বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বরে পত্রিকা বের হতে পারেনি। ১৭ তারিখ প্রস্তুতি নিয়ে পত্রিকা বের হয়েছিল ১৮ তারিখ। পত্রিকাগুলোর প্রধান সংবাদের মধ্যে ফুটে উঠেছে ৯ মাসের অবরুদ্ধ অবস্থার পর স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আনন্দ। ‘বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুধারা বৃথা যায় নাই/ বাংলাদেশ রাহুমুক্ত’ (দৈনিক আজাদ, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১) সংবাদে বলা হয়, ‘সংগ্রাম কোনো দিন ব্যর্থ হয় না। ব্যর্থ হয়নি বীর প্রসবিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম। যে সংগ্রামে সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি ছিল দুর্জয় মুক্তিযোদ্ধা, সে সংগ্রাম বিফল হতে পারে না। তাই বৃথা যায়নি বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুধারা। অন্ধকারের বক্ষবিদারী স্বাধীনতার লাল সূর্যোদয় হলো বাংলাদেশের রক্তাক্ত আকাশে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল একটি নতুন দেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নবরূপায়ণ ঘটল গত বৃহস্পতিবার (১৬ ডিসেম্বর) দখলদার পাকিস্তানি ফৌজের বিনা শর্তে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।’ এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়, ‘বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর আত্মদানের মাধ্যমে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে আমরা ছিনিয়ে এনেছি।’

তখন মানুষের মধ্যে মুক্তির আনন্দ ছিল অপার। সেই চিত্রও পাওয়া যায় সংবাদপত্রের পাতায়। ‘রাজধানীর আকাশ বাতাস “জয় বাংলা” স্লোগানে মুখরিত’ (আজাদ, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ তুলে ধরা হয়েছে বিজয়ী বাঙালির প্রতিচ্ছবি, ‘দীর্ঘ ২৫ বৎসরের স্বৈরাচারী পাঞ্জাবি শাসকচক্রের বর্বরতা নির্মম নির্যাতন ও শোষণের অবসানের বহু প্রতীক্ষিত বার্তাটি ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে রাজধানীর অযুত জনতার বুকে বিজয়ের যে উত্তাল তরঙ্গ উচ্ছ্বাসিত হইয়া উঠিয়াছে তাহা স্বচক্ষে না দেখিলে উপলব্ধি করা যায় না। দখলদার বাহিনী সান্ধ্য আইন জারি করিয়া যখন আত্মসমর্পণের আয়োজনে ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে জনতা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করিয়া ঊর্মিমালার মতো নামিয়া আসে রাজপথে। সেই অভূতপূর্ব প্রাণাবেগ, প্রাণচাঞ্চল্য ও স্বতঃস্ফূর্ত জনতার তরঙ্গমালা কেহ স্বচক্ষে না দেখিলে বিশ্বাস করিতে পারে না।’

সরকার দ্বারা পরিচালিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকাটি ১৮ ডিসেম্বর থেকে নাম পরিবর্তন করে দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশিত হতে শুরু করে। জয় বাংলার জয়’ শিরোনামে এদিন এ দৈনিকেও ছিল বিজয়ের খবর, আর সেই সংবাদের মধ্যে যুগপৎভাবে লুকানো ছিল হাসি ও কান্না।

দৈনিকগুলোতে বিজয়ের সংবাদের সঙ্গে ওঠে আসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের করুণ কাহিনি। ‘সোনার বাংলায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড’ (ইত্তেফাক, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১) অংশে ‘সাংবাদিক সাহিত্যিক অধ্যাপক চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবীসহ শতাধিক সোনার দুলাল নিহত’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, ‘পাক সামরিক জান্তার শেষ নৃশংস গণহত্যা, তথা বাংলাদেশ হইতে বুদ্ধিজীবী নির্মূল অভিযানের নির্মম শিকারে পতিত সোনার দুলালদের ক্ষত-বিক্ষত ও পুঁতিগন্ধময় ও বিকৃত মৃতদেহগুলি রায়ের বাজারের পার্শ্ববর্তী খানা-খন্দক, নালা-ডোবা, ইটের ভাটা ও গর্তে, কোথাও অনাবৃত এবং কোথাও সামান্য মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় ছড়াইয়া-ছিটাইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। সবগুলি মৃতদেহের চোখ বাঁধা, বুকে, মাথায় অথবা পিঠে গুলি ও বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন এবং দুই হাত পিছনে শক্ত করিয়া বাঁধা। অনেকগুলির চোখ উপড়াইয়া ফেলা হইয়াছে।’

দৈনিক পূর্বদেশ-এর প্রধান সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘হে বীর হে নির্ভয় তোমারই হলো জয়/ জয় বাংলা বাংলার জয়’ (১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১)। আবার একই পত্রিকার ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ প্রকাশিত ‘এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের জবাব কি’-তে স্মৃতিচারণার মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে মিশে গেছে বেদনার নীল শিখা।

তখনকার পত্রপত্রিকা দেখলে বাংলাদেশের বিজয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিও উপলব্ধি করা যায়। ‘লোকসভায় ইন্দিরা গান্ধী/এ বিজয় আদর্শের বিজয়’ (আজাদ, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ বলা হয়, ‘১৭ ডিসেম্বর নয়াদিল্লি: মহান বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী আজ এখানে বলেন যে বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর নিকট হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ফলে যে বিজয় সূচিত হইয়াছে তাহা কোনো সামরিক বিজয় নহে,Ñতাহা আদর্শের বিজয়।’

ঢাকা শহরে সে সময় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীকে বরণ করার আয়োজন চলছিল নাগরিক সমাজের উদ্যোগে। ‘শহীদ মিনারে নাগরিক সম্বর্দ্ধনা/মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর জোয়ানদের প্রতি প্রাণঢালা অভিনন্দন’ (আজাদ, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ বলা হয়, ‘গতকাল নাগরিকবৃন্দের পক্ষ হইতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক বিরাট সমাবেশে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর জোয়ানদের প্রাণঢালা অভিনন্দন জানান হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা। সভায় বেগম সুফিয়া কামাল, ডা. অদুদ, ফজলুল কবীর ও জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বক্তৃতা করেন।’ সভায় সুফিয়া কামাল অশ্রুভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আজ যে মা-বোন মানসম্ভ্রম হারাইয়াছে,Ñযে ভাই বুকের রক্ত ঢালিয়া দিয়াছে, তাহাদেরই কথা বারবার মনে পড়িতেছে। আমাদের মনে রাখিতে হইবে যে বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি শহীদের খুনে সিক্ত। তাই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা আজ পবিত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য আজ শান্তির প্রয়োজন। যাহারা গত আট মাস ধরিয়া দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করিয়াছিল,Ñসেই সব জঘন্য ব্যক্তিদের প্রতি সবারই ক্রোধ থাকিতে পারে। তবে তিনি জনতাকে তাহাদের বিচারের ভার নিজেদের হাতে না নিবার আবেদন জানান।’

বঙ্গবন্ধু তখনো ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে অন্তরীণ। আর বঙ্গবন্ধুর পরিবার ঢাকায় বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর মুক্তির অপেক্ষায়। সে সময় বেগম মুজিবের সঙ্গে নেতৃস্থানীয় অনেকে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ‘বন্দীখানায় এক কাপ চা না খেয়ে যেতে পারবেন না’ (পূর্বদেশ, ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১)। এই সংবাদভাষ্যে লেখা হয়, ‘জাতির জনকের পত্নী বেগম মুজিবুর রহমান মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার উদ্দেশে কথা কয়টি বলেন। গতকাল রবিবার মধ্যাহ্নে লে. জেনারেল অরোরা এক সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারে বেগম মুজিবের বন্দীখানায় উপস্থিত হন।...বেগম মুজিব যখন লে. জেনারেল অরোরার সামনে মাতৃসুলভ সহাস্য বদনে হাত তুলে অভিবাদন জানান, তার আগেই জেনারেল অরোরা আসন থেকে ওঠে সামরিক কায়দায় বেগম মুজিবকে স্যালুট (সালাম) জানান।...চা পানের সময় শেখ সাহেবের ঢাকায় উপস্থিত ছেলেমেয়েদের সাথে জেনারেল অরোরাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।’ এভাবে ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছিল।

একই সমান্তরালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্রও বেরিয়ে আসতে থাকে। ‘ঢাকা প্রেসক্লাবে আয়োজিত শোকসভার দাবি/ ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও বিচার চাই’ (ইত্তেফাক, ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ বলা হয়, ‘জঙ্গিনায়ক ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীনে দখলদার পাকিস্তান সামরিক জান্তা বাংলাদেশে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত করিয়াছে, সেই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদ্‌ঘাটন করা একান্ত প্রয়োজন। এই তথ্য ভিন্ন বাংলার স্বাধীনতাসংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব কে জি মুস্তাফা গতকাল (সোমবার) সকালে ঢাকা প্রেসক্লাবে বাংলাদেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের শিকার অধ্যাপক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, তথা বুদ্ধিজীবীদেরসহ সর্বস্তরের নিহতদের জন্য আয়োজিত এক শোকসভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বক্তারা উপরোক্ত অভিমত প্রকাশ করেন। শোকসভা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে শহীদানের জন্য গায়েবানা জানাজা আদায় করা হয়।’

শুধু বুদ্ধিজীবী হত্যা নয়, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল চরম ক্রোধে। ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞে বাংলাদেশকে পরিণত করেছিল শ্মশানে। এসবের চিত্রও পত্রিকায় বের হচ্ছিল। ‘দেশে দশ সহস্রাধিক কোটি টাকার সম্পত্তি ধ্বংস/ হানাদার বাহিনী বাংলার ১০ লক্ষাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে’ (আজাদ, ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ গোলাম আম্বিয়া প্রদত্ত সংবাদে বলা হয়, ‘কুমিল্লাস্থ বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে কিছুদিন যুদ্ধবাজ ইয়াহিয়া সরকারের বর্বর সেনাবাহিনীর নরহত্যা এবং ধ্বংসলীলার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে গোপনে একটি প্রাথমিক জরিপ চালানো হয় বলে জানা যায়। এ জরিপ অনুযায়ী দস্যু হানাদার বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০ লক্ষাধিক নিরীহ নর-নারী ও শিশুকে হত্যা করে এবং ১০ হাজার কোটি টাকার অধিক মূল্যের সম্পত্তি ধ্বংস করে।’ এ সংবাদ প্রতিবেদন থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, দেশের অর্থনীতি ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা ও বিপণিকেন্দ্র, হাটবাজার, ঘরবাড়ি, শত শত গুদাম জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা জানা যায়। পাকিস্তানি বাহিনী যে আত্মসমর্পণের আগে ঢাকা স্টেট ব্যাংকের টাকা পুড়িয়ে দিয়েছিল, সে খবরও উঠে এসেছিল প্রতিবেদনটিতে।

এ পর্যায়ে শোনা গিয়েছিল ছাত্রসমাজের কণ্ঠ। তাদের বক্তব্যের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও দেশ পুনর্গঠনের অঙ্গীকার পাওয়া যায়। ‘ধ্বংসস্তূপ হইতেই বাংলাদেশকে গড়িয়া তোলা হইবে/ মুক্ত বাংলার রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম ছাত্র সমাবেশে বলিষ্ঠ শপথ ঘোষণা’ (ইত্তেফাক, ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ বলা হয়, ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক মাঠে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ছাত্রসভায় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার উদ্দেশে আত্মনিয়োগের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। সভায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কারাগার থেকে যেকোনো মূল্যে মুক্ত করে আনার জন্য সকল বক্তাই দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী সভায় সভাপতিত্ব করেন।’

অন্য সভাটি ছিল ছাত্র ইউনিয়নের। ‘ছাত্র ইউনিয়নের সভায় বজ্রশপথ/ শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করবই’ (আজাদ, ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১)-এ বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন দেশে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার জন্য সকলের প্রতি সর্বশক্তি নিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছে বলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ। রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে শত্রুর কারাগার হতে মুক্ত করার জন্যও ছাত্র ইউনিয়ন সংকল্প ঘোষণা করেছে। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ভবনের প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের এক কর্মী সমাবেশে এই আহ্বান জানান হয়। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নূরুল ইসলাম [নূরুল ইসলাম নাহিদ] এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বক্তৃতা করেন।’

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সমকালীন বিদ্বৎসমাজকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তার ছবি ফুটে উঠেছিল পত্রিকার সম্পাদকীয় ভাষ্যেও। ইত্তেফাক-এ ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ প্রকাশিত ‘বধ্যভূমির বীভৎসতা’ শিরোনামের শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘মানুষ-জন্তুর হু-হুংকার আর শ্মশানের শেষ প্রান্তচরদের পতনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ে সাড়ে সাত কোটি বঙ্গসন্তান যখন অনাবিল বিজয়োল্লাসে মত্ত, তখন উদ্‌ঘাটিত মানব-ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের কাহিনি আমাদের যুগপৎ বিস্মিত, হতভম্ব ও অবর্ণনীয় বেদনাহত করিয়াছে।...যাঁহারা নিহত হইয়াছেন, তাঁহাদের প্রায় প্রত্যেকেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। দেশ ও দেশের মাটির সঙ্গে তাঁহাদের চিত্ত বিগলিত হইত। এই সব বুদ্ধিজীবী ও গুণী ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুতে দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হইল, তাহা কোনো দিন পূর্ণ হইবার নয়।’

তবে সবকিছুর পর মানুষের মধ্যে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার প্রেরণা। এ সময় প্রতিটি সংবাদপত্রেই এ-সংক্রান্ত সম্পাদকীয় প্রকাশ পায়। ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক আজাদ-এর সম্পাদকীয় বক্তব্য ‘জয় বাংলা’য় বলা হয়, ‘নবীন বাংলার জন্ম হইয়াছে। জয় বাংলার জয়ের সূচনায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ তাহাদের নবযাত্রা শুরু করিয়াছেন। ইতিহাসের এই স্মরণীয় ঘটনা এক অত্যুজ্জ্বল সম্ভাবনা লইয়া আসিয়াছে। বিপুল ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে একটি নূতন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইল।’

বঙ্গবন্ধু তখনো কারাবন্দী। তাঁর অভাব অনুভব করছেন সবাই। এই অবিসংবাদিত নেতার আশু মুক্তিই সে সময় সবার কাম্য। তাই নেতার ফিরে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করে সংবাদপত্রে বলা হয়েছিল পুনর্গঠনের কথা, ‘জয় বাংলার সংগ্রাম এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে। স্বাধীনতার সুফল সর্বস্তরে পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব এখন সবাইকে বহন করিতে হইবে।’

মূলত এভাবেই বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে শোকে মুহ্যমান হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। তারা আশা ছাড়েনি। রক্তে কেনা দেশকে গড়ার স্বপ্নে তখন সবাই বিভোর। ১৮ থেকে ২১ ডিসেম্বরের সংবাদপত্রগুলোতে চোখ বোলালে এই সত্যই ফিরে ফিরে আসে।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন