মুক্তিযুদ্ধের অনন্য সাহিত্য

>

কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে লেখা হয়েছে অজস্র বই। তার মধ্য থেকে বিজয়ের মাসে কয়েকটি বইয়ের কথা

যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাহিত্য রচনার কথা উঠলে প্রথমেই মনে পড়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্পেনের প্রতিরোধ যুদ্ধ, ভিয়েতনাম ও ফিলিস্তিনি জনগণের যুদ্ধের কথা। একাত্তরে সংঘটিত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করেও সাহিত্য রচনার প্রাবল্য চোখে পড়ার মতো। কবিতা-গল্প-উপন্যাস-স্মৃতিকথা—সব মিলিয়ে সাহিত্যের এ ধারাটি প্রাচুর্যে যেমন ঋদ্ধ, তেমনি সে সবের পাঠকপ্রিয়তাও অব্যাহত। এ লেখায় তুলে ধরব তারই কিছু দৃষ্টান্ত।

নিজবাসভূমে থেকেই আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের রাজনীতিপ্রবণ হয়ে ওঠার কালপর্বের সূচনা। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশ্ব-নাড়ানো ঘটনা নিস্পৃহ থাকতে দেয়নি তাঁকে। তাঁর বন্দীশিবিরথেকে কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি তিনি কলকাতায় পাঠাচ্ছেন সেই তখন, ‘ঢাকা যখন শত্রুপুরী ছিল’। বইটির কলকাতা সংস্করণের মুখবন্ধে জানা যাচ্ছে, ‘তখন একদিন দুই মুক্তিযোদ্ধার হাতে এসে পৌঁছল গোপন কিছু পাণ্ডুলিপি। সেই হলো শামসুর রাহমানের নতুন কবিতা: সৈন্যশাসিত বাংলাদেশের ভিতর থেকে পাঠিয়ে দেওয়া স্বর।’ আর শামসুর রহমান নিজে বন্দীশিবিরথেকে লেখার নেপথ্য-বিবরণ দিতে গিয়ে জানাচ্ছেন, ‘বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের ধ্বংসযজ্ঞ আমাদের ঠেলে দিয়েছিল হতাশার অতল খাদে। তখন পড়াশোনা, লেখালেখি, অা​িপসে যাওয়া-না-যাওয়া, খাওয়া-না-খাওয়া সবকিছুই অর্থহীন ঠেকত।...যখন এই অর্থহীনতায় ভুগছিলাম চরমভাবে...তখন হঠাৎ একদিন মনে পড়ে গেল একটা ছবির কথা। ঊনিশ শ একাত্তরের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি ছবি দেখেছিলাম সংবাদপত্রে—রাস্তার ধারে একজন গুলিবিদ্ধ মানুষ নিজের রক্ত দিয়ে লিখছেন স্লোগান, তাঁর দেশের সপক্ষে, দেশবাসীর সপক্ষে। সেদিন সেই গুলিবিদ্ধ মানুষটিকে স্বাধীনতার নকিব বলে মনে হয়েছিল আমার।...ভাবতাম, যদি একজন মৃত্যুপথযাত্রী নিজের বুকের রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির জাগরণের জ্বলন্ত স্বাক্ষর আঁকতে পারেন বোবা দেয়ালের গায়ে, যদি পাথুরে দেয়ালকে করতে পারেন অমন ঐতিহাসিক, প্রবল বাঙ্‌ময়, তবে আমি কেন খাতার পাতা শব্দাকীর্ণ করতে পারব না? আর সেই মুহূর্তেই, সেই কৃষ্ণ ঋতুতে মনস্থির করে ফেললাম, আমি আবার লিখবই। একাত্তরের এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকে আমাদের গ্রামে এক দুপুরে লিখে ফেললাম “স্বাধীনতা তুমি” ও “তোমার জন্যে হে স্বাধীনতা” কবিতা দুটি।’ বন্দী শিবির থেকে কাব্যগ্রন্থের জন্ম এভাবেই। কালক্রমে শামসুর রাহমান ভূষিত হয়েছেন আমাদের ‘স্বাধীনতার কবি’ হিসেবে। অন্য অনেক কবিতার পাশাপাশি বেশি জনপ্রিয়তাধন্য তিনি বন্দীশিবিরথেকে-এর কবিতারাজির জন্যই।

নাৎসি অধিকৃত জার্মানির মাটিতে বসে কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক লিখেছিলেন তাঁর বিশ্বখ্যাত দিনলিপি। আমাদেরও আছে। জাহানারা ইমামের ধ্রুপদি দিনলিপি একাত্তরেরদিনগুলির পাঠ সবাইকে আজীবন স্মরণ করাবে একজন আত্মত্যাগী, মহীয়সী মায়ের কথা।

একাত্তরে ঢাকা শহরজুড়ে কীভাবে চলেছিল গেরিলা তৎপরতা, তার জলজ্যান্ত বিবরণ ধরা আছে এই দিনলিপির পাতায় পাতায়। ১৯৭১-এর ১ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনার, দেশের ভেতরে এবং বাইরের প্রায় অনুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন জাহানারা ইমাম। নিজের ছেলেকে নিঃসঙ্কোচে পাঠাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে। নিজের গাড়িতে গেরিলাদের এবং তাঁদের অস্ত্রও বহন করছেন। ট্রেনিং নিয়ে ঢাকা শহরে গেরিলা অপারেশন চালাতে গিয়ে ধরা পড়েন তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পুত্র রুমী, নিজেরই বাসা থেকে। স্বামীও ধৃত হয়ে অত্যাচারিত হচ্ছেন পাকিস্তানি মিলিটারিদের হাতে। সেই ছেলে টর্চার সেল থেকে কোনোদিন ফেরেননি। এই শোকে মারা গেলেন তাঁর স্বামী। এত কিছুর পরও শোক কাটিয়ে উঠলেন জাহানারা ইমাম। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের দিনের বিবরণ দিচ্ছেন তিনি এইভাবে, ‘আজ ভোরে বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলা হলো।...২৫ মার্চ যে ফ্ল্যাগপোলটায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে আবার নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই ফ্ল্যাগপোলটাতেই আজ আবার সেদিনের সেই পতাকাটাই তুললাম।’ শেষ করেছেন এইভাবে, ‘সবাই কাঁদতে লাগলেন। আমি কাঁদতে পারলাম না। জামীর হাত শক্ত মুঠিতে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।’

 একাত্তর: করতলেছিন্নমাথা কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণামূলক এমন এক দলিল, যা স্থানিক হয়েও সর্বজনীন। যার পাঠ পাঠকের মনে জীবন্ত করে তোলে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। তাঁর বইয়ের শুরুটাই অবিস্মরণীয়, ‘আমার জানা ছিল না যে, পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ উপুড় হয়ে। মৃত্যুর পরে পানিতে এদের মধ্যে এইটুকু তফাৎ। এই জ্ঞান আমি পাই ’৭১ সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে—ত্রিশ বা ঊনিত্রশ তারিখে।’ স্মরণে রাখা দরকার, এই লাশ তিনি দেখছেন খুলনায়। আর ঢাকায় তখন চলছে জাহান্নামের আজাবকেও ছাড়িয়ে যাওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নিপীড়ন-নির্যাতন। জ্বালাও-পোড়াও থেকে শুরু করে তাদের মানুষ হত্যার সশস্ত্র তাণ্ডবলীলা। মফস্বলে থাকা হাসান আজিজুল হক দেখছেন পাকিস্তানি বাহিনীর চেহারা, তাদের কর্মকাণ্ড। অন্য কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও তলব করা হচ্ছে খুলনা সার্কিট হাউসে, যেখানে খোলা হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন সেল। পথে রিকশায় যেতে যেতে দেখছেন ট্রাকবাহী সেই সব যুবককে, যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে খুলনার কুখ্যাত গল্লামারী বধ্যভূমিতে। যারা সেখানে যায়, তাদের কেউ আর ফেরে না। হাসান আজিজুল হকসহ ২০-২৫ জন সার্কিট হাউস থেকে ভাগ্যবলে বেঁচে এলেও ভীতি তাঁদের পিছু ছাড়ে না। লাশের পর লাশ আর গাছের মাথায় ঝোলানো দেখেন শহীদ রফিকের মাথা।

খুলনার দিকে শিরোমণি বলে যে জায়গা, সেখানকার যুদ্ধ থেমে যায়। পিছু হটে পাকিস্তান বাহিনী। ফলে স্থানীয়ভাবে যুদ্ধ থেমে যায় একাত্তরের ১০ কি ১১ ডিসেম্বর। এই সময়কার স্থানিক ছবি হাসান যেভাবে আঁকেন, তা তখনকার সারা দেশের চালচিত্র হয়ে ওঠে। করতলেছিন্নমাথায় যে ভাষা ও ভঙ্গিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন খুলনার মতো জেলা শহরের ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।

সাম্প্রতিক কালে লেখা সেলিনা হোসেনের হেঁটেযাইজনমভর উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা যাবে নতুন মাত্রায়। এ উপন্যাসে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন লেখক। উপন্যাসের কাহিনিটি পরিব্রাজনের মতো। একই নায়ক নাম পাল্টে দ্বিতীয় অধ্যায়ে হন ওসমান আলি, ‘যে শৈশব হারিয়ে বড় হয়ে ওঠা একজন যুবক। যে খুঁজে বেড়ায় জহির রায়হানকে।’ সে-ও তার প্রিয়পাত্র একজন কিশোরের নিষ্ঠুর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে। এই মেধাবী ছাত্র নিজেও, গরিব ঘরের ছেলে, শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দুটি পক্ষের গোলাগুলির শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে আরিফুর রহমান নাম গ্রহণ করেন মশিরুল। নিজের সম্পর্কে তাঁর কথা, ‘আমি তো ভালোবাসি জীবনের এই রূপান্তর। একের মধ্যে বহুর বিন্যাস আমার সাধনা।’ এ রকম যে বশিরুল, তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই মানুষটিকে, ‘সেদিন যে মানুষটিকে পাকিস্তানি সেনারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তাঁর নাম ছিল লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি আগরতলা মামলার আসামি ছিলেন।’

অনতি অতীত আর বর্তমান—সবখানেই হত্যা। আছে জীবনের পদধ্বনি এবং শান্তির মিছিলও। এই উপন্যাসের অন্তিমে তাই দেখা যায় সেই মিছিলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি। ফায়জাকে আরিফুর বলেন, ‘এখন আমাদের ব্যাগ গোছাতে হবে। তুমি কি রেডি?’

 ‘হ্যাঁ, রেডি। কী নেবে? তুমি বলতে থাকো, আমি ঢুকিয়ে ফেলি।’

আরিফুর বলেন, ‘ঢোকাও একুশের ভোর। প্রভাতফেরি। গানের সুর। আলতাফ মাহমুদ। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন। শহীদ আসাদ, মতিউর। সাতই মার্চের ভাষণ। ছাব্বিশে মার্চের সকাল। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। স্টপ জেনোসাইড। জহির রায়হান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য।’

 ‘এসব নিয়ে আমাদের মানুষের মাঝে যেতে হবে। কিন্তু কত দিন হাঁটব?’

 ‘আমি দুহাত ওপরে তুলে বলি, জনমভর।’

মৃত্যুতে শেষ হয় না সব—কথাটি জানেন মানতে সেলিনা হোসেন। এরই স্বাক্ষর বিধৃত তাঁর এই উপন্যাসের পরতে-পঙ্‌ক্তিতে। যেভাবে তিনি উপন্যাসটির সমাপ্তি টানেন, চরিত্র-বিচারে তা ধ্রুপদি গোত্রভুক্ত।

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের মা মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক তেমন এক উপন্যাস, যার কাহিনি ও রচনাশৈলী অমোঘ ও চিরায়ত। তাঁর এই বইয়ে বলা হয়েছে এমন এক মায়ের কথা, চিত্রিত করা হয়েছে এমন এক মাতৃরূপ, যিনি আচারে সহজ-সরল অথচ চরিত্রে অনমনীয়। তাঁর স্বামী ছিলেন বড়লোক। চৌধুরী পরিবারের সন্তান। কিন্তু স্বামীর দ্বিতীয় দারপরিগ্রহের কারণে তাঁর সংসার ছেড়ে  চলে আসেন তিনি। আসেন একমাত্র ছেলে আজাদকে সঙ্গে নিয়ে। দুরন্ত আজাদ দিনে দিনে বড় হয়। স্কুলজীবন শেষে ভর্তি হয় কলেজে। এর মধ্যে এসে যায় একাত্তরের সেই দিনগুলো। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আজাদ যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। তাঁর কাজ ছিল সরাসরি যুদ্ধ করা নয়, সহযোগী যোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র নিরাপদে নিজের বাসায় লুকিয়ে রাখা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ব্যাপারটা কীভাবে যেন টের পায় রাজাকাররা, তাঁকে তুলে দেয় পাকিস্তানিদের হাতে। তাঁর ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন। কিন্তু আজাদ মুখ খোলেন না। তখন তিনি রমনা থানায় বন্দী। খোঁজ পেয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান তাঁর মা সফিয়া বেগম। আজাদ সে সময় শুয়ে ছিলেন নিপাট মেঝেতে। মাকে দেখে কথা বললেন শুয়ে শুয়েই। কেননা, নির্যাতন তাঁকে প্রায় পঙ্গু করে ফেলেছিল। কথা প্রসঙ্গে আজাদের কথা থেকে মা জানতে পারেন, পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ছেড়ে দেবে যদি তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের নাম প্রকাশ করেন। এ সময় দৃঢ়তার সঙ্গে মা সফিয়া বেগম ছেলেকে বলেন, ‘কখনোই নাম প্রকাশ করবি না।’ কথা শেষে মায়ের কাছে ভাত খাওয়ার আবদার করেন আজাদ। কিন্তু ভাত নিয়ে গিয়ে আর আজাদের দেখা পাননি মা। ছেলের সঙ্গে সেই ছিল তাঁর শেষ দেখা। সেই থেকে আমৃত্যু কখনোই আর ভাত খাননি আজাদের মা। কারণ, তাঁর প্রাণপ্রিয় একমাত্র ছেলে আজাদকে তো তিনি ভাত খাওয়াতে পারেননি। এখানেই শেষ নয়, মৃত্যু অবধি কখনোই আর নরম বিছানাতে শোননি মা, শুয়ে থেকেছেন নিপাট মেঝেতে। আটক ও নির্যাতিত আজাদের মেঝেতে শুয়ে থাকার দৃশ্য মন থেকে যে কখনোই মুছতে পারেননি তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর বিশ্বাস ছিল, আজাদ বেঁচে আছেন এবং অবশ্যই তিনি তাঁর কোলে ফিরে আসবেন।

মুক্তিযুদ্ধ এবং মা এই উপন্যাসে একাকার। এমন কাহিনি কি আমাদের সাহিত্যের ভান্ডারে আর আছে? বইটি একেবারেই বিরল গোত্রের। কাহিনির পেছনে সত্যতার ভিত্তি থাকলেও, নানা সূত্র থেকে এর রসদ জোগাড় করেছেন আনিসুল হক। তবে ইতিহাসভিত্তিক এ আখ্যানের অনন্য শক্তি লেখকের কল্পনা। কলম ও কল্পনার জোরে এটি হয়ে উঠেছে এমন এক উপন্যাস, যা সত্যের চেয়েও নিরেট সত্য। বলে রাখা ভালো, মা অনূদিত হয়েছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি ভাষায়।

মাহবুব আলমের গেরিলাথেকেসম্মুখযুদ্ধ বইটি যুদ্ধদিনের মহাকাব্যপ্রতিম গদ্যভাষ্য। ভূমিকা থেকে জানা যায়, লেখক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের যুদ্ধ-এলাকা ছিল ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ গণ্ডি পর্যন্ত। যুদ্ধের সময় প্রতিদিনই যুদ্ধের বিবরণ ডায়েরিতে লিখে রাখতেন লেখক। পরে দেশ স্বাধীন হলে একে আরও বিস্তারিত রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ডায়েরির ভঙ্গিটি বাদ দিয়ে প্রতিটি অধ্যায় আরও বিস্তারিতভাবে লিখতে শুরু করেন তিনি।

দুই খণ্ডে লেখা এই বই পাঠ করলে একটি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা দলের নিত্যকার মেনে চলা কঠোর সামরিক, বেসামরিক ও তাঁদের নিয়মনীতির সঙ্গে যেমন পরিচিত হওয়া যাবে, তেমনি এর ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের ব্যক্তিগত দিনানুদৈনিক আচার-আচরণগত ব্যাপার-স্যাপারগুলোও যাবে জানা; জানা যাবে মুক্তিযোদ্ধাদের একান্ত ব্যক্তিগত বোধের কথাও।

বইয়ের প্রথম খণ্ডে আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। এই পর্বটি দুটি অধ্যায়ে বিভক্ত। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় খণ্ড বিভক্ত তিন অধ্যায়ে। এ রকম বই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর নেই। আদতে গেরিলাথেকেসম্মুখযুদ্ধ একটি ইতিহাস-সৃষ্টিকারী বই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন প্রামাণ্যগ্রন্থের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয়।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যে বইগুলোর কথা বলা হলো এই রচনায়, তার বাইরেও রয়েছে আরও অসংখ্য বই। কিন্তু এখানে আলোচ্য গ্রন্থগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে এদের ধ্রুপদি চরিত্রের কারণে, অনন্যতার জন্য। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা এই সব বইপত্র যুগে যুগে বাঙালিকে যে অপরিমেয় প্রেরণা জোগাবে, তাতে আর সন্দেহ কী!