পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞছবি: সংগৃহীত

আমার জানা ছিল না যে পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিত হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে। মৃত্যুর পরে পানিতে এদের মধ্যে এইটুকু তফাত। এই জ্ঞান আমি পাই একাত্তর সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে—ত্রিশ বা উনত্রিশ তারিখে। আগের রাতে একটুও ঘুম হয়নি। পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকায় কী ঘটেছে, খুলনায় বসে তা জানার উপায় ছিল না, এমনই লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল পথঘাট যোগাযোগের ব্যবস্থা। খবরের কাগজ আসা বন্ধ হয়েছিল। রেভিও বোধ হয় চলছিল, কিন্তু তা শুনে কিছু বোঝার উপায় ছিল না। দেশ অতি চমৎকার চলছে—এই কথাটা রেডিও থেকে বোঝা যেত বটে, তবে এ কথা বিশ্বাস করার লোক তখন বাংলাদেশে একজনও ছিল না। ঢাকায় ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে, সেটা জানতে কারও বাকি ছিল না। তবে ঠিক কী ঘটেছে, তার ধারণা করা নিজের আন্দাজের ওপরেই নির্ভর করছিল। খুব বাড়িয়ে আন্দাজ করার কল্পনাশক্তি যাদের ছিল, তাদেরও আন্দাজ যে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছিল পঁচিশে মার্চের রাতের ঘটনা, সেটা আমরা জানতে পারি কয়েক দিন পরে। দিনের বেলা দূরের আগুন চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, শুধু একটা হু হু শব্দ ওঠে, আর ধোঁয়াটা কালো হলে খানিকটা দেখা যায় আকাশে পুরোপুরি মিলিয়ে যাবার আগে। তবে প্রচণ্ড শব্দ ওঠে, বাতাস গরম আগুন হয়ে যায়, ঘরবাড়ি, সংসার-সামগ্রী পুড়ে যাবার কটু গন্ধটাও বাতাস বয়ে আনে। রেল রাস্তার দুপাশের টানা বস্তির কিংবা সড়কের ধারগুলোতে যৎকিঞ্চিৎ জনপদ পঁচিশে মার্চের পর থেকে অনবরত পুড়ছিল। সতর্ক, কণ্টকিত, স্নায়ু-পীড়নে জর্জরিত মানুষদের সঙ্গে যাতায়াতের পথে আমিও জনশূন্য কুঁড়েগুলো পুড়তে দেখতে পেতাম। এসব বসতির যারা বাসিন্দা, তারা তত দিনে মুছে ফেলেছে নিজেদের, শূন্য ভিটেগুলোতে আধপোড়া বাঁশের খুঁটি মাটির ওপরে কালো কালো জেগে আছে। টলটলে পানিতে ভাসছে গাদা গাদা ছাই।

সন্ধের পর অত বড় শহর খুলনা দাউ দাউ জ্বলা আগুনের ঘেরের মধ্যে পড়ে যেত। আগুনের একটা বিশাল বৃত্ত আকাশের নিচু ঝালর পোড়াতে পোড়াতে ঘেরটা ছোট করে আনছে। দিগন্ত ভয়াবহ আলোয় উজ্জ্বল, কিন্তু খানিকটা ওপরে যেখানে আলো আর পৌঁছায় না, সেখানে কি ঝকঝকে শাণানো অন্ধকার। সে অন্ধকার চিরে কান ফাটানো আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজ। যেন অন্ধকারই নিজেকে কঠিন আক্রোশে বিদীর্ণ করছে। আর এই সব শব্দের সঙ্গে ঠিক ঠিক সংগত হয়ে ভেসে আসে কুকুর-শিয়ালের চিৎকার। সেই শব্দ ভীতির, না উল্লাসের—বলা কঠিন। শিয়াল আর কুকুরেরা এই সময়েই সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

দিনের বেলায় একরকম করে চলত—গলার কাছে প্রাণটাকে কোনোরকমে ধরে রেখে, নিচু-চোখে রাস্তার মেঝে দেখতে দেখতে, শক্ত মুখে মানুষজন চলাফেরা করত—রাতে অন্ধকারে ডুবে-যাওয়া শহর সম্পূর্ণ নিস্পন্দ। উনত্রিশ তারিখে রাতে আমি ঘরে বসে বুঝতে পারি, শহর ছেড়ে যাবার জন্য বাসিন্দারা তৈরি হচ্ছে। কত দূরের শব্দ শুনতে পাচ্ছি—বাক্স–পেটরা টানাটানির নিচু ঘষ ঘষ শব্দ, বিছানাপত্র বাঁধার মৃদু ধুপধাপ আওয়াজ কিংবা হঠাৎ কোনো শিশুর অতর্কিত চিৎকার, কান্না আর মাঝপথেই সেটা থেমে যাওয়া। কেউ তার মুখে হাত চাপা দিয়েছে। বোঝা যায়, অত্যন্ত সন্তর্পণে শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনোমতেই কোনো শব্দ বাইরে না আসে। যেন মানুষেরা শব হয়ে চলাফেরা করছে, যেন মাথায় পিঠে বোঁচকা-কুঁচকি নিয়ে হেঁটে, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনে শহরের সমস্ত মানুষ শবের মিছিল করে শহর ছেড়ে যাবে। প্রচণ্ড পরিশ্রমের কাজ চলছে। কিন্তু নিশ্বাস রাখতে হচ্ছে বন্ধ করে। নিদ্রাহীন এত মানুষ এমন প্রচণ্ড তৎপর হয়ে উঠেছে, অথচ শহর যেন মরে গেছে। একটু দূরের কোনো বাড়িতে হাত ফসকে ধাতুর পাত্র পড়ে ঝনঝন আওয়াজ করে উঠল। সেটা থামতেই কানে আসে কষে বিছানা বাঁধার আঁক আঁক শ্বাস নেবার শব্দ। পাশের বিরাট বাড়ি থেকে আসছে একটা ঝপঝপ শব্দ। কেউ যেন কিছুক্ষণ পরে পরে ফ্রিজের দরজা খুলছে আর বন্ধ করছে। শব্দটা আমার মাথায় গেঁথে যায়, আমার তন্দ্রা আসে, তার ঘোরের মধ্যেই শুনতে পাই অস্পষ্ট ঝপঝপ শব্দ, কফিনের ডালা খোলা আর বন্ধ করার মতো। আমরা শহর ছেড়ে যাচ্ছি না। রাইফেলের গুলি ফাটার প্রচণ্ড কড়াং শব্দে ছেলেমেয়েরা ঘুমের মধ্যেই বারবার আঁতকে উঠছে। একদৃষ্টে খানিকক্ষণ চেয়ে আছি তাদের দিকে, তারপর নিজের অজান্তেই ঘুমে ঢুলে পড়ছি। সকালে নিদ্রাহীন চোখে বাসার বাইরে খোলা উঠোনটায় এসে দাঁড়াই।

আতপ্ত দুই চোখ পুড়ছে, সকাল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে, শবেরা বেরিয়ে আসছে রাস্তায়। শত শত নীরব মানুষ, রাস্তা পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বোঁচকা-বুঁচকির মতোই ছেলেপুলে কোলে-কাঁধে উঠেছে। খানিকটা করে এগিয়ে দিয়ে কুকুরগুলো আবার ফিরে আসে শূন্য বাড়ির দিকে, বোঝাই রিকশা গাড়ি ট্রাকের ভিড়ে রাস্তার মোড়ে মারাত্মক যানজট। রাস্তার ভিড় থেকে চোখ ফিরিয়ে দেখতে পাই বাড়ির সামনের ন্যাড়া উঠোনটায় শুকিয়ে ওঠা শিউলিগাছটার কঙ্কালে একটি দোয়েল শিস দিচ্ছে।

default-image

রাতে প্রচণ্ড গুলির আওয়াজ পাওয়া গেছে। সেসব গুলি শুধু কি বাতাসই চিরে শূন্যে মিলিয়ে গেছে—বিদীর্ণ করার জন্য পায়নি রক্তমাংসমজ্জার লক্ষ্যবস্তু? তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে এত বড় একটা নগর কী করে ফাঁকা হয়ে যেতে পারে, সে এক রহস্য। সবাই নদীর দিকে গেছে—ওপারে বাগেরহাট, রামপাল, মোংলা হয়ে মানুষেরা ছড়িয়ে পড়বে বনজঙ্গল খানাখন্দভরা খুলনা-বরিশালের ভেতরের গ্রামগুলোতে। পরিবার–পরিজনের হাত ধরে ভয়ংকর বাদা, নাবি অঞ্চলে, শরণখোলা, পটুয়াখালী, ফরিদপুরের একেবারে ভেতরের দিকে চলে যাবে। তারপর অনাহারে, মড়কে মারিতে হাজারে হাজারে মারা পড়বে, যদি না তার আগেই বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের বুলেট তাদের নাগাল পায়।

রোদ আর একটু চড়লে বাইরে বেরিয়ে এসে আমি শহরের শূন্য খোলের ভেতরে চৈত্রের বাতাসের দাপাদাপি শুনতে পাই। ঝর ঝর করে শুকনো হলুদ পাতা ঝরে পড়ছে, বাতাস তাদের ঝেঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা জনশূন্য খাঁ খাঁ। গরম হাওয়ার তোড়ে বালি-কাঁকর-ধুলো গায়ে সুচ ফোটাচ্ছে। কেউ আমাকে কিছু বলে না, আমি ঠিক ঠিক সাউথ সেন্ট্রাল রোড আর হাজী মুহসীন রোডের মোড়ে এসে পৌঁছুই। পিচ ঢালা রাস্তার ওপরে উকিলবাবুর তিন ছেলে শুয়ে আছে, সঙ্গে ধুতি-ফতুয়া গায়ে আর একজন মাঝবয়সী লোক। কী বিচিত্র শোবার ভঙ্গি তাদের? মাটিকে ভূমিবাহু ধরলে একজনের পা ত্রিভুজের মতো ভাঁজ করা, অন্য পা মেলে দেওয়া। ছোট ছেলেটি, রাজপুত্রের মতো চেহারা, টকটকে ফরসা রং, টিকোলো নাক, লাল গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, হাঁটু ভাঁজ করে তলপেটের কাছে গুটিয়ে নিয়ে যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মেজ ভাই দলা মোচড়ানো, ডানবাহুর নিচে প্রায়-ছিন্ন মাথা, দুই চোখ চেয়ে রয়েছে, বা হাতটি বড় ভাইয়ের গলার ওপর মেলে দেওয়া। কী নিশ্চিন্তে আরামে শুয়ে থাকা, শুধু জীবিতেরা এভাবে ঘুমোতে পারে না। আমি অনেকটা কাছে চলে যাই, যাওয়া উচিত নয়, তবু যাই। রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, ফেনা তুলে মৃদু কলকল শব্দে গড়িয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়, এখন শুকিয়ে চটকা উঠে গেছে এখানে-সেখানে। কার কোথায় বুলেটের আঘাত দেখতে পাই না। রাজপথে এই চারজনের শুয়ে থাকা দেখতে দেখতে কেমন অদ্ভুত সম্মোহনের মধ্যে পড়ে যাই আমি। ওদের তিনজনকেই আমি চিনতাম। দোতলা বাড়িটা পাশেই, শেক্সপিয়ার আর মিল্টন পড়া উকিলবাবুর বাড়িতে আমি একসময় খুবই যেতাম। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি, দোতলার বারান্দায় উকিলবাবু আকাশের দিকে মুখ তুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তার হালকা রুপোলি চুলগুলো এলোমেলো বাতাসে উড়ছে। আমি একদৃষ্টে তাঁর দিকে চেয়ে থাকি এই ভেবে যে তিনি দৃষ্টি নামাবেন, হয়তো আবার, আবার দেখে নিতে চাইবেন তাঁর তিন আত্মজের মুখ। কিন্তু আমার অপেক্ষা বৃথা হলো, আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন, তাঁর মৃত সন্তানেরা শুয়ে রইল শেষ মার্চের তীব্র রোদে পিচ গলে-যাওয়া রাজপথে। রূপসা নদী বেশি দূরে নয় । ঘাটে এসে যখন দাঁড়াই, তখন সূর্য একটু পশ্চিমে হেলেছে। রাস্তার দুপাশের বড় বড় বাড়ির ছাদের দখল নিয়েছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। মেশিনগান বসিয়েছে সেখানে। ট্রিগারে আঙুল রেখে উবু হয়ে শুয়ে শ্বাপদের-হিংসুক চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে ঘাটের হাজার হাজার নারী–পুরুষের ভিড়। কখন ট্রিগারে পড়বে আঙুলের চাপ কে জানে, তখন লুটিয়ে পড়বে শত শত মানুষ। এর মধ্যেই নৌকার মাঝির সঙ্গে দরাদরি, বাক্স–তোরঙ্গ নিয়ে টানাটানি, শিশুর তীব্র চিৎকার, কোনো নারীর উতরোল। কান্না। মৃত্যুর লোমশ উপস্থিতিও মানুষ বেশিক্ষণ মনের মধ্যে ধরে রাখতে পারে না। আমি এই তৎপর জনতার ভেতর দিয়ে নদীর জলের সীমানায় গিয়ে দাঁড়াই। আকাশে এত রোদ, নির্মেঘ আকাশ কিন্তু এমনি জোরালো হাওয়া যে আসন্ন জোয়ারে ফেঁপে-ওঠা নদীর বুকে এখন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউয়ের আলোড়ন। তার মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে গোখরোর চোয়াল থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইঁদুরের মতো পলায়নপর যাত্রীদের নৌকাগুলো ঢেউয়ের ঢালুতে ঢালুতে মোচার খেলার মতো দুলছে। এ রকম শান্ত আবহাওয়ায় নদীতে এত ঢেউ কখনো দেখিনি। ঠিক তখুনি ঢেউয়ের ওঠা-নামার তালে তালে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়া লাশগুলো আমার চোখে পড়ে। অসংখ্য লাশ নেমে আসছে ভৈরবের স্রোত বেয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে। নাচতে নাচতে এল তারা সংখ্যাহীন, বৈশিষ্ট্যহীন একাকার লাশ। ঢেউয়ের মাথায় তারা আছে, ঢেউয়ের নিচে তারা আছে, ঢেউয়ের ঢালু বেয়ে গড়িয়ে তারা নামছে খেলাপ্রিয় জীবিতেরই মতো। পরস্পরে আটকে গিয়ে তারা জ্যামিতির নানা ছক বানাচ্ছে, আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা বর্ণনাহীন, তারা শুধুই লাশ, মানুষের লাশ। নাচতে নাচতে দৃপ্ত ভঙ্গিতে যাবে দক্ষিণে, তারা যাবে আরও দক্ষিণে, বইঠা দিয়ে তাদের গিজগিজে হয়ে জমে থাকা স্তূপ সরিয়ে সরিয়ে পথ করে নিচ্ছে মাঝিরা, আবার এগিয়ে যাচ্ছে তারা দক্ষিণে, যাবে বলেশ্বরের স্রোতের মুখে হরিণঘাটার মোহনার দিকে। তার পরে বঙ্গোপসাগর।

সেই আমি প্রথম দেখলাম, নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে, পুরুষের ভাসে চিত হয়ে।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন