প্রাচীন মিশরসংক্রান্ত কৌতুহল মেটাবে যে বই
প্রাচীন সভ্যতাগুলোর গড়ে ওঠার পেছনে নদ-নদীর যে অনেক বড় একটা ভূমিকা আছে, সে কথা মোটামুটি সবার জানা। সেকালে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পানির যোগান থেকে শুরু করে কৃষি, অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস ছিল নদী। তাই গঙ্গা, সিন্ধু, টাইগ্রিস ইউফ্রেটিস কিংবা নীল নদের মতো বড় বড় নদ-নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো হয়ে ওঠে মানব বসতির কেন্দ্রস্থল।
এভাবেই খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছরেরও আগে নীল নদের দুই পাড়ে গড়ে উঠতে শুরু করে মানুষের বসতি। কালক্রমে সেটিই হয়ে ওঠে প্রাচীন পৃথিবীর প্রধান এক সভ্যতা। প্রাচীন মিশরের সমৃদ্ধির প্রাণকেন্দ্র ছিল নীল নদ। এর তীরবর্তী মানুষেরা তাদের দেশকে বলত কেমেট। গ্রিকরা এ দেশকে ডাকতেন এইজিপ্টাস, যা পরে ইজিপ্ট নামে পরিচিত হয়। আরবদের কাছে এ দেশের পরিচয় মিশর। নীল নদের উপত্যকায় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষে একটা রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা মেনেস।
পরবর্তী প্রায় তিন হাজার বছর আরও ৩২টি রাজবংশ এ সভ্যতাকে শাসন করে এসেছে। তাদের মধ্যে ফারাও রাজবংশ আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। সেজন্য অবশ্য সেমিটিক ধর্মগুলোর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। সেমিটিক তিনটি ধর্মেই মিশরের কয়েকজন সম্রাটের সঙ্গে কয়েকজন নবীর কীর্তিকাহিনির বর্ণনা রয়েছে।
মিশরীয়দের সমৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একসময় বাড়তে থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। দীর্ঘ তিন হাজার বছরে জ্ঞান-বিজ্ঞানে শীর্ষে উঠে গিয়েছিল মিশরীয় সভ্যতা। গণিত, জ্যামিতি, শারীরবিদ্যা কিংবা আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার পূর্বসূরী জ্যোতিষশাস্ত্রের অনেকাংশের হাতেখড়িও হয়েছিল ওই মিশরেই। এভাবে ওই এলাকায় গড়ে ওঠা সভ্যতায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতটাই এগিয়ে গিয়েছিল যে সে যুগেই তারা পিরামিডের মতো সুউচ্চ ইমারত বানাতে পেরেছিল। সেসব দেখে আধুনিক যুগেও আমাদের চোখ কপালে উঠে যায়। তাই নীল নদ, মিশর, ফারাও, পিরামিড, মমি, হারায়োগ্লিফিক—এখনো ঘুরেফিরে চলে আসে আমাদের ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্ম বা পুরাণ সংক্রান্ত আলোচনায়। তীব্র আগ্রহ জাগায় এ সভ্যতার নানা বিষয়ে।
মিশরীয় মিথলজি: আদি থেকে অন্তএস এম নিয়াজ মাওলাপ্রকাশকাল: মার্চ ২০২১, প্রকাশক: জাগৃতি প্রকাশনী, প্রচ্ছদ: চারু শিল্পী, পৃষ্ঠা: ৯৫০দাম: ১৩৩৫ টাকা
সেসব আগ্রহ মেটাতে চলতি বছর প্রকাশিত হয়েছে ‘মিশরীয় মিথলজি: আদি থেকে অন্ত’।
মোট পাঁচটি পর্বে বিভক্ত এই ঢাউস বইটিতে মূল আলোচ্য বিষয় মিশরীয় পূরাণ। অন্যান্য অনেক সভ্যতার মতোই মিশরের সংস্কৃতিতে পুরাণ ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। মিশরীয়দের সৃষ্টিতত্ত্ব, ধর্ম, বিভিন্ন দেবতা, মন্দির, মমি ও পিরামিড বানানোর পেছনে ছিল তাদের প্রচলিত পৌরাণিক ধর্মবিশ্বাস। তাই পুরাণের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনা ধীরে ধীরে মিশরের চিত্রকলা, স্থাপত্য এবং সাহিত্যের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। এমনকি তাদের রাজা ও পুরোহিতদের অনেক আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় ওই পুরাণে। তাই প্রাচীন মিশরকে জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম মিশরীয় পুরাণ।
কিন্তু সবার আগ্রহের কেন্দ্রে থাকলেও দীর্ঘদিন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা আধুনিক যুগের কাছে রহস্যের চাদরে মোড়া ছিল। তাদের সম্পর্কে জানার কোনো উপায় ছিল না। তার কারণ মিশরীদের বিভিন্ন গ্রন্থ বা দেয়ালচিত্র লেখা হয়েছিল দুর্বোধ্য চিত্রলিপি হায়ারাগ্লিফিকে। একসময় নিজেদের প্রাচীন আদি ভাষা ভুলে অন্য ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে মিশরবাসী। তাতে প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিকে লেখা গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর পাঠোদ্ধার অসম্ভব হয়ে ওঠে। ভাষার এই বাধার কারণে দীর্ঘ কয়েক হাজার বছরের সমৃদ্ধ এক সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক দিন চাপা পড়েছিল গভীর রহস্যের অন্তরালে। অবশ্য দীর্ঘ চেষ্টায় অবশেষে তাদের ভাষার অর্থ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এরপর উনবিংশ শতকে শুরু হয়েছে প্রাচীন মিশরীয়দের নিয়ে গবেষণা—মিশরতত্ত্ব বা ইজিপ্টোলজি। এর মাধ্যমে মিশরীয়দের আকর্ষণীয় আর অবিশ্বাস্য সব ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানা গেছে। এসব প্রসঙ্গ চমৎকার বর্ণনায় উঠে এসেছে ‘মিশরীয় মিথলজি: আদি থেকে অন্ত’–তে।
মিশরীয় পুরাণের কথা আলোচনা করতে গিয়ে ঘুরে ফিরেই এসেছে সেখানকার কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস আর গল্পগাথা। রয়েছে তুতানখামুন, রামিসেস, আমেনহোটেপের মতো মিশরীয় উল্লেখযোগ্য রাজা ও রাজবংশের কথা, তাদের গ্রন্থ, পিরামিডের কথা, তাদের সৃষ্টিতত্ত্ব, দেবতা, মমি তৈরির প্রক্রিয়া, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া প্রক্রিয়া ও রীতিনীতি, জাদুবিদ্যা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, জীবনযাত্রা, শিক্ষা, পূজা, প্যাপিরাস সাহিত্য, তাদের পতনের কারণসহ আরও নানা কিছু। এককথায় প্রাচীন মিশর সংক্রান্ত প্রায় সব কৌতুহল মেটাবে বইটি। তা বইটা যে সব পাঠকের ভালো লাগবে সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
তবে কিছু ব্যাপারে লেখক এস এম নিয়াজ মাওলার আরও সর্তক থাকার দরকার ছিল। যেমন ৬৮৭ পৃষ্ঠার ব্যবহৃত ছবিতে ক্যাপশন লেখা হয়েছে কার্ট মেন্ডেলসোহন, কিন্তু ছবিটি আসলে পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের। এরকম দু-একটি অনাকাঙক্ষিত ভুলের কথা বাদ দিলে বইটি প্রাচীন মিশর সম্পর্কে জানার একটা আকর গ্রন্থ।