যাপ্টারে আলাদা আলাদা ঘটনার বিবরণ, দিনক্ষণ, নেপথ্য কাহিনি এমনভাবে ঝরঝরে ভাষায় লিখেছেন, যেগুলো যে কাউকে ওই ঘটনা সম্পর্কে বুঝতে মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা তৈরি করবে না। যেমন, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রিত পাহাড়ি শরণার্থীশিবির পরিদর্শনে গিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, তা তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায়: আশ্রয়শিবিরটি ঘুরে দেখার সময় একঝাঁক চাকমা শিশু ঘিরে ধরে আমাকে। এই সব শিশুর জন্ম আশ্রয়শিবিরেই। তারা শুধু বড়দের কাছে শুনেছে ওপারে বাংলাদেশে একসময় তাদের আনন্দময় জীবনের স্বপ্নকথা। আর শুনেছে দেশত্যাগের একটি অন্যতম কারণ গণহত্যা, সেটেলারদের জমিজমা দখল, তাদের সশস্ত্র হামলার হিংসার রাজনীতির টুকরো কথা। শিশুর দল ঘিরে ধরে বাংলাদেশ থেকে আসা ‘বাঙাল’কে। চিৎকার করতে থাকে, সেটেলার! সেটেলার!

‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ বইটিতে ১৯৯২ সালের লোগাং গণহত্যা থেকে শুরু করে নানিয়াচর, বাঘাইছড়ি, রাঙামাটির সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা; কল্পনা চাকমাকে অপহরণ ঘটনা; সীতাকুণ্ড পাহাড়ের শ্রমদাস ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কথা; পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত কথা ও পার্বত্য শান্তি চুক্তির কথা উঠে এসেছে। এ ছাড়া বিপ্লব রহমান সরকারি বেশ কিছু দলিল ও নির্দেশনা সংগ্রহের কথা তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, যেগুলো পাহাড়ে বৈষম্যের রাজনীতিকে আরও স্পষ্ট করেছে। বলা যায়, পাহাড়ে আরোপিত দ্বৈতনীতিগুলো সেসব দলিলের ওপর ভর করে এখনো টিকে আছে। একই সঙ্গে বাঙালি জাত্যভিমানের মুখচ্ছবিগুলোও বিপ্লব তাঁর লেখার মাধ্যমে তুলে এনেছেন। তাই ‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ বইটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত ঘটনাবলির দলিল বলা যায়, যেখানে প্রতিটি ঘটনার দিন, তারিখ, সাল ও ঘটনার বিবরণ একজন পাঠক সহজে পাবেন।

এখানে আরেকটি কথা না বললে পুস্তক সমালোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তা হলো লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে কোনো কোনো পক্ষকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, তাতে পাঠকের মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে তিনি পুরোপুরি পক্ষপাতহীন নন। তাঁর লেখার সুরে বিশেষ কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা দেখা যায়। কোনো বিশেষ এলাকার ঘটনাবলির ওপর বিশ্লেষণ করতে গেলে ওই এলাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যালোচনা করা হলে বইটি আরও সর্বজনগ্রাহ্য হতো নিঃসন্দেহে।

‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ বইটি সংহতি প্রকাশন থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি মূলত পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত একটি সংস্করণ। ২০০৯ সালে ‘রিপোর্টারের ডায়রি: পাহাড়ের পথে পথে’ নামে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। পরে লেখক নতুন কিছু সংযোজনীর মাধ্যমে বইটির পরিমার্জন করে সংহতি প্রকাশন থেকে পুনঃ মুদ্রণ করেন। বইটি উৎসর্গ করা হয় জুম্ম (পাহাড়ি) জাতির অগ্রদূত এম এন লারমার প্রতি।
সবশেষে বলব, পাহাড়ের অনুভূতিগুলো জানতে, বুঝতে ও অনুধাবন করতে হলে ‘পাহাড়ের বিপন্ন জনপদ’ বইটি যেকোনো পাঠকের একবার হলেও পড়া উচিত।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন