বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঈদসংখ্যায় আমাদের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। এরপর যুক্ত হলেন হুমায়ূন আহমেদ। আমরা ঈদসংখ্যার বিজ্ঞাপনে খুঁজতাম সৈয়দ শামসুল হক ও হুমায়ূন আহমেদ আছেন কি না। যদিও অন্য লেখকদের গল্প-উপন্যাসও আমরা খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। রশীদ করীমের লেখার আকর্ষণ ছিল আলাদা। আমার মনে আছে, একবার ঈদসংখ্যায় বেরোল রশীদ করীমের ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’। হাসান আজিজুল হকের গল্প ‘পাতালে হাসপাতালে’ আমি ঈদসংখ্যাতেই পড়েছিলাম। তাতে একটা লাইন ছিল, ‘রাতে স্ত্রী সহবাসে সে খুব’...ওই লাইনটা ঘুরেফিরে বারবার পড়তাম।

সত্যি কথা বলতে কি, সত্তরের দশকের ঈদসংখ্যাগুলোতে সাহিত্যে যৌনতা ছিল প্রকট।

আলাউদ্দিন আল আজাদ কিংবা আবুল খয়ের মুসলেহউদ্দিন এবং আরও কারও কারও লেখায় রগরগে প্রসঙ্গ থাকত প্রচুর। আজকের দিনে আমরা এই ধরনের লেখা প্রকাশ করবার কথা ভাবতেও পারি না। সম্ভবত উনিশ শ ষাটের দশকের অ্যাংরি জেনারেশন, হাংরি জেনারেশনের প্রভাব সত্তরের দশকের লেখার ওপরে ভর করেছিল। আমাদের রিজিয়া রহমান, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেনও খুবই সাহসী লেখা লিখতেন।

ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর সেসব লেখা নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে যেত। শওকত ওসমান, শওকত আলী, হাসনাত আবদুল হাই, মাহবুব তালুকদার ও ইমদাদুল হক মিলনের লেখা ছাপা হতো নিয়মিত। ইমদাদুল হক মিলনের সুন্দর একটা উপন্যাস ‘ভূমিপুত্র’ পড়েছিলাম ঈদসংখ্যায়। হুমায়ূন আহমেদের ‘এই বসন্তে’, ‘অন্যদিন’ যেমন প্রকাশিত হয়েছিল ঈদসংখ্যাতেই। সেলিনা হোসেনের ‘চাঁদবেনে’ পড়েছিলাম কোনো এক ঈদসংখ্যায়। রাবেয়া খাতুনের ‘নীল নিশীথ’ উপন্যাসটি ঈদসংখ্যায় পড়ে লেখকের সাহস দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।

সৈয়দ শামসুল হকের কথাসাহিত্য তখন নতুন রূপ নিচ্ছে। যদিও ‘বালিকার চন্দ্রযান’ উপন্যাসে যৌনতা ছিল, সেই কথাটাই এখন মনে পড়ছে। আরেকটা উপন্যাস পড়েছিলাম, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’। যা-ই হোক, সৈয়দ শামসুল হক ধীরে ধীরে ষাটের দশকের লেখা থেকে সত্তরের শেষে এবং আশির দশকে নিজেকে বদলে ফেললেন। আগে তাঁর বাক্য ছিল ছোট ছোট। পরে তিনি লিখতে লাগলেন বড় বাক্য। এ ক্ষেত্রে তাঁর গুরু ছিলেন, আমার ধারণা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। অনেকটা ইংরেজি সিনট্যাক্সে বাংলা লিখতে শুরু করলেন তিনি। এমনকি, এ হয় একটি বাগান—এ রকম ইংরেজি ইজ-এর ধরনে একটা ‘হয়’ তিনি বাক্যে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তখনো রংপুরে, হয়তো কারমাইকেল কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ি। এই সময় হাতে এল দুটো বই—সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরানের গহীন ভিতর’ এবং ‘বৈশাখে রচিত পঙ্‌ক্তিমালা’।

সৈয়দ শামসুল হকের কথাসাহিত্য তখন নতুন রূপ নিচ্ছে। যদিও ‘বালিকার চন্দ্রযান’ উপন্যাসে যৌনতা ছিল, সেই কথাটাই এখন মনে পড়ছে। আরেকটা উপন্যাস পড়েছিলাম, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’। যা-ই হোক, সৈয়দ শামসুল হক ধীরে ধীরে ষাটের দশকের লেখা থেকে সত্তরের শেষে এবং আশির দশকে নিজেকে বদলে ফেললেন।

‘পরানের গহীন ভিতর’-এর একেকটা পঙ্‌ক্তি আমাদের মনে চিরদিনের জন্য গাঁথা হয়ে রইল—‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর, নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর’ কিংবা ‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর, যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহিন ভেতর।’ সব্যসাচী প্রকাশিত ‘পরানের গহীন ভিতর’-এর প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদে হলদে সবুজে ন্যাড়ামাথা সৈয়দ শামসুল হকের বড় ছবি। প্রকাশক সৈয়দ হামিদুল হুসেন, লেখকের আপন ভাই। শুরুতে একটা ভূমিকা। আমি স্মৃতি থেকে লিখছি, সৈয়দ শামসুল হক বলছেন, ‘এলোমেলো চুল আর আউলা-বাউলা কেশ কি চিত্তের মধ্যে এক এবং অভিন্ন?’ ভেতরের কবিতাগুলো পড়ে পুরাই আউলা হয়ে গেলাম:

আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।
আর আছে ‘বৈশাখে রচিত পঙ্‌ক্তিমালা’। খদ্দরের কাপড়ের মলাট। মলাটে সৈয়দ শামসুল হকের হাতের লেখা শিরোনাম এবং স্বাক্ষর দিয়ে কবির নাম।
তারপর শুরু হলো, বাংলা ভাষার অন্যতম দীর্ঘ কবিতা:
বহুদিন থেকে আমি লিখছি কবিতা,
বহুদিন থেকে আমি লিখি না কবিতা;
লিখিনি কবিতা পূর্ব, পরে, বর্তমানে?
তাহলে এক কি বলি? এই যা লিখছি
শোকগ্রস্ত জননীর মতো? বাক্যরোলে
শাসন বারণ নেই, কি তবে এগুলো?
কখনো পয়ার ছন্দে, কখনো ছড়ায়,
উচ্চকিত, দ্রুত, লঘু মন্থর পায়ে, চিত্রল,
কখনো অমর্ত্য গদ্যে, বলব কি তাকে?
সঙ্গীতবাহন চিত্র? প্রলাপ, প্রলাপ?

বুঝি না অক্ষরগুলো বলতে কি চায়?
কেন তারা বেজে ওঠে চরণে চরণে...

ওই দীর্ঘ কবিতার এক জায়গায় আছে:

‘বেশ্যাকে বসাই কোলে...মিয়াভাই, কী জিগান হাবিজাবি, বাতি নিবায়া দিমু নাকি থাকব কন? আমার অসুখ নাই, নিশ্চিন্তে করেন।’

আছে শার্ল বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুমের কথা।
আছে:
‘এমন বিশ্বাস ছিল শুধু কবিতায়
প্রথমে করব জয় সুরূপা, বিরূপা;
তারপর পরিবার, যারা রোজ বলে,
‘কবিতার সরোবরে ফোটে অনাহার,
ছেঁড়া চটি, শস্তা মদ, আসক্তি বেশ্যায়’;
তারপর বাংলাদেশ এশিয়া আফ্রিকা;
ফর্মায় ফর্মায় ক্রমে বেড়ে উঠে হবে
কবিতার সংকলন খদ্দরে বাঁধানো,
যে কোনো ঋতুতে যে কোনো উৎসবে
পাটভাঙ্গা পাঞ্জাবীতে লম্বমান যুবা
পড়বে সে বই থেকে; বাংলার তারিখে
আমার জন্মের দিন হবে লাল ছুটি।’

কবিতার সংকলন খদ্দরে বাঁধানো—এই পঙ্‌ক্তিটার জন্যই প্রথম সংস্করণে এই বইয়ে খদ্দরে মোড়ানো মলাট ছিল। দীর্ঘ কবিতাটা তিনি শেষ করেছিলেন: ‘জন্মে জন্মে বারবার কবি হয়ে ফিরে আসব এই বাংলায়।’—এই বলে। এই কথাটা আমিও বলি, জন্মে জন্মে যেন কবি হয়ে জন্ম নিই এই বাংলায়।
১৯৮৪-তে বেরোল ‘অন্তর্গত’। কথাকাব্য:
চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়,
চোখ ভেসে যায় মানুষের চোখ,
মানুষের তো চোখ আছে,
সে চোখ শুধু দ্যাখে না,
সে চোখ কাঁদে, সে চোখ ভিজে আসে, ভেসে যায়…।
অতঃপর কবির সঙ্গে আমাদের চোখও কাঁদে,
অবিরাম ভিজে আসে,
ভেসে যায়,
ভেসে যেতে থাকে।

এই কথাকাব্য পড়ে
এই কথাকাব্য পড়ে আমরা মুগ্ধ, গ্রস্ত, সমাহিত, নিমজ্জিত বোধ করতে লাগলাম।
সৈয়দ শামসুল হক বিচিত্রায় কলাম লিখছেন, মার্জিনে মন্তব্য। তাতে তিনি খুলে খুলে দেখাচ্ছেন গল্পের কলকবজা। জানাচ্ছেন যে এই লেখায় ক্রিয়াপদের কালের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হয়, এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প থেকে তিনি জানাচ্ছেন, ভবিষ্যৎ কাল দিয়েও গল্প লেখা যায়। যেমন:
‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে হলে একদিন বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাসে গিয়ে আপনাকে উঠতে হবে, তারপর রাস্তার ঝাঁকানির সঙ্গে মানুষের গুঁতো খেতে-খেতে ভাদ্রের গরমে ঘামে, ধুলোয় চটচটে শরীর নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক বাদে রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়তে হবে আচমকা।

‘সামনে দেখবেন নিচু একটা জলার মতো জায়গার ওপর দিয়ে রাস্তার লম্বা সাঁকো চলে গেছে। তারই ওপর দিয়ে বিচিত্র ঘর্ঘর শব্দে বাসটি চলে গিয়ে ওধারে বাঁকে অদৃশ্য হবার পর দেখবেন সূর্য এখনো না ডুবলেও চারদিক ঘন জঙ্গলে অন্ধকার হয়ে এসেছে।

default-image

কোনোদিকে চেয়ে জনমানব দেখতে পাবেন না, মনে হবে পাখিরাও যেন সভয়ে সে জায়গা পরিত্যাগ করে চলে গেছে। একটা স্যাঁতসেঁতে ভিজে ভ্যাপসা আবহাওয়া টের পাবেন। মনে হবে নিচের জলা থেকে একটা ক্রূর কুণ্ডলীতে জলীয় অভিশাপ ধীরে-ধীরে অদৃশ্য ফণা তুলে উঠে আসছে।’

আমি রংপুরে বসে সেই কলাম পড়ছি। শিখছি। শেখার চেষ্টা করছি। তিনি বললেন, নতুন লেখকদের কর্তব্য হলো বই পড়া। আমি কিছু কিছু করে বই পড়ছি।
এই সময় সৈয়দ শামসুল হক এলেন রংপুরে। রংপুরে অভিযাত্রিক সাহিত্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে। তিনি উঠলের রংপুর সার্কিট হাউসে।

অনিক রেজা, তখন হয়তো ক্লাস টেনে কি ইলেভেনে পড়ে, হৃদয় নামে একটা সাহিত্যের কাগজ বের করছে, প্রথম সংখ্যা বেরিয়ে গেছে, দ্বিতীয় সংখ্যার কাজ চলছে, আমাকে এসে ধরল, চলেন, সৈয়দ শামসুল হকের সাক্ষাৎকার নিতে যাই সার্কিট হাউসে।

আমরা বিশাল একটা ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে গেলাম সকাল সকাল, সার্কিট হাউসে।
তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হলেন।

তাঁকে জিগ্যেস করলাম, আপনি রংপুরে প্রথম কবে এসেছিলেন?
তিনি বললেন, আমি রংপুরে প্রথম আসি সেই শৈশবে, আমার বাবার হাত ধরে।
সন্ধ্যায় রংপুর টাউন হলে প্রধান অতিথির ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন সম্পূর্ণ উল্টো কথা। বললেন, আমি রংপুরে প্রথম আসি একা। কুড়িগ্রাম থেকে ট্রেনে করে। ভর সন্ধ্যায় আমি রংপুর রেলস্টেশনে নামি। চারদিকে অন্ধকার জাল ফেলছে। আমি শূন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি। ভয় ভয় করছে। হঠাৎ কে যেন আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তাকিয়ে দেখি, বাবা। আমার বাবা আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আরেকটা কামরায় উঠে আমাকে অনুসরণ করে চলে এসেছেন।
(চলবে)

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন