বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁকে হারিয়েছি আমরা। মৃত্যুর পর ১৫ বছর পরেও বেঁচে আছেন তরুণ শিল্পীদের সাধনায়, মানুষের প্রাণে প্রাণে।

শেফালী ঘোষের জনপ্রিয় গানের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সেগুলো মানুষ যেমন আনন্দ দিয়েছে, তেমনি মানুষের মনকেও জাগিয়েছে। কর্ণফুলীর দুই তীরের মানুষের জীবন, তাদের ভাবনা, আচার–আচরণের নিখুঁত চিত্র উঠে আসত তাঁর গানে। সে কারণে আজও মানুষের হৃদয়ে সেই সব গান বেজে ওঠে। চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলী যত দিন বইবে, তত দিন শেফালী বেঁচে থাকবেন। কেননা তাঁর গানে সূর্য ওঠার অসাধারণ বর্ণনার সঙ্গে প্রিয় বিরহের বেদনা একাকার যেমন হয়েছে, তেমনি চিরপ্রবহমান জলধারা কর্ণফুলীর কথাও উঠে এসেছে, ‘সূর্য উডের অভাই লাল মারি/ রইস্যা বন্ধু যারগই আমার বুকে সেল মারি’ (চারদিকে লাল আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য উদিত হচ্ছে/ এ সময় আমার বুকে সেল মেরে যেন রসিক বন্ধু চলে যাচ্ছে অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী)।

default-image

‘ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত, লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়ারে যারগই কর্ণফুলী’। (জলে ছোট ছোট ঢেউ তুলে, লুসাই পাহাড় থেকে নেমে কর্ণফুলী ধেয়ে যাচ্ছে—গীতিকার: মলয় ঘোষ দস্তিদার)
শুধু কর্ণফুলী নয়, কর্ণফুলীর মাঝির সঙ্গে প্রেমের খুনসুটিও উঠে এসেছে তার গানে
মনখাচারা মাঝিরে তো সাম্মানত চইরতাম নঅ। (মন খারাপ মাঝি আমি তোমার সাম্পানে চড়ব না। গীতিকার: সৈয়দ মহিউদ্দিন)
প্রেমিকার অভিমান, চাষির দুঃখ, বানভাসির ভোগান্তি, মাতৃপ্রেম সবকিছুই পাওয়া যায় তাঁর গানে।
‘বউ হারাইলে বউ পাবি তুই
গাইডুর পইসা ছারিলি
মা হারাই আর ফাতিনো
মাথা বাইরগেই হাঁদিলি’
(বউ হারালে বউ পাবি তুই টাকাপয়সা খরচ করলে, কিন্তু মাথা কুটে মরলেও হারানো মাকে ফিরে পাবি না। গীতিকার: সৈয়দ মহিউদ্দিন)
শেফালীর গানের বিচিত্র বিষয়, মানবিক আবেদন এবং তাঁর সুর কখনো শ্রোতার মর্মে গিয়ে আঘাত করে। সে রকম একটি গান গাড়িটানা গরু নিয়ে। গেল শতকের আশির দশকেও চট্টগ্রাম শহরে রাস্তায় গরুর গাড়ি দেখা যেত। সেই গাড়ি টানা গরুকে নিয়ে শেফালীর হৃদয় বিদীর্ণ করা গান।
‘আহারে গরু টানের গরুর গাড়ি
মুখ ফেনা চোখত ফানি
রাস্তা ধরি যারগই টানি
ফাঁত ফাঁত ফাঁত পিডত ফড়ের
হাইল্যা চোঁয়ার বাড়ি
পিঠটান ফুলি দাগ দেহা যার
আতারি পাতারি।’

(মুখে ফেনা, চোখে পানি/ রাস্তা ধরে যাচ্ছে টানি/ সপাৎ সপাৎ পিঠের ওপর পড়ছে কঞ্চির আঘাত। পিঠটা ফুলে গেছে। তাতে এলোপাতাড়ি মারের দাগ দেখা যাচ্ছে। গীতিকার: সৈয়দ মহিউদ্দিন।)

শেফালী ঘোষ পুরোনো হয় না। চিরায়ত প্রকৃতির মতো তাঁর গান সব সময় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। উৎসব, পার্বণ, মেলা তাঁর গান ছাড়া জমে না চট্টগ্রামে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশ কিংবা বিশ্বের অনেক অঞ্চলে অঞ্চলে তরুণ শিল্পীর কণ্ঠে এখনো শোনা যায় শেফালীর মঞ্চকাঁপানো গানগুলো। ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁকে হারিয়েছি আমরা। মৃত্যুর পর ১৫ বছর পরেও বেঁচে আছেন তরুণ শিল্পীদের সাধনায়, মানুষের প্রাণে প্রাণে।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া শেফালীর বেশির ভাগ গান চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। তবে শুরুতে তিনি নজরুলগীতি আর আধুনিক গানই করতেন। ১৯৬৩ সালের কথা। শেফালীর বয়স তখন ২২। চট্টগ্রাম বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন আশরাফুজ্জামান। ডাকলেন শেফালী ঘোষ আর আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে। প্রস্তাব দিলেন আঞ্চলিক ভাষায় গান গাওয়ার। দুজনে রাজি হলেন। ডেকে আনা হলো মলয় ঘোষ দস্তিদারকেও। তিনি এই দুই শিল্পীর জন্য গান বাঁধলেন। এ গানের কথায় মানুষের অন্তরের আকুলতা যেন কর্ণফুলীর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে, ‘নাইয়র গেলে বাপর বাড়ি আইস্য তাড়াতাড়ি/ তোঁয়ারে ছাড়া খাইল্যা ঘরত থাইক্যুম কেন গরি?’ (বাপের বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছ, ফিরে এসো তাড়াতাড়ি। তোমাকে ছাড়া একা ঘরে কেমন করে থাকব?)।

default-image

শেফালী ঘোষ আর শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের সেই দ্বৈত কণ্ঠের গান নিয়ে হইচই পড়ে গেল। শেফালী ঘোষকেও আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান তাঁকে জনপ্রিয়তার এমন শীর্ষ একপর্যায়ে নিয়ে গেল যে কোনো পালাগান, অনুষ্ঠান আর শেফালী ছাড়া জমল না। গ্রামে, গঞ্জে, পাড়ায় ছেলে–বুড়ো–যুবক সবার মুখে শেফালীর গান। তাই তো তাঁর জন্য গান লিখলেন উপমহাদেশখ্যাত রমেশ শীল, আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতার, কবিয়াল এয়াকুব আলী, সৈয়দ মহিউদ্দিন, অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী, চিরঞ্জিত দাশ, মোহাম্মদ নাসির, মোহন লাল দাশেরা। তাঁদের লেখা সেই সব গান শেফালীর জাদুকরি কণ্ঠে এসে মানুষের হৃদয় কেড়ে নিল, আর তাদের মুখে ফিরতে ফিরতে একধরনের লোকগানের মর্যাদায় অমর হয়ে গেল। মানুষ কি ভুলবে সেই কথাগুলো—‘আঁধার ঘরত রাত হাডাইয়ুম হারে লই’, ‘ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দেওয়ানা’, ‘পালে কী রং লাগাইলি রে মাঝি’, ‘সাম্পানে কি রং লাগাইলি’, ‘নাতিন বরই খা বরই খা হাতে লইয়া নুন।’

default-image

১৯৯১–এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলে মানুষের হাহাকার। ঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞের পর তখনো হতবিহ্বল মানুষ ও প্রকৃতি। ঠিক সেই সময় তিনি গাইলেন এক অসাধারণ গান।
‘গর্কি তুয়ান-বইন্যা-খরা মোহামারি ঘুন্নিঝড়
ভাসায় মারে ধ্বংস গরে, মাইনসে তো আর বই ন লর
অক্কল হামর ধান্দা চলে আবার নয়া সিষ্টি অর
আবার নয়া সিষ্টি অর
ভাঙা গাছর নয়া ঠেইল
পাতা মেলি দেহার খেইল
পঙ্খী আবার উড়রে ঘুরের
চুপ্পে প্রেমর হতা হর।’
(গোর্কি, তুফান, বন্যা, খরা, মহামারি, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো ভাসিয়ে মারে, ধ্বংস করে, মানুষ তবু বসে থাকছে না। সব কাজের চাকা ঘুরছেই, আবার নতুন নতুন সৃষ্টি চলছে। ভাঙা গাছের নতুন ডালপালা মেলে কী জাদু দেখাচ্ছে, পাখি আবার উড়ছে, ঘুরছে, চুপিচুপি প্রেমের কথাও বলছে। কথা: সৈয়দ মহিউদ্দিন)।

এটি এক আশ্চর্য উদ্দীপক গান। ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে এ সুরেলা প্রেরণা সেদিন শেফালী ঘোষের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে। অগুনতি মানুষের কান্নার ভেতর, হাহাকারের ভেতর, বিলাপের ধ্বনির ভেতর এ গান শুনে সেদিন প্রতি রোমকূপে জীবনের পুলক জেগেছিল।

এভাবে একটা জনপদের ইতিকথা, মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি আর গৌরবময় ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো রয়ে যাবে শেফালীর গানে।
২০০৬ সালে মৃত্যুর এক বছর পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন একুশে পদক। কিন্তু শিল্পী হিসেবে শ্রেষ্ঠ যে পুরস্কারটি তিনি পেয়েছেন, তা হচ্ছে অগুনতি মানুষের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় তিনি বেঁচে থাকবেন।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন