বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ওই সময় আব্বা ছিলেন পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট। পিটিআইয়ের লাইব্রেরি ছিল আমাদের সব ভাইবোনের জন্য অবারিত দ্বার। বিএসসি স্যার লাইব্রেরি চালাতেন। গেলেই বই ধার দিতেন, পড়ে ফেরত দিয়ে আমরা আবার বই নিয়ে আসতাম। আব্বা বললেন, সরকার টাকা দিয়েছে, লাইব্রেরির জন্য বই কিনতে হবে, তালিকা দাও তো।

এইবার পাইছি সুযোগ। আমি জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ থেকে শুরু করে যত কবির নাম জানি, সবার বইয়ের নাম দিয়ে দিলাম। তখন বিপ্রদাস বড়ুয়া কবিতার ‘বাকপ্রতিমা’ নামের একটা প্রবন্ধের বই লিখেছিলেন, সেটা পর্যন্ত সেই তালিকায় থাকল। বইগুলো এসে গেল। আর আমি পড়তে পড়তে সেসব মুখস্থ করে ফেললাম। এখন অনেকেই অবাক হয়, আরে আপনার দেখি সব কবিতা মুখস্থ। হ্যাঁ। ওই সময়, যখন আমার স্মৃতিশক্তি ভালো ছিল, তখন আমি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবির কবিতার বই প্রচুর পড়েছি ও কবিতা মুখস্থ করে ফেলেছি। ওই সময় রফিক আজাদের কবিতাও মুখস্থ করে ফেললাম এবং তাঁর ‘হে কলম নত হও নত হতে শেখো’ কবিতার নকল করে লিখে ফেললাম—‘হে কুঠার নত হও।’

ঢাকায় এসেছি ১৯৮৪ সালের দিকে। তারপর কখন কবি রফিক আজাদের সঙ্গে কীভাবে দেখা হলো, পরিচয় হলো, মনে নেই। কিন্তু তাঁকে দুর্দান্তভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ইমদাদুল হক মিলন, তাঁর ‘দুঃখকষ্ট’ উপন্যাসের মাধ্যমে। তাতে লেখা ছিল, কবি চলেন হোন্ডা দাবড়িয়ে। জিনস পরেন। ইত্যাদি। আর ছিল রফিক আজাদের এই কবিতাটা—‘দুঃখ/কষ্ট’—
‘পাখি উড়ে চ’লে গেলে পাখির পালক প’ড়ে থাকে।
...
দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে পার্থক্য অনেক:
বহু রক্ত-ক্ষরণের পর শব্দ-দুটির যাথার্থ্য বোঝা যায়!’
আর তার ‘তুমি: বিশ বছর আগে ও পরে’ কবিতাটা পড়ে ভীষণ মজা পেয়েছিলাম—কারণ ‘জনৈক’কে ‘জৈনিক’ আমিও বলতাম ছোটবেলায়। এই কথাটা লেখা থাকত আমাদের নোটবইয়ে—‘জনৈক অভিজ্ঞ হেডমাস্টার প্রণীত।’ কবিতাটি এখানে দেওয়া হলো—
‘তুমি যে-সব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিল। তোমার কথায় ছিলো গেঁয়ো টান, অনেকগুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণ: ‘প্রমথ চৌধুরী’কে তুমি বলতে ‘প্রথম চৌধুরী’; ‘জনৈক’ উচ্চারণ করতে গিয়ে সর্বদাই ‘জৈনিক’ বলে ফেলতে। এমনি বহুতর ভয়াবহ ভুলে-ভরা ছিল তোমার ব্যক্তিগত অভিধান। কিন্তু সে-সময়, সেই সুদূর কৈশোরে ঐ মারাত্মক ভুলগুলো তোমার বড়-বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলুম।

default-image

তোমার পরীক্ষার খাতায় সর্বদাই সাধু ও চলতির দুষণীয় মিশ্রণ ঘটাতে। ভাষা-ব্যবহারে তুমি বরাবরই খুব অমনোযোগী ছিলে। বেশ হাবাগোবা গোছের লাজুক ও অবনতমুখী মেয়ে ছিলে তুমি। ‘শোকাভিভূত’ বলতে গিয়ে ব’লে ফেলতে ‘শোকাভূত’। তোমার উচ্চারণের ত্রুটি, বাক্যমধ্যস্থিত শব্দের ভুল ব্যবহারে আমি তখন
এক ধরনের মজাই পেতুম।

২০ বছর পর আজ তোমার বক্তৃতা শুনলুম। বিষয়: ‘নারী-স্বাধীনতা’! এত সুন্দর, স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে তোমার বক্তব্য রাখলে যে দেখে অবাক ও ব্যথিত হলুম।
আমার বুকের মধ্যে জেঁকে-বসা একটি পাথর ২০ বছর পর
নিঃশব্দে নেমে গেল।’

রফিক আজাদ এক কবিতায় লিখেছিলেন: স্যার এই ভিড়ের মধ্যে থেকে এবার সশব্দে একটা পাদ দিন তো, দিয়ে প্রমাণ করুন আপনিও একজন মানুষ!
পাদ যে কবিতায় ব্যবহৃত হতে পারে, রফিক আজাদ ছাড়া আর কেউ কি তা করে দেখাতে পেরেছিলেন!
কিন্তু কবি রফিক আজাদের সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হলো, সেটা আর মনে নাই। সাকুরায় তো আমার যাওয়া হয় না, বহু বছর আগে গেছি, সেও তো দুপুরে ওদের পরোটা আর মাংসভুনাটা ভালো হয় জেনে, রেস্তোরাঁ অংশে। তখনই একবার হাবীবুল্লাহ সিরাজী ভাইকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে হয়েছিল, মনে পড়ছে কবিপত্নীর দৃষ্টিবাণ। কিন্তু রফিক আজাদ ভাইকে নিয়ে যেসব কাহিনি প্রচলিত আছে, তার সাক্ষী আমি মাত্র দু-তিনবারের বেশি হতে পারিনি। রফিক আজাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমেরিকা গেছি, হিউস্টনে, এক ফ্লাইটে গেছি, ফিরেওছি, একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেছি, একই মঞ্চে কবিতা পড়েছি। শুধু মনে পড়ে, বিমানের মধ্যে রফিক ভাই একটা থলে বের করতেন, তাতে প্রায় দুই কেজি বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ছিল। আর দিলারা আপা বিমানবন্দরে বলে দিয়েছিলেন, ওকে যেন বিমানে দেখে রাখি। সাতটা দিন আমরা একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু বলার মতো কোনো গল্প তো দেখছি না।

তাঁকে দেখলেই আমি নাঁকি সুরে কবিতা আবৃত্তি শুরু করতাম, ‘চুনিয়া একটা গ্রাম, ছোট কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব শক্তিশালী, মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।’ তাঁকে নকল করতাম। তিনি হাসতেন। আর একটু খুশি হতেন, কারণ একের পর এক তাঁর কবিতা মুখস্থ বলে যেতে পারছি। তাঁর হাত ধরতাম। তাঁর কলার ঠিক করে দিতাম। এতটাই অন্তরঙ্গতা ছিল। তাঁকে খুব ভালো মানুষ মনে হতো। একেবারে শিশুর মতো লাগত। পরে যখন মৌলবির হাঁটা নিয়ে কবিতা লিখলেন, তারপর বললাম, রফিক ভাই, হাঁটছেন তো ঠিকভাবে, মৌলবির সঙ্গে দেখা হয়! কবিতাটা কিন্তু খুব ভালো লিখেছেন, রফিক ভাই। আমার দেখা রফিক ভাইকে মনে হতো মাটির মানুষ, তিনি যে পুরুষরক্ষা সমিতি করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন, কিংবা চুম্বনের বিনিময়ে কবিতার বই উৎসর্গ করার ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন, তাঁকে দেখে মনেই হতো না। আর তিনি ছিলেন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, কাদের সিদ্দিকীর দলে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়, রাইফেল কাঁধে নিয়ে সত্যিকারের যুদ্ধ করেছিলেন।

‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটাও খুব সুন্দর। তার প্রতিটা পঙ্‌ক্তিতে আছে কেবল কবিতাই। তাঁর ‘গদ্যের গহন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া আমি এক দিগ্‌ভ্রান্ত পথিক’ কবিতাটা সম্ভবত বেরিয়েছিল ইত্তেফাকে, এত বড় কবিতা, প্রায় পুরো এক পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপানো হয়েছিল, যেদিন বেরোল, সেদিন সারা দেশ নড়ে উঠেছিল। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছিল। এরকম হয়েছিল, আর তিনবার, সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ‘একদা একটা দেশ ছিল’ ও ‘আমার শহর’ বেরোনোর পরে, আর শামসুর রাহমানের ‘একটা মোনাজাতের খসড়া’ প্রকাশিত হলো। সংবাদপত্রের পাঠকেরা তখন ওই কবিতাগুলো নিয়ে কথা বলছিলেন, এখন যেমন হয় কলাম প্রকাশের পরে।

রফিক আজাদ যখন ‘ঘরে-বাইরে’ পত্রিকার সম্পাদক, তখন তাঁর নামে ওই পত্রিকাতেই স্টাইলশিট প্রকাশিত হয়েছিল। মানে পত্রিকাটার ভাষারীতি। কী লিখব, কী লিখব না। তাতে রফিক আজাদ লিখেছিলেন, সব স্মৃতি থেকে বলছি, ৩০ বৎসর আগের কথা, আজও মনে আছে, কতটা দাগ কেটেছিল ভাবুন—জীবনানন্দ দাশ ‘শাদা’ লিখে লিখে ‘সাদা’কে শুভ্রতা দিয়ে গেছেন, আমরা তাই ‘শাদা’ই লিখব।... কেন যে রবীন্দ্রনাথ পুঁথি শব্দটিতে চন্দ্রবিন্দু দিতে গেলেন? ... ‘সাথে’ নয় ‘সঙ্গে’, ‘সাথে’ বাজে কাব্যিক শব্দ। ...‘ভারী’ শব্দটি ‘ভারি’ লিখলে যথেষ্ট ‘ভারী’ বলে মনে হয় না। ইত্যাদি। এটা পড়ার পর থেকে আমি আর ‘সাথে’ লিখতে পারি না, এমনকি নাটকের সংলাপেও আমার হাতে ‘সাথে’ আসতে চায় না, ‘সঙ্গে’ চলে আসে।

মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশিত রফিক আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকাতেও কবিতা নিয়ে কোনো কথা নাই, আছে বানান নিয়ে কথা, স্তবক বুঝতে পঙ্‌ক্তির প্রথম শব্দটা যে একটুখানি ডানে সরানো হয়েছে—সেসব নিয়ে কথা। রফিক আজাদ বানান নিয়ে, ভাষারীতি নিয়ে, যতিচিহ্ন নিয়ে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল ছিলেন, সচেতন ছিলেন এবং সক্রিয় ছিলেন। প্রায় ৩০ বছর আগে তাঁর লেখা ভাষারীতিটাই আজও ভেতরে ভেতরে অনুসরণ করে যাচ্ছি।

default-image

এখন তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ হাতে নিয়ে দেখছি, অসংখ্য ভালো কবিতা তিনি লিখে গেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরীর পরেই সম্ভবত তাঁকে স্থান দিতে হবে। আগে-পরের হিসাবটা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু এ কথা বলতেই হবে যে তিনি আমাদের কবিতার একজন প্রধান পুরুষ হয়েই বেঁচে রইবেন।

রফিক আজাদের একটা লাইন আমার কাছে সদাসত্য বলে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকে তিনি অভিহিত করেছিলেন ‘বাংলার সবচেয়ে রূপবান পুরুষ’ বলে। ‘এই সিঁড়ি’ নামে রফিক আজাদের লেখা সেই কবিতাটা এখানে উদ্ধৃত করি:
‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,
সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে—
বত্রিশ নম্বর থেকে
সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে
অমল রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।
মাঠময় শস্য তিনি ভালোবাসতেন,
আয়ত দু’চোখ ছিল পাখির পিয়াসী
পাখি তার খুব প্রিয় ছিলো—
গাছ-গাছালির দিকে প্রিয় তামাকের গন্ধ ভুলে
চোখ তুলে একটুখানি তাকিয়ে নিতেন,
পাখিদের শব্দে তার, খুব ভোরে, ঘুম ভেঙে যেতো।
স্বপ্ন তার বুক ভ’রে ছিল,
পিতার হৃদয় ছিল, স্নেহে-আর্দ্র চোখ—
এদেশের যা কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র
তার চোখে মূল্যবান ছিল—
নিজের জীবনই শুধু তার কাছে খুব তুচ্ছ ছিল:
স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে প’ড়ে আছে
বিশাল শরীর…
তার রক্তে এই মাটি উর্বর হয়েছে,
সবচেয়ে রূপবান দীর্ঘাঙ্গ পুরুষ:
তার ছায়া দীর্ঘ হতে-হ’তে
মানিচিত্র ঢেকে দ্যায় সস্নেহে, আদরে!
তার রক্তে প্রিয় মাটি উর্বর হয়েছে—
তার রক্তে সবকিছু সবুজ হয়েছে।
এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,
সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে—
স্বপ্নের স্বদেশ ব্যেপে
সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে
অমল রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে ॥

রফিক ভাইকে অনুরোধ করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, এমন কখনো হয়নি। ‘প্রথম আলো’ থেকে একটা ‘ঈদ উপহার’ বেরোয়, সবার জন্য ঈদসংখ্যা। তাতে কবিতা নিয়ে নানা কিছু করি। একবার ভাবলাম, একটা প্রেমের কবিতা ছাপাব, আর তার সঙ্গে কবি নিজে লিখে দেবেন, কবিতাটা তিনি কোন নারীকে নিয়ে কখন লিখেছিলেন। রফিক আজাদ ভাই একটা কবিতা ও তার পেছনের কাহিনি লিখে দিলেন। কাহিনিটা এ রকম, একটা জেলা শহরে তিনি গেছেন, রাতে একটা বাড়িতে থাকছেন, বেশি রাতে বাড়ির নারীটি এসে তাঁর চাদর পায়ে টেনে দিয়ে গেল। এতটুকুনই। আর তেমন কিছু না। আমি বললাম, আরেকটু বিশদ করেন... তিনি বললেন, না না, ভদ্রমহিলার সংসার আছে না?
কে বলল, কবি রফিক আজাদ সমাজদ্রোহী ছিলেন? বরং তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, ঘরে ঘরে শুয়ে আছে নির্বিরোধ পুরুষ-রমণী!
‘সর্বদাই দেখে যেতে চাই—ঘরে ঘরে শুয়ে আছে সুখের শয্যায়/আলিঙ্গনাবদ্ধ দুই নির্বিরোধ পুরুষ রমণী।’

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন