বাবার ফেরার পথে চাঁদ হব

সত্তর দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি আবিদ আজাদ। আজ তাঁর ষোড়শ মৃত্যুবার্ষিকী। পিতৃস্মৃতি লিখেছেন কবির ছেলে তাইমুর রশীদ

বিজ্ঞাপন

'বাবা' শব্দটি সব সময় আমার কাছে ভিন্ন কিছু। এক ভিন্ন অনুভূতি। আবেগের বড় এক জায়গা। খুব ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। তাই আমার কাছে বাবাই ছিলেন সব। ছেলেরা নাকি মা ভক্ত হয়। কিন্তু মায়ের শূন্যতার সবটুকু পূরণ করে আমার অস্তিত্বের সবটুকু জুড়ে ছিলেন আমার বাবা। মা নেই, ভাবতে সব সময় খারাপ লেগেছে। কিন্তু বাবা নেই, এ যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা। বাবা না থাকলে পৃথিবী কিভাবে উল্টে যায়—এর বড় সাক্ষী আমি। এখনো মনে পড়ে, ছোটবেলায় বাবাকে জড়িয়ে না ধরলে, বাবার শরীরের ঘ্রাণ না পেলে ঘুমই আসত না। এ যেন এক অদ্ভুত মায়াজাল!

বাবা ছিলেন আবেগি মানুষ। কবিরা সম্ভবত এমনই হন। বাবাকে কখনো পার্থিব জীবন নিয়ে খুব বেশি ভাবতে দেখিনি। বাবার জীবনের শেষ সময়গুলোতে যখন চিকিৎসা ব্যয় মেটানো কষ্টসাধ্য ছিল—তখনো এ নিয়ে ন্যুনতম আক্ষেপ দেখিনি। অথচ কবিতার প্রতি তার আমৃত্যু এক অদ্ভুত ভালোবাসা দেখেছি। রাতের পর রাত জেগে তার কবিতা চর্চা, খাতায় কাটাকুটি আমার কাছে ছিল বিস্ময়। আমার লেখালেখির হাত নেই। তবে বাবার কবিতা আমার সবসময় খুব প্রিয়। বাবার কবিতার লাইনে লাইনে যেন আমিও কোথায় মিল, সেটা খুঁজতাম, খুঁজে পেতাম। এখন অবধি কেন জানি অবসরে, মন খারাপ করা সময়ে, বাবার প্রথম কাব্যগ্রন্থ অর্থাৎ ছাপার অক্ষরে প্রথম কবিতা গ্রন্ত ঘাসের ঘটনার আজও তুমি কবিতাটি বারবার পড়ি। পড়তে ভালো লাগে:

'বুক থেকে অবিস্মরণীয় মৌনতার লতাতন্তু ঝরাতে-ঝরাতে চলে গেছ তুমি।

আমি পড়ে আছি অপাঙ্গেবিদীর্ণ হতশ্রী বাড়ির মতো একা আকণ্ঠবিরহী এই একা আমি...

তোমার জীবন আজ চারিদিকে বস্তুর জীবনে, তোমার হৃদয় আজ আকরিক লোহায়,দস্তায়,টিনে।

আজো তুমি প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের চেয়ে আরো বেশি গভীর প্রকট চাহিদার মতো

লেগে আছ।

আর কোন মাঠ নেই, আলো নেই, হাওয়া নেই, খোলামেলা চাওয়া-পাওয়া নেই।

তুমি চলে গিয়ে আজো আক্রমণ করো, আজো তুমি প্রয়োজন সৃষ্টি করে চলো…

বিজ্ঞাপন

বাবার বহু লেখায়, বহু কবিতায় আমার কথা উল্লেখ আছে। ‘তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?’ এই কাব্যগ্রন্থে আমার বাবা যখন লেখেন: —

'যা কিছু হাতের কাছে যায় তাতেই আমার ছেলে

তার নাম লেখে—

তার নাম লিখতে লিখতে ভরে ফেলে...'

তখন ভাবি, আমার কতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় বাবাকে নাড়া দিত। বাবার কবিতা সবসময় কেন জানি খুব টানত। আনন্দ, বেদনা, আবেগী সব মুহূর্তে বাবার কবিতাতেই আশ্রয় খুঁজেছি। যখন শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রেখেছি তখন ভালো লাগত, 'তবে ভালবাসা ইশারায় যদি ডাকে/সবচেয়ে দ্রুত যেতে পারি মনে মনে-/যাও মন-পাখি উড়ে যাও ঝাঁকে ঝাঁকে/আমি বসে থাকি কুয়াশার জংশনে।'

অথবা “বল আমাকে ভালবাসিস/নইলে এবার খবর আছে/তোর বাবাকে জানিয়ে দিস্/অস্ত্র আছে আমার কাছে।

বল আমাকে ভালবাসিস/নইলে এবার জবাব পাবি-/যখন খুশি মারব শিস্/আমায় দেখে থমকে যাবি।'

প্রথম প্রেম, তাকে লেখা প্রথম চিঠি, তার সাথে অভিমান, ভালো লাগা সব অনুভূতি প্রকাশেই বাবার এসব কবিতার কত যে আশ্রয় নিয়েছি। চিঠিতে কত কতবার যে বাবার কবিতার চরণ লিখেছি, তার তো কোনো হিসেবই নেই। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাবার প্রেমের কবিতার পকেট বই আমার কাঁধ ব্যাগেই থাকত।

শেষ দুটো বছর বাবা শ্বাসকষ্টের জটিল সমস্যায় ভুগেছেন। আজ হাসপাতাল তো কাল বাসা, তো আবার পরশু হাসপাতাল পুরো দুটি বছরই এভাবে কেটেছে। কি অদ্ভুত—হাসপাতাল কিংবা বাসায় বাবার প্রথম প্রশ্নই হত, 'আমার কবিতার খাতাটা এনেছ বাবু?' ভাবতাম কতটা কবিতাপাগল আমার বাবা। শত অসুস্থার মাঝেও একটু ভালো বোধ করলেই বলতেন কলম নিতে। বাবা বলতেন, আমি লিখতাম। আর শরীর সায় দিলে বাবা নিজেই কলম নিয়ে বসতেন। হাসপাতালে অসুস্থ শরীরে লেখা কবিতাগুলো বাবার মৃত্যুর পর ‘হাসপাতালে লেখা’ কাব্যগ্রন্থ আকারে প্রকাশ করি। বাবার মৃত্যুর ১৬ বছর পরও বারবার এই কবিতাগুলো পড়ি। আর বাবাকে অনুভবের চেষ্টা করি। চিন্তা করি—কী করে শরীরে সুইঁয়ের যন্ত্রণা আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে একটা মানুষ এভাবে লিখতে পারে? ভাবি, আসলে এই তো কবি। বাবা যখন লেখেন, 'মৃত্যুকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াই আমি এক রাখাল, ভেড়ার পালের মতো মৃত্যু চড়ে বেড়ায়, রৌদ্র-মাঠে-প্রান্তরে' অথবা 'স্পষ্ট হচ্ছে শুধু ফিরে যাওয়ার রাস্তা, চশমার কাচ মুছতে আর ভাল্লাগে না আমার।'

অনুভব করি মৃত্যুকে কি এক অদ্ভুত যন্ত্রণা নিয়েই না আলিঙ্গন করেছেন আমার বাবা। বাবা যখন লেখেন 'মৃত্যুর হাতকে আজ পরিচ্ছ্ন্ন মনে হলো খুব/জীবন, প্রতিষ্ঠা, গ্লানি সব তার মুঠোয় লুকালো'—তখন কেন জানি নিজের অজান্তেই চোখে জল চলে আসে।

বাবার শারীরিক মৃত্যু হয়েছে ২০০৫-এ। কিন্তু আমার বাবা এখনো আমার সবকিছুর কেন্দ্রে। আমার ভালো লাগা-খারাপ লাগা এখনো আমি নিরবে বিড়বিড় করে বাবার সাথে ভাগাভাগি করি। জানি, আমার বিশ্বাস, বাবা ঠিকই শুনতে পান। এখনো যখন কোথাও বাবার কবিতা নিয়ে আলোচনা শুনি, অথবা কোন কণ্ঠে বাবার কবিতার আবৃত্তি শুনি—ভালো লাগে। বাবার কবিতা নিয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর গবেষণার খবরে গর্ব বোধ করি যে, আমি কবির সন্তান। বাবার কবিতা, গল্প, উপন্যাস, আত্মস্মৃতি—এসব নতুন করে প্রকাশের নানা পরিকল্পনা মাথায় ঘুরপাক খায়। কিন্তু জীবনের টানাপোড়েনে অনেক কিছুই মেলাতে পারি না। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। খুব বেশিক্ষণ বাবার কথা ভাবলেই দুচোখ বেয়ে জল নেমে আসে। ঝাপসা চোখে তখন বাবার মুখটা ভেসে আসে। আমি যেন নিজের অজান্তেই বাবার এই কবিতাটি বিড়বিড় করতে থাকি…

'তারপর বাবার ফেরা যখন অন্ধকার হয়ে আসবে/একটি লক্ষীহারা পাখি ডাকবে ঘরের ওষ্ঠাগত ডালে/কুকরের মতো দূরগামী কান্নায় উঠে বসবে উচ্ছন্ন আটচালা।

দেউলিয়া সুপারিসারির পাড়া দিয়ে/কুয়াশার ঢালুতে ঝকঝকে জ্যোৎস্নার টুকরো ছড়িয়ে ফতুর হতে হতে/সেই নিশুতিরাতে আমি আমার বাবার ফেরার পথে চাঁদ হবো।'

তুমি অনেক ভালো থাকো, বাবা। তুমি ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকি।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন