কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

খোঁড়া পায়ের লেকু তার দশ কি এগারো বছর বয়সী মা মরা মেয়েটাকে নিয়ে রাস্তার ধারে ইট ভাঙছে। অভুক্ত তৃষ্ণার্ত মেয়েকে পানি খেতে পাঠায় অদূরের এক কলসি থেকে। সহযাত্রী শ্রমিক ভায়েরা লেকুকে তিরস্কার করে এতটুকু মেয়েকে দিয়ে এমন খাটুনির কাজ করিয়ে নিচ্ছে বলে। নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে নেমে আসে ঠিকাদার। কাজ ফেলে রেখে খোশগল্পে মেতেছে বলে ধিক্কার দেয় শ্রমিকদের। ওদের কঙ্কালসার জীবনে কী এমন খোশগল্পই বা আছে! সে কথা কে বোঝায় ইংরেজ সেপাইয়ের মতো হ্যাট, খাকি শার্ট, খাটো প্যান্ট আর বুট পরা ঠিকাদারকে। তার সাফ সাফ কথা, সেদিনের মতো ইটভাঙার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে মজুরি মিলবে না।

কলসির পাড়ে গিয়ে লেকুর মেয়ের আর পানি খাওয়া হয় না। মাথা ঘুরে পড়ে যায় ইটের স্তূপের ওপর। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ছুটে আসে লেকু। পড়িমরি করে এগিয়ে আসে শ্রমিক বন্ধুরাও। কিন্তু ঠিকাদরের হুংকারে কাজে ফিরে যেতে হয় ওদের। একা লেকু মেয়েকে টেনে তোলে। ঠিকাদারের কাছে হাত পাতে; মেয়েকে হাসপাতালে নিতে হবে। সচল হয় ঠিকাদারের হাতের লাঠি লেকুর পিঠে। থেমে থাকে না তার সহযোগীও। লাথি-কিল সমানে চলে লুটিয়ে পড়া লেকুর শরীরে। আহত রক্তাক্ত লেকু খোঁড়া পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়ায়। দুহাতে তুলে নেয় মৃতপ্রায় কন্যাকে। বস্তিতে ফিরে গিয়ে ওঝা ডাকে। ঝাড়ফুঁকে কাজ হবে না বুঝতে পেরে ওঝাই ডাক্তার আর ওষুধ আনতে পরামর্শ দেয়।
কোনো উপায় না দেখে অবশেষে লেকু ভিক্ষার থালা নিয়ে বের হয়। পথের ধারে আগে থেকে দাঁড়ানো ভিক্ষুকেরা লেকুকে দেখে মহাবিরক্ত। এক মহৎপ্রাণ সে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় একে একে সবার থালাতেই পয়সা দেন মুক্তহস্তে। লেকুও বাদ যায় না।

কিন্তু পেশাদার ভিক্ষুকেরা তা মানবে কেন? ওদের আয়ে ভাগ বসানোর অপরাধে চড়াও হয় ওরা লেকুর ওপর। কারও লাঠি, কারও হাত, কারও বা পা চলে। ভিক্ষুকদের মাঝে একজনের লেকুর মতোই খোঁড়া পা, একজনের এক হাত অবশ। অন্য জনেরও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে। দাবি ছেড়ে দিলে চলবে কী করে! পেট তো আর মানবতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতার গুণগান শুনে শান্ত হবে না।

বিজ্ঞাপন

শেষ দৃশ্য। আহত রক্তাক্ত ক্ষুব্ধ লেকু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে আসে বস্তির সেই ডেরায় মেয়ের কাছে। ঘর ভরা মানুষ, হাড়জিরজিরে প্রতিবেশীরা ভিড় করে আছে। নোংরা চিটচিটে এক টুকরা কাপড়ে মেয়ের আপাদমস্তক ঢাকা। লেকুর বুঝতে বাকি নেই কিছু। প্রাণহীন কন্যাকে দুই হাতে তুলে নিয়ে দ্বীন দুনিয়ার মালিক মওলার কাছে প্রশ্ন ছুড়ে লেকু খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, ‘কে আমার মালিক? নিঠুর তুমি, না ঐ রক্তচোষা ঠিকাদার?’

বলা বাহুল্য লেকুর উদ্ধত প্রশ্নের কোনো জবাব মেলে না।
গল্পটি অনেক পাঠকেরই চেনা। গল্প ঠিক নয়, গল্পের কয়েকটি অনুল্লেখযোগ্য দৃশ্য মাত্র। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপসংহার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি ও বিস্তার এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের গোড়ার কথা নিয়ে অমর কথাশিল্পী শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার রচিত ‘সংশপ্তক’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ধারাবাহিক নাটকের দৃশ্য কয়েকটি প্রচারিত হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায়, পলাশী দিবসের কয়েক দিন আগে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের এক শ বিরাশিতম বছর চলছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে ভারতের নানান কোনায়। স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, নানামুখী সংস্কার আন্দোলনের তোড়ে টগবগ করে ফুটছিল সমগ্র ভারত। এ অবস্থায় পিছিয়ে থাকে না বাংলা, বরং এগিয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

বিপ্লবী জাহেদ ইংরেজের ভারত ছাড়ার আগের মরণ কামড়ের বৃত্তান্ত জানিয়ে বিশাল পত্র লেখে গ্রামের বন্ধু সেকান্দর মাস্টারকে। চিঠির শেষের বাক্যগুলো এ রকম, ‘অভাগা দেশের অভাগা জনগণের জন্য কিছু করার চেষ্টা অন্তত করিয়াছি—এটাই সান্ত্বনা।’ শহীদুল্লা কায়সার অভাগা দেশ বলেছিলেন পরাধীন ভারতকে। আট দশক পর স্বাধীন বাংলাকে আজও কেন অভাগা দেশ বলা হয়, জনগণকেই বা কেন অভাগা বলে ডাকা হয়?

মহাযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা হাত ধরাধরি করে এসেছিল ভারতজুড়ে। তার হলকা আসে বাংলায়। লাশের পাহাড় আর স্বজনহারা, বাস্তুহারার মিছিলের উল্টো দিকেই দেখা যায় অনেকের কপাল খুলে গিয়েছে। ইতিহাস বলে, যেকোনো দুর্যোগে কিছু মানুষ উপকৃত হয়, আখের গোছায়। হ্যাঁ মানুষই বটে; রক্ত মাংসের মানুষ। জাতীয় দুঃসময়ে উল্লসিত হয় এমন মানব সন্তানেরা। কানকাটা রমযান রায়টের খবরটা পেয়েই গোঁফ পাকাতে শুরু করে। ‘মিল গ্যায়া’—এখনই সময় ভবিষ্যতের বীজ বপনের। যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষের বদৌলতে কুঁড়েঘরের জায়গায় চৌচালা টিনের ঘর উঠেছে, ভদ্র বাড়ির মতো খাট–পালং, চেয়ার-টেবিল এসেছে ঘরে, বউয়ের পরনে বনেদি বাড়ির মেয়েদের মতো সাজপোশাক। নিজেও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মিয়ার ব্যাটার মতো পোশাক পরার মহড়া দেন চুপিচুপি। এমন সময় দাঙ্গার সংবাদ মধু বর্ষণ করে রমযানের কানে। মিয়ার ব্যাটাকে ছাড়িয়ে গিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার এ এক সুবর্ণ সুযোগ। মিয়াদের দোর্দণ্ড প্রতাপে ঘুণ ধরতে শুরু করেছে কিছুকাল আগেই; মিয়ার ব্যাটার আত্মম্ভরিতা দুমড়েমুচড়ে যায় রমযানেরই ধূর্তামি ও কারসাজিতে।

বিজ্ঞাপন
একসময় মনে হতো ইংরেজরাই যত নষ্টের গোড়া। ওদের তাড়াতে পারলে শান্তি নেমে আসবে ধরায়। কিছুদিন পর উপলব্ধি হয়, হিসেবে ভুল হয়ে গিয়েছে। আমাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাতে নেমে এসেছে পাকিস্তানি ভূত। কত সংগ্রাম আর রক্ত দিয়ে সে ভূতও তাড়ানো হলো। ভূপেন হাজারিকার সেই গানটা মনে পড়ে যায়, ‘বর্গিরা আর দেয় না হানা নেইতো জমিদার, তবু কেন এদেশ জুড়ে নিত্য হাহাকার’। ভূপেন হাজারিকা খোলা চিঠি লিখেছিলেন শরৎ বাবুর কাছে। আমি না হয় শহীদুল্লা কায়সারকেই লিখি।

স্বজনহারা, আশ্রয়হারা অরক্ষিত হুরমতির ওপর হামলে পড়ে সহস্র শকুন। এক রমযানের হাত থেকে রেহাই পেলেও লক্ষ রমযান ঘিরে ধরে অসহায় হুরমতিকে। রেডিও, ঘড়ি আর একখানা সাইকেলের কাছে সংসারে স্ত্রী-পুত্রের সাহচর্য মূল্যহীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে যৌতুক প্রথার প্রচলন শুরু হয় এতদঞ্চলে। সেকান্দর মাস্টারের বোন রাশু অনেক দিন বাপের বাড়ি পড়ে আছে কেবল তার হতদরিদ্র ভাই ওই তিনটি বস্তুর জোগান দিতে পারছে না বলে।

অনেকটা কাকতালীয়, ‘সংশপ্তক’ নাটকেও চলছিল মড়কের কাল। কলেরায় উজাড় হয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। বিত্ত আর রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে অনেককাল আগের জমিদার বাড়ির দখল নিয়ে খানদানি জীবন যাপন করে রমযান। রমযানের মা রিক্তহস্ত। কলেরায় আক্রান্ত হয়ে অন্যের বাড়িতে মরে পড়ে থাকে। রমযান খবরটা শুনেও মায়ের মুখটা শেষবারের মতো দেখতে যায় না। গাঁয়ের লোকেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সৎকারের ব্যবস্থা করে। রমযান ব্যস্ত নিজ বাসগৃহে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজনে। দুর্যোগের কালে তাদের সঙ্গেই তার নিত্য ওঠাবসা। ঠিক এই দৃশটির সঙ্গে আমাদের রাজধানীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া উচ্চমার্গের এক জালিয়াতির নায়কের পিতার মৃত্যু ও তার অন্তর্ধান গল্পটির বেশ মিল পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতা, পতাকা, মানচিত্র পাওয়ার পর কত কত অর্জন এল একে একে জাতীয় জীবনে! অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি কত কিছুই না দিয়েছে আমাদের! বড় বড় দালানকোঠা, ঝলমলে বিপণি, রেস্তোরাঁ, উড়ালসড়ক, নদীর বুকের ওপর অতিকায় সেতু, সৌন্দর্যচর্চা কেন্দ্র, স্বাস্থ্যরক্ষা কেন্দ্র—আরও কত কী! শতকরা সত্তর জনের বেশি নাগরিক শিক্ষিত, পরিসংখ্যান অন্তত তাই সাক্ষ্য দেয়। তবে বুকে হাত দিয়ে বলি তো, ঠিক কতটুকু এগিয়েছে আমাদের সমাজ?

একসময় মনে হতো ইংরেজরাই যত নষ্টের গোড়া। ওদের তাড়াতে পারলে শান্তি নেমে আসবে ধরায়। কিছুদিন পর উপলব্ধি হয়, হিসেবে ভুল হয়ে গিয়েছে। আমাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাতে নেমে এসেছে পাকিস্তানি ভূত। কত সংগ্রাম আর রক্ত দিয়ে সে ভূতও তাড়ানো হলো। ভূপেন হাজারিকার সেই গানটা মনে পড়ে যায়, ‘বর্গিরা আর দেয় না হানা নেইতো জমিদার, তবু কেন এদেশ জুড়ে নিত্য হাহাকার’। ভূপেন হাজারিকা খোলা চিঠি লিখেছিলেন শরৎ বাবুর কাছে। আমি না হয় শহীদুল্লা কায়সারকেই লিখি। একবার এসে দেখে যান শহীদ বুদ্ধিজীবী, আপনার লেকু, হুরমতি, রাশুরা আজও আছে বাংলার পথে প্রান্তরে, ঘরে-বাইরে; অসহায়, উপেক্ষিত। রমযানদের দাপট চলছে সমাজজুড়ে, দেশজুড়ে। সেকান্দর মাস্টাররা মাঝেমধ্যে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে ওঠে, এটা কী মগের মুল্লুক নাকি?

সংশপ্তক এক অকুতোভয় সৈন্যদলের নাম, জয় অনিশ্চিত জেনেও লড়ে যায় আমরণ। আমার সোনার বাংলায় আবারও কী দেখা দেবে সংশপ্তক?

অন্য আলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0