বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৬৪ সাল, ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ। হবিগঞ্জের মাকালকান্দির গোপাল চৌধুরী ও প্রভাষিনী চৌধুরী দম্পতির কোল আলোকিত করে পৃথিবীর আলো দেখেছিল এক মানবশিশু। আমাদের ঠিক ঠাহর হওয়ার কথা নয়, গোপাল চৌধুরী ও প্রভাষিনী চৌধুরী দম্পতি ভাবতে পেরেছিলেন কি না, তাঁদের সপ্তম সন্তানটি হবে ক্ষণজন্মা। এ-ও আমাদের জানার কথা নয়, তাঁদের কল্পনায় খেলেছিল কি না, তাঁদের সন্তানটি মানুষের হৃদয়ের গভীর তলদেশ ঘুরে ঘুরে সন্ধান করে স্বপ্নের পাখিটিকে ধরার নিমিত্তে জন্মলাভ করবে। ভাবতে কি পেরেছিলেন তাঁরা, তাঁদের সন্তানটি এক মানুষজীবন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে লিপ্ত রেখে এমনকি মানুষের অনাবাদি, ঊষর-বন্ধ্যা হৃদয়জমিনেও সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তোলার অধিকারী হবেন?
গোপাল চৌধুরী ও প্রভাষিনী চৌধুরীর ভাবনা বহু দূরের কল্পনা হলেও বাংলা গানের অন্যতম মহাজন কমরেড সঞ্জীব চৌধুরীকে নিয়ে লেখা কথাগুলো যে কল্পনা নয়, সত্যি, সে ব্যাপারে তাঁর পাঠক-শ্রোতা এবং পরিচিতজন জ্ঞাত।

কবি-গীতিকার-গায়ক-গল্পকার-সুরকার-নাট্যকার-রাজনৈতিক কর্মী-সাংস্কৃতিক সংগ্রামী—নিজের আত্মা বহুভাবে বাজানো সঞ্জীব চৌধুরী ছিলেন অসম্ভব রকম প্রতিভাবান।

১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধাতালিকায় ১২তম স্থান অর্জন করার পাশাপাশি ১৯৮০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও মেধাতালিকায় তিনি স্থান করে নিয়েছিলেন। পড়ালেখায় নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখার পাশাপাশি স্কুলজীবন থেকে তাঁর রাজনৈতিক বোধও ছিল শাণিত। স্কুলে পড়ার সময়ই যদিও ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, মূলত ঢাকা কলেজে পড়াকালে ছাত্র ইউনিয়ন তথা সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়া। নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭৯-৮০ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। ছাত্ররাজনীতির নিবেদিতপ্রাণ, সঞ্জীব চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সংস্কৃতি সম্পাদকেরও।

মাত্র ৪৩ বছরের এক স্বল্পপ্রজ অথচ ঘটনাবহুল আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। পার্থিব জীবনে, যার কারণে, বোধ করি, যতভাবে পেরেছেন শুধু কাজ করে গেছেন, কাজ করেছেন মানুষের জন্য। মানুষের অন্তরের কথা, স্বপ্নের কথা নিজের অন্তরাত্মায় লীন করে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হতো কথার ফল্গুধারা। মানুষের হৃদয়ের ব্যথা অনুধাবন করে তাঁর অন্তরাত্মা উৎকণ্ঠিত হতো। পাখির হৃদয় নিয়ে জন্মলাভ করা মানুষটির বুকের ভেতর বড় কষ্ট হতো কোনো মানুষ খুন হলে। মেনে নিতে না পেরে তিনি চিৎকার করে উঠতেন, ‘তিনটি লাশ, তিনটি লাশ। ঠান্ডা হিম, যাঁদের গুম করে ফেলা হবে।’ মানুষের অকালে চলে যাওয়াও তাঁর বুকে বড় বেদনার মতো ক্ষত সৃষ্টি করে বাজতে থাকত। তাঁর মাথার কোষে কোষে যেন লাফ দিত একসঙ্গে এক শ হরিণ। বাপ্পা মজুমদারের বন্ধু আনন্দ অকালে প্রয়াত হলে সঞ্জীব চৌধুরী লেখেন, ‘ছিল গান, ছিল প্রাণ’ গীতিকবিতাটি। ফলে দরদি সঞ্জীব চৌধুরী রচিত, সুর করা, গাওয়া গান পিনপতন নৈঃশব্দ্যে ছাওয়া রাতে কর্ণকুহর ভেদ করে আমাদের মস্তিষ্কে হয়ে ওঠে অমিয় সংগীত। সুর-সংগীতের চেয়ে তাঁর গানের কথাই মূলত ছড়িয়ে পড়ে মগজের চারদিকে, তারপর গেঁথে যায় মননে:
‘আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া, সন্ধান করিয়া/ স্বপ্নের ওই পাখি ধরতে চাই/ আমার স্বপ্নের কথা বলতে চাই; আমার অন্তরের কথা বলতে চাই।’

[স্বপ্নবাজি]
সঞ্জীব চৌধুরীর কথার শক্তির মাহাত্ম্য ব্যাপক। মগজের কোষে কোষে সঞ্জীব-শ্রবণের অনুধাবন ছড়িয়ে পড়লে অনুভূত হয়, কেউ যেন মগজে আসন গেড়ে বসে বলে চলে, ‘নিভৃত, শব্দহীন, আমার উৎসর্গময় ভালোবাসা, তোমাদের আত্মার উৎকর্ষ সাধনের নিমিত্তে পথে-প্রান্তরে গান কুড়িয়েছি, শব্দ কুড়িয়েছি, কবিতা রচেছি। তোমাদের হৃদয়গভীরের সকল সুখ-অসুখ, সুস্থতা-অসুস্থতায় নিজেকে সিঞ্চিত করে রচেছি তোমাদের আত্মা-সংগীত।’ হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পাঁজরের ওপর সংবেদনশীল একাকী হাওয়ারা তখন যেন আচম্বিত আছড়ে পড়ে, আছড়ে পড়ে স্বয়ং সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিচ্ছবি আর মাথার ভেতর দ্রিমদ্রিম করে বাজে:
‘ওঠো ও গোলাপ/ জাগাও আমাকে/ কাঁটার পুলকে/ যে উদ্ভাসিত/ দুলছে আকাশ/ জল তিরতির/ জ্বলছে শরীর / অমীমাংসিত।’
[নৌকাভ্রমণ]
মানুষ হিসেবে সঞ্জীব চৌধুরীর ছিল সম্মোহনী ক্ষমতা, মানুষকে তিনি আপন করে নিতে জানতেন। আমরা তাঁর লেখা ‘দলছুট’ গানটিতে দেখতে পাই, মানুষকে তিনি কত গভীরে ভালোবেসে গান রচেছেন:
‘তাকে নিয়ে দু–একটি গান গেয়ে যাই/ আমাদের গানে তার দুঃখ বিকাই/ দুঃখের বেচাকেনা বাজার সরব/ ছেঁড়া স্যান্ডেল হাতে ছেলেটা নিরব।’

[দলছুট]
সঞ্জীব চৌধুরীর গানের গভীরে বিচরণ করলে আমাদের অনুভব করতে বেগ পেতে হয় না, গানের পরতে পরতে প্রেম ও দ্রোহ সমানভাবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি সমাজের যেকোনো অসঙ্গতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি গানে গানে কথা বলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। তিনি ভালোবাসতেন, পরমতম আনন্দটুকু খুঁজে পেতেন রাতের মহানগরী ঢাকায় ঘুরে ঘুরে। তিনি যে শুধু চারদিক পর্যবেক্ষণ করতেন তা–ই নয়, চারদিকের চলমানতাকে তিনি ধারণ করতেন আর ব্যাকুলতা থেকে গাইতেন আকুল হৃদয়ের গান। ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষা সংগীত’ গীতিকবিতাটিতে বলেছেন:
‘আল্লার ওয়াস্তে দুইডা ভিক্ষা দেন গো মা
আমি অন্ধ ফকির বাবা, চোখে দেখি না হাবাগোবা
ভাঙ্গা লাডি, ফুডা থালা
হাতে হারিকেন, পিঠে ঝোলা
আল্লাহর ওয়াস্তে দুইডা ভিক্ষা দেন গো মা।’

গান, কবিতার পাশাপাশি সঞ্জীব চৌধুরী ছোট গল্প ও নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখেছেন এবং ‘সুখের লাগিয়া’ নামে একটি নাটকেও অভিনয় করেছেন। তাঁর প্রতিস্পর্ধী বিকল্প প্রকাশনা ‘রাশপ্রিন্ট’–এ দেখতে পাওয়া যায়, ঘাত-অভিঘাতের দারুণ ক্লেদাক্ত অভিযোগের পরও কতটা সরল তিনি জীবনের প্রতি, কতটা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ তিনি মানুষজীবনের প্রতি। আমাদের আত্মার ওঠাপড়ার জন্য, আমাদের ফেনিল অস্তিত্বের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন এক কাকচক্ষুর জলাভূমি, যে স্তব্ধতার সূচক পাঠকের বোধ করি জানা থাকে না। ‘রাশপ্রিন্ট’–এ বলেছেন, ‘লেফটেন্যান্ট জেনারেল ট্রাকের চাকার নিচে ফেটে যাওয়া দিপালী সাহার হৃৎপিণ্ডকে যারা ভ্যালেন্টাইন-বেলুন বানিয়ে বেচে দ্যায়, অথবা যাদের শুধুমাত্র শরৎবাবুই কাঁদাতে পারেন, একমাত্র গোপাল ভাঁড়ই হাসাতে পারে—সেই নিথর স্বাভাবিকতায় মৃত মানুষদের ব্যবচ্ছেদ ঘটে এক নীল ক্লিনিকে।’

সঞ্জীব চৌধুরী যেমন ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ, ঠিক ততটাই সোচ্চার ছিলেন তিনি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে। অবরুদ্ধ সময়ে যখন বেয়নেট আর জলপাই রঙের মহড়া চলছিল দেশে, তখনো বুকের স্ফুলিঙ্গের হলকা উদ্‌গীরণ করে ওপেন কনসার্টে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা বলে, ওই গাড়িতে করে আমাদের জন্য খাদ্য আর পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ, আমি জানি, ওই গাড়িতে আমাদের জন্য কোনো খাদ্য ছিল না, আমাদের জন্য কোনো পানীয় ছিল না। ৩০০ লাশ…। ৩০০টি লাশ ঠান্ডা, হিম! যাদের খুন করে ফেলা হবে। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সত্য কথা। আর তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত রাইফেল। আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত বেয়নেট। ওরা বলে, খামোশ…। তবুও বন্ধুগণ, আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই, আমার অন্তরের কথা বলতে চাই…’

সঞ্জীব চৌধুরীর অকালপ্রয়াণ ভীষণ কষ্ট দেয়। তাঁকে মনে পড়ে। ভীষণভাবে মনে পড়ে তাঁকে। বলেছিলেন সঞ্জীব, ‘মনে পড়ে, মনে পড়ে সেই হৃদয় কাঁপানো স্বপ্নের কথা, কথা ছিল নিশ্চিত বিজয়, কথা ছিল, সমান অধিকার। কথা ছিল, ঘাড়ের ওপর চেপে বসা রক্তচোষার ঝাড়গুলোকে, নর্দমার কীটগুলোকে পায়ে পিষে মারার। কথা ছিল একদিন না হয় একদিন। কোথায় যেন ভুল ছিল, সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনতে যারা বেরিয়ে পড়েছিল, তাদের কেউ আর ফিরে আসেনি, কেউ আর ফিরে আসেনি।’

মৃত্যুচিন্তা সঞ্জীব চৌধুরীকে যে শুধু বিচলিতই করতে পারেনি তা নয়, মৃত্যু নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে রসিকতা করা থেকেও তিনি রহিত থাকতেন না। বলেছিলেন, ‘টিএসসি চত্বরে কিংবা আজিজ সুপার মার্কেটে আমি থাকব না, সেটা কি কখনো কল্পনা করা যায়! গিয়ে দেখবেন, আমি সেখানে মস্ত আড্ডা জমিয়ে বসে আছি। জীবনানন্দ দাশের “আবার আসিব ফিরে” কবিতাটির আদলে আমি আউড়ে যাই, আবার আসিব ফিরে, টিএসসির মোড়ে, হয়তো কোনো এক বিপ্লবীর বেশে।’ কিন্তু কী আশ্চর্য! মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ২০০৭ সালের নভেম্বরের ১৯ তারিখের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১০ মিনিটে তিনি সত্যিই অলোকলোকবাস নিলেন!

নষ্ট-ভ্রষ্ট মহানগরী ঢাকার পথে পথে হাঁটার সময় তাঁর কথা মনে আসে। স্ফুলিঙ্গডানা কমরেড সঞ্জীবনী সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতি আকাশে উড়ো কথা ভাসিয়ে দিয়ে বলি, কত একা দীর্ঘ রাত হেঁটে যাই আপনার সঙ্গ নানা পথে! এই নষ্ট শহরের বুকে আসমুদ্র-হৃদয় নিয়ে কোনো হৃদয়বান পাগল বোধ করি চাঁদের জন্য আর গান লেখে না। গায় না কেউ আর—
‘শহরে এসেছে এক নতুন পাগল
ধরো তাকে ধরে ফেলো, এখনই সময়
পাগল রাগ করে চলে যাবে
খুঁজেও পাবে না,
পাগল কষ্ট চেপে চলে যাবে
ফিরেও আসবে না
মেয়ে, আমাকে ফেরাও।’
[চাঁদের জন্য গান]

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন