
সুকান্ত ভট্টাচার্য বইটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন এই কবিকে আমরা ভুলতেই বসেছি। ‘কিশোর কবি’ অভিধায় অভিহিত বাংলা সাহিত্যে আসন করে নেওয়া সুকান্তের জন্ম বা মৃত্যুদিবস পাকিস্তান আমলেও যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো। এমনকি ঢাকায় তাঁর স্মরণে গড়ে উঠেছিল ‘সুকান্ত একাডেমি’ নামের প্রতিষ্ঠান। এসব সম্ভবত এখন অতীতের বিষয়। ফলে মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের লেখা সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই জীবনীগ্রন্থের প্রকাশ আমাদের মনে করতে বাধ্য করল যে ‘কিশোর কবি’ স্মরণযোগ্য। তাঁর কাব্যকৃতি, কর্মবহুল সংক্ষিপ্ত জীবন ভোলার নয় এবং নানা বিচারেই তা দৃষ্টান্তস্থানীয়।
আলোচ্য বইটি ছোট আকারে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। বর্তমানটি এর বর্ধিত সংস্করণ। এখানে ‘সবিনয় নিবেদন’-এ মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের ভাষ্য এমন: ‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক পরিবেশে সুকান্ত-চর্চা চোখে পড়ে না। বিত্তহীন, গরিব, মুটে, মজুর ও কৃষকদের কথা এখন রাজনীতি ও সাহিত্যে তেমন স্থান পায় না। এমনকি বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাহিত্য-শিবিরেও সুকান্ত নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।’
এই জীবনী বইয়ে অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় সুকান্তর শৈশব-কৈশোর ও তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রায় বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন তিনি। তুলে ধরেছেন তাঁর পরিবারের বিবরণ, নিত্যসঙ্গী তাঁদের দারিদ্র্যের কথাও। আর এসবের ভেতরেই যে সুকান্তর কাব্যচর্চার শুরু, জাহাঙ্গীর খুবই সুন্দরভাবেই লিখেছেন সে প্রসঙ্গ, ‘সুকান্তর কবি-জীবন সত্যিকার অর্থে শুরু হয় যখন তার বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এসে পড়েছে কলকাতায়ও। মানবতা তখন লাঞ্ছিত। যুদ্ধের তাণ্ডবলীলা চোখের সামনে তখনো দেখা না গেলেও এর ভয়াবহতা অনুমান করে সবাই শঙ্কিত। এ সময় সুকান্ত বেশ কিছু কবিতা লেখেন। পূর্বাভাস গ্রন্থে এসব কবিতা সংকলিত হয়েছে।’
>সুকান্ত ভট্টাচার্য মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা প্রকাশক: বাতিঘর, চট্টগ্রাম প্রকাশকাল: জুলাই ২০১৬ ৯৫ পৃষ্ঠা * দাম: ১৫০ টাকা।
এসবই সুকান্তের আনুষ্ঠানিক কবি-জীবনের শুরুর কথা। এর পরপরই এই কবি দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় মানবতার চরম ভূলুণ্ঠনের দৃশ্য, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, সংখ্যাহীন মানুষের মৃত্যু। তবে এসব কিছু তিনি শুধু অবলোকনই করেননি, মানবতার লাঞ্ছনার অপনোদনে রেখেছেন সক্রিয় ভূমিকা। ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ গঠিত হলে ক্রমেই তিনি চলে এলেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির সংস্পর্শে। নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষের মুক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য—তাঁর সময়কার সবচেয়ে অল্পবয়সী পার্টি-সদস্যও বটে। সে সময় নিয়মিত মিছিলে যাওয়া, সভা-সমিতি করা হয়ে উঠল তাঁর দায়িত্বের অংশ। এখানেই শেষ নয়, অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন গঠিত ‘কিশোর বাহিনী’র সক্রিয় সংগঠক ও নেতা। তাঁরই উদ্যোগে শহরে-নগরে—সর্বত্র গড়ে উঠল ‘কিশোর বাহিনী’। এভাবে মাত্র ২১ বছরের আয়ুষ্কালের জীবনে সমগুরুত্বের সঙ্গে সুকান্ত যেমন চালিয়েছেন রাজনৈতিক-সাংগঠনিক তৎপরতা, তেমনি তাঁর সাহিত্যসাধনাও চলেছে সমানতালে। বইটিতে এই তথ্যগুলো আছে সবিস্তার।
সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর লেখক আমাদের জানাতে ভুল করেননি, কবির সবগুলো বই-ই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর। ‘বই পরিচয়’ অধ্যায়ে আছে রচিত বইয়ের নাম ও সেগুলোর বিষয়-বিবরণ। আর সুকান্তর মৃত্যুর বিবরণও আলোচ্য বইয়ে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায়।
বইয়ের শেষে আছে সুকান্তর হাতের লেখা, রয়েছে সুকান্তের বড় বৌদিসহ তাঁকে চিনতেন ও জানতেন এমন মোট ১৯ জন সাহিত্যিক ও কবির স্মৃতিচারণমূলক লেখা, যেগুলোর ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনের সামগ্রিক ছবি।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনকথা যে এখনো খুবই প্রাসঙ্গিক ও অনুসরণযোগ্য, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের এই জীবনীর ভেতর দিয়ে তা সুপরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।