শিয়াল

অলঙ্করণ: কাইয়ুম চৌধুরী
অলঙ্করণ: কাইয়ুম চৌধুরী

মির্জা খান লেনের হাজার হাজার মানুষ অদ্ভুত এক আমোদে মেতেছে আজ। তাদের চোখে খুশির ঝিলিক। পায়ের পাতা থেকে চুলের গোড়ালি পর্যন্ত ফুর্তি কিলবিল করছে। তারা হাঁটছে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়তে পড়তে। বেশির ভাগের হাতে লাঠি। কেউ কেউ এনেছে পুরোনো জং ধরা কোরবানির গোশত কাটার রামদা। চ্যালাকাঠ হাতেও এসেছে কয়েকজন। তাজিয়ার মিছিলের মতো শিয়ালটাকে কাঁধে নিয়ে দলটা চলছে বাজারের দিকে। সেখানে কসাইখানায় জবাই করা হবে ওটাকে। তার আগে সবাই একটু খুশিমতো পিটিয়ে নিতে চায়।

কসাইখানার সামনের চত্বরটায় জন্তুটাকে ছেড়ে দেওয়া হোক, সবাই তা-ই চাইছিল। ঠাট্টা আর ইয়ার্কিতে চারপাশটা এমন ফুলে উঠছে যে দূর থেকে তাকে বড়সড় একটা বেলুনের মতো মনে হচ্ছিল। রাতের শেষ প্রহর তখন। বিহারি কলোনির কাওয়ালিও শেষ হয়েছে ঘণ্টা খানেক হতে চলল। ভোর হতে আর খুব দেরি না থাকলেও গরুর ভুঁড়ি কাবাবের দোকানগুলোতে তখনো পুরোদমে কাবাব বানিয়ে চলছেন কারিগরেরা। এই উন্মত্ত জনগণ শেয়ালটাকে খতম করেই ঝাঁপিয়ে পড়বে ভট বা ভুঁড়ির কাবারের ওপর, সেটা তারা বিলক্ষণ জানে। কনকনে শীতের হাওয়ার মধ্যেও ঘরে গিয়ে লেপের তলায় আশ্রয় নেওয়ার কথা মনে হচ্ছে না কারও। কেনইবা মনে হবে? জলজ্যান্ত একজন মানুষের শিয়ালে পরিণত হওয়ার ঘটনা এই এলাকার কেউ তার বাপের জন্মেও দেখেনি। জটলা করে লোকে দেখতে এসেছে একনজর। পক্ষঘাতের রোগী আর বুড়োবুড়িরাও জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল।

ঠাট্টা-তামাশা থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত। তাই ঠাট্টা-তামাশার মধ্য দিয়েই এর একটা পরিসমাপ্তি ঘটবে, সবাই তা-ই চাইছিল। ভুঁড়ি কাবাবের ওপর হালকা বিট লবণ ছিটিয়ে দিয়ে মুখে পুরতে পুরতে লোকজন হাসিতে ভেঙে পড়ে। বিরামহীন সেই হাসি যেন থামতেই চায় না। কেবল থেকে থেকে হাসির দমকে ছিটকে যাওয়া কয়েকটা শব্দ শোনা যায়, ‘হালারহুত হিয়াইল্লা’। তীব্র হাসির তোড়ে বাকি কথাগুলো আর শোনা না গেলেও বোঝা যায় এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটা চমকপ্রদ কাহিনি। গত জুলাই মাসের প্রচণ্ড গরমের দিনে যে কাহিনির সূত্রপাত।

দুই.

লোকে বলে, দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে নিরুদ্বেগ সুখী জীবন যাপন করছিল আবদুর রহমান। কিন্তু সেই সুখ তার কপালে সইল না। অতি সংবেদনশীল মনের কারণেই আজ তার এই করুণ দশা। লোকজনের কথা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়। জুলাই মাসের সেই অলস দুপুরে স্ত্রীর সঙ্গে নাকি তার ঝগড়াও হয়েছিল। রাগে ধৈর্যহারা হয়ে তার স্ত্রী নাকি বলেছিল, ‘তোঁয়ারে কিয়ে ফাইয়্যি?’ অর্থাৎ তোমার তাতে কী? এমন সংলাপ অবশ্য অনুমান করে নেওয়া। কেচ্ছা-কাহিনি বলার সময় সুযোগমতো এমন কথোপকথন যোগ করে সবাই। তবে সেদিন প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তা আর জানার উপায় নেই। এ বিষয়ে অধিকাংশ কাহিনির মূল কাঠামো অবশ্য একই রকম। কল্পনাপ্রতিভার বাহুল্য বাদ দিলে মোটামুটি একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্পও পাওয়া যায়।

লোকে বলে সেদিন ছুটির দিন ছিল। পাড়ার সেলুন থেকে দাড়ি কামিয়ে মোড়ের সবুরের চায়ের দোকানে এসে বসেছিল আবদুর রহমান। ঘটনার সূত্রপাত হয় তখনই। ডিসি পাহাড়ের দিক থেকে একদল মানুষ হই-হল্লা করতে করতে এদিকেই আসছিল। দলের অগ্রভাগে বাঁশে বাঁধা একটা শেয়াল কাঁধে নিয়ে হাঁটছিল পাড়ার গফুর আর রাজ্জাক। হই-হট্টগোল শুনে রাস্তায় এসে দাঁড়ানো লোকজনের ভিড়ে রহমানও ছিল। কোনো কারণে পুরো বিষয়টি তার কাছে নৃশংস মনে হয়ে থাকবে। বাঁশে বাঁধা শিয়ালের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে দেখে আর ঠিক থাকতে পারেনি সে।

‘তোমরা কি মানুষ! একটা পশুরে এইভাবে মারছ!’

এলাকার উঠতি মাস্তান গফুর সুযোগ পেলে নিরীহ ছেলেপিলেকে চড়-থাপড় মারতে ছাড়ে না। নানান ঘটনা ঘটিয়ে নাম করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল সে। লোকালয়ে চলে আসা শিয়ালটাকে বাজারে বিক্রি করার প্ল্যানটা তার। টেরিবাজারে নিয়ে গেলে বাতের রোগীরা দ্রুতই কিনে নেবে সব মাংস। কেজি দুশ টাকায় বিক্রি কোনো ব্যাপার না। তাই আনন্দফূর্তির একটা সুযোগ পেয়ে হই-হল্লা করতে করতে চলছিল পাড়ার ছেলেরা। শিয়াল ধরার এই আনন্দের ভাগ নিতে নিঃস্বার্থভাবে যোগ দিয়েছিল পথচলতি বহু কৌতূহলী মানুষ। থেকে থেকে সমস্বরে চিৎকার করছিল তারা, ‘শিয়াল মামা, কেয়া হুয়া/ হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া!’

আবদুর রহমানের এমন কথায় তাই সবাই অবাক হয়। বাঁশের লাঠিটা পাশের জনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে শিকারি কুকুরের গন্ধ নেওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ায় গফুর। রহমানের খুব কাছে ঝুঁকে বলে, ‘অনেরে কিয়ে ফাইয়্যি? আঁরার হিয়াল আঁরা মাইরগুম, ছইড্ডম’ (আপনার তাতে কী? আমাদের শিয়াল আমরা মারব, পিষ্ট করব!)। খুব অল্পের জন্য রহমান সেদিন চূড়ান্ত অপমানের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল। তবে শিয়ালটাকে ওই অবস্থায় বাজারে নিতে দেয়নি সে। নগদ এক হাজার টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়েছিল। এলাকার একটা ছেলেকে কিছু টাকা দিয়ে আহত শিয়ালটাকে ভেটেরিনারি হাসপাতালেও পাঠিয়েছিল। চিকিৎসা শেষে যেন শিয়ালটাকে ডিসি পাহাড়ে ছেড়ে দেয়, এমন অনুরোধ করেছিল রহমান। ট্যাক্সিতে আহত শেয়ালটাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে আর এক মুহূর্তও রাস্তায় দাঁড়ায়নি সে। কারও দিকে তাকাতে পারছিল না। পাইলট স্কুলের ছাত্র পেটানো মাস্টার কিনা এক হাজার টাকা খরচ করে একটা শিয়ালকে বাঁচিয়েছে! বিষয়টা ভেবেই আমোদ পাচ্ছিল এলাকার মানুষজন।

তিন.

মনসুর নামের যে ছেলেটি শিয়ালটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, সে কিছু দূর গিয়েই ট্যাক্সির মুখ ঘুরিয়ে দেয়। প্রতিদানে গফুর গুন্ডা এক শ টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়েছিল। তবে একটা দাঁত বিসর্জন দিতে হয়েছিল তাকে। আইডিয়াটা গফুরের। এতে আবদুর রহমানের কাছ থেকে চিকিৎসা বাবদ আরও কিছু নগদ অর্থ খসানো যাবে। রাতে রহমানের বাসায় গিয়ে মনসুর শিয়াল ছিনতাইয়ের গল্প ফাঁদে। কান্নাকাটি করে চিকিৎসা বাবদ আরও হাজার খানেক টাকা আদায় করে। বাচ্চার দুধ আর বাজার খরচের সব টাকাই বের করে দিতে বাধ্য হয়েছিল রহমানের স্ত্রী। রাগে-ক্ষোভে টাকাগুলো ছুড়ে মেরেছিল মনসুরের মুখের ওপর। লোকে বলে, সেদিন রাতে আবদুর রহমান স্ত্রীর গালিগালাজ সহ্য করতে না পেরে রুপালি সিনেমা হলের বারান্দায় রাত কাটিয়েছিল।

চার.

সেদিনের পর থেকেই পাড়ায় ছেলেবুড়ো সবার কাছেই আবদুর রহমান নতুন করে পরিচিতি পায়। পাইলট স্কুলের আবদুর রহমানের বাসা কোন দিকে? কোনো আগন্তুকের এই প্রশ্নের জবাবে এলাকাবাসীকে পাল্টা প্রশ্ন করতে হয় বুঝে নেওয়ার জন্য। কোন রহমান, শিয়াল রহমান? ওই যে হলুদ বিল্ডিংয়ের দোতলায়। চল্লিশের ঘরে পা দেওয়া রহমান এ ঘটনার পর আরও দ্রুতই যেন বুড়িয়ে গিয়েছিল। এমনিতেই সে মাথা নিচু করে হাঁটত। এরপর তার মাথাটা যেন আরও নিচের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল। পাড়ায় ঢুকলেই পিচ্চিদের একটা দল তার পিছু নিত, হুক্কা হুয়া ধ্বনি দিয়ে লাফালাফি করত। নির্মল আনন্দের এই উপলক্ষ ছাড়তে চাইত না কেউ। ছড়া কেটে নিত্যনতুন অশ্লীল গালি দিয়ে প্রত্যেকেই তাদের প্রতিভার পরিচয় দিতে চেষ্টা করত। একদিন পূর্ণিমার রাতে এলাকার নেশাখোরদের একটা দল রহমানের বাড়ির সামনে হাজির হয়। সবাই গলা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে হুয়া হুয়া রব তুলে চিৎকার দিতে থাকে। দশ-বারোটা ছেলের এমন গগনবিদারী চিৎকার শুনে আশপাশের জঙ্গল থেকে আরও শত শত শিয়াল যেন জেগে উঠে উত্তর দেয় হুয়া হুয়া ধ্বনিতে। অনেক রাত পর্যন্ত চলেছিল মানুষ আর শিয়ালের এমন দ্বৈত সংগীত। পরদিন খুব ভোরে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে আবদুর রহমানের স্ত্রী চিরদিনের মতো বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল। লোকে বলে, এমন ক্যালাস স্টুপিড টাইপের মানুষের সংসার তো না টেকারই কথা।

পাঁচ.

আবদুর রহমানকে এরপর দীর্ঘদিন পাড়ার লোকজন দেখেনি। স্কুলে যাওয়াও ছেড়ে দিয়েছিল সে। তবে রাতে তার জানালার আলো দেখে বোঝা যেত ঘরে মানুষ আছে। তবু একসময় যা হয়, ধীরে ধীরে সবাই ভুলে যেতে থাকে রহমানের কথা। শিয়ালের ঘটনার কথাও মনে থাকে না কারও। লোকে এ-ও ভুলে যায় যে মির্জা খান লেনের ১৬৫ বাই বি হলুদ বিল্ডিংয়ে কোনো দোতলা আছে। ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা একতলায় যায়। তিনতলায় যায়, চারতলায় যায়, ছাদে যায়, কিন্তু দোতলায় ওঠার কথা ভুলে যায়। যেন দোতলায় না উঠেই তারা তিনতলায় উঠেছে, চারতলায় উঠেছে কিংবা ছাদে গিয়ে দুপুরের অলস হাওয়া গায়ে মেখেছে।

ছয়.

আবদুর রহমানকে সবাই যখন ভুলে গিয়েছিল তখন তার দিনকাল কেমন কাটছিল জানা যায় না। তার তিন ফুট লম্বা বইয়ের র‌্যাকে ধুলা জমেছিল। সেই বেতের পুরোনো র‌্যাক থেকে জীবনানন্দ দাশের সমগ্র খুলে ‘সেইসব শেয়ালেরা’ কবিতাটি রহমান পড়েছিল কি না তা কে বলতে পারে? সে কী খেত, কী করে বেঁচে ছিল, সেই প্রশ্নও অবান্তর। কারণ বাস্তব দুনিয়ার অর্থাৎ পাড়ার লোকজনের সঙ্গে তখন তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। যে মানুষটি রোজ বাজারে যেত, স্কুলের পর দুটো টিউশনি করত, সকালে একটা ব্যাচ পড়াত, ছুটির দিনে বউ-বাচ্চাসহ বেড়াতে বের হতো, ছাত্র পেটাত, সেই আবদুর রহমান যেন হঠাৎই অতীত হয়ে গেল। সবার দৃষ্টির অন্তরালে, মনোযোগের বাইরে। তবে প্রতি রাতে শিয়ালেরা হাজির হতো তার বাড়ির সামনে। দিন দিন বাড়ছিল তাদের সংখ্যা। রোমশ লেজ, লালচে বাদামি শরীর আর লম্বাটে সুচালো মুখ। হয়তো সেসব শিয়ালের ডাকে আবদুর রহমান শেষ পর্যন্ত সাড়া না দিয়ে পারেনি।

সাত.

মধ্য মাঘের প্রচণ্ড হিম রাতে মির্জা খান লেনের শত শত, হাজার হাজার মানুষ অদ্ভুত এক আমোদে মেতেছে। তাদের চোখে খুশির ঝিলিক, পায়ের পাতা থেকে চুলের গোড়ালি পর্যন্ত ফুর্তি কিলবিল করছে। শিয়ালরূপী মানুষ অথবা মানুষরূপী শিয়ালটাকে ঘিরে এলাকাবাসীর উচ্ছ্বাস কিছুতেই থামছে না। বাজারের কসাইখানার একটা উঁচু বেদির ওপর বসানো হয়েছে তাকে। গা-ভর্তি ঘন লোম সত্ত্বেও মানুষের অবয়বটা স্পষ্ট। সুচালো লম্বা মুখটা ঝুঁকে আছে নিচের দিকে। গফুরের এসে পৌঁছানোর অপেক্ষায় আছে লোকজন। জন্তুটাকে রেখে একটা ক্যামেরা জোগাড় করতে গেছে তারা। ওটাকে পায়ের নিচে রেখে শিকারির মতো পোজ দিয়ে ছবি তুলবে। পরদিন এই ছবি পত্রিকায় ছাপা হলেই রাতারাতি তারকা বনে যাবে গফুর। কে না জানে, এই দেশের লোকজন বীরপূজারি!