কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কালজয়ী আমেরিকান ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনার একসময় ছিলেন হলিউডের আলো-ঝলমলে ভুবনে। তাঁর হলিউডে থাকার দিনগুলো কেমন ছিল, তিনি কী করতেন এখানে—সব মিলিয়ে ‘গার্ডেন অ্যান্ড গান’ ম্যাগাজিনে ২০১৪ সালে একটি লেখা প্রকাশ হয়। ‘উইলিয়াম ফকনার’স হলিউড ওডিসি’ শিরোনামে সেই লেখাটি অনুবাদ করেছেন শোয়েব করিম।

‘আমরা শুনেছিলাম তিনি আসছেন।’ ফকনার যেদিন প্রথম হলিউডে পা রাখলেন, সেদিনের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন ওয়ার্নার ব্রাদার্সের চিফ স্ট্যানোগ্রাফার। মিসিসিপির অক্সফোর্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষটি এলেন হলিউডে। এখানকার নিয়ন আলো আর পামগাছের ভিড়ে তাঁর ট্যুইড আর পাইপ খুব একটা খাপ খাচ্ছিল না যদিও।
অবশ্য ফকনারকে সব সময়ই সিডার-ঘেরা অক্সফোর্ডের মানুষ হিসেবেই দেখা হয়। ১৯৬৮ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন যেমন লিখেছিল, ‘এ মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সুগভীর, আত্মিক।’ তবু হলিউডে যে সময়টা তিনি কাটিয়েছেন, তা তাঁর জীবনীর প্রসঙ্গক্রমে বলে দেওয়ার বিষয় নয়।

কারণ, এই ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি প্রায় ২০ বছর কাজ করেছিলেন। সে জন্য তাঁর জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ দুটি সম্পর্ক এখানেই গড়ে উঠেছিল। একটা পেশাগত দুনিয়ার সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ব্যবসার অন্যতম প্রভাবশালী পরিচালকের সঙ্গে, অন্যটা ব্যক্তিগত—একজন সুন্দরী স্ক্রিপ্ট সুপারভাইজারের সঙ্গে—জীবন বদলে দেওয়া রোমান্সের সম্পর্ক।
ফকনারের মতো আমিও দক্ষিণে বেড়ে উঠি এবং ৩০ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলাম। আমাকে এখানকার বারোমাসি গ্রীষ্মের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়েছিল। স্বভাবের দিক থেকেই দক্ষিণি একজন বিশ শতকের মানুষের কাছে—বিশেষত যাঁর পিতামহ কনফেডারেসির জন্য যুদ্ধ করেছিলেন—লস অ্যাঞ্জেলেস কেমন ছিল, জানে না। এখানে, বাড়ি থেকে প্রায় দুই হাজার মাইল দূরে এমন একটা জায়গায় ছিলেন তিনি, যার বর্ণনায় তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘প্লাস্টিক অ্যাসহোল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’।

হলিউডে বহু বিখ্যাত ঔপন্যাসিকই কাজ করেছেন। কিন্তু বিশেষভাবে ফকনারেরই যেন এ ক্ষেত্রে প্রতিভাটি ছিল স্বভাবসুলভ। আরেকজন ঔপন্যাসিককে চিত্রনাট্যকার হয়ে উঠতে দেখে স্টিফেন লংস্ট্রিট যেমন তাঁকে ‘হাতে গোনা কয়েকজন সত্যিকারের প্রতিভাধরের একজন’ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। এতটাই দক্ষ ছিলেন তিনি যে রেইমন্ড চ্যান্ডলার আর হেমিংওয়ের মতো ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসের চিত্রনাট্য তিনি লিখেছিলেন, যাঁরা নিজেরাই চিত্রনাট্য লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন।

১৯৩২-এ যখন তাঁর ‘সেঞ্চুয়ারি’ উপন্যাস নাম-জশ পেতে শুরু করেছে, তখন তিনি খবর পেলেন, হলিউডের একজন প্রতিভাধর এজেন্ট লিল্যান্ড হেইওয়ার্ড, মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের হয়ে চিত্রনাট্য লিখবার জন্য সপ্তাহে ৫০০ ডলার বা বর্তমান দিনের ৮ হাজার ৫০০ ডলারের চুক্তি তাঁর জন্য নিশ্চিত করেছেন। ফকনার ছিলেন আধুনিক আর চলচ্চিত্র তখন গল্প বলার নতুন রোমাঞ্চকর ফর্ম। যদিও ফকনার আদতে এই কারণে যে এই চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন, তা নয়; কারণটা মূলত ছিল টাকা।

বিজ্ঞাপন

ঠিক যে সময় ফকনার মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের প্রস্তাবটি পান, তিনি জানতে পারেন, তাঁর প্রকাশক কেইপ অ্যান্ড স্মিথ দেউলিয়া ঘোষিত হয়েছে। ফকনার ভেবেছিলেন, ‘সেঞ্চুয়ারি’র জন্য তিনি ৪ হাজার ডলার পাবেন (বর্তমানের ৬৮ হাজার ডলার)। তবে দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় যার কিছুই এখন আর তিনি পাচ্ছেন না।
মুহূর্তেই তিনি হয়ে উঠলেন সর্বহারা। খবরটা সম্ভবত অক্সফোর্ডজুড়েই ছড়িয়েছে। একটা স্পোর্টস শপে তিনি তিন ডলারের চেক লিখতে গেলে দোকানের মালিক তাঁকে সাফ বলে দিলেন, ‘ক্যাশে দিলেই ভালো হয়।’ তাই অকস্মাৎ হলিউড আকর্ষণীয় হয়ে উঠল ফকনারের কাছে।

default-image

ফকনারের কাছে এমনকি তখন সম্মতি জানিয়ে টেলিগ্রাফ করার পয়সাটাও নেই। তৎক্ষণাৎ এমজিএম (হলিউডের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের একটি পদবি) কিছু টাকা অগ্রিম পাঠায় এবং ট্রেনের টিকিটের মূল্যটাও চুকিয়ে দেয়। এর কয়েক দিন পরই তিনি কালভার সিটিতে এসে পৌঁছান।

এই ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারে ফকনার তখন এতটা আনাড়ি ছিলেন যে ভেবেছিলেন, বুঝিবা তখনকার বিখ্যাত মিকি মাউসে কাজ পাবেন তিনি। কিন্তু মেট্রোর লোকজন তাঁকে বললেন, ‘মিকি অন্য স্টুডিওর। আমরা তোমাকে ওয়ালেস ব্যারির ছবির জন্য চাই।’ তখন ফকনারের পাল্টা জিজ্ঞাসা ছিল, ‘সে কে?’

যতই তিনি জানলেন, তত ভয় বাড়ল তাঁর। ‘সত্য বলতে গেলে আমি ভয় পাচ্ছিলাম।’ ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি। ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম আমার আগমন নিয়ে হইচইয়ে, আর যখন তারা একটা প্রজেকশন রুমে ছবি দেখাতে নিয়ে গিয়ে বারবার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছিল, সব ঠিক হয়ে যাবে, তখন একদমই হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল এ আমার কর্ম নয়। পালানো ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না।’ মানসিক শান্তির জন্য গেলেন ডেথ ভ্যালিতে। বললেন, ‘মনে হচ্ছিল এর চেয়ে শান্তির জায়গা আর কোথাও নেই।’ এক সপ্তাহ পর ফকনার যখন স্টুডিওতে ফিরলেন, লিখবার জন্য তিনি তখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

চার সপ্তাহে ফকনার চারটে গল্পের কাজ শেষ করলেন। আর এই কর্মদক্ষতার গুণেই উদীয়মান পরিচালক হাওয়ার্ড হকসের ডাক পেলেন তিনি। ফকনারের লেখা তাঁর ভালো লাগল এবং তিনি ‘স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট’ কিনলেন, যেখানে ফকনারের লেখা একটা গল্প ছিল। কেননা, তিনি চাইছিলেন ফকনার এই গল্পেরই চিত্রনাট্য তৈরি করুন, যে চলচ্চিত্রের পরিচালক হবেন তিনিই।

বিজ্ঞাপন

সামান্য পানাহারের পরই তাঁরা একমত হলেন। ফকনার পরদিন ভোর থেকেই লেগে পড়লেন কাজে এবং পাঁচ কি ছয় দিনে একটা চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেললেন। ‘আর সেটা ছিল আমার পড়া সবচেয়ে নিখুঁত চিত্রনাট্যগুলোর একটি’, হকস জানাচ্ছেন কথাটা।

হকস চিত্রনাট্যটি দেখালেন মেট্রোর হেড অব প্রোডাকশন আরভিং থেলবার্গকে। তিনি বললেন, ‘শুভস্য শীঘ্রম’। আর এরই ফলাফল ‘টুডে উই লিভ’। ছবিটা কেবল ফকনারের প্রথম কাজ নয়, হকসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পেশাগত সম্পর্কেরও শুভারম্ভ।
দান্তে ‘ডিভাইন কমেডি’তে নরকের প্রবেশদ্বারে লিখেছিলেন, ‘দুর্দশার জন্য প্রস্তুত হও’, ফকনারের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রবেশদ্বারেও এই কথাটাই খোদাই করে দেওয়া যায় (অ্যারিজোনার ক্ষেত্রে তাঁর মত, ‘সাই-ফাই সিটি’)। ফকনার তাঁর এই ঠাঁই ছেড়ে আসা ঠিকানাকে কী চোখে দেখতেন, তা তাঁর এই কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। হলিউডে এলেই লোকজন নিজের আত্মপরিচয় খুইয়ে বসে, শিকড় ভুলে যায়, ভুলে যায় জীবনের নিজস্ব মানে, মূল্যবোধ—সব পেয়েছির দেশ বলে কথা। যদিও ফকনার ভোলেননি। তাঁর পাইপ, তামাক, বরবন আগের মতোই ছিল। একই সঙ্গে এমনকি এখানে এসেও তিনি ঠিক শিকারে যেতেন।

মিসিসিপি থাকাকালে তিনি ওকাতোবা হান্টিং আর ফিশিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার অর্থ লেখালেখি ছাড়াও আরও অনেক কিছুতে তিনি হাত পাকিয়েছেন। ফকনার যে সাহিত্য নিয়ে আদতে কথা বলতেই পছন্দ করতেন না, তা তাঁর জীবনীকার জোসেফ ব্লন্টারও বলেছেন। বরং ঘোড়া, কুকুর, শিকার, ওড়া—এসবই ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়। তিনি যখন নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে সুইডেনে যাচ্ছেন, সে সময় সাংবাদিকেরা তাঁকে সাহিত্য নিয়ে নানা প্রশ্ন করলে ফকনার বললেন, ‘সাহিত্য সাময়িকী পড়িটড়ি না, যেগুলো আমি পড়ি, তার বিষয়বস্তু শিকার, ঘোড়া, গরু-ছাগল।’
এখন হয়তো কল্পনাই করা যাবে না, তবে ফকনার যখন তরুণ, তখন স্যান ফার্নান্দো ভ্যালির ভেঞ্চুরা বুলভার্ডের মাত্র দু-এক ব্লক পর সবটাই ছিল কমলাবাগান। আর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া রীতিমতো সাগরপারের মরুভূমি। এখানে আসার কিছুদিন পরই ফকনার ‘শিকারে যাই’ বলে চলে গেলেন সান্তা ক্রুজ আইল্যান্ডে, বুনো ভালুক তাড়া করে কাটিয়ে দিলেন দিনটা।

বিজ্ঞাপন

ভ্রমণ শেষে তিনি হোটেল বেভারলি হিলে ফিরলেন ‘ধার করা বন্দুক হাতে কাদামাখা শিকারির পোশাক আর খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে।’ এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছিলেন প্রযোজক ডেভিড হ্যামস্টেড। ফকনার যখন এভাবে হোটেলে ঢুকছিলেন, সে সময় অন্য পর্যটক আর হোটেলের স্টাফরা আড়াল খুঁজছিল। কারণ, এর কিছুক্ষণ আগেই ডাকাতি হয়েছিল এখানে আর ফকনারকে দেখে সবাই তাদেরই একজন ভেবেছিল।

ফকনার মাঝেমধ্যে হকসের সঙ্গেও শিকারে যেতেন। একবারের শিকারাভিযানে ক্লার্ক গেবলও ছিলেন আমন্ত্রিত, তিনি তত দিনে প্রতিষ্ঠিত তারকা। তখন ফকনার আর হকস সাহিত্যালাপ শুরু করলে গেবল জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই সময়ের সেরা বইগুলো যদি কেউ পড়তে চায়, তার কার কার বই পড়া উচিত? আপনার মতে জীবিতদের মধ্যে সেরা লেখক কে কে?’ ফকনার বললেন, ‘টমাস মান, উইলা ক্যাথার, জন ডস প্যাজোস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আর আমি।’ এ কথা শুনে আশ্চর্য হলেন গেবল, ‘ওহ, আপনি লেখেন?’ ‘হ্যাঁ লিখি, আপনি যেন কী করেন?’

ফকনার মাঝেমধ্যে হকসের সঙ্গেও শিকারে যেতেন। একবারের শিকারাভিযানে ক্লার্ক গেবলও ছিলেন আমন্ত্রিত, তিনি তত দিনে প্রতিষ্ঠিত তারকা। তখন ফকনার আর হকস সাহিত্যালাপ শুরু করলে গেবল জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই সময়ের সেরা বইগুলো যদি কেউ পড়তে চায়, তার কার কার বই পড়া উচিত? আপনার মতে জীবিতদের মধ্যে সেরা লেখক কে কে?’ ফকনার বললেন, ‘টমাস মান, উইলা ক্যাথার, জন ডস প্যাজোস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আর আমি।’ এ কথা শুনে আশ্চর্য হলেন গেবল, ‘ওহ, আপনি লেখেন?’ ‘হ্যাঁ লিখি, আপনি যেন কী করেন?’

মুসো অ্যান্ড ফ্র্যাঙ্ক গ্রিল হলিউডে আমার প্রিয় জায়গাগুলোর একটা। বাইরে থেকে খুব আলাদা মনে না হলেও ভেতরে ঢুকতেই মনে হবে টাইম মেশিনে চেপে আপনি ঠিক সেই সময়টায় ফিরে গেছেন, যখন লোকজন ফেদোরাস পরত, আর চামড়ার বুথ আর কাঠের প্যানিলিং ছিল আভিজাত্যের চিহ্ন। ওয়েটারদের দেখলে মনে হয় ওরা যেন এখানে সেই ১৯১৯ সালে রেস্টুরেন্টটা খুলবার প্রথম দিন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। গোর ভিদালের সঙ্গে কয়েক বছর আগে একবার এখানেই দেখা হয়েছিল, তাঁর কাছে এটা ‘লস অ্যাঞ্জেলেসের অদ্বিতীয় রেস্টুরেন্ট।’

রেস্টুরেন্টটা যে ফকনারের রুটিনের অংশ হয়ে গিয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই রেস্টুরেন্ট থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে হোটেলে বসে তিনি তাঁর কন্যাকে লিখেছেন, ‘হোটেলের নিগ্রো ওয়েটারটা রুমে এসে খাবার দিয়ে যেত, কিন্তু পরে রেশনিং শুরু হয়ে গেলে এখানকার লোকজন এ্যারক্রাফট। প্ল্যান্টে ভালো চাকরি পেতে শুরু করলে হোটেলের ডাইনিং বন্ধ হয়ে গেল। তো সাতটায় ঘুম থেকে উঠে শেভ, গোসল সেরে চলে যাই মুসো ফ্র্যাঙ্ক রেস্টুরেন্টে, একটা পেপার নিয়ে বসি, নাশতা সারি কমলার জুস, টোস্ট, মার্মালেড আর মাঝেমধ্যে সসেজ দিয়ে।’ তিনি সন্ধ্যায়ও এখানে আসতেন ধূমপান করতে। কখনো-সখনো কয়েকজন লেখকও থাকতেন তাঁর সঙ্গে। আর যাঁকে জীবনের শেষাবধি ভালোবেসেছিলেন ফকনার, মেটা কার্পেন্টার নামের সেই নারীর সঙ্গে প্রথমবার আহারও করেছিলেন এখানেই।

বিজ্ঞাপন

মাঝামাঝি গড়নের সোনালি চুলের ওই নারীর বেড়ে ওঠা মিসিসিপির টিউনিকায়; ফকনারের অক্সফোর্ড থেকে গাড়িতে মাত্র ঘণ্টাখানেকের পথ, কাজ করতেন হাওয়ার্ড হকসের সেক্রেটারি হিসেবে। ১৯৩৫ সালের যে দিনটিতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, সেদিনই ফকনার তাঁকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করলেন মুসো অ্যান্ড ফ্র্যাঙ্কে। তিনি জানতেন ফকনার বিবাহিত, তাই তিনি আমন্ত্রণটি এড়াতেই চেয়েছিলেন শুরুতে। কিন্তু ফকনার ছিলেন নাছোড়বান্দা। ফলে হার মানেন মেটা কার্পেন্টার। সেদিন স্রেফ খেতে বসা হলেও মুসো অ্যান্ড ফ্র্যাঙ্কে আরও কয়েক দিনের সাক্ষাতে তাঁদের সম্পর্কটা সেটা গড়ায় উষ্ণ প্রেমে। ‘প্রতি রাতেই তোমার দেখা চাই’, ফকনার বলেছিলেন কার্পেন্টারকে।
তাঁদের সম্পর্কটা হলিউডের আর দশটা বিলাসী প্রণয়ের মতো ছিল না। ফকনার যা আয় করতেন, তার বেশির ভাগই পাঠিয়ে দিতেন মিসিসিপির বাড়ির খরচ মেটাতে। এখানে থাকতেন তাঁর স্ত্রী। তিনি ছিলেন নেশাগ্রস্ত অস্বাভাবিক মেজাজের এক নারী। ফকনারের কাজের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা ছিল না তাঁর। স্ত্রী সম্পর্কে ফকনার বলেছিলেন, ‘লোকে যেমন শখের বশে ডাকটিকিট জমায়, ওর কাছে আমার কাজটা ছিল তেমনই কিছু একটা।’

default-image

ফকনারের সঙ্গে কার্পেন্টারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সময় তাঁদের টাকার এতই টানাটানি ছিল যে সিনেমা দেখতে যাওয়াটাও ছিল রীতিমতো বিলাসিতার ব্যাপার। ১৯৭৬ সালে নিজের স্মৃতিকথায় এ কথা লিখেছিলেন কার্পেন্টার। কার্পেন্টারের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের গেমরুমে পিংপং, অফিসের দিনগুলোতে কাজের আগে সস্তার গাড়ি করে ঘোরা—বেশির ভাগ সময়ই তাঁদের বেড়ানোর মানে ছিল এতটুকুই। আর ছুটির দিনে যেতেন সমুদ্রসৈকতে, খেতেন বড়জোর হট ডগ, সঙ্গে সোডা।
এক সন্ধ্যায় হলিউড বুলভার্ড ধরে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লেন একটা বুক স্টোরে। ফকনারের ইচ্ছা মেটা কার্পেন্টারকে তাঁর কবিতার বই ‘আ গ্রিন বাউ’ কিনে দেবেন। ফকনারের আর কোনো বই আছে কি না, জিজ্ঞেস করলে দোকানদার জানালেন, নেই। ফকনারের বই তেমন বিক্রি হয় না। তা ছাড়া তাঁর বেশির ভাগ বই-ই পুনর্মুদ্রণ হয়নি বলে বাজারেও নেই।

অভাব থাকলেও ক্যালিফোর্নিয়ার এই দিনগুলো ছিল ফকনারের জীবনের সবচেয়ে সুখের। কার্পেন্টারের ভাষায়, ‘মিহি রোদের দিন’। আমি কার্পেন্টারের সেই বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করলাম, যেখানে সে সময় থাকতেন তিনি।
হলিউডের লোডি প্লেস আর লেক্সিংটন অ্যাভিনিউয়ের কোনায় একটা হালকা গোলাপি রঙের তিনতলা বাড়ি, সময়ের জৌলুশ সময়ে মিলিয়ে গেছে। বর্তমানে এটা ওয়াইএমসিএ পরিচালিত লস অ্যাঞ্জেলেস জব করপোরেশনের অফিস, কেন ফাঁকা কে জানে।

বিজ্ঞাপন

তিনটি ছেলেমেয়ে সামনের সিঁড়িতে বসে গাঁজা টানছে। দরজা বন্ধ, তবু আমি জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলাম। রাত করে পার্টি সেরে ফেরার পর ফকনার আর কার্পেন্টারকে অভ্যর্থনাকারী যেখান থেকে সম্ভাষণ জানাত, লবির সেই ডেস্কটা চোখে পড়ল। সম্ভবত এখানটাতে দাঁড়িয়েই অন্য কোনো সময় ফকনার বলেছিলেন, ‘তুমি আমায় বাঁচিয়েছ মেটা, সত্যি বলছি, তোমার জন্যই বেঁচে আছি, ভালো আছি।’
১৯৩৬ সালের মধ্যে ফকনার পৌঁছান তাঁর পেশাগত উৎকর্ষের চূড়ায়। যখনই হাওয়ার্ড হকস কোনো ছবি নিয়ে ঝামেলায় পড়ে যেতেন, ফকনারকে কল দিতেন, ‘কী করি বলুন তো?’ ফকনার জানতেন কী করে সব সামলে নিতে হয়। তিনি তখন ‘গুঙ্গা ডিন’ ছবির চিত্রনাট্য লেখায় সহযোগিতা করছিলেন আর হাবুডুবু খাচ্ছিলেন কার্পেন্টারের প্রেমে।

তবু মাঝেমধ্যে কুয়াশার মতো একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরত তাকে। কার্পেন্টারের সঙ্গে কাটানো সময়গুলোর অনেকটাই কেটে যেত দীর্ঘ নীরবতায়। চেয়ে থাকতেন আকাশে, শূন্য দৃষ্টিতে। ফকনারের মন তখন অক্সফোর্ডে পড়ে আছে।
তাঁর স্ত্রী তাঁদের টাকার অনেকটাই তাঁর নিজের মা-বাবার কাছে পাঠাতেন—এঁরা ছিলেন তাঁরাই, যাঁরা ফকনারকে পাত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন—ফলে বাধ্য হয়ে তিনি দক্ষিণের পত্রিকাগুলোয় তাঁর নামে আর কেউ যাতে ঋণ করতে না পারে, সে জন্য একটা বিজ্ঞাপন ছাপলেন। ‘মিসেস উইলিয়াম ফকনার বা মিসেস এস্টেল ওল্ডহ্যাম ফকনার স্বাক্ষরিত কোনো চেক বা বিল কিংবা ঋণের দায় আমি বহন করব না।’ ‘মেম্ফিস কমার্শিয়াল অ্যাপিল’ আর ‘অক্সফোর্ড ইগল’-এ এভাবেই ছাপা হয় বিজ্ঞাপনটি।
পরের মাসে তিনি যে পদক্ষেপটি নিলেন, তাতে তাঁর প্রেম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো: এস্টেল আর সন্তান জিলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে তিনি তাঁদের মিসিসিপি থেকে নিয়ে এলেন লস অ্যাঞ্জেলেসের পাশেই প্যাসিফিক প্যালিসেডসে। এই বাড়ি বদলের ঘটনা এমন দিকে মোড় নিল, যার জন্য ফকনারের অন্তত একজন জীবনীকার তাঁকে স্যাডিস্ট বলেছিলেন।

default-image

একদিন দুপুরে সেই বাসাতেই কার্পেন্টারকে দাওয়াত করলেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনাটি ছিল কার্পেন্টার বেন ওয়েসনেরির সঙ্গে আসবেন এবং ভান করবেন যে তিনি ওয়েসনেরির প্রেমিকা।
শুরু থেকেই ব্যাপারটাকে নড়বড়ে মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এস্টেল শুরু থেকেই কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছেন। ‘শুনলাম তোমার বাড়ি নাকি ডেল্টায়! পৃথিবীটা কত ছোট!’ কার্পেন্টার ফকনারের সঙ্গে চোখাচোখি এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ফকনারও কেমন যেন এস্টেলার প্রতি বাড়তি যত্ন দেখানোর চেষ্টা করছেন, এস্টেল পানি ঢালতে গেলেও তিনি তাঁর হাত সরিয়ে নিজে সেটা ঢেলে দিতে চাচ্ছিলেন। পরদিন অনেকের মতেই এস্টেল আর ফকনারের ঝগড়া হয়েছিল। নারীর আন্দাজই বলুন আর যা-ই বলুন, তিনি তাঁর স্বামীর চালাকিটা ঠিক ধরতে পেরেছিলেন।

ফকনাররা যে বাসাটি নিয়েছিলেন, আমি সেটা খুঁজে বের করলাম এবং সেই ডিনার পার্টিটির ছবি মনে মনে আঁকবার চেষ্টা করলাম। কল্পনাকে বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার হলিউডি প্রবণতা কি ফকনারকে শেষে বিপদেই ফেলে দিয়েছিল?
আমি সেন্টার ফর ফকনার স্টাডিজের সহকারী পরিচালক রবার্ট হ্যাম্বলিনকে ফোন করলাম।

বিজ্ঞাপন

তিনি বললেন, ‘ফকনার অহম ছিল প্রচণ্ড। কে কী ভাবল, অন্য কারও কেমন লাগতে পারে—এসব নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবতেন না। যেটা তাঁর উপন্যাসের জায়গা থেকে দেখলে আয়রনিই বটে; যেহেতু একটা ঘটনাকে নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে, নানা মানুষের বাস্তবতা থেকে দেখানোই ছিল তাঁর উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’
অনেক বছর পর কার্পেন্টার বলেছিলেন, ওই চালাকিতে শামিল হওয়াটা ঠিক হয়নি। তাঁর কাছে পরে ব্যাপারটাকে এস্টেলের ঘরে ‘আগ্রাসন’ চালানোর মতো মনে হয়েছে।

ফকনার মনে করেছিলেন, স্ত্রী-কন্যা লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকলে সমস্যা কিছু কমবে, কিন্তু এতে জটিলতাই বেড়েছে কেবল। জোসেফ ব্লন্টার বলছিলেন, এক সহকর্মী ফকনারের কপালে আঘাতের চিহ্ন দেখে যখন জানতে চাইল কী হয়েছে, তখন তিনি বললেন, ‘আমি শুধু বসে বসে পেপার পড়ছিলাম। এস্টেল কোথা থেকে একটা ক্রুকে ম্যালেট নিয়ে হাজির (হাতুড়ির মতো দেখতে এবং হকিস্টিকের মতো লম্বা ম্যালেট দিয়ে মাটিতে রাখা ছোট ছোট খোপে বল ঢোকানোর খেলার নাম ক্রুকে বা ক্রুকেট)।
‘একটা বড়সড় সিনেমার চিত্রনাট্যে হাত দিয়েছি, ছবিটির পরিচালক আমার পুরোনো বন্ধু হাওয়ার্ড হকস। ছবিটা বেশ লম্বা, প্রায় তিন ঘণ্টার আর প্রযোজক হাওয়ার্ডকে ছবিটির জন্য ৩০ লাখ ডলার দেবে, সঙ্গে তিন-চারজন পরিচালক এবং প্রায় সব বড় তারকা। ছবিটার নাম হবে সম্ভবত “ব্যাটল ক্রাই”’ চিঠিটি ফকনার লিখছেন তাঁর মেয়েকে ১৯৪৩ সালে। যেখানে তিনি, তখন পর্যন্ত তাঁর নেওয়া সবচেয়ে বড় প্রজেক্টের কথা বলেছেন। যুদ্ধের একটা অভূতপূর্ব সিনেমা হতে যাচ্ছিল তা, যা পৃথিবী যে গোলযোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তা তুলে ধরবে, যা হয়ে উঠবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তির কণ্ঠস্বর আর আবেগের প্রতিভূ ‘সারা বিশ্বের স্বাধীনতার ন্যায্যতার দাবি’।
‘ব্যাটল ক্রাই’-এর নথিপত্র প্রথম দেখতে পাই ওয়ার্নার ব্রাদার্সের আর্কাইভে। এটি মূলত ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার স্কুল অব সিনেমাটিক আর্টসের অংশ। এই নথিপত্রের পরিমাণ এত বেশি যে মূল ভবনে না রেখে বর্ধিত অংশে রাখা হয়েছে। ঢোকার পর থেকেই ফাইল বক্সে ভর্তি শেলফের পর শেলফ পেরিয়ে এগোচ্ছিলাম। পরিচালক সান্ড্রা মেয়ার জানান, এগুলোতে আছে চিত্রনাট্য, চুক্তিপত্র, চিঠি, টেলিগ্রাম আর প্রায় চার লাখ ছবি।

ফকনারের ফাইলগুলো আমার জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল। ফাউন্টেন পেনে সই করা ফকনারের চুক্তিপত্র দেখলাম। আমি যখন আরও গভীরে গেলাম, জানতে পারলাম, হকস আসলে ফকনারকে দুটো ছোট গল্প, একটা বেতার নাটক আর একটা গীতিনাট্যকেও একটাই চিত্রনাট্যে নিয়ে আসার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৯৩০ সালের ‘টুডে উই লিভ’ দিয়ে শুরু করে তাঁরা দুজনেই পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ। হকস তত দিনে ‘স্কারফেস’, ‘ব্রিগিং আপ বেইবি’, ‘হিজ গার্ল ফ্রাইডে আর সার্জেন্ট ইউর্কে’র ছবির টাইটেল নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। ফকনারও হলিউডে আসার পর থেকে তত দিন পর্যন্ত ‘দ্য আনভ্যানকুইসড’, ‘দ্য ওয়াইল্ড পাম’, ‘দ্য হ্যামলেট’ আর ‘গো ডাউন’, ‘মোজেস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’—বইগুলো প্রকাশের মাধ্যমে প্রবাদপুরুষদের কাতারে নাম লেখানোর পথে আছেন।

ফকনারের সঙ্গে কারপেন্টারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সময় তাঁদের টাকার এতই টানাটানি ছিল যে সিনেমা দেখতে যাওয়াটাও ছিল রীতিমতো বিলাসিতার ব্যাপার। ১৯৭৬ সালে নিজের স্মৃতিকথায় এ কথা লিখেছিলেন কার্পেন্টার। কার্পেন্টারের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের গেমরুমে পিংপং, অফিসের দিনগুলোতে কাজের আগে সস্তার গাড়ি করে ঘোরা—বেশির ভাগ সময়ই তাঁদের বেড়ানোর মানে ছিল এতটুকুই। আর ছুটির দিনে যেতেন সমুদ্রসৈকতে, খেতেন বড়জোর হট ডগ, সঙ্গে সোডা।

‘ব্যাটল ক্রাই’ নিয়ে কাজ করতে ফকনার হকসের সঙ্গে চলে এলেন সিয়েরা নেভাডার জুন লেকে, উদ্দেশ্য লেখা, পান করা আর মাছ ধরা । দুই সপ্তাহ পর ফকনার ১৪৩ পৃষ্টার কাজ শেষ করলেন আর জুলাইয়ের শেষ নাগাদ পুরো স্ক্রিপ্ট।
স্ক্রিপ্টটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে চোখে পড়ল প্যারিস, ডানক্রিকের বিচ, ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডের প্রেক্ষাপটে সাজানো দৃশ্যগুলো। ফোন্ডা আর রিগান দুটি চরিত্রের নাম চোখে পড়ল। পরে জানতে পারলাম, আসলে একটা চরিত্রে যে সবচেয়ে ভালো অভিনয় করবে বলে লেখকেরা মনে করতেন, তাদের নাম লিখে রাখার যে অভ্যাস লেখকেদের ছিল, এ নাম দুটি তারই নিদর্শন।

ফকনারের স্বপ্ন ছিল ‘ব্যাটল ক্রাই’ হবে একটা এপিক, যেখানে অভিনয় করবেন ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দুই তারকা হেনরি ফোন্ডা আর রোনাল্ড রিগ্যান। (১৯৪৫ সালে ফকনার স্টিফেন লংস্ট্রিটের উপন্যাস ‘স্ট্যালিয়ন রোড’কে চিত্রনাট্যে রূপ দেন এবং তাতে অভিনয় করেন রোন্যাল্ড রিগ্যান।)

আমি আবিষ্কার করলাম, ফকনারের এই উৎসাহ এত দূর অগ্রসর হয়েছিল যে তা শেষ পর্যন্ত তাঁর আর হকসের নিজস্ব স্বাধীন ফিল্ম ইউনিট গঠনের প্রস্তাবে এসে ঠেকল। ‘ফিশিং ক্যাম্পের সময় তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে…। আমি হব তাঁর লেখক’, ১৯৪৩-এ এস্টালকে লিখছেন ফকনার, ‘আমরা যৌথভাবে কাজ করব আর আমাদের মুভিগুলোর বাজেট হবে কমপক্ষে দুই মিলিয়ন ডলার।’

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনাটা ছিল দারুণ, এমনকি এখনকার চলচ্চিত্রকারদের জন্য সেটা লুফে নেওয়ার মতো। ফকনার লিখছেন, ‘ছবিটি যদি আমাদের হয় তো যা-ই আমরা বানাতে চাই না কেন, সেটা বানানোর জন্য যেকোনো প্রযোজকের কাছ থেকে দুই মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা আমরা করতেই পারি। তো ছবিটা আমরা বানাব আর লাভটা নেব ভাগাভাগি করে। আশা করি বাড়ি ফেরার আগেই হকস আর স্টুডিওকে পুরোপরি রাজি করাতে পারব। সেটা যদি সম্ভব হয় তো হঠাৎ হঠাৎ হাত খালি হয়ে যাওয়ার ভয় আর পেতে হবে না।’

এ ছিল তাঁর এক জীবনের স্বপ্ন। ভেবেছিলেন, সফল হলে এই স্বপ্নই তাঁদের পৌঁছে দেবে খ্যাতির চূড়ায়। কিন্তু তা আসলে কখনোই হওয়ার ছিল না। বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার খ্যাতি ছিল হকসের। তার মানে ৪০ লাখ ডলারের ‘ব্যাটল ক্রাই’ প্রযোজনায় খরচ পড়ত আরও অনেক অনেক বেশি। স্টুডিওও রাজি হলো না। ফলে ফকনারের ছবি বানানোর রোমান্টিক স্বপ্নের ইতি ঘটল এখানেই। হকসের ছবির চিত্রনাট্য লেখাতেই তিনি নিয়োজিত থাকলেন, যার মধ্যে হেমিংওয়ের ‘টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট’, চ্যান্ডলারের ‘দ্য বিগ স্লিপ’ উপন্যাস দুটির চিত্রনাট্যও ছিল, দুটিতেই বোগার্ট আর বেইক্যাল অভিনয় করেছিলেন। বাইরের যে কারও মনে হবে, এই ক্ল্যাসিকগুলোই তো হতে পারে যে কারও ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত অর্জন। কিন্তু ফকনারের কাছে পে-চেকের বেশি কিছু ছিল না এগুলো, জুন লেকে গ্রীষ্মের রাতগুলোয় হকসের সঙ্গে যে অসাধারণ ছবিগুলোর স্বপ্ন তাঁরা এঁকেছিলেন, সেগুলোর মতো কিছু নয়।

বাকি জীবন ফকনার কার্পেন্টারকে নিয়মিত চিঠি লিখেছেন, কথা বলেছেন মাঝেমধ্যে। তবু মেয়ে বড় হলে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে যে বিয়ের প্রতিশ্রুতি তিনি বারবার দিয়েছিলেন, তা তিনি রাখতে পারেননি, দক্ষিণি দায়বোধ থেকে তিনি শেষতক বেরোতে পারেননি। ফলে হলিউডে তাঁর দুটি ‘সম্পর্কের’ একটিরও ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ ঘটেনি। নিজের পরিবারকে তিনি যেমন ছাড়তে পারেননি, তেমনি পারেননি কার্পেন্টারের সঙ্গে যে জীবনের স্বপ্ন দেখতেন, তা সত্য করতে, কিংবা হকসের সঙ্গে যে সাফল্যের পেছনে ছুটেছেন, তা-ও অর্জন করতে পারেননি।

default-image

যদিও ফকনারের বাকি জীবনটাকে ব্যর্থ বলা কঠিন। তাঁর জীবনটা যদি একটা ছবির গল্প হতো, তবে তাঁর শেষভাগটা হতো দিগ্‌বিজয়ী বীরের। চিত্রনাট্যকারের আপাতদৃষ্টে ব্যর্থ ক্যারিয়ার থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি পাবেন বলেই। বলা বাহুল্য, তাঁর নিজের বই থেকে করা চলচ্চিত্রও তিনি দেখে গেছেন। ১৯৫০ সালে নোবেলপ্রাপ্তির এক বছর আগে, মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার তাঁর উপন্যাস ‘ইন্ট্রুডার ইন দ্য ডাস্ট’ থেকে করা চলচ্চিত্র প্রকাশ করে। ছবিটি ধারণ করা হয়েছে অক্সফোর্ডে। প্রযোজক ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারও করেছিল সেখানে।
ফকনারের মৃত্যুর প্রায় ২৬ বছর পর রোনাল্ড রিগ্যান যখন সবে অবসরে গেছেন, একজন ফকনার বিশেষজ্ঞ ও সংগ্রাহক ড্যানিয়েল ব্রডস্কি, রিগ্যানের কাছে ‘ব্যাটল ক্রাই’-এর চিত্রনাট্য নিয়ে হাজির হন। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির কাছে মার্কিন সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের লেখা চিত্রনাট্য হস্তান্তরের মুহূর্ত ছিল সেটা। তত দিনে হলিউডের একই স্টুডিওতে ফকনার আর রিগ্যানের দেখা হওয়ার পর গত হয়েছে প্রায় ৪০ বছর। ‘বিল ফকনার আমাকে মাথায় রেখে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, জানতাম না’, রিগ্যান বললেন।

গত হেমন্তের এক বিকেলে সেই বাড়িটায় গেলাম, যেখানে ফকনার ছিলেন সেই সময়টায়, যখন তিনি মেটা কার্পেন্টারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন এবং ‘ব্যাটল ক্রাই’ নিয়ে উদয়াস্ত খাটছিলেন।

জেফ ইয়ানেরো নামের এক ভাড়াটের সঙ্গে দেখা হলো সেখানে। লোকটা মিউজিশিয়ান, ১৩ বছর ধরে এখানে আছেন। তিনি আমাকে বললেন, যখন তিনি নিউইয়র্ক থেকে এখানে প্রথম এলেন, বিল্ডিংটা আর পেন্টহাউসের আলো তাঁর চোখে পড়ল। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, এখানেই থাকবেন। কিন্তু ম্যানেজার জানাল, এটা সম্ভব নয়। পেন্টহাউসের বাসিন্দারা কখনো যাবে না। ফলে তিনি তিনতলায় একটা বাসা নিলেন আর পেন্টহাউসটা খালি হওয়ার অপেক্ষায় রইলেন। অবশেষে একদিন সেটা খালি হলো এবং ইয়ানেরো সেখানে থাকতে শুরু করলেন।

আমি তাঁকে জানালাম, ফকনারও এখানেই ছিলেন। এখানেই ‘লাইফ’ ম্যাগাজিন তাঁর সানগ্লাস, শর্টস আর খালি গায়ের বিখ্যাত ছবিটা তুলেছিল। ইয়ানেরো এসবের কিছুই জানতেন না। তিনি আমাকে আশপাশ ঘুরে ঘুরে দেখালেন। ফকনারের উঠানের দিকে তাকাতে তাকাতে আমরা ফিরে গেলাম অতীতে। ফকনারও সব সময় অতীতচারীই ছিলেন।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0