বেলাল চৌধুরীর ছবি অবলম্বনে
বেলাল চৌধুরীর ছবি অবলম্বনে

মার্কিন মুলুকে জন্ম নেওয়া নোবেলজয়ী প্রখ্যাত ব্রিটিশ কবি টি এস এলিয়টের ‘মাস্টারপিস’খ্যাত ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তি ছিল ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’ বা ‘নিষ্ঠুরতম মাস এপ্রিল’। আমার প্রয়াত পিতা কবি বেলাল চৌধুরীর কছে এই লাইনের তাৎপর্য আরও বৃদ্ধি পায়, যখন তাঁর প্রিয় ঔপন্যাসিক নোবেলজয়ী ‘গ্যাবো’ অর্থাৎ গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল ইহলীলা সংবরণ করেন। ঠিক তার পরের বছর, ২০১৫ সালের এই এপ্রিল মাসেরই ১৩ তারিখ ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুত্বের সান্নিধ্য পাওয়া, বিশ্বখ্যাত আরেক নোবেলজয়ী জার্মান ঔপন্যাসিক গুন্টার গ্রাসের প্রয়াণের পর বেলাল চৌধুরীর কাছে এপ্রিলের নিষ্ঠুরতা নিয়ে হয়তো আর কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না। ছিল না বলেই হয়তো তিনি যেদিন সবাইকে ছেড়ে মহাকালের পথে যাত্রা করেছিলেন, সেদিনও ছিল এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ, ২০১৮ সাল।

এক আশ্চর্য রকম বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী কবি বেলাল চৌধুরী তাঁর জ্ঞান, সুমধুর ভাষার ব্যবহার ও হৃদয়ের প্রশস্ততা দিয়ে যেমন জয় করে নিয়েছিলেন দেশ– বিদেশের খ্যাতিমান নক্ষত্রপুঞ্জের মন, তেমনি সরল ভালোবাসার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন কাঁচা বাজারের সবজিবিক্রেতা সুলতান মিঞা থেকে শুরু করে পুরানা পল্টন-সেগুনবাগিচা এলাকার পুরাতন বইয়ের ব্যবসায়ী বাচ্চু মিঞার মতো অতি সাধারণ মানুষদের। বন্ধুবান্ধব ও আড্ডা ছিল কবির জীবনের একটি বিশাল অংশজুড়ে, যার সপক্ষ দালিলিক প্রমাণের স্বাক্ষর বহন করে জার্নিম্যান বুকস থেকে প্রকাশিত কবিকে লেখা দুই বাংলার কবি-লেখকদের পত্রগুচ্ছের সংকলন ‘প্রাণের পত্রাবলি’। যেখানে কবিরবি শামসুর রাহমান কবিকে প্রেরিত একটি পত্রে লিখেছেন, ‘আপনার কর্মস্থলে নিশ্চয়ই আগের মতো আড্ডা জমে নিয়মিত। আমি এখন খুবই নিঃসঙ্গ, আপনাদের সঙ্গসুখ থেকে বঞ্চিত। এটা নিয়ে হা-পিত্যেশ করি না; তবে আপনাদের নৈকট্য আমাকে আনন্দ দেয়, জানবেন।’ কবিবন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘তোমার আরেকটি আমন্ত্রণ কলকাতায়। জুলাই মাসে ‘কৃত্তিবাস’-এর পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে তিন দিনের একটা উৎসব ও হইচই করা হবে ঠিক হয়েছে। তোমার উপস্থিতি ছাড়া সেটা জমবে কী করে?’ কথাসাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি পত্রে যেমন অভিমান করে লেখা, ‘তোমার আসলে আমাকে ভালো লাগে না, আমি এটা বুঝতে পেরেছি।’ তেমনি আরেকটি পত্রে ভালোবাসার আবেগে লিখেছেন, ‘এবার বাংলাদেশে গিয়ে আমার বারবার কান্না এসেছে। তোমাদের ছেড়ে আসি কী করে? তোমার মুখখানি লাল, কখনো শুভ্র, কখনো মনে হয় এ মুখ না জানি কত কিছু জানে।

এক আশ্চর্য রকম বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী কবি বেলাল চৌধুরী তাঁর জ্ঞান, সুমধুর ভাষার ব্যবহার ও হৃদয়ের প্রশস্ততা দিয়ে যেমন জয় করে নিয়েছিলেন দেশ–বিদেশের খ্যাতিমান নক্ষত্রপুঞ্জের মন, তেমনি সরল ভালোবাসার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন কাঁচা বাজারের সবজিবিক্রেতা সুলতান মিঞা থেকে শুরু করে পুরানা পল্টন-সেগুনবাগিচা এলাকার পুরাতন বইয়ের ব্যবসায়ী বাচ্চু মিঞার মতো অতি সাধারণ মানুষদের।
বিজ্ঞাপন

তবু চুপ করে থাকে। আমাদের বাচালতা দেখে গভীরে হাসে।’ এসব চিঠিপত্র যদি বেলাল চৌধুরীর বন্ধুবাৎসল্যের প্রমাণ বহন করে, তেমনি বাংলা সাহিত্যেও তিনি এক প্রিয় চরিত্রের নাম। তাঁকে বিষয় করে অনেক অনেক গল্প, উপন্যাস, কবিতা রচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কবি, লেখক ও সাহিত্যিকেরা। তাঁর সংগৃহীত বই ও পাঠের ব্যাপকতা নিয়ে সবিস্তার লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘অর্ধেক জীবন’ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থসহ বেশ কিছু লেখায়। তবে যে সময় এই অঞ্চলে ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিল অজানা কিংবা মিডিয়ার প্রসারও ছিল না এত ব্যাপক, সে সময় বেলাল চৌধুরী সমগ্র বিশ্বের বিচিত্র সব বই এবং বিশ্বসাহিত্যের দখল, খবরাখবর ও সংগ্রহ নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে তথ্যবহুল আলোচনাটি করেছেন বাংলা সাহিত্যের আরেক মহিরুহ প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, কবির প্রয়াণের পর তাঁকে নিয়ে জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজিত শোকসভায়।

default-image

সমগ্র জীবন মানুষের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে চলা, এমনকি চিরপ্রস্থানেও সেই ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কবি বেলাল চৌধুরীর প্রয়াণের আজ তৃতীয় বর্ষপূর্তি। তাঁর ভালোবাসায় সিক্ত পরবর্তী প্রজন্মের কবি ও সাহিত্যকর্মীরা দিনটিতে তাঁকে স্মরণ করেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে। কবির সন্তান হিসেবে আমরা তিন ভাইবোন প্রাত্যহিক জীবনের চলার পথে মর্মে মর্মে অনুভব করি, আমাদের চারপাশের জগৎ পরিপূর্ণ হয়ে আছে কত মানুষের ভালোবাসায়, যাঁদের সবাই কোনো না কোনোভাবে বাবার ভালোবাসার বলয়ে সম্পৃক্ত ছিলেন। এভাবেই আমাদের জীবন প্রবহমান হয়ে চলেছে প্রয়াত পিতার ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসার মুক্তো-মাণিক্যের মধ্যে।
অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন