default-image

আষাঢ়-শ্রাবণজুড়ে তুমুল কোলাহলে, আকাশের কোল ছাপিয়ে বৃষ্টি নামার দিন কবেই শেষ হয়ে গেছে। এখন বর্ষাদিনের বৃষ্টি দেখে মনে হয়, কেউ যেন পুরোনো দিনের কোনো বেদনার স্মৃতি মনে করে মাঝেমধ্যে চোখের জল ফেলছে। এখন বৃষ্টির দিনেও প্রহর-ঘণ্টাগুলো আর একটানা ভিজতে চায় না, তারা লম্বা ছুটি নেয়। দিনের শেষ আর শুরুও নানা চিহ্নে তাদের নিজস্বতা ধরে রাখে, দুপুরটা সফেদ হয়ে জ্বলতে থাকে। কিন্তু ছেলেবেলায় আমার শহরে বৃষ্টি পড়ত দিনের পর দিন, বিরতিহীন। এক দিন থেকে অন্য দিনটাকে আলাদা করা যেত না, ভোরের আকাশ ইস্পাত-ধূসর রং মেখে ঝিম মেরে থাকত, দুপুরেও তাতে কোনো স্বচ্ছ আলো খেলত না, সন্ধ্যার কালি সব ঢেকে দেওয়ার আগপর্যন্ত ওই ধূসরতার রাজ্যপাট সামলে রাখত। শেষ রাতে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য বৃষ্টিটা ধরত, তখন মনে হতো আকাশটা যেন দম ফেলছে, কিন্তু সে আর কতক্ষণ। সকালটা জাগত জলের শব্দে। বৃষ্টির শাসনে স্থবিরতার একটা হুমকি থাকত, কিন্তু তারপরও আড়মোড়া ভেঙে জাগত শহর, নিত্যদিনের আয়োজন শুরু হতো। ছাতা মাথায় অফিস-আদালতের দিকে ছুটতেন বেতনভুক আর পেশাজীবীরা, বন্দর–বাজার-মহাজনপট্টিতে বেচাকেনার পালা শুরু হতো, আর আমরা কাঁধে বই ফেলে রাস্তা ডোবানো পানিতে পা ফেলে প্রচুর আওয়াজ তুলে যেতাম স্কুলে এবং ছাতার বর্মকে পরাস্ত করে বৃষ্টি ভেজাত আমাদের পিঠ, আস্তিন আর পা। আমার শহরে শৈশবে আমি মানুষকে সাদার বাইরে খুব একটা রং পরতে দেখিনি। আমাদেরও পরতে হতো সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, কেউ কেউ ঝোলানো শার্টের নিচে পরত পায়জামা। আমাদের কাপড়ে লম্বা-মেয়াদি বৃষ্টি চিতি ফেলত—সাদা জমিনে বিন্দু বিন্দু, কালো, ঘনবদ্ধ অথবা ছড়ানো–ছিটানো। সারা বর্ষায় সেগুলো স্থায়ী হয়ে থাকত। এখন ‘চিতি পড়া’ কথাটা আর শোনা যায় না। ছেলেবেলার বর্ষার মতো চিতি পড়াও বিদায় নিয়েছে, স্মৃতির পাতায় শুধু রেখে গেছে কিছু কালো কিন্তু উজ্জ্বল বিন্দু।

বর্ষায় আমার শহরে ইস্পাত-ধূসর যদি ছিল একটা রং, সারা দিন সেই রঙের নানা পালাবদলও ঘটত আমাদের মনে। স্কুলে অঙ্কের ক্লাসটা আমার জন্য ছিল সুরমা-কালো, গাঢ়; দুপুরের লম্বা বিরতিতে সেই রঙে রুপার প্রলেপ পড়ত, ছুটির ঘণ্টা বাজলে আকাশটা যেন করমচার মতো সাদা-লালে জেগে উঠত।

বৃষ্টির যে এত শব্দ থাকে, আমার শহরে আমাদের সময়ের মানুষেরা তা ভালোভাবেই জানত, যারা কানে হাত দিয়ে রাখত না, তারা। 

তখন কানে হাত দেওয়া মানুষ বলতে গেলে আমার চোখেই পড়ত না, অথচ এখন এই মানুষেরা এত অজস্র! কোনো গান, কোনো হাসি অথবা কলরোল তারা শোনে না, তাদের কান দখলে নিয়েছে আত্মপ্রচারের আওয়াজ, ক্ষমতার গর্জন আর শক্তির হুংকার; অথবা নগর আর যন্ত্রজীবনের ঘর্ঘর, প্রযুক্তির হোয়াইট নয়েজ। বৃষ্টির শহরে সন্ধ্যায় জলে ডোবা মাঠে ব্যাঙের গান—গানই তো ছিল তাদের ডাক—শুনতাম, যেন তারা সমস্বরে আষাঢ়কে জানাচ্ছে, তারও আছে; শ্রাবণে মণিপুরী মন্দির থেকে ভেসে আসা মাদলের শব্দের সঙ্গে ঝুলনযাত্রার মন্দ্রিত গান, রাধা-কৃষ্ণের লীলাকে যা সুরে সুরে করত উদ্​যাপন, পাড়ার কোনো বাড়ি থেকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে কারও সাধা সুর অথবা একটি গানের কলি। সন্ধ্যাটা মুখর হয়ে থাকত এই সব শব্দে এবং রাতে বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে কান পেতে দিতাম টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের জন্য। কী অপার্থিব ছিল সেই শব্দ—ছন্দিত, অন্তহীন। যত রাত হতো, শব্দটা তত অন্তরঙ্গ হতো, যেন কোনো জাদুর স্টিল ড্রামে বৃষ্টি তুলছে তার মায়াবী সুর। কত রাত যে চোখে ঘুম নেমেছে এই আবেশ ছড়ানো শব্দে, হিসাব নেই, হয়তো আমার স্বপ্নেও ছায়া ফেলেছে টিনের চালের গান, কে জানে।

এই তুলনাহীন সংগীতের সঙ্গেও আমার কত দিনের ছাড়াছাড়ি! 

মাঝেমধ্যে ভাবি, এই সময়ের মানুষের চোখে যে ঘুম না থাকা, অথবা ঘুমকে নির্বাসনে পাঠিয়ে লোভের নানা অলীক স্বপ্নে চোখকে ব্যস্ত রাখা এবং সারা রাত বালিশ আঁকড়ে বিছানার এপাশ–ওপাশ করা—এসবের একটা উপশম তো হতে পারত টিনের চালে বৃষ্টির ক্যালিপসো সংগীত। তবে তা কি আর সম্ভব? বৃষ্টির শহর যেমন নেই, টিনের চালও নেই—গ্রামে এখনো আছে, তবে একদিন উন্নয়নের ঢেউ সেই চালগুলো উড়িয়ে নিয়ে সিমেন্টের ছাদ বসিয়ে দেবে তাদের জায়গায়। গ্রামেও এখন বৃষ্টি নামে রাস্তার পাশে খঞ্জ ভিখারির পেতে রাখা টিনের থালায় হঠাৎ জোটা সিকি-আধুলির মতো।

আমার শহরে বৃষ্টির আরেকটা শব্দ পথচলা মানুষকে শিহরিত করত, যা বাজাত শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া অনেকগুলো ছড়া, যাদের উৎপত্তি পাহাড়ে এবং যাদের স্বচ্ছ পানি নিচের পাথর-নুড়িগুলোকেও আড়াল দিত না। ছড়াগুলোতে স্রোত ছিল প্রবল, কাগজের একটা নৌকা ভাসিয়ে দিলে চোখের পাতা ফেলার আগেই তা নিরুদ্দেশ হতো। ছড়াগুলো এখন হয় মৃত, না হয় ম্রিয়মাণ; বর্জ্যে আর দূষণে তারা বিপর্যস্ত। অনেক ছড়া দখলও হয়ে গেছে, তারা চাপা পড়েছে ইট-সিমেন্টের নিচে। গত বর্ষাতেও দেখেছি, যেন কায়ক্লেশে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে আমার পাড়ার ছড়াটা, আরও দুই কি তিনটি ছড়ার সঙ্গে। 

বৃষ্টির শহরে গাছেরা ছিল অসংখ্য এবং নিপাট সবুজ। সেই সবুজের মধ্যেও ছিল কত বৈভব—শেওলা থেকে কপিশ, কচি কলাপাতা থেকে বোতল সবুজ। গাছগুলো এবং বাঁশঝাড়গুলো—যাদের দেখা যেত প্রায় প্রতিটি পাড়ায়—ঝোড়ো বাতাসে দুলত আর হুসহাস শব্দে একটা চাঞ্চল্যের আওয়াজ তুলত। আমার শহরে তালগাছও ছিল। এক পায়ে দাঁড়িয়ে তারা মেঘ থেকে বাজ ছিনিয়ে নিত। এখন তালগাছ নেই, এখন বাজ সহজেই খুঁজে পায় মানুষের অরক্ষিত শরীর। এখন আকাশ শাসন করে—না, বটগাছ নয়, তালগাছ নয়, করে মানুষের তৈরি দালান, মানুষের অহংকার গায়ে মেখে। একদিন শ্যামল ছায়া খুঁজতে আমাদের যেতে হবে সুন্দরবন অথবা লাউয়াছড়ার সংরক্ষিত বনে।

বটগাছ নেই, বটগাছের মতো মানুষও আর নেই, যে রকম মানুষ আমি দেখেছি আমার শহরে, ছেলেবেলায়। 

তবে সে গল্প আরেক দিন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0