রিকশায় একদিন দেখেছি এক কিশোরীর মুখ, তাকে দেখে হৃদয়ের একূল–ওকূল দুকূল ভেসে যেতে লাগলে কবিতা লেখা ছাড়া আমি আর কী–ই বা করতে পারি!
আমি পড়ি বুয়েটের ফার্স্ট ইয়ারে, আমার ভাই আশরাফুল হক পড়েন ফোর্থ ইয়ারে। দুই ভাই শীতের চাদর মোড়া রংপুরে আজানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিআরটিসির বাস ধরতে বাস-টার্মিনালের দিকে যাই। ধাপের মোড়ে রিকশাওয়ালা রিকশার হুড তুলে ঘুমাচ্ছেন। তাঁকে ডেকে তুলি।

বুয়েটে ভর্তি হয়ে সহপাঠীদের জলসায় ঘোষণা দিই: আমি কবি হব বলে ঢাকায় এসেছি। আমি পাস করব, ভর্তি যখন হয়েছি ফেল করার কোনো মানে হয় না, কিন্তু আমি পাস করেও ইঞ্জিনিয়ারিং করব না। পাস করে আমি কোনো সংবাদপত্রে যোগ দেব। তাতে আমার লেখা প্রকাশে সুবিধা হবে।

আমার মাথায় তখন উঁকি দিচ্ছে ‘ইত্তেফাক’। কচি-কাঁচার আসর। ‘ইত্তেফাক’–এ বসেন দাদাভাই—রোকনুজ্জামান খান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ছড়া পড়ে আসছি। ‘বাকবাকুম পায়রা মাথায় দিয়ে টায়রা, বউ সাজবে কাল কি? পরবে সোনার পালকি’, কিংবা ‘একটা দড়ির দুদিক থেকে টানছে দুদল ছেলে, তাই না দেখে বনের বানর লাফায় খেলা ফেলে’ অথবা ‘হাসতে নাকি জানে না কেউ কে বলেছে ভাই...’ আমি রংপুরে থাকতে করতাম কচি-কাঁচার মেলা। সেই সূত্রে দাদাভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় আছে, খাতিরও আছে।

দাদাভাই আমাকে আদর করেন। আমি দাদাভাইকে লেখা দিলাম ‘পাখিরা আছে বলে’। দাদাভাই ‘ইত্তেফাক’–এ কচি-কাঁচার আসরে বড় করে প্রকাশ করে দিলেন। তারপর ঢাকায় যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, রাস্তায় কারফিউ, আমি ছড়া লিখলাম:
রাত্রি আসে
শহরজুড়ে রাত্রি আসে নিয়নে,
চাঁদের চিঠি ভুল ঘরে দেয় পিয়নে।
অনেক দূরে কমলাপুরে ট্রেনের বাঁশি,
বাস ডিপোতে বৃদ্ধ বাসের হঠাৎ কাশি।
নিঝুম সড়ক কারফিউ দেয় পাহারা,
শহরটা কি মরুভূমি, সাহারা।
ছোট্ট খোকা স্বপ্ন বোনে খেয়ালে,
কী যেন কী হচ্ছে লেখা দেয়ালে।
এই ছড়া নিয়ে আমি গেলাম ‘ইত্তেফাক’ অফিসে। দাদাভাইয়ের রুমে ঢুকলাম।
‘আনিসুল হক, এসেছ। বসো। দুইটা চিঠি এডিট করে দাও।’
‘জি দাদাভাই, দিচ্ছি। দিন। দাদাভাই, ছড়া এনেছি।’
‘দাও।’

দাদাভাই তাঁর মোটা ফ্রেমের চশমা পরে নিয়ে আমার ছড়াটা পড়তে লাগলেন। বসে ছিলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো করে উঠে দাঁড়ালেন।

default-image

‘তুমি এই লেখা আরেকটু আগে আনলে না কেন?’
‘কেন দাদাভাই?’
‘একটু আগে আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিল একজন। প্রশ্ন করল, ছড়া আর কিশোর-কবিতার পার্থক্য কী। তোমার এটা কবিতা। এই যে লাইনটা, চাঁদের চিঠি ভুল ঘরে দেয় পিয়নে...এটা হলো কবিতা...’
‘ইত্তেফাক’–এ এই ছড়া লিড হিসেবে ছাপা হলো, পাশে ফয়েজ আহমদের ছড়া।
আমার খুশি দেখে কে!
আমি আমাদের ক্লাসমেট কলিকে ছড়াটা দেখালাম। কোনো একটা ল্যাবে স্যারের টেবিলে ‘ইত্তেফাক’। ছড়াটা বের করে বললাম, ‘দ্যাখো, কলি, আমার লেখা!’
কলি ঠোঁট উল্টে বলল, ‘বাচ্চাদের পাতায় কেন? তুমি কি বাচ্চা নাকি!’
‘অবশ্যই না। আচ্ছা, আমি বড়দের পাতায় কবিতা লিখে তোমাকে দেখাচ্ছি।’

দাদাভাইয়ের মুখ কালো হয়ে গেল, ‘তুমি কি পপুলার লেখক হয়ে যাচ্ছ নাকি! হুমায়ূন–মিলনের মতো বিক্রি হওয়া মোটেও ভালো লেখকের লক্ষণ নয়! পপুলার লিটেরাচার জিনিসটা ভালো নয়। তুমি লিখবে লিটেরারি ফিকশন। পপ ফিকশন না। পাল্প ফিকশন না।’

আমি গেলাম ‘ইত্তেফাক’–এ। দাদাভাইকে বললাম, ‘আপনি আমার কবিতা ছাপুন। আপনি তো “ইত্তেফাক”–এর বিশেষ সংখ্যা দেখেন। বিজয় দিবস সংখ্যা, ঈদসংখ্যা, ফেব্রুয়ারি সংখ্যা। আগামী বিশেষ সংখ্যায় আমার কবিতা ছাপবেন।’
দাদাভাই বললেন, ‘বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হবে বিশেষ কবির কবিতা। তুমি তো বিশেষ কবি না। নতুন কবি। তোমার কবিতা আমি ছাপাতে পারব না।’

আমি গেলাম ‘ইত্তেফাক’–এর সাহিত্য সম্পাদকের কাছে। আল মুজাহিদী সাহিত্য সম্পাদক। তিনি বললেন, ‘তুমি আবু জাফর শামসুদ্দীনকে চেনো?’
‘জি চিনি।’

‘তার ওপরে একটা প্রবন্ধ লিখে আনো।’
আমি খেটেখুটে একটা প্রবন্ধ রচনা করলাম। ‌‌‘দ্বিজাতিতত্ত্বকে মিথ্যা প্রমাণিত করে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলো’, এই হলো প্রথম লাইন।

আল মুজাহিদী প্রথম লাইন দেখে বললেন, ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব মিথ্যা তোমাকে কে বলল?’
আমি বললাম, ‘ধর্মের বিভাজনে জাতি বিভক্ত হয় না। ধর্ম এক হলেই এক জাতি হয় না। না হলে এতগুলো আরব রাষ্ট্র না হয়ে একটা দেশ হতো...কিংবা ভারত টুকরা-টুকরা হতো...’
আল মুজাহিদী বললেন, ‘হিন্দু–মুসলমান অবশ্যই আলাদা জাতি।’
আমি বললাম, ‘আমাদের হলে আমার বন্ধুদের দলে হিন্দু আছে, মুসলমান আছে, আমরা একসঙ্গে চলি, ফিরি, খাইদাই, ঘুমাই...কোনো পার্থক্য আমার চোখেও পড়ে না, মনেও বাজে না, আমরা সবাই বাঙালি...’
আল মুজাহিদী বললেন, ‘হিন্দুরা কলাপাতার একদিকে ভাত রেখে খায়, মুসলমানরা অন্য পিঠে রেখে খায়...’
আমি বললাম, ‘তাতেই কি জাতি আলাদা হয়ে যায়? আমাদের নদীর এই পারে পলি অঞ্চলে আমরা একভাবে খাই, অন্য পারে খিয়ার অঞ্চলে (লাল মাটির অঞ্চল) আরেকভাবে খায়, তাহলে নদীর এই পারে একজাতি, আরেক পারে আরেক জাতি...তা তো হয় না। দুই পাশেই কিন্তু মুসলমান বাঙালি...’
তিনি বললেন, ‘হিন্দুরা ডাল আগে খায়...মুসলমানরা ডাল পরে খায়...’
আমি রেগে লাল হয়ে গেলাম। দৌড়ে বের হয়ে গেলাম দাদাভাইয়ের ঘরে।

দাদাভাই বললেন, ‘আনিস, তোমার কী হয়েছে? তোমার চোখমুখ এ রকম দেখাচ্ছে কেন।’

‘আমি আল মুজাহিদীর ঘরে গিয়েছিলাম।’
‘কী হলো সেখানে?’
‘উনি বলেন, দ্বিজাতিতত্ত্ব মিথ্যা নয়। আমার সঙ্গে ঝগড়া লেগে গেল।’
দাদাভাই বললেন, ‘তুমি ওই প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক লোকের কাছে গেছ কেন?’
আমি বললাম, ‘কবিতা ছাপাতে।’
‘কবিতা ছাপাতে তুমি আল মুজাহিদীর কাছে যাবে কেন?’
‘আপনি বলেছেন, আমি বিশেষ কবি না। তাই আমার কবিতা বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হবে না।’

default-image

‘আচ্ছা, তুমি কবিতা দাও। সামনেই বিশেষ সংখ্যা আছে। কবিতা ছাপিয়ে দিচ্ছি।’
‘ইত্তেফাক’–এ আমার কবিতা ছাপা হলো।
দাদাভাই আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। বইমেলায় দেখা হলে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আনিস, তুমি কী করছ।’
‘সাংবাদিকতা করছি দাদাভাই।’

‘কী বলো। তুমি আমার কাছে আসো। আমি তোমাকে একজনের কাছে পাঠাচ্ছি। তিনি তোমাকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চাকরি দেবেন। আমাদের কচি-কাঁচার মেলার অনেকেই এখন বড় বড় পোস্টে আছে। আসো...’
আমি মাথা চুলকাই।

আরেকবার বইমেলায় দেখা। আমি দৌড়ে গেলাম। ‘দাদাভাই, আমার উপন্যাস বেরিয়েছে। দুই এডিশন ১০ দিনেই শেষ। তিন হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেছে। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনের পরই আমার বই বিক্রি হয়!’
দাদাভাইয়ের মুখ কালো হয়ে গেল, ‘তুমি কি পপুলার লেখক হয়ে যাচ্ছ নাকি! হুমায়ূন–মিলনের মতো বিক্রি হওয়া মোটেও ভালো লেখকের লক্ষণ নয়! পপুলার লিটেরাচার জিনিসটা ভালো নয়। তুমি লিখবে লিটেরারি ফিকশন। পপ ফিকশন না। পাল্প ফিকশন না।’

আমি মাথা চুলকে বললাম, ‘আমার জনরা লিটেরারি ফিকশন। আমি পাল্প ফিকশন লিখি না। ইন ফ্যাক্ট আমি সেসব পড়িও না। আমার উপন্যাসের নাম “ফাঁদ”। আপনাকে দিই। আপনি পড়ে দেখেন।’

তারপর একদিন ধুপ করে দাদাভাই মারা গেলেন। মাথার ওপর থেকে একটা ছাতা সরে গেল। তবে ‘ফাঁদ’ পড়েছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। দুজনেই ফাঁদের প্রশংসা করেছিলেন। আলোচনা লিখে দিয়েছিলেন। সেটা অন্য গল্প।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন