বহু স্বরের পেসোয়া

ছদ্মনামে বা ভিন্ন নামে কবিতা লেখা, বলা যায়, কবিদের এক সাধারণ প্রবণতা। বহু দেশের বহু ভাষার কবিগণ ছদ্মনাম বা ভিন্ন নামে অনেক কবিতা লিখেছেন, লিখছেন। কিন্তু বিস্মিত হতে হয় এটি জেনে যে পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবি ফের্নান্দো আন্তেযানিয়ো নুগেইরা পেসোয়া তাঁর নিজ নাম পেসোয়া ছাড়াও আরও তিনটি পৃথক নামে কবিতা লিখেছেন, ওই সব নামকে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিসত্তা, এমনকি তাদের ভিন্ন ভিন্ন জন্ম-মৃত্যু তারিখসহ আলাদা আলাদা লেখক পরিচিতি দিয়ে, পৃথক পৃথক বই প্রকাশ করে তাদের করেছেন ভিন্ন স্বরের কবি! নিজ নাম পেসোয়া ছাড়াও আর যে তিনটি নামে তিনি কবিতা লিখেছেন সেই নামগুলো হলো আলবের্তো কায়েইরু, আলভারু দ্য কাম্পুস ও রিকার্দো রাইশ। হ্যাঁ, এই সব নাম ধারণ করে নেপথ্য থেকে কবিতা লিখেছেন পেসোয়াই! ‘পেসোয়া’ শব্দের পর্তুগিজ অর্থ ব্যক্তি, যা এসেছে ‘পারসোনা’ থেকে, যা ব্যবহৃত হতো রোমান অভিনেতাদের মুখোশ অর্থে। আর ভিন্ন ভিন্ন নামে কবিতা লিখে, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিসত্তা সৃষ্টি করে পেসোয়া যেন স্বয়ং বহুরঙা মুখোশ পরেই কবিতা লিখেছেন।

বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর কবিতা
বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর কবিতা
বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর কবিতা
ভূমিকা, অনুবাদ ও সম্পাদনা: কুমার চক্রবর্তী
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর l
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬ l
১৯২ পৃষ্ঠা l
দাম: ২৫০ টাকা।

২.

ফের্নান্দো পেসোয়াকে নিয়ে কথা হওয়ার কারণ কুমার চক্রবর্তী অনূদিত বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর কবিতা নামের বইটি। তো, বই বিষয়ে আলাপের প্রারম্ভিকা হিসেবেই পেসোয়া ও তাঁর সাহিত্যের গভীরে ঢোকার এই প্রয়াস।

নিজেই বলেছেন পেসোয়া, ‘আমার রয়েছে অনেকগুলো আত্মা/ রয়েছে “আমার” চেয়েও অনেকগুলো “আমি”।’ আর একজন কবি যখন চার নামে কবিতা লিখতে থাকেন তখন তা এমন একটি ঘটনা হয়ে ওঠে, যা ভিন্ন এক কবিসত্তার আত্মাকেও ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। তাই তো দেখা যায়, কায়েইরু নামে লেখা তাঁর কবিতাগুলো মুক্তছন্দের, কাম্পুস নামে লেখা কবিতাগুলো ছন্দ এক হলেও ভিন্ন স্বরের, রাইশ নামে লেখা কবিতাগুলো ছন্দোবদ্ধ, তবে মিলহীন আর স্বয়ং পেসোয়া নামে লেখা কবিতাগুলো ছন্দোবদ্ধ এবং ঘনমিলযুক্ত। আবার কায়েইরুর প্রধান কাজ রাখাল বা দ্য কিপার অব শিপ কাব্যগ্রন্থ—যিনি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন প্রকৃতির কবি হিসেবে। রাইশের কবিতা ছোট আকারের, এটি দর্শনের নিস্পৃহবাদ ও নির্বিকারবাদ ধারণাকে তুলে ধরে। কাম্পুস খ্যাতি পায় দীর্ঘ কবিতা ‘দ্য ম্যারিটাইম ওড’ লিখে। তাঁর কবিতা দীর্ঘ ও মনোক্তিনির্ভর। অন্যদিকে পেসোয়া নামে পেসোয়া তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করেন চারটি কবিতার বই। ইংরেজি ও ফরাসি দুই ভাষাতেই লিখতেন। তাঁর কাব্যভাষা সরল ও সত্যসন্ধানী। ‘পর্তুগালের সমুদ্র’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘হে লবণাক্ত সাগর, বলো কী পরিমাণ লবণ তোমার/ পর্তুগালের চোখের জল!/ তোমাকে পাড়ি দিতে গেলে/ কত ছেলে অতন্দ্র জেগেছিল ব্যর্থভাবে,/ কত মায়েরা করেছিল ক্রন্দন!/ কত বয়স্ক অবিবাহিতা আমৃত্যু থেকে গিয়েছিল/ তাই, যাতে তুমি, হে সমুদ্র, হও আমাদেরই!’

 ৩.

 বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর কবিতা শিরোনামের বইটির মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আলোচনায় এসেছে পেসোয়ার এই বহুমাত্রিক বহু সত্তা। কেবল তা-ই নয়, কবির বহুমাত্রিক সত্তার স্বরূপটি বইয়ের খুব সুন্দর করে শনাক্ত ও উপস্থাপন করেছেন কুমার চক্রবর্তী। বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো অনুবাদ গ্রন্থটিতে পেসোয়ার কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন এক অনাবিষ্কৃত পেসোয়াকে, পাঠকের সামনে হাজির করেছেন তাঁর বহুবর্ণিল রূপ; যা সাধুবাদযোগ্য এবং পেসোয়ার প্রতি দুর্মর ভালোবাসারই স্মারক। তবে অনুবাদকের ভাষ্যমতে, ভালোবাসা পরিশ্রমপ্রার্থী, সে পরীক্ষা চায়, চায় নিষ্ঠা ও আত্মদান। সে কথার সূত্র ধরে বলা যাবে, সেই পরিশ্রমের, পাশাপাশি অভিনিবেশের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে আলোচ্য বইটিতে—ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভুল বানানগুলোই তার সাক্ষ্য দেয়। তা ছাড়া আছে কিছুটা তাড়াহুড়োর ছাপও। তবে বাংলা ভাযায় পেসোয়াকে তুলে এনে অনুবাদক কুমার চক্রবর্তী যে দায়িত্ব পালন করলেন, তার জন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পাবেন।