বিজ্ঞাপন

আম্মা সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে তাকালেন। বললেন, ‘কী হয়েছে? তুই কখন এলি?’

বড় ভাই হতভম্ব, কিঞ্চিৎ হতাশও মনে হলো। কারণ, সে যেন চাইছিল মায়ের মৃত্যু তার চোখের সামনে ঘটবে, সে দেখবে একজন মানুষের পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে! ততক্ষণে বড় বোন, মেজ বোন চলে এসেছে। আম্মাকে উদ্দেশ করে বড় ভাই বলেই ফেলল, ‘আমি তো ভাবছি আপনি মারা যাচ্ছেন...এখন তো দেখছি দিব্যি...!’ আম্মা উঠে বসে হেসে ফেললেন। সবাই তখন হাসতে শুরু করেছে। একটা কঠিন মুহূর্ত মুহূর্তেই হাসি–ঠাট্টার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। বড় ভাই সঙ্গে সঙ্গে ভালো খাবারদাবার আনতে লোক পাঠাল। মোটামুটি একটা উৎসবমুখর দিন শুরু হয়ে গেল তখনই। এই হচ্ছে আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ। মৃত্যু নিয়ে সব সময় তার ঠাট্টা–তামাশা, আবার মৃত্যু নিয়ে প্রচণ্ড কৌতূহলও তার। সেই ছোটবেলা থেকেই মৃত্যুর পর কী হয়, মানুষ কোথায় যায়—এসব জানতে ঘন ঘন বন্ধুদের নিয়ে প্ল্যানচেট করত সে। তার ঘনিষ্ট বন্ধু ডাক্তার করিম ভাইয়ের কাছে শুনেছি, বগুড়ায় থাকতে মাঝেমধ্যে রাতের বেলা শ্মশানে গিয়েও সে প্ল্যানচেট করেছে বন্ধুদের নিয়ে। উদ্দেশ্য একটাই, মৃত্যুর পর কী হয়? মানুষ কই যায়? এসব বিষয়ে বই পড়ার পাগল ছিল সে। নানা রকম বইও সংগ্রহ করেছিল। সুপারন্যাচারাল নামের একটা ইংরেজি বইয়ের কথা এখনো মনে আছে। ভৌতিক সব ছবিতে ভর্তি ছিল বইটা। আমরা ছোটরা রাতে ওই বই দেখে শিহরিত হতাম। এখনকার বাচ্চারা যেমন রাতে হরর মুভি দেখে ভয় পেতে চায়, ওই ভয়ংকর মোটাসোটা ঢাউস বইটা ছিল আমাদের হরর মুভি দেখা।

তার যখন ক্যানসার ধরা পড়ল, সবাই দেখা করতে আসছে। এ সময় সে ঘোষণা দিল, তার কুলখানি করা হবে ইন অ্যাডভান্স। এই নিয়ে ফের হাসি–ঠাট্টা–মশকরা। হিউমারে যেটাকে ব্ল্যাক হিউমার বা ক্রুড হিউমার বলে, সেটা জীবদ্দশায় নিজের মৃত্যু নিয়ে সে প্রচুর করে গেছে। তার মৃত্যুর পর কে কে কী কী মন্তব্য করবে, এটা নিয়েও সে মজা করত।

আবার মৃত্যু নিয়ে তার অন্য রকম একটা হাহাকারও ছিল। সেটা তার লেখালেখিতে প্রায়ই উঠে এসেছে। একটা কথা তো সে সব সময় বলত বা লিখত, ‘পৃথিবীতে জ্যোৎস্না থাকবে, টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি থাকবে, বর্ষায় কদম ফুল ফুটবে, উথাল–পাতাল দখিনা হাওয়া থাকবে, আর আমি থাকব না, তা–ই কি হয়?’ এটা যেন সে মানতেই পারত না।

ফিনিক ফোটা জোৎস্নার প্রতি তার ছিল প্রবল তৃষ্ণা। এই জ্যোৎস্না পৃথিবীতে ফেলে রেখে সে যেন কোথাও যেতে রাজি না। জ্যোৎস্না দর্শনে প্রায়ই সে তার বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ত, কোথায় কোথায় চলে যেত! মনে আছে, তার মৃত্যুর কিছুদিন পর এক তরুণ এল আমাদের পল্লবীর বাসায়। তার হাতে পলিথিনে মোড়া একটা গোল সিডি।

: আপনি হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবীব?

: হ্যাঁ।

: আমি এই সিডিটা স্যারকে দেওয়ার জন্য রেডি করেছিলাম। কিন্তু স্যার তো চলে গেলেন।

: কিসের সিডি?

: জ্যোৎস্নার সিডি।

: মানে?

আমি অবাক হই!

: স্যার আমাদের গ্রামে গিয়েছিলেন একবার। শুক্লপক্ষের রাতে আমাদের গ্রামে অনেক জ্যোৎস্না হয়, স্যার দেখতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আহা, কী সুন্দর জ্যোৎস্না!’ সেই জ্যোৎস্না আমি স্যারের জন্য ভিডিও করে সিডিতে তুলে এনেছি। ইচ্ছা ছিল, এটা স্যারের জন্মদিনে দেব। কিন্তু স্যার চলে গেলেন। তাই ভাবলাম আপনাকে দিয়ে যাই।

এক রাতে আমি একা একা সিডিটা ওপেন করে দেখলাম। বড় ভাইয়ের চোখেই দেখার চেষ্টা করলাম... আহা! সত্যি কী সুন্দর জ্যোৎস্না! একেই বোধ হয় বলে ফিনিক ফোটা জ্যোৎস্না, গাছের ফাঁকে ফাঁকে ধবধবে সাদা চাদরের মতো বিছানো জ্যোৎস্না! দেখতে দেখতে আমার চোখ ভিজে এল।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই হুমায়ূন আহমেদ চলে গেল। তার মৃত্যুসংবাদ শুনে নীলক্ষেতের ফুটপাতে বই বিক্রি করে, এমন এক মধ্যবয়স্ক বিক্রেতা নাকি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ‘হুমায়ূন স্যারের বদলে আমি কেন মরলাম না।’

আমার মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদ তার প্রিয় ফিনিক ফোটা জ্যোৎস্না, টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি, বর্ষার কদম ফুল বা উথাল–পাতাল দখিনা হাওয়া...হয়তো কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু কিছু মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে গেছে সঙ্গে করে, তা–ই বা কম কী? একজন লেখকের আর কী লাগে!

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন