বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেদিক থেকে বইয়ে সবচেয়ে বেশি জায়গা নিয়েছে তুলনামূলক কম আলোচিত একটি উপন্যাস এই বসন্তে। বইটি গত শতকের আশির দশকের বাংলাদেশের গ্রাম ও মফস্বলের এক ক্ল্যাসিক উপস্থাপনা। বেশ বড় কাঠামোয় অথচ কম কথায় সামষ্টিক প্রতিরোধ-প্রবণতায় ব্যক্তির ভূমিকা পরীক্ষিত হয়েছে উপন্যাসটিতে। এ উপন্যাসের দার্শনিক আকাঙ্ক্ষাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঠিক দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা নয়, কিন্তু একই ঘটনাকে বহুস্তর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবার সাফল্য আছে হুমায়ূনের অপর উপন্যাস প্রিয়তমেষুতে। ধর্ষণের মতো একটি অতি স্পর্শকাতর বিষয়কে আইনি-নৈতিক-সামাজিক-আর্থিক ইত্যাদি বিচিত্র স্তরে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করার জন্য ঔপন্যাসিক এ গ্রন্থে অবলীলায় প্রয়োজনীয় কাঠামো নির্মাণ এবং চরিত্র-সমাবেশ করেছেন। আর সম্ভাব্য ক্ষুদ্রতম পরিসরে সাফল্যের সঙ্গে কাজটি করতে পেরেছেন। আঙ্গিক ও গল্প উপস্থাপনের নিপুণ নিরীক্ষা আছে ক্ষুদ্র উপন্যাস গৌরীপুর জংশনে। এক মাজুর কুলির জবানে, তারই দৃষ্টিকোণ ও জীবনদৃষ্টিকে নিঃশেষে ব্যবহার করে পুরো গল্পটি বলার জটিল সাফল্য আছে উপন্যাসটিতে। রচনাটি বাস্তববাদী কাজের দারুণ নজির হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হুমায়ূনের লিপ্ততা রীতিমতো বিপুল। আছে বেশ কয়েকটি উপন্যাস। আকারে বড় উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্তরকে একসঙ্গে ধরতে চেয়েছে। অবশ্য প্রকৃতির দিক থেকে রচনাটি সব সময় উপন্যাসসুলভ নিরাসক্তি বজায় রাখতে পারেনি। আগুনের পরশমণি ঢাকার গেরিলা অপারেশননির্ভর রচনা হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা শহরের অন্যতম নির্ভরযোগ্য চিত্রায়ণ আছে এ উপন্যাসে। তবে নান্দনিক আয়োজনের সফলতার বিচারে হুমায়ূনের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভবত ১৯৭১। একটা গ্রামকে বাংলাদেশের প্রতীক বানিয়ে নিয়ে তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ও যুদ্ধকালীন জনজীবনের অনেকগুলো মাত্রা সূক্ষ্মভাবে ধরার সাফল্য আছে এ উপন্যাসে। ১৯৭১ হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা।

জনপ্রিয় ধারার লেখালেখিতে হুমায়ূন পুরো বাংলা সাহিত্যেই অনন্য। বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, ফ্যান্টাসি, মিসির আলি ও হিমু সিরিজ ইত্যাদির ক্ষেত্রে হুমায়ূনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব নিজস্বতা প্রতিষ্ঠা করতে পারা। সে নিজস্বতায় লেখক হিসেবে তাঁর নিজের বিশিষ্টতাগুলো পরিষ্কার পড়া যায়। আবার দেশ-কালের আবহের মধ্যে চরিত্র বা ঘটনাগুলো স্থাপন করার অনায়াস মুনশিয়ানাও উপভোগ্য। এদিক থেকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি শূন্য বিশেষ মনোযোগের দাবিদার। বড় ল্যাবরেটরি বা মহাকাশ অভিযানের মতো উপাদান ব্যবহার না করে এ রচনায় হুমায়ূন বেছে নিয়েছেন গণিত, আর এভাবে বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে সম্ভব করেছেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। মিসির আলি সিরিজের অনেকগুলো বই ঢাকা শহরের জনবহুলতায় বা গ্রামবাংলার নিস্তরঙ্গ জনজীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারার সাফল্যে উজ্জ্বল। নিশীথিনী এ তালিকার খুব উল্লেখযোগ্য রচনা, যেখানে ফ্যান্টাসি, ভীতি, মনোরোগ এবং তদন্তের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাঠামো একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে পাঠকপ্রিয় উপাদানের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রদর্শনীর দিক থেকে তিনটি বড় গল্পের সংকলন ভয়ও আলাদা মনোযোগ পাওয়ার মতো। সিরিজের চতুর্থ গ্রন্থ দরজার ওপাশে হিমু সিরিজের আদর্শস্থানীয় রচনা হিসেবে গণ্য হতে পারে। একটা আইডিয়াকে কেন্দ্র করে হিমুর লৌকিক-অলৌকিক কলার নিটোল উপস্থাপনা উপন্যাসটিতে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। হিমুর প্রতিষ্ঠিত চরিত্রবৈশিষ্ট্যকে আলগোছে কাজে খাটিয়ে রচিত হয়েছে এ সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ রচনা হলুদ হিমু কালো র‌্যাব। বাংলাদেশের এক বিশেষ বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে হাস্যরসিকতায় তরল করে আনার সাফল্যের নমুনা হিসেবে এ রচনা হয়তো আরও বহুদিন গুরুত্বের সঙ্গে পঠিত হবে।

default-image

ফ্যান্টাসি হুমায়ূনের নিজস্ব কুশলতার এলাকা। জনজীবনের ভাঁজে ভাঁজে পাঠককে প্রায় বুঝতে না দিয়ে ফ্যান্টাস্টিক উপাদান চারিয়ে দেওয়া বা পুরো লেখাটিকে দৈনন্দিনতার ছলে ফ্যান্টাসি বানিয়ে ফেলা হুমায়ূনের সহজাত ক্ষমতার অংশ। তবে আলাদা করে ফ্যান্টাসি বলা যায়, এমন রচনার সংখ্যাও তাঁর প্রচুর। এ ধরনের রচনার মধ্যে নি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যান্টাসির ছলে এখানে আসলে প্রেম-ধারণার এক অতি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পরীক্ষা করেছেন লেখক। কায়দাটা হয়েছে ভারি সুন্দর। কেউ একজন চাইলে একে মজাদার ফ্যান্টাসি হিসেবেও পড়তে পারেন। আবার ফ্যান্টাসি অনুসরণ করতে করতে আস্বাদন করতে পারেন দৈনন্দিন বাস্তবতার বিচিত্র আয়োজন। প্রেমের তুমুল প্রতিষ্ঠার জন্য লেখককে এর বাইরে আলাদা কোনো আয়োজন করতে হয়নি।

নি উপন্যাসের সূত্রেই বলা দরকার, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে প্রেম-ধারণার তত্ত্বায়ন ও রূপায়ণের অন্যতম প্রধান শিল্পী। প্রেমমাত্রই অসামাজিক এবং সে কারণেই ফ্যান্টাস্টিক—এ রকম একটা ধারণাকে ভিত্তি করে অনেকগুলো সফল প্রেমের উপন্যাস রচনা করেছেন তিনি। সামাজিকভাবে স্বীকৃত হওয়ার সম্ভাবনা কম—সে বয়সজনিত ব্যবধানের জন্যই হোক, আর শ্রেণি বা স্বভাবগত ফারাকের জন্য হোক—এমন পরিস্থিতিতেই জন্ম নেয় প্রেমের তুরীয় আকর্ষণ। এ কারণেই হুমায়ূনের রচনায় প্রেম প্রায়ই ট্র্যাজিক। আমার আছে জল নামের ছোট নির্মেদ কিন্তু কুশলী রচনাকে এ ধরনের রচনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। দ্বৈরথ, কৃষ্ণপক্ষ, নবনী, যখন গিয়াছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ ইত্যাদি বেশ কিছু রচনায় বাস্তব জীবনের প্রত্যক্ষতায় হুমায়ূনের বিশিষ্ট ও অপূর্ব প্রেম-ধারণা নিটোল উপন্যাসের আকার পেয়েছে। সাহিত্যে নর-নারীর সম্পর্কের উপস্থাপন এবং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও এ রচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

ভাটিবাংলার রূপাঙ্কন এবং ওই স্থানিকতাকে বিচিত্র শৈল্পিক ফর্মে অনুবাদ করতে পারা হুমায়ূন আহমেদের শিল্পীজীবনের অন্যতম প্রধান অর্জন। বলা যাবে, সাহিত্যের মূলধারায় হুমায়ূনই বাংলাদেশের ওই বিশিষ্ট অঞ্চলের সাহিত্যিক প্রতিনিধি। ভাটিবাংলাকেন্দ্রিক উপন্যাস অচিনপুর ফেরা শুধু হুমায়ূনের নয়, বাংলাদেশের সাহিত্যেরই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উপন্যাস। অচিনপুর ভাটি অঞ্চলের এক স্বপ্নময় উপস্থাপন, আর ফেরা উপন্যাসে অসাধারণ মানবিক আখ্যান শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে মানবিক প্রতিরোধ-সংগ্রামে। ভাটি অঞ্চলের সফল রচনাগুলোর তালিকায় আরও পড়বে মধ্যাহ্ন। হুমায়ূন মুখ্যত ছোট উপন্যাস ও ছোটগল্পের কুশলী কারিগর। বড় উপন্যাসের শৈল্পিক সমুন্নতি রক্ষা করা তাঁর পক্ষে খুব একটা সম্ভব হয়নি। মধ্যাহ্ন উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডও কাহিনি ও চরিত্রের সামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু অতীত জীবনের প্রাত্যহিকতা, হিন্দু-মুসলমানের জীবনযাপনগত স্বাতন্ত্র্য ও যৌথতা এবং ইতিহাসের ধারাক্রম নির্মাণের ক্ষেত্রে মধ্যাহ্ন প্রথম খণ্ড হুমায়ূনের তো বটেই, বাংলাদেশের সাহিত্যেরও অন্যতম প্রধান উপন্যাস।

আমরা এ তালিকায় এখন পর্যন্ত লেখকের প্রথম দুই রচনার নাম নিইনি। নন্দিত নরকে শঙ্খনীল কারাগার নামের উপন্যাস দুটি তাঁর খুব গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে স্বীকৃত। মধ্যবিত্ত পারিবারিক কাহিনি নির্মাণের সাফল্যে এবং একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে উপন্যাসের বেশ অনেকগুলো কুশলতার সাক্ষাৎ পাওয়ার দিক থেকে উপন্যাস দুটি হুমায়ূনের রচনাধারায় নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা এখানে যেসব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর প্রধান রচনাগুলোর একটা কাজচলতি তালিকা করলাম, সেদিক থেকে বলা যায়, এ দুটো তুলনামূলক কম তাৎপর্যপূর্ণ।

আজকাল হুমায়ূনপাঠের পরিসর প্রসারিত হচ্ছে। একাডেমিক গবেষণা হয়েছে বা হচ্ছে অনেকগুলো। তার দু-একটা বই হয়েও বেরিয়েছে। আশা করা যায়, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো এসব গবেষণায় ক্রমশ শনাক্ত হবে এবং এভাবে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের মূলধারার পঠন-পাঠনে সংস্কারমুক্ত মনোভঙ্গিতে গৃহীত হবেন।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন