গুলতেকিন খান। একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। অনেকেই তাঁকে চেনেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাবেক স্ত্রী হিসেবে। এবার নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করছেন তিনি। অমর একুশে বইমেলায় তাঁর একটি কবিতার বই এসেছে। লেখালেখি করছেন বহু বছর ধরেই। কিন্তু বই প্রকাশ এবারই প্রথম। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ছটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তাঁর ‘আজো, কেউ হাঁটে অবিরাম’ শীর্ষক বইয়ের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন হবে। লেখালেখি, অনুপ্রেরণা আর নতুন বই নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন তানভীর সোহেল।
default-image

প্রথম আলো: আজ প্রথম বই প্রকাশ হচ্ছে। কবি পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করছেন, কেমন লাগছে? 
গুলতেকিন খান: খুব ভালো লাগছে। তবে নিজেকে কবি বলতে চাই না। ভালো লাগা থেকে লেখালেখি করি। এবার বই আকারে সেটি প্রকাশ পাচ্ছে। নিজেকে কবি বলার স্পর্ধা আমার নেই। লেখালেখির মধ্যেই থাকব। তবে মাঝেমধ্যে বই আকারে সেগুলো প্রকাশ করব কি না, সেটি এখনো ভাবিনি। তা ছাড়া লেখক-পরিবারভুক্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছাও নেই। সেটা থাকলে অনেক আগেই লেখালেখি করতাম। 
প্রথম আলো: লেখালেখির শুরুটা কবে থেকে? 
গুলতেকিন: ১৯৭৩ সালে আমার লেখা একটি ছড়া দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। তখন স্কুলে পড়ি। বলা যায়, সেই সময় থেকেই ছড়া লিখতাম।’ ৭৩ থেকে’ ৭৫ পর্যন্ত সময়ে দৈনিক বাংলার বাণী, পূর্বদেশ ও ইত্তেফাক পত্রিকায় আমার অনেক ছড়া ছাপা হয়েছিল। দাদা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর অনুপ্রেরণায় আমি ও আমার অন্যান্য ভাইবোন লেখালেখির চর্চা করতাম। কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত দাদার মতো লেখালেখিতে জড়াননি। ছোটবেলায় দাদা আমাদের ভাইবোনদের কিছু একটা লিখতে বলেছিলেন। তখন আমি প্রথম দুই লাইন ছড়া লিখি। এটা ছিল এমন, ‘গোস্ত খেতে মজা, খাবো আমি গজা’। এটা দেখে দাদা বলেছিলেন, লেখাটা এমন হলে ভালো হতো, ‘গোস্ত খেতে মজা, খাবো গোস্ত ভাজা’। 
প্রথম আলো: তাহলে এত বছর কেন লাগল একটা বই বের করতে? 
গুলতেকিন: ১৯৭৬ সালে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বিয়ে। তারপর বিদেশে চলে যাওয়া। এসব কারণে আর লেখালেখি সেভাবে হয়নি। পুরোনো ছড়াগুলোও হারিয়ে গেছে। তবু মাঝে মধ্যে লিখতাম। ২০০০ সালের পরও কিছু লিখেছি। একটি খাতায় সেটা লিখতাম। এক সময় সেটিও হারিয়ে যায়। কয়েক বছর আগে আমার মেয়েরা খাতাটি খুঁজে পায়। ওরা, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব বলল লেখা চালিয়ে যেতে। তখন থেকে লিখে সেগুলো নিজের ফেসবুকে দিতাম। সেখান থেকে কয়েকজন প্রকাশক আমাকে বই প্রকাশের কথা বলেন। তাম্রলিপির প্রকাশককে বলেছিলাম, যদি কখনো বই করি, তবে তাঁকেই বলব। সেভাবেই এবার বই বের হলো। বইয়ে যে কবিতাগুলো আছে, সেগুলো ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে লেখা। 
বইটি আমি আমার দাদাকে উৎসর্গ করেছি। কেননা আমার অনুপ্রেরণা আমার দাদাই। তাঁর সমর্থন আমাকে লেখার জন্য উৎসাহিত করেছে। দাদার মতো আমাদের পরিবারের অন্য কেউ লেখালেখিতে আসেনি। এটা নিয়ে দাদার দুঃখ ছিল। বলা যায়, দাদা ছাড়া আর কোনো অনুপ্রেরণা নেই। প্রথম যখন কবিতা একটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, তখন দাদা আমাকে পাঁচ টাকা দিয়েছিলেন। 
প্রথম আলো: আপনার সব কবিতার মধ্যে দারুণ ছন্দ লক্ষ করা যায়? 
গুলতেকিন: আসলে আমি ছন্দ ভালোবাসি। সবকিছুর মধ্যেই ছন্দ আছে। আমি মনে করি, সবকিছুর মধ্যে ছন্দ থাকা উচিত। সেটা সাহিত্যের সবক্ষেত্রে যেমন থাকা উচিত, জীবনের ক্ষেত্রে তো বটেই। সবকিছু মিলিয়ে আমার কবিতায় আমি ছন্দকে গুরুত্ব দিয়েছি। এখানে দেশ-কাল-পাত্র বা অন্য কোনো বিষয় সামনে আসেনি। মনের ভেতর থেকে এসেছে। 

default-image

প্রথম আলো: আপনি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন। দেশে-বিদেশে কাদের কবিতা ভালো লাগে। কাউকে কি অনুসরণ করেন? 
গুলতেকিন: বিদেশি লেখকদের মধ্যে টি এস এলিয়ট, অডেন, ডব্লিউ বি ইয়েটসের লেখা ভালো লাগে। আর দেশের কবিদের মধ্যে অলক দাসগুপ্ত, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদের কবিতা ভালো লাগে। তবে কাউকে অনুসরণ করি, তা নয়। লেখার সময় হয়তো কারও কবিতার টানটা চলে আসে। সম্প্রতি আমার এক বন্ধু বলেছিলেন, আমার লেখা কবিতায় জীবনানন্দের ধাঁচ দেখতে পেয়েছেন। এটা হতেই পারে। তবে সচেতনভাবে কাউকে অনুসরণ করি না। লেখালেখির চেষ্টা করার কারণে প্রচুর কবিতা পড়ি। কোনো কোনো কবিতা পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা হয়েছে। যখন একটি লাইন মনে এসেছে, তখন সেটা লিখে রেখেছি। 
প্রথম আলো: বই প্রকাশের পর পাঠকের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, এ নিয়ে আপনার কোনো ভাবনা? 
গুলতেকিন: সবাই চাইবে পাঠক বইটি ভালোভাবে নিক। আমার কাছে মনে হয়েছে, বইটি প্রকাশ পেয়েছে, এতে আমি খুশি। দাদা বেঁচে থাকলে তাঁর দুঃখ কিছুটা হলেও দূর হতো। দেখা যাক, পাঠক কীভাবে নেয়। অনেকের কিছু প্রতিক্রিয়া ফেসবুকে পেয়েছি। ইতিবাচক বা নেতিবাচক সব মন্তব্যই আমার কাছে অনুপ্রেরণা হবে। লেখালেখি আরও ভালো করার চেষ্টা করব। কয়েক বছর আগে লুৎফর রহমান রিটন আমাকে বইমেলায় বলেছিল, আপনি তো পত্রিকায় লেখার বিল নেননি। তখন মনে হয়েছে, লেখা ছাপা হয়েছে—এটাই বড় কথা। এ জন্য আবার টাকাও দেবে। 
প্রথম আলো: ছেলেমেয়েরা আপনার এই লেখালেখিকে কীভাবে দেখছে? 
গুলতেকিন: ওরা খুবই খুশি। একটা মেয়ে দেশের বাইরে আছে। অন্যরা সবাই মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে যাবে। ওরা বলল, মা, তুমি ‘সাইনিং মানি’ পাওনি। ওরা ওদের বাবাকে (হুমায়ূন আহমেদ) দেখেছে ‘সাইনিং মানি’ নিতে। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই মনে করেছে। আমি আসলে টাকার জন্য লিখিনি। 
প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 
গুলতেকিন: আপনাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন