পুনর্নিরীক্ষণের আলোকে

বছর ঘুরে আবার এল পঁচিশে বৈশাখ—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী। তবে এই ক্ষণে তাঁকে চিনে নেওয়া যাক নতুন করে...

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ ১২৬৮—২২ শ্রাবণ ১৩৪৮), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ ১২৬৮—২২ শ্রাবণ ১৩৪৮), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

১৩৩৪ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ ১৯২৬-২৭ সালে, তাঁর চিত্ররচনের প্রাবল্যের মধ্যে, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার আপনার মধ্যে এই নানা বিরুদ্ধতার বিষম দৌরাত্ম্য আছে বলেই আমার ভিতরে মুক্তির জন্যে এমন নিরন্তর এবং এমন প্রবল কান্না’। (‘পথে ও পথের প্রান্তে’, ১ বৈশাখ, ১৩৩৪)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাঙ্কন ব্যাপারটি যে তাঁর স্বভাব-সৃজনের অন্যান্য দিকগুলোর সঙ্গে মেলে না সেটি আমরা দেখতেই পাই। এটি যে তাঁর ভেতরের কোনো বিরুদ্ধতার ‘বিষম দৌরাত্ম্য’ থেকেই উদ্ভূত সেটিও রবীন্দ্রভক্ত আম-দর্শক অস্বস্তি সত্ত্বেও মেনে নিয়েছেন। ভারতশিল্পের পরিক্রমায় রবীন্দ্রনাথকে গুরুত্বপূর্ণ চিত্রশিল্পী হিসেবে মানতে এখন আর তেমন বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয় না। এ উপমহাদেশে, বহির্বিশ্বেও, অন্তত শিল্পী-শিল্পবোদ্ধা মহল এখন তাঁকে আধুনিক ভারতশিল্পের পথিকৃৎ অথবা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। তবে সাহিত্য-সংগীত-নাটক ইত্যাকার সৃষ্টিকর্মে তাঁর সৃজন-মহিমা যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতায় স্বীকৃত রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মের বেলায় তেমনটি এখনো ঘটেনি, এটি অস্বাভাবিকও নয়। নানা মাত্রার কাজ হলেও চিত্ররচনে তাঁর একেবারে ভিন্নতর চেহারার হদিস পুরোপুরি মিলেছে—এমন কথা বলার সময় বোধ হয় আসেনি, সে সুযোগ এখনো রয়েছে বলেই মনে হয়।
এ সুযোগটি বিশেষ করে তৈরি হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর দুই হাজারের অধিক চিত্রকর্মের প্রতিলিপি-সংবলিত চার খণ্ডে রবীন্দ্র চিত্রাবলী গ্রন্থটি প্রকাশের কারণে। রবীন্দ্রনাথের আঁকা মোট চিত্রের সংখ্যা সোয়া দুই হাজারের মতো বলে ধারণা করা হয়ে থাকে, তার মধ্যে বিভিন্নভাবে মুদ্রিত কয়েক শ মাত্র ছবি এত দিন সাধারণ দর্শকের দেখার সুযোগ ছিল। এ গ্রন্থটি তাঁর প্রায় সব চিত্রকর্ম অতি সুমুদ্রিত পারিপাট্যে দেখার বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছে আর এর মাধ্যমে রবীন্দ্র চিত্রকলা নিয়ে নতুন ও নানামুখী ভাবনার ও ব্যাখ্যার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বইটির মুদ্রণে ও উপস্থাপনে যে উচ্চ মানের দক্ষতার পরিচয় রয়েছে তা প্রশংসাযোগ্য। এ প্রতিলিপিগুলোতেই প্রথম স্পষ্ট অনুমান করা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বর্ণপ্রয়োগ ও স্তর রচনার প্রক্রিয়া।
চার খণ্ডের রবীন্দ্র চিত্রাবলীতে চিত্রের অনুলিপি রয়েছে ২ হাজার ৬৩টি। দু-চারটি বাদে এর সব ছবি আঁকা হয়েছে ১৯২৪ থেকে মৃত্যুর বছর ১৯৪১-এর মধ্যে, অর্থাৎ মাত্র ১৮ বছরে, তা-ও জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে। এর অর্থ দাঁড়ায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামের অবিরল সৃজনশীল একজন মানুষ চিত্ররচনের মতো ভিন্নধর্মী মাধ্যমে যখন কাজ করেন, তখনো সৃষ্টির প্রবল স্রোত একই মত্ততায় উদ্গিরণ ঘটাতে থাকে। এর লক্ষণ প্রতিলিপিগুলো দেখতে দেখতে প্রতিভাত হয়ে ওঠে, যাকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অতুলনীয় ভাষাভঙ্গিতে বলেছেন ‘ভল্কানিক ইরাপশন’। আমরা লক্ষ করি, কবিতার মতোই, একই দিনে সৃষ্ট তাঁর ছবির সংখ্যা কখনো কখনো ষোলো-সতেরো ছাড়িয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভারের মাত্র দু শ-তিন শ প্রতিলিপি দেখেও—তাঁর চিত্রকলা বিষয়ে লেখালিখির পরিমাণ নেহাত কম নয়। এর মধ্যে দেশি-বিদেশি শিল্পী ও সমালোচকেরা রয়েছেন। প্রায় সব চিত্রের উন্নত মানের প্রতিলিপি দেখার পর রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে একেবারে আনকোরা কোনো ভাষ্য নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেটি হয়তো এখনই বলা সম্ভব নয়।
আমরা জানি অসুন্দর, অবাস্তব, কুৎসিত, আদিম, জান্তব চেতনার জগৎ—যাকে রবীন্দ্রনাথ লেখনীতে ধারণ করতে পারেননি, তারা রূপ পেয়েছে তাঁর ছবিতে। তাঁর দুই হাজারাধিক শিল্পকর্মে এর প্রমাণ লেখা আছে। রবীন্দ্রনাথের একটি প্রবণতাকেও বোধ হয় এ চিত্রমালা তুলে ধরে, বর্জনে তাঁর অনীহা। তাঁর কবিতায় আমরা যেমন দেখি, বিশেষ করে একই দিনে লেখা একই ভাবের অনেকগুলো কবিতা থেকে শ্রেয়তর দু-একটি চয়ন করলেই যেখানে চলে, সেখানে তিনি সবগুলোকেই স্থান দিয়েছেন, গানেও তেমন উদাহরণ আছে। ছবিতেও পরপর আঁকা একই ধরনের চিত্র সবই রক্ষিত হয়েছে, বাছাইয়ের প্রশ্ন ওঠেনি। ফলে তাঁর শিল্পকর্ম বিষয়ে আলোচনায় নির্বাচনের একটি প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তাঁর চিত্রকর্মের বিশাল সম্ভার থেকে শ দুই-তিনেক ছবিকে সম্ভবত উল্লেখযোগ্য বিবেচনা করে আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া চলে।
দেশের মানুষের, বিশেষ করে বাঙালির, শিল্প-উপভোগের যোগ্যতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একেবারেই আস্থাশীল ছিলেন না। মনে হয় এ ব্যাপারে তিনি একটু অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর ছবি পশ্চিমের জিম্মায় রেখে আসবেন, দেশের যোগ্যতাহীন দর্শকের সামনে ফেরাবেন না—এমন কথাও বলেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য তীব্র ও শাণিত, যদিও আমরা দেখি বিরূপ সমালোচনা থাকলেও দেশের বিদ্বৎসমাজ তাঁর চিত্রকর্মকে স্বাগতই জানিয়েছে, অনেক সময় না বুঝতে পারলেও।
অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, যামিনী রায়ের মতো প্রথম সারির শিল্পীরা ছাড়াও অর্দ্ধেন্দু শেখর গাঙ্গুলি বা বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের মতো বিদগ্ধ শিল্পী-সমালোচকেরাও তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর চিত্রকর্ম নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেছেন।

রবীন্দ্র চিত্রাবলীর একটি খণ্ডের প্রচ্ছদ
রবীন্দ্র চিত্রাবলীর একটি খণ্ডের প্রচ্ছদ

পশ্চিমে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে বলেই আমরা জানি, তবে এর মাত্রাটি কেমন সেটি সম্যক বোঝা যায় না। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পশ্চিমে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এরপরে আসে একটি ভাটার টান, বর্তমানে আবার তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে শোনা যায়। ১৯৩০ সালে পারির গ্যালারি পিগেল্-এ তাঁর প্রথম প্রদর্শনীতে বিশ্বশিল্পের এ পিঠস্থানের বড় মাপের শিল্পীরা কেউ এসেছিলেন কি না, আমরা জানতে পারি না। রবীন্দ্র চিত্রাবলীর সম্পাদক অধ্যাপক শিব কুমার তাঁর ভূমিকায় এ সম্পর্কে আলোকপাত করেননি। ভিভান সুন্দরমের বয়ানে বরং আমরা জানতে পাই আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পের আরেক পথিকৃৎ শিল্পী অমৃতা শের-গিল ঘটনাচক্রে এ প্রদর্শনী দেখেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম তাঁকে আলোড়িত করেছিল। পরে ভারতবর্ষে এসেও তিনি রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন।
সমসাময়িক কালেও রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম নিয়ে ইতি ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত আছে। ১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে লন্ডনের বারবিকান গ্যালারিতে তাঁর চিত্রকর্মের একটি বড়সড় প্রদর্শনী হয়। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায় বিষয়ে কাজ করা অ্যান্ড্রু রবিনসেনর প্রতিক্রিয়া: ‘আমি অনুভব করি যে সাহিত্য ও সংগীতের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বিবিধমুখী অবদানের চেয়েও যা আমার আবেগ ও কল্পনাকে অধিক স্পর্শ করে সেটি হচ্ছে তাঁর চিত্রাবলী। তাঁর সেরা কাজগুলোতে এমন একটি অভিনবত্ব রয়েছে যা সর্বদাই আমাকে বিস্মিত করতে পারে।...তাঁর চিত্রকলা এটি প্রমাণ করতে সক্ষম, অবশ্য প্রমাণ যদি এখনো প্রয়োজন মনে করা হয়, যে ভারতীয় সভ্যতা রবীন্দ্রনাথকে সৃষ্টি করেছে সে বিষয়ে যাঁদের তেমন আগ্রহ নেই তাঁর চিত্রকলা তাঁদের সঙ্গেও ভাব বিনিময়ে সক্ষম।’ একই প্রদর্শনী দেখে বয়সে তরুণতর শিল্পসমালোচক ব্রায়ান সেওয়েলের মন্তব্য: ‘এগুলো সম্পর্কে প্রযোজ্য সঠিক শব্দ হচ্ছে “ভুল”। এরা একদম বিশৃঙ্খল। বোধ হয় আঁকিবুঁকি, আঁচড় বা হিজিবিজি লেখা কখনো এত কম পরিণতি অর্জনে ব্যবহৃত হয়নি। তাঁর পরিসর-জ্ঞান শিশুর মাতৃস্তনের অবস্থান-জ্ঞানের বেশি কিছু নয়; তাঁর বর্ণক্রমের অভিনবত্ব প্রাথমিক ধারণার অভাব-প্রসূত; এবং (তথাকথিত) “সংবেদনশীল বুনট” সমালোচকের অতিকথন মাত্র, কারণ এগুলো এমন একটি জগাখিচুড়ি যে আমি তো দেখতেই পাই না কোনটা কী।’ অবশ্য বিরূপ সমালোচনার একটি ধারা অব্যাহত থাকলেও বিগত ৮০ বছরে ২৫টি একক প্রদর্শনী প্রমাণ করে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম বিষয়ে একালের দর্শকের আগ্রহেও ভাটা পড়েনি।

জীবনের প্রথম পর্যায়ে স্কেচবুকে পেনসিলে প্রতিকৃতিটি এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ। এখানেই লেখা ছিল ‘সর্ব্ব প্রথমোদ্যম’
জীবনের প্রথম পর্যায়ে স্কেচবুকে পেনসিলে প্রতিকৃতিটি এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ। এখানেই লেখা ছিল ‘সর্ব্ব প্রথমোদ্যম’

রবীন্দ্র চিত্রমালার এ বিশাল ভোজ শিল্পরসিক দর্শকের জন্য বিস্ময়, আনন্দ ও ভাবনার ব্যাপক অবকাশ করে দিয়েছে। পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি থেকে তাঁর মধ্যপর্ব পর্যন্ত কাজে মোটামুটি সাদা-কালোয় ছন্দ নির্মাণে ও পরিসর বিতরণে মুনশিয়ানা আর কল্পনার অবিশ্বাস্য বিস্তার ছড়িয়ে আছে। পরবর্তী পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে আঁকা শুরু করার পর কল্পনা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে মানবদেহ, মুখচ্ছবি আর নিসর্গের চিত্রায়ণকে। তবে মানবদেহ আর মুখের রূপায়ণের বিপুল উদাহরণ চমৎকৃত না করে পারে না। মানবদেহের বৈচিত্র্যময় ভঙ্গিমাগুলোর ৪৬০টি প্রতিলিপি মনে করায় নৃত্যভঙ্গিমার প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনিঃশেষ আগ্রহের কথা, শুধু ভারতের নয়, জাপান-বালি-জাভা বা শ্রীলঙ্কায়ও তিনি অভিনিবেশ নিয়ে এগুলো দেখেছেন। এক বা একাধিক অবয়বের আকৃতি চিত্রপটে সন্নিবেশিত হয়েছে আলো আর কালোর আশ্চর্য সব ছন্দোময় বিতরণে, কখনো নৃত্যময় ঘূর্ণিতে।
৫০০টি মুখচ্ছবি বা প্রতিকৃতিতে মাঝেমধ্যেই জ্যামিতিক গড়ন ও মুখোশের আভাস দেখা দেয়, সেখানেও পশ্চিমের সাম্প্রতিক চিত্রধারা আর বিভিন্ন আদিম জনগোষ্ঠীর মুখোশ-শিল্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ধরা পড়ে।
যদিও এর মধ্যে মুড বা ভাব-মেজাজের নানান ঢঙের কমতি নেই, তবু এক গভীর বিষাদ সবটাতে লেপ্টে থাকে। এত অধিকসংখ্যক ছবিতে তাঁর নিজস্ব এই মুডকে ধরে রাখা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা ও রং-রেখার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সম্ভব নয়। নিসর্গের ২২৯টি রচনায় তাঁর নিজস্ব প্রকৃতি জনহীন গোধূলির অনির্বচনীয় অনুভূতির প্রকাশকে ধরে রাখে। ভূদৃশ্যের এক নির্দিষ্ট রূপকল্পে ভাব প্রকাশের এমন উদাহরণ আমাদের শিল্পধারায় অভাবনীয়। এসবেরই কিছু উদাহরণ আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, তবে দ্রুতচালে শেষ করা বিপুলসংখ্যক ছবিতে একটি বিশেষ চরিত্র ও মুড বজায় রাখার এ কৃতিত্ব তো তাঁকে দিতেই হবে। আর দুই হাজারের অধিক চিত্রকর্মজুড়ে এক মেলাঙ্কলিক ভাবের আবরণ সুস্পষ্ট স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত করে এ শিল্পীকে।
রবীন্দ্র চিত্রমালার এ উন্মোচন কিছু স্বল্পালোচিত দিক নিয়ে ভাবার অবকাশ করে দিয়েছে। একটি, তাঁর কিছু ছবিতে নগ্ন নারী ও পুরুষের প্রায় খোলামেলা রূপায়ণ—যাকে কেউ কেউ শিল্পীর অবদমিত যৌনবোধের প্রতিফলন বলতে চেয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভুলে যান যে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় একেবারে তরুণ বয়স থেকেই নারীর শরীর ও অঙ্গ নিয়ে বেশ খোলামেলা উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এটি প্রায় স্তুতিতে পরিণত হয়েছে ইউরোপ ভ্রমণকালে জাদুঘরে দেখা বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা নগ্নিকা দেখার পর ইউরোপ-যাত্রীর ডায়ারীতে। তবে নগ্ন পুরুষ শরীর বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রশংসাসূচক মন্তব্য দেখা যায় ১৯১৬ সালে জাপান যাত্রী লেখার একটি বর্ণনায় যেমনটি তাঁর লেখায় আর কখনো দেখা যায়নি। ডব্লিউ জি আর্চার, শিবনারায়ণ রায়, সুশোভন অধিকারী প্রমুখ এ বিষয়ে লিখেছেন। তবে বেশির ভাগ নারী-পুরুষের ছবিতেই যৌনাঙ্গ ঢাকা বা অস্পষ্টতায় আবৃত হলেও রবীন্দ্রনাথের একটি নগ্ন পুরুষমূর্তির ছবিতে পুরুষাঙ্গ স্পষ্টভাবে প্রতিভাত, এর কোনো ব্যাখ্যা হয়তো এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়।

আবুল মনসুরের অাঁকা চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ
আবুল মনসুরের অাঁকা চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ

মনে করা হয়েছিল দুই হাজারাধিক চিত্রকর্মে রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত আরও আত্মপ্রতিকৃতির খোঁজ মিলবে। দেখা যাচ্ছে সে রকমটি ঘটেনি, সংকলনে মুদ্রিত আত্মপ্রতিকৃতিগুলো পূর্বপরিচিত বলেই মনে হয়েছে। শঙ্খ ঘোষ ও সমীর ঘোষের লেখায় অন্য আরও আত্মপ্রতিকৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এ সংকলনে দেখা গেল না। শিব কুমার আত্মপ্রতিকৃতি বিষয়ে খুব নতুন কিছু যোগ করেননি। অন্তরের মুক্তির জন্য যে নিরন্তর কান্নার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, নিজের আত্মপ্রতিকৃতিতে সংশয়াকুল মুখচ্ছবিতে তার কোনো ছায়াপাত কি চোখে পড়ে? পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি শুরু করার অনেক আগে ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের চিত্রবিদ্যা শিক্ষার প্রয়াস ধরা আছে একটি স্কেচবুকে। এটির একটি প্রতিলিপিতে পেনসিলে হুবহু প্রতিকৃতি অঙ্কনের একটি প্রয়াস দেখা যায়, যাতে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে ‘সর্ব্ব প্রথমোদ্যম’ কথাটি লেখা রয়েছে।
এ প্রয়াসের সঙ্গে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী চিত্রকর হিসেবে আবির্ভাবের প্রত্যক্ষ কোনো যোগ নেই, যে কারণে অধ্যাপক শিব কুমার এগুলোকে ‘ফল্স স্টার্ট’ আখ্যা দিয়ে বর্তমান সংকলনে স্থান দেননি। তবে আমরা লক্ষ করি মোটামুটি তরুণ বয়স থেকেই আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার স্বরূপ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ-উদ্বেগ ও সম্পৃক্ততা ছিল, সে বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতায় এ চিত্রগুলো হয়তো কখনো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে।
কেউ কেউ এমনও ভাবছেন, রবীন্দ্রনাথের চিত্রমালা তাঁর সৃজিত সাহিত্যের চেয়ে অধিক আধুনিক মনের পরিচয় বহন করছে। একালের মানুষের মানসিক জগতের আর্তি-সংক্ষোভ-বিশ্লিষ্টতা, অবচেতন মানসের দমিত আকাঙ্ক্ষা—এ সবের বিপুল বিস্ফোরণ তাঁর চিত্রের অস্থির জগতে প্রকাশমান হয়েছে। তাঁর ‘ভিতরে মুক্তির জন্যে...প্রবল কান্না’ এখানে কি বাঁধন ছিন্ন করল অবশেষে, রবীন্দ্র-সাহিত্য যে রোমান্টিক পরিশীলনের অবগুণ্ঠন ছিন্ন করতে পারেনি? তাঁর চিত্রকৃতির প্রায় সব ফসল এখন আগ্রহীজনের করায়ত্ত। সমগ্র চিত্রকর্মের পর্যালোচনায় আধুনিক চিত্তের সৃজন-উদ্ভাসনে রবীন্দ্র চিত্রকলা কি একদিন তাঁর বিপুল সাহিত্য-সম্ভারের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে? সে প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত থাকল।