প্রাচ্যকলার আধুনিক যাত্রা

‘জীবন সহজ নয়’ শিল্পী: কান্তিদেব অধিকারী
‘জীবন সহজ নয়’ শিল্পী: কান্তিদেব অধিকারী

পৃথিবীজুড়ে চারুশিল্পের প্রধানত দুটি ভাগ—প্রাচ্যশিল্প ও পাশ্চাত্য শিল্প। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, পারস্য, চীন, জাপানসহ এশিয়া মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হাজার বছর ধরে জলরঙে ওয়াশ দিয়ে যে শিল্পধারা প্রচলিত, অল্প কথায় সেটিই প্রাচ্যকলা।
‘প্রাচ্যকলা অনুশীলন দল’-এর পঞ্চম আয়োজন—দলীয় চিত্র প্রদর্শনী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার আগে প্রাচ্যকলা ও এর ইতিহাস সম্পর্কে খানিকটা জেনে নিলে হয়তো মন্দ হবে না। তবে প্রথমেই বলে রাখি, ঢাকার চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে এই প্রদর্শনীটি হয়েছিল ১৭ থেকে ২৩ মার্চ অবধি।
গত শতকের ইংরেজদের প্রভাবে গোটা ভারতবর্ষে যখন পাশ্চাত্যশিল্পের জয়জয়কার, তখন হ্যাভেল সাহেবের অনুপ্রেরণায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতশিল্পের শিকড় সন্ধান করলেন। নিজেদের শিল্পের পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়ে এ সময় তিনি প্রবর্তন করলেন নববঙ্গীয় এই শিল্পরীতি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষায় পাশ্চাত্য পদ্ধতির আরোপ ও উচ্চশিক্ষায় পাশ্চাত্যযাত্রার সহজ সুযোগ থাকায় এ ধারাটি প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি তেমনভাবে। ১৯৪৮ সালে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠার পর শিল্পাচার্য জয়নুলের আগ্রহে ১৯৫৫-তে জন্ম নিল প্রাচ্যকলা বিভাগ। শিকড় চেনার ও সম্প্রসারণের সুযোগ ছিল সেটি।
আশার কথা, প্রাচ্যশিল্পকে আমাদের মূলধারার শিল্প হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ শিক্ষক মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘প্রাচ্যকলা অনুশীলন দল’। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা—কেবল ঐতিহ্যবাহী রূপায়ণে নয়, প্রাচ্যশিল্প এগিয়ে যাক নতুন ধ্যানধারণায় সমসাময়িক বিষয়কে সঙ্গী করে। জয়নুল গ্যালারির এই প্রদর্শনীর কাজের মধ্যেও দেখা গেল সেই চিন্তার অনুরণন।
অবন ঠাকুরের ওয়াশ পদ্ধতি প্রায় অক্ষুণ্ন রেখেই আধুনিক প্রকাশে তাঁদের বিষয়গুলোকে উত্থাপন করেছেন শিল্পীরা। সুশান্ত অধিকারী এমন এক ফিগর কম্পোজিশন এঁকেছেন, ওয়াশ পদ্ধতিতে যা তুলে ধরেছে সমসাময়িকতা। তারিক ফেরদৌসের ‘নারী ও ফুলদানি’ শীর্ষক কাজটিও তুলে ধরে এ সময়ের সৌন্দর্যপ্রিয়তার রূপ। মলয় বালার আঁকা শিকড়ের বিস্তারে শকুন্তলা, কান্তিদেবের দেয়ালের ফাঁক গলে জন্ম নেওয়া সবুজের আশ্বাস বিষয় ও উপস্থাপনায় একদিকে যেমন অনন্য তেমনি এর মধ্যে আছে চিরকালীনতাও। অন্যদিকে জাঁনেসার ওসমানের জলরং ছবিটি এবং জাহাঙ্গীর আলমের সরাচিত্র চিত্তাকর্ষক হয়েছে কাগজ ভিজিয়ে রং ঢেলে আঁকার ফলে। আর সুমন বৈদ্যের জলরং চিত্রে ধরা পড়েছে বাংলার বর্ষার স্নিগ্ধতা।
এ প্রদর্শনীর ভেতর দিয়ে প্রাচ্যকলার আধুনিক যাত্রা নিশ্চয় আরও নতুন পথের দিশা পাবে।
প্রাচ্যকলা অনুশীলন দলের আয়োজনে গেল জুনে ‘ওয়াশ পেইন্টিং’-এর ওপর অনুষ্ঠিত হয়েছিল সপ্তাহব্যাপী কর্মশালা। সেই কর্মশালায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী-শিল্পী ও কয়েকজন প্রশিক্ষক মিলেই এই প্রদর্শনী। এখানে অংশ নিয়েছেন ৪৭ জন শিল্পী। তাঁরা হলেন তাজুল ইসলাম, জাহিদ মুস্তাফা, রশীদ আমিন, জি সি ত্রিবেদী, সুশান্ত কুমার অধিকারী, কান্তিদেব অধিকারী, জাঁনেসার ওসমান, শংকর মজুমদার, মলয় বালা, তারিক ফেরদৌস খান, সুনীত কুমার, সীমা ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মাতুরাম চৌধুরী, গোপাল সাহা, সুমন বৈদ্য, নায়লা হুমায়রা, মহসিন কবির, আসরাফা সনেট, বিকাশ আনন্দ, সুমন কুমার সরকার, তানজিনা তাবাসসুম, মুস্তাকিনা তারিন, অমিত নন্দী, শারমিন আকতার, আইরিন সুলতানা, নাহিদা নিশা, সানজিদা, নিপা রানি সরকার, চন্দন কুমার সরকার, সুস্মিতা সাদিয়া, এম এ হোসেন, হাসিবা ইয়াসমিন, ইতি রাজবংশী, পদ্মাবতী ঢালি, হৃদিতা আনিশা, হরেন্দ্রনাথ রায়, তানভিক জাহান, তৌহিদা হক, হাসুরা আকতার, কাজী নওরিন, তানিয়া আকতার, তাজমুল হোসেন, সৈয়দা আফসানা, সামিনা জাহান, আফরোজ শাম্মী ও মামুনুর রশিদ।