সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির গানের পাঠ

সাধুসঙ্গে ঘুরি ফিরি। সাধু-গুরুদের গান শুনি। সাধুরা বলেন—যে গানে চেতনার বোধন ঘটে না তা গান নয়, আর গানকে তাঁরা যেভাবে দেখেন, গেয়ে থাকেন, এমনকি গানকে যেভাবে বিবেচনা করে থাকেন, তাতে আমার খুব মনে হয়—‘গান’ শব্দটিকে সাধু-গুরুরা আসলে ‘জ্ঞান’-এর আঞ্চলিক ও প্রতীকায়িত শব্দ বলেই মনে করেন। সাধু-গুরুদের ভাষ্য অনুযায়ী গানের আরেক নাম ‘কালাম’। যেমন লালন সাঁইজির গানকে তাঁরা বলেন—‘সাঁইজির কালাম’ অর্থাত্ সাঁইজির দিকনির্দেশনা।সাধুসঙ্গে ঘুরে ফিরে বুঝি সাঁইজির যে দিকনির্দেশনায় যখনকার কথা বলা হয়েছে, তখনই তা গাইতে হয়। যেমন গোষ্ঠলীলার গানকে সকালেই গাইতে শুনেছি। আবার রাসলীলার গানকে কখনোই রাতে গাইতেও শুনিনি। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে যে মাটিতে লালন সাঁইজি শায়িত, সেখানকার শিশু থেকে বয়স্ক, সাধারণ মানুষ সবাই একটা কথা জানে ও মানে—‘রাতে গোষ্ঠ দিনে রাস যে গায় তার সর্বনাশ।’ এমন সুসঙ্গবদ্ধ নিয়মের কারণে সাঁইজির গানের বাণীকে যখন তখন গাইতে শোনা যায় না। তাই সাঁইজির দিকনির্দেশনামূলক বহু গানই সাধারণ শ্রোতাদের শ্রুতির অগোচরেই থেকে যায়, কেননা তা সময়ের বিধান মেনে সুনির্দিষ্ট সময়েই গীত হয়। গানগুলো সচরাচর সাধুসঙ্গেই গীত হয়। আজ আমরা সে আলোচনায় যাচ্ছি না, আজকের আলোচনা সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির গানের পাঠ নিয়ে।সাধু-গুরুদের গান তো মৌখিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার লিখিত পাঠ পাওয়া ভার, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু গানের বাণীর লিখিত পাঠ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রেও সমস্যা হয় একই গানের একাধিক লিখিত পাঠ পেলে, আবার লিখিত পাঠ প্রথমবার আবিষ্কৃত হবার পর আকস্মিকভাবে তা হারিয়ে গেলে এবং কোনো হারানো লিখিত পাঠ নতুনভাবে পুনরায় আবিষ্কৃত হলে কিংবা লিখিত পাঠের সঙ্গে সাধু-ভক্তদের গাওয়া বা শহুরে শিক্ষিত শিল্পীদের গাওয়া পাঠের মিল-অমিল নিয়েও কখনো কখনো বিতর্ক ওঠে। বহুদিন ধরেই দেখে আসছি, সাধু-গুরুদের গানের পাঠ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষক, এমনকি শিল্পীদের মধ্যেও গবেষণা, বিতর্ক বা ঝগড়া-ঝাঁটির অন্ত নেই। গবেষকদের মতো গানের বাণীর পাঠ নিয়ে বিতর্ক কিন্তু সাধু-গুরুদের সাধুসঙ্গেও নিত্যই হয়ে থাকে। যেখানে গুরুর উপস্থিতিতে শিষ্য গান পরিবেশন করেন, সেখানে শিষ্যকে যেমন গানের উত্তর ব্যাখ্যান করতে হয়, তেমনি গানের পাঠের ভিন্নতা নিয়েও জবাব দিতে হয়। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, দৌলতপুর, খলিসাকুণ্ডু, মিরপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা অঞ্চলে সাধুসঙ্গে গিয়ে লালন সাঁইজির বিভিন্ন গানের বাণীর পাঠ নিয়ে সাধু-গুরুদের বিতর্ক দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে।১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯। সেদিন চুয়াডাঙ্গা জেলার বেলগাছি ইউনিয়নের অন্তর্গত ফরিদপুর গ্রামে রইসউদ্দিন শাহর বাড়িতে অনুষ্ঠিত একটি সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির একটি গানের পাঠ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। সে সাধুসঙ্গে পূর্ণসেবার আগে গানের অনুষ্ঠানে শব্দগান বা ভাবগানের শিল্পী সানোয়ার হোসেন (২৭) তাঁর ভাঙা দোতরা বাজিয়ে বেশ সুরেলাকণ্ঠে লালন সাঁইজির যে গানটি গাইলেন, তা হলো—জাত গেল জাত গেল বলেএকি আজব কারখানাসত্য কাজে কেউ নয় রাজি সব দেখি তা না না না \যখন তুমি ভবে এলেতখন তুমি কী জাত ছিলেযাবার বেলায় কী জাত নিলেএ-কথাটি বলো না \ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল চামার-মুচিএকই জলে সব হয় শুচিদেখে শুনে হয় না রুচি যমে তো কাউকে ছাড়বে না \গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়লালন বলে জাত কারে কয় এই ভ্রমও তো গেল না \গানটি গাওয়া শেষ হতেই সাধুসঙ্গে উপস্থিত বাউলগুরু দিদার শাহ (৮৪) বললেন—‘‘গান তো ভালোই গাইলে, কিন্তু কথা হলো, ওইখানে কি বললেন—‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’! এটা কি ঠিক?”সানোয়ার উত্তর করল—‘আপনারা আমাদের গুরুজন। আমরা যেটা শুনেছি, তাই গেয়েছি। ভুল হলে শুধরে দেবার জন্যে আপনাদের মুখ চেয়ে আছি।’দিদার শাহ বললেন—“সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’, এটা বলার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে! দুনিয়ায় কতজন সত্য কাজে রাজি আছে। আর তুমি বলছো ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’। সাঁইজি দুনিয়ার লোককে নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, আমাদের জানার বাইরে বহু লোক আছে যারা সত্য কাজে রাজি আছে। আসলে কথাটা হবে ‘সত্য কাজে মন নয় রাজি’। আমার মন রাজি নেই, অনেকের মনও হয়তো রাজি নেই, তাই কথাটা হওয়া উচিত, ‘সত্য কাজে মন নয় রাজি/সব দেখি তা না না না।’ আর একটা কথা বললে—‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়’। এ কথাটাও ঠিক নেই। কারণ, কি জান?”সানোয়ার মন্ত্রমুগ্ধের মতো গুরু দিদার শাহের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—‘কি গুরু?’বাউলগুরু দিদার শাহ বললেন—“ধর্মের ক্ষতি গোপনে করলেও হয় প্রকাশ্যে করলেও হয়। রোজা রেখে গোপনে ডুব দিয়ে পানি খেলে কি রোজা ভাঙে না মনে করছো! তাই ওই কথাটা বলা ঠিক না—‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়।’ আসলে, কথাটা হওয়া উচিত ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে জাতের কী ক্ষতি হয়।’ তা ছাড়া, এই গানটাও তো জাতের গান।”লালন সাঁইজির গানের প্রচলিত পাঠের সঙ্গে দিদার শাহের বলা পাঠের এই অমিল নিয়ে আমি পরে আরেক সাধুসঙ্গে কুষ্টিয়ার ঘোড়ামারা-ভেড়ামারা গ্রামের রওশন ফকিরের সাথে আলাপ করি। রওশন ফকির (৫৪) বলেন—“দিদার শাহ প্রবীণ সাধু-গুরু, তাঁর কথাকে আমরা অমান্য করতে পারি না। তবে, কথা আছে। সাঁইজির বাণীর কথাবস্তুর অন্য অর্থও আমাদের ভেবে দেখতে হয়, এই গানের বাণীতে বলা ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’ কথাটাকে যদি আমার দেহবস্তুর দিকে তাকিয়ে বিবেচনা করি তাহলে তো কথাটা ঠিক আছে—আমার দেহের কোনো কিছুই অর্থাত্ রিপুর বিষয়গুলো কেউই তো সত্য কাজে রাজি নেই, সব সময় তারা তা না না না করে ফিরছে। তাদেরকে রাজি করানোর জন্যই সাঁইজির এই হুঁশিয়ারি ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’।”বাংলাদেশের সাধুসঙ্গে প্রতিনিয়তই গানের বাণীর এমন পাঠ-পাঠান্তর হয়ে থাকে। আর নিশ্চিতভাবেই হয়ে থাকে মুখে মুখেই, তাই প্রায় প্রতি সাধুসঙ্গেই এক একটি গান নতুন নতুনভাবে ব্যাখাত হয়। এ বিষয়টি নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ খুঁজে ফিরব। আজ এটুকুই।